সাহিত্যিকা

বলিউডের বাঙ্গালী কিংবদন্তিরা ও নায়ক বিশ্বজিতের উত্থান।

বলিউডের বাঙ্গালী কিংবদন্তিরা ও নায়ক বিশ্বজিতের উত্থান।
© প্রদীপ ভৌমিক, ১৯৭৪ মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং

বম্বের সিনেমা জগতে বাঙ্গালী কৃতি গুণীজনদের নিয়ে লিখতে গিয়ে যদি কারও নাম বাদ থেকে যায়, সে আমার অনিচ্ছাকৃত অজ্ঞতা। আমার এই অনিচ্ছাকৃত অজ্ঞতাকে দয়া করে ক্ষমা করবেন।

********

১৯৩০ দশকের কথা। হিমাংশু রায় জার্মানির স্টুডিয়োতে কয়েকটি ইংরেজী সিনেমা প্রযোজনা করেছিলেন, যার মধ্যে অন্যতম ছিল Light of Asia, গৌতম বুদ্ধের জীবন অবলম্বনে। ‘৩০ দশকে জার্মানীতে নাৎসী দলের প্ররোচনায় ও আর্থিক সহায়তায় কিছু প্রোপাগান্ডা সিনেমা বানাবার ঝোঁক শুরু হলো। আর সিনেমা স্টুডিয়োগুলি এই প্রলোভনে প্রোপাগান্ডা সিনেমা তৈরির ঝোঁকে হিমাংশু রায়ের চুক্তি বাতিল করলো। এরপরই ১৯৩৪ সালে দেশে ফিরে কিংবদন্তি হিমাংশু রায় ও উনার স্ত্রী দেবীকা রানী মুম্বাইয়ের মালাড অঞ্চলে একজন পারসীর থেকে ১৮ একর জমি লিজ নিয়ে বম্বেটকিজ স্টুডিয়ো স্থাপন করলেন, আর কয়েকজন অভিজ্ঞ জার্মান টেকনিশিয়ান ও পরিচালকদের বম্বেটকিজে নিয়ে এলেন। এরমধ্যে ছিলেন চিত্রপরিচালক Franz Osten ও Cinematographer, Joseph Wirsching ও আরো কয়েকজন। Joseph Wirsching এরপর আর নিজের দেশে ফিরে জাননি। বম্বেটকিজের প্রযোজনায় প্রায় সমস্ত সিনেমায় উনিই Cinematographer ছিলেন। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় পরাধীন ভারতের বৃটিশ শাসক ভারতে অবস্থিত জার্মানদের সন্দেহের চোখে দেখতো। সেই সময় উনাকে ভারতের বিভিন্ন জেলে থাকতে হয়েছিল। স্বাধীনতার পর উনি জেল থেকে মুক্তি পান। ভারত স্বাধীন হবার পর উনি বেশ কিছু হিন্দি সিনেমায় কাজ করেছিলেন। যেমন মহল, পাকিজা, ইত্যাদি। এরপর আমাদের দেশেই তিনি পরলোক গমন করেন।

এরপর বাঙ্গালী লেখক, চিত্রনাট্যকার, সিনেমা ও সঙ্গীত পরিচালক, টেকনিশিয়ান, নায়ক-নায়িকাদের মুম্বই চিত্রজগতে আগমন শুরু হয়। শশধর মুখার্জী বম্বেটকিজে হিমাংশু রায়ের সহকারী হয়ে যোগ দিলেন। নিরঞ্জন পাল (অগ্নিযুগের বিপ্লবী বিপিন চন্দ্র পালের পুত্র) প্রথম থেকেই হিমাংশু রায়ের সঙ্গে ছিলেন। তিনি সিনেমার গল্প ও চিত্রনাট্য লিখতেন। অশোক কুমারের নায়ক জীবনের সূত্রপাত এখানেই। এই নিয়ে একটা ঘটনা আছে। বম্বেটকিজে দেবীকা রানীই সিনেমার নায়িকার ভুমিকায় কাজ করতেন। সেই সময় পাঞ্জাবের শিক্ষিত ও সুদর্শন যুবক নাজাম-উল-হাসান বম্বেটকিজে যোগ দিয়ে দেবীকা রানীর সঙ্গে নায়কের ভুমিকায় দুটি সিনেমাও করেন। এরপর এই জুটির তৃতীয় সিনেমা ‘জীবন নাইয়ার’ কাজ শুরু হলে শুটিং চলাকালীন এক রাত্রে নায়ক ও নায়িকা কলকাতায় পালিয়ে যান। উদ্দেশ্য নিউ থিয়েটার্সে যোগ দেওয়া। হিমাংশু রায় বিধ্বস্ত হলেন। একদিকে সমাজে অপদস্থ হওয়া আর অন্যদিকে আর্থিক ক্ষতি। উনি বন্ধু শশধর মুখার্জীকে কলকাতায় পাঠালেন দেবীকা রানীকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে বম্বেটকিজে ফিরিয়ে আনার জন্য। দেবীকা রানী ফিরে এলেন কয়েকটি শর্তে। নায়িকার ভুমিকায় কাজ করার জন্য উনাকে আলাদা পারিশ্রামিক দিতে হবে, আর বম্বেটকিজের সহকর্নধার হিসাবে যোগ্য সন্মান দিতে হবে। এই ঘটনার পর শশধর মুখার্জীর শ্যালক অশোক কুমার বম্বেটকিজ প্রযোজিত ‘জীবন নাইয়া’ সিনেমায় দেবীকা রানীর বিপরীতে নায়কের ভূমিকায় প্রথম অভিনয় করলেন। হিমাংশু রায়ের মূত্যুর পর দেবীকা রানী বম্বেটকিজের কর্ণধার হয়েছিলেন। দেবীকা রানীকে বলা হয় The First Lady of Indian Cinema। তিনিই প্রথম ‘দাদা সাহেব ফালকে’ পুরষ্কারে ভূষিত হন।

বম্বেটকিজ স্টুডিও বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর শশধর মুখার্জী ‘ফিল্মালয়’ স্টুডিয়ো স্থাপন করলেন। বিমল রায় কলকাতার নিউ থিয়েটার্স স্টুডিয়ো ছেড়ে মুম্বাইয়ে এসে পাড়ি জমালেন। এবার শশধর মুখার্জী ও বিমল রায়ের হাত ধরে অনেক বাঙ্গালী বলিউডে এসে পরবর্তী জীবনে নিজেদেরকে কিংবদন্তী রূপে প্রতিষ্ঠা করেন। যেমন শচীন দেব বর্মন, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, সলিল চৌধুরী, মান্না দে, হৃষিকেশ মুখার্জী, রাহুল দেব বর্মন, কিশোর কুমার ও আরো অনেকে। শচীন দেব বর্মন বাংলার মাটির সুর হিন্দী সিনেমার সুরে মিলিয়ে এক সুরের যাদু সৃষ্টি করলেন যা সারা দেশকে মোহাবিষ্ট করে দিলো। সলিল চৌধুরীর প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সুরের সংমিশ্রন দর্শককে এক নতুন দিগন্তের সন্ধান দিল। সলিল চৌধুরীর কথায় পঞ্চম (আর ডি বর্মন) ছিলেন এক ক্ষনজন্মা প্রতিভা, কমার্শিয়াল সিনেমার ঘৃতাহুতিতে তাঁর প্রতিভার অনেকটাই জ্বলে পুড়ে শেষ হয়ে গিয়েছিল। ১৯৬৬ সালে উনার সুরে ‘তিসরী মঞ্জিল’ সিনেমার গানে অভিভূত হয়েছিলো তরুন প্রজন্ম। একাধিকবার উনি ফিল্মফেয়ার সেরা সঙ্গীত পরিচালকের পুরস্কার পেয়েছিলেন। ১৯৯৪ সালে 1942: A Love Story সিনেমায় তিনি শেষ বার শ্রেষ্ঠ সংগীত পরিচালকের সন্মান অর্জন করেন। সন্মান পান তাঁর মৃত্যুর পর, মাত্র ৫৫ বছর বয়সে। গায়ক কিশোর কুমারের প্রথাগত সংগীত শিক্ষা না থাকা সত্বেও ভারতের এই অন্যতম শ্রেষ্ঠ গায়ক লক্ষ লক্ষ মানুষের হৃদয় জয় করেছিলেন। অন্যদিকে হিন্দি সিনেমার ক্ল্যাসিকাল রাগাশ্রিত প্লেব্যাক গানে মান্না দে অপরিহার্য হয়ে উঠলেন।

চিত্র পরিচালক বিমল রায় সামাজিক ন্যায় ও বিচারের পটভুমিকায় দিয়েছিলেন তাঁর কিছু বিখ্যাত সিনেমা ‘দো বিঘা জমিন’, ‘পরিনীতা’, ‘দেবদাস’, ‘সুজাতা’, ‘বন্দিনী’, ‘মধুমতী’, ইত্যাদি। ‘মধুমতী’ সিনেমার চিত্রনাট্য লিখেছিলেন ঋত্বিক ঘটক। বিমল রায় সাতবার ফিল্মফেয়ার শ্রেষ্ঠ চিত্রপরিচালকের পুরষ্কার পেয়েছিলেন। পরবর্তীকালে হৃষিকেশ মুখার্জী, বাসু চ্যাটার্জী, বাসু ভট্টাচার্য, ইত্যাদি চিত্র পরিচালকদের সিনেমা দর্শকদের প্রশংসা অর্জন করেছিলো। কে ভুলতে পারে হৃষিকেশ মুখার্জীর ‘আনন্দ’, বাসু চ্যাটার্জীর ‘রজনী গন্ধা’, বাসু ভট্টাচার্যের ‘তিসরী কসম’, ইত্যাদি সিনেমা! এর পাশাপাশি বানিজ্যিক সিনেমায় নিজেকে প্রতিষ্ঠা করলেন শক্তি সামন্ত, প্রমোদ চক্রবর্তী, অজয় বিশ্বাস, শচীন ভৌমিক, ও আরও কয়েকজন।

কুমুদ রঞ্জন গাঙ্গুলি বম্বেটকিজের ফিল্ম ল্যাবরেটরিতে কেমিস্ট ছিলেন। তখন নায়কের অভাব হওয়ায় শশধর মুখার্জী উনার শালা বম্বেটকিজের কর্ণধার হিমাংশু রায়ের কাছে কুমুদ রঞ্জনের নাম প্রস্তাব করেন। ছবির নায়িকা ছিলেন দেবীকা রানী যাকে কুমুদ রঞ্জন খুবই ভয় পেতেন। তাঁর কাছাকাছিও কুমুদ রঞ্জন আসতেন না। উপায় না দেখে কুমুদ রঞ্জন উকিল পিতাকে চিঠি লিখলেন। কুমুদ রঞ্জনের পিতা ঠিক করলেন ছেলেকে মুম্বই থেকে ফিরিয়ে নিয়ে যাবেন। হিমাংশু রায় তখন কুমুদ রঞ্জনের বাবার সঙ্গে কথা বলে উনাকে রাজী করান। অশোক কুমার নাম দিয়ে ‘জীবন নাইয়া’ সিনেমায় দেবীকা রানীর বিপরীতে কুমুদ রঞ্জনকে নায়কের অভিনয় করানো হলো। জীবন নাইয়া’ হিট করেছিল। অশোক কুমারকে এরপর আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। ১৯৩০-১৯৫০ দশকের সময়ে অশোক কুমার বম্বের মহানায়কের ভুমিকায় পরিচিত ছিলেন।

সিনেমায় কত রকমের মোড় ও ঘটনা থাকে! স্বামী হিমাংশু রায়ের মৃত্যুর পর দেবীকা রানী বম্বেটকিজের কর্ণধার হলেন। ১৯৪৪ সালে অল্প কিছুক্ষনের সাক্ষাতে দেবীকা রানী দিলীপ কুমারকে বম্বেটকিজের নায়ক নির্বাচন করলেন। তখনকার দিনে শিল্পীরা স্টুডিয়োর সঙ্গে যুক্ত হয়ে মাসিক পারিশ্রমিক চুক্তিতে কাজ করতেন। দিলীপ কুমারের পারিশ্রমিক মাসে ১২০০ টাকা, যা সেইসময় অকল্পনীয়। রাজকাপুর তখন সিনেমার সহ পরিচালক হিসাবে কাজ করতেন, পারিশ্রমিক ছিল মাসিক ১৫০ টাকা। অশোক কুমারের পরবর্তীকালে বাঙ্গালী নায়ক এসেছিলেন প্রদীপ কুমার, জয় মুখার্জী ও বিশ্বজিত। উত্তমকুমার হাতে গোনা কয়েকটি হিন্দি সিনেমায় অভিনয় কারেন। বম্বের সফল তারকা মিঠুন চক্রবর্তী এসেছিলেন আরও অনেক পরে।

শশধর মুখার্জী বম্বেটকিজের ব্যনারে তিনটি সিনেমা তৈরি করেন কঙ্গন (’৩৯), বন্ধন (’৪০), ঝুলা (’৪১)। ১৯৫৩ সালে উনি রায়বাহাদুর চূণীলাল, অশোক কুমার ও জ্ঞান মুখার্জী একত্রে ফিল্মিস্তান স্টুডিও স্থাপন করেন ও আনারকলি (’৫৩), নাগিন (’৫৪), জাগৃতি (’৫৪), মুনিমজী (’৫৫), তুমসা নাহি দেখা (’৫৭), পেয়িং গেস্ট (’৫৭) এরকম অনেক বানিজ্যিক সফল সিনেমা প্রযোজনা করেন। এরপর উনি নিজস্ব প্রডাকশন হাউস ফিল্মালয় প্রতিষ্ঠা করে দিল দেখে দেখো (’৫৯), লাভ ইন সিমলা (’৬০), এক মুসাফির এক হাসিনা (’৬২), লিডার (’৬৪) ইত্যাদি হিট সিনেমা উপহার দেন।

শশধর মুখার্জীর ছেলে হওয়ার সুবাদে জয় মুখার্জী বেশ কিছু সিনেমায় সুযোগ পান। এবং বেশ কিছু সিনেমা বক্স অফিসে জনপ্রিয়তা লাভ করে। প্রদীপ কুমার ১৯৫৩ সালে ‘আনার কলি’ সিনেমায় নায়িকা বীণা রাইয়ের বিপরীতে ও ১৯৫৪ সালে নায়িকা বৈজয়ন্তীমালার বিপরীতে ‘নাগিন’ সিনেমায় অভিনয় করে বিখ্যাত হন। এরপর নায়িকা মধুবালা ও মীনাকুমারীর রিপরীতেও বেশ কিছু সিনেমায় অভিনয় করেন। তবে ৬০ এর দশক থেকে উনার কাজের সংখ্যা কমতে লাগলো। ১৯৬৭ সালে উনি মহানায়ক উত্তম কুমার ও মহানায়িকা সুচিত্রা সেনের সাথে বাংলা সিনেমা ‘গৃহদাহ’ অভিনয় করেন।

১৯৫৫ সালে বিমল রায়ের ‘দেবদাস’ ছবিতে এলেন বাংলার মহানায়িকা সুচিত্রা সেন। এরপর তাঁকে আমরা পেয়েছি ঋষিকেশ মুখার্জির ‘মুসাফির’ (’৫৭), রাজ খোসলা পরিচালিত দেবানন্দের বিপরীতে ‘বম্বাই কা বাবু’ (’৬০), অসিত সেনের ‘মমতা’ (’৬৬) সিনেমায়। তারপর হঠাতই উনি অন্তরালে চলে গেলেন। পরে আবার ১৯৭৫ সালে একবার ফিরে এসেছিলেন গুলজারের ‘আধি’ সিনেমায়।
এরপর ১৯৬০ এর দশকে এলেন শর্মিলা ঠাকুর, রাখী ও মৌসুমী ।

সেই সময় কয়েকজন বিখ্যাত বাঙ্গালী ফটোগ্রাফার বম্বেতে আসেন। যেমন রাধু কর্মকার, কমল বোস, নিতিন বোস, অসিত সেন। নিতিন বোস ও অসিত সেন সিনেমা পরিচালক হিসাবেও বিখ্যাত হয়েছিলেন। রাধু কর্মকার রাজ কাপুরের ‘আওয়ারা’ (১৯৫১) থেকে ‘রাম তেরি গঙ্গা ময়লি’ (১৯৮৫) পর্যন্ত প্রায় প্রতিটি সিনেমার ফটোগ্রাফার ছিলেন। ‘মেরা নাম জোকার’ সিনেমার জন্য জাতীয় পুরষ্কার পেয়ে ছিলেন, আর ৪ বার ফিল্মফেয়ার পুরস্কার পেয়েছিলেন ‘শ্রী ৪২০’, ‘মেরা নাম জোকার’, ‘সত্যম সুন্দর সুন্দরম’ ও ‘হেনা’ সিনেমার জন্য। বিমল রায়ের অনেক সিনেমার ফটোগ্রাফার ছিলেন কমল বোস। যেমন ‘দো বিঘা জমিন’, ‘পরিনীতা’, ‘দেবদাস’, ‘সুজাতা’, ‘পরখ’, ‘বন্দিনী’, ইত্যাদি ছবিতে।

একজনের নাম উল্লেখ করতেই হয় যাঁর গানের সুরেলা কন্ঠ দেশকে মাতিয়ে রেখেছিল ও এখনও রাখছে। উনার আয়ু ছিল অল্প, মাত্র ৪১ বছর। তিনি মহাগায়িকা গীতা দত্ত। তাঁর রিন রিনে করুন বিষন্ন কন্ঠ শচীনদেব ব্যবহার করলেন ‘দুই ভাই’ ( ১৯৪৭) সিনেমায় – ‘মেরা সুন্দর সপনা বীত গয়া’ গানের মাধ্যমে। বহুবার শচীন কর্তা গীতা দত্তের বিশেষ সুরেলা কন্ঠের ব্যাবহার করেছিলান যেখানে গ্রাম বাংলার গান ও কীর্তনাঙ্গ সুর হিন্দী সিনেমায় এক বিশেষ স্থান অধিকার করেছিল। এছাড়াও আছে বাংলা ও অন্যান্য আঞ্চলিক ভাষায় গান। চলচ্চিত্রে শেষ গান ছিল কানু রায়ের সুরে ‘অনুভব’ সিনেমায় ( ১৯৭১) – ‘মুঝে জান না কহো মেরি জান’। অসুস্থ শরীরে তিনি এই গানের রেকর্ডিং করেছিলেন। সংসার জীবনে উত্থান পতনের কারনে উনার একাগ্রতার সঙ্গে গান গেয়ে যাবার সৌভাগ্য হয়নি। তা সত্বেও মাত্র ১৫ বছরের সঙ্গীত জীবনে শুধু হিন্দী গান গেয়েছিলেন প্রায় ১২০০। এখনও নিজেদের মধ্যে আলোচনা হয় ‘লতা কন্ঠী’ বা ‘আশা কন্ঠী’ হওয়া যায়। কিন্তু ‘গীতা কন্ঠী’ হওয়া যায়না।
ওয়াক্ত নে কিয়া ক্যা হাসিন সিতম
তুম রহে না তুম, হাম রহে না হাম ……..
স্বামী গুরু দত্তের ক্লাসিক ‘কাগজ কা ফুল ‘ সিনেমায় গীতা দত্তের কন্ঠে গানটা শুনতে শুনতে সিনেমা প্রেমিক মানুষ স্মৃতিমেদুর হয়ে উনাদের নিঃসঙ্গতা ও ট্রাজেডির কথা অনুভব করে।

হেমন্ত মুখোপাধ্যায় বম্বেতে এসে হেমন্তকুমার নামে পরিচিতি লাভ করেন। ১৯৫৪ সালে ‘নাগিন’ সিনেমার সঙ্গীত পরিচালনা করে বলিউডে বিখ্যাত হন। ঈশ্বরপ্রদত্ত কন্ঠে উনি অনেক সিনেমায় হিট গানে প্লেব্যাক করেন। পাশাপাশি উনি কিছু সিনেমার প্রযোজনা ও সঙ্গীত পরিচালনা করতে থাকেন। উনার প্রথম হিন্দী সিনেমা প্রযোজনা ‘বিশ সাল বাদ’, নায়ক বিশ্বজিতের প্রথম হিন্দী সিনেমা। নায়িকা ওয়াহিদা রহমান। হেমন্তকুমার বিশ্বজিতকে মুম্বাইয়ে নিয়ে আসেন। বিশ্বজিৎ কলকাতায় উত্তমকুমারের সঙ্গে ‘মায়ার সংসার’ ও ‘দুইভাই’ সিনেমায় কাজ করে বাংলা সিনেমায় জনপ্রিয় হয়েছিলেন। হেমন্তকুমারের কাছে মোকাবিলা ছিল তদানীন্তন পাঞ্জাবী-পেশোয়ারি নায়কদের মুম্বাইয়ের ফিল্ম জগতে প্রতিপত্তি, তার মধ্যে একজন নতুন বাঙ্গালী নায়ককে প্রতিষ্ঠা করা। সেই বিশ্বজিতের প্রথম হিন্দী সিনেমা হিট হয়েছিল। হেমন্তকুমারের সুরে ‘বিশ সাল বাদ’ সিনেমার গান অভূতপুর্ব জনপ্রিয় হয়েছিল। লতা মুঙ্গেশকারের কন্ঠে ‘কহি দীপ জ্বলে কহি দিল’ ও হেমন্তকুমারের ‘বেকরার করকে হামে ইউ না যায়ে’, ‘ইয়ে অপনা দিল তো আওয়ারা’ (সোলয়া সাল), ‘না তুম হামে জানো’ (বাত এক রাত কি), ‘ইয়াদ কিয়া দিল নে’ (পতিত), ইয়ে রাত ইয়ে চাঁদনী ফির কাহাঁ’ (জাল), ‘জানে ও ক্যায়সে লোগ থে’ (পিয়াসা), ‘ইয়ে নয়ন ডরে ডরে’ (কোহরা), ‘ছুপ গয়া কোই রে দূর সে পুকার কে’ (চম্পাকলি),
এইসব গানগুলি সিনেমা রসিক মানুষদের আজও স্মৃতিমেদুর করে তোলে। মনের কোনে অনুরনন তোলে। ৬০ এর দশকের শুরুতে বোম্বাই শহর তখন এক মায়াবী কুয়াশায় ঢাকা, আর সেই কুয়াশার বুক চিরে অদ্ভুত সাহসের জন্ম দিয়েছিলেন সুরের জাদুকর হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। আর বাংলার সুদর্শন যুবক বিশ্বজিৎ চট্টোপাধ্যায়কে বম্বের জাঁকজমকপূর্ণ রূপালি পর্দার কেন্দ্রস্থলে দাঁড় করিয়ে দেওয়া কেবল দুঃসাধ্য পদক্ষেপই ছিল না, বরং তাকে ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসের এক রাজকীয় মোড় বদল বলা যায়।

বোম্বাই পাড়ি দেওয়ার ঠিক আগেই বিশ্বজিৎ বাংলা ‘মায়ামৃগ” ‘দুই ভাই’ সিনেমায় নিজের অভিনয় প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছিলেন। কিন্তু হেমন্ত মুখোপাধ্যায় তাঁর মধ্যে দেখেছিলেন ‘প্যান ইন্ডিয়া’র আবেদন। ১৯৪৫ সালের সুপার হিট থ্রিলার ‘মহল’-এর পর হিন্দি সিনেমা যখন রহস্যধর্মী গল্পের রাস্তা হারিয়ে ফেলেছিল, তখনই হেমন্ত মুখোপাধ্যায় প্রযোজনা করলেন ‘বিশ সাল বাদ’। এর ফ্রেম আর সুরের মাঝে মিশে ছিল এক অদ্ভুত রহস্যময় আভিজাত্য, যা বম্বের পেশাদার জগতকে থমকে যেতে বাধ্য করেছিল। বিশ্বজিৎ ছিলেন সেই নতুনত্বের প্রতিনিধি, যার জন্য হেমন্তকুমার কেবল একজন মেন্টর ছিলেন না, ছিলেন এক বটবৃক্ষ।

‘বিশ সাল বাদ’ সিনেমার সেই চিরস্মরণীয় গান ‘কঁহি দীপ জ্বলে কঁহি দিল’ স্টুডিওতে রেকর্ডিং এর সময় ছিল এক অদ্ভুত নীরবতা। হেমন্ত মুখোপাধ্যায় ছিলেন কঠোর শৃঙ্খলাবদ্ধ সংগীত পরিচালক, যাঁর কাছে সুর ছিল উপাসনা। লতা মঙ্গেশকর যখন সেই ভূতুড়ে অথচ প্রেমাতুর সুরটি ধরলেন, তখন রেকডিং রুমের কাঁচের ওপার থেকে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে ছিলেন তরুণ বিশ্বজিৎ। লতাজী’র কণ্ঠে সেই সূক্ষ্ম কম্পন আর হেমন্তকুমারের সুরের গাম্ভীর্য মিলে এক অলৌকিক আবহাওয়া তৈরি করেছিল। বিশ্বজিৎ হয়তো জানতেন, এই গানটি কেবল একটি প্লেব্যাক নয়, এটি তাঁর ভবিষ্যতের ভাগ্যলিপি। ছবিটির দৃশ্যধারণের সময় যখন ধুনুচি নাচের তালে সেই রহস্যময় আবহ তৈরি করা হলো, তখন বিশ্বজিতের হেমন্ত’দা বলেছিলেন, “তুই শুধু নিজেকে স্বাভাবিক রাখিস, বাকি কাজ লতার কণ্ঠ আর আমার সুর করে দেবে।” সেই ভরসার জোর এতটাই দাপুটে ছিল যে, মুক্তির পর ছবিটি ভারতে সাসপেন্স থ্রিলার সিনেমার ইতিহাস গড়েছিল। বিশ্বজিৎ রাতারাতি হয়ে উঠলেন তারকা, যার পিছনে দাঁড়িয়ে ছিলেন দুই প্রবাদপ্রতিম নক্ষত্রের নিরবচ্ছিন্ন আশীর্বাদ।

ছবি: ‘বিশ সাল বাদ’ সিনেমার গানের স্টুডিয়োতে কোন এক মুহূর্তে।

সাফল্যের এই রেশ কাটতে না কাটতেই ১৯৬৪ সালে মুক্তি পায় ‘কোহরা’। ড্যাফনে দু মারিয়ের ‘রেবেকা’র ছায়ায় তৈরি এই ছবিতে হেমন্ত-বিশ্বজিৎ-লতা ত্রয়ী আবার নিজেদেরকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যান। ‘কোহরা’ মানে কুয়াশা, আর সেই কুয়াশাচ্ছন্ন আভিজাত্যের মায়ায় লতা মঙ্গেশকরের কণ্ঠ যেন এক মায়াবী কুহক তৈরি করেছিল। ‘ও বেকারার দিল’ বা ‘ইয়ে নয়ন ডরে ডরে’ এই গানগুলির প্রতিটি মূর্ছনায় হেমন্ত মুখোপাধ্যায় আবার প্রমাণ করেছিলেন যে, কেন তিনি বিশ্বজিৎকে বাংলার মাটি থেকে তুলে এনে বম্বের তখতে বসিয়েছিলেন। রেকর্ডিংয়ের সময়কার একটি অকাট্য দালিলিক সত্য হলো, লতা মঙ্গেশকর এই ছবির গানগুলো গাইবার সময় বিশ্বজিতের উপস্থিতি বিশেষভাবে প্রার্থনা করতেন। তিনি বলতেন, “নায়কের চোখের ভাষা না বুঝলে গানে সেই আর্তি আনা কঠিন।” বিশ্বজিৎ তাঁর শান্ত ও গভীর চাহনি দিয়ে সেই অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিলেন। হেমন্ত মুখোপাধ্যায় তখন একাধারে প্রযোজক, সুরকার এবং গায়ক। তিনি জানতেন লতার কণ্ঠের সেই মৃদু মোলায়েম স্পর্শ আর বিশ্বজিতের স্ক্রিন প্রেজেন্স মিলে এক এমন রসায়ন তৈরি করবে, যা দর্শককে রহস্যের কুয়াশার গভীরে টেনে নিয়ে যাবে।

এই মায়াবী কুয়াশার কথা বলার পেছনে ছিল গভীর যৌক্তিকতা, কারণ কুয়াশা যেমন সত্যকে আড়াল করে এক অলৌকিক মায়া তৈরি করে, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সুরও তেমনই এক আবহ তৈরি করেছিল যা দর্শককে বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিত। সেই সময়ের বোম্বাই আজকের মতো যান্ত্রিক ছিল না, বরং ছিল এক ধরণের ধীরগতি ও স্বপ্নিল আবেশ। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সুর ছিল সেই আবেশের ধারক। লতা মঙ্গেশকর বহুবার বলেছেন, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সুরে গাইতে হলে নিজের আত্মার সাথে কথা বলা হয়। সেই আত্মিক সংযোগই বিশ্বজিতের অভিনয়কে এক অন্য মাত্রার গভীরতা দিয়েছিল, যা সমসাময়িক অন্য নায়কদের সুযোগ হয়নি। হেমন্ত’দা বিশ্বজিৎকে শিখিয়েছিলেন কীভাবে সুরের তালে পা মেলাতে হয়, আর লতাজী শিখিয়েছিলেন গানের ভেতরের নিঃশব্দ হাহাকারকে অভিনয়ে ফুটিয়ে তুলতে। তাঁদের এই মেলবন্ধনই ছিল পেশাদারিত্বের ঊর্ধ্বে এক নিটোল পারিবারিক সখ্য।

তবে এই রাজকীয় কাহিনীর শেষটা এক আশ্চর্য টুইস্টে মোড়া। সচরাচর দেখা যায়, কোনো সফল ত্রয়ী সময়ের সাথে সাথে একে অপরের পরিপূরক হয়েই থেকে যান। কিন্তু বিশ্বজিৎ যখন বম্বের মাটিতে প্রতিষ্ঠিত, এবং বড় বড় ব্যানারের ছবিতে কাজ করছেন, তখন হেমন্ত মুখোপাধ্যায় ধীরে ধীরে নিজেকে বম্বের বাণিজ্যিক দৌড় থেকে সরিয়ে নিয়ে বাংলা সিনেমা ও রবীন্দ্রসংগীতের গভীরে ডুব দিলেন। তিনি তাঁর ‘মানসপুত্র’ বিশ্বজিৎকে প্রতিষ্ঠিত করে দিয়ে অনেক তৃপ্তি নিয়ে যেন নেপথ্যে চলে গেলেন। সবচেয়ে বড় টুইস্টটি এখানেই—যে বিশ্বজিৎকে হেমন্ত’দা ‘রহস্যের নায়ক’ রূপে পরিচয় করিয়েছিলেন, সেই বিশ্বজিৎই পরবর্তীকালে হিন্দি সিনেমায় ‘কিং অফ রোমান্স’ হয়ে উঠলেন। ১৯৬০ দশক ও ১৯৭০ দশকের প্রথম দিক পর্যন্ত তিনি প্রায় পঁচিশটি হিট ছবির নায়ক হিসাবে মুম্বাইয়ে নিজের জমি প্রতিষ্ঠা করলেন। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সেই চিরন্তন সুর ‘ইয়ে নয়ন ডরে ডরে’ গাইবার সময় বিশ্বজিৎ জানতেনও না যে, তিনি এক অমোঘ সাফল্যের দিকে এগিয়ে চলেছেন।

বছরের পর বছর পেরিয়ে আজও যখন সেই সুর বাজে, তখন সাধারণ মানুষের মনে হয় এটি কেবল একটি গান; কিন্তু ইতিহাসের গভীরে তাকালে বোঝা যায়, এটি ছিল এক গুরুর শিষ্যকে দেওয়া শ্রেষ্ঠ উপহার এবং এক সুরসম্রাজ্ঞীর সেই শিষ্যকে রাজমুকুটে অভিষিক্ত করার পবিত্র আয়োজন। এই ত্রয়ীর অবদান তাই কেবল সেলুলয়েডে সীমাবদ্ধ নয়, তা বাঙালির শ্রেষ্ঠত্বের এক অকাট্য দলিল হয়ে টিকে আছে মহাকালের গর্ভে।

বিশ্বজিৎ মুম্বাই চিত্রজগতে থেকে গেলেন। দিলেন একের পর এক বানিজ্যিক সফল সিনেমা এপ্রিল ফুল (’৬৪), মেরে সনম (’৬৫), শেহনাই, আসরা (’৬৪), নাইট ইন লন্ডন, ইয়ে রাত ফির না আয়েগি (’৬৬), জাল (’৬৭), কিস্মত, দো কলিয়া (’৬৮), ও আরও অনেক।

বাংলা ছবির শুটিংয়ের কাজে উনি মাঝে মাঝে কলকাতায় যেতেন। ১৯৬৮ সালে হৃষিকেশ মুখার্জি রচিত এবং পরিচালিত বাংলা ‘ছোট্ট জিজ্ঞাসা’ তাঁরই প্রযোজনা। বলিউডে সফল হওয়ার পরেও তিনি বাংলা মনিহার (’৬৬), ‘চৌরঙ্গী’ (১৯৬৮), ‘গড় নাসিমপুর’ (১৯৬৮), ‘কুহেলি’ (১৯৭১), শ্রীমান পৃথ্বীরাজ, আমি সিরাজের বেগম (’৭৩), ‘জয় বাবা তারকনাথ’ (১৯৭৭) ইত্যাদি বানিজ্যিক সফল সিনেমায় অভিনয় করেন। ১৯৭৪ সালে বাংলা রক্ততিলক সিনেমায় অভিনয় ও পরিচালনা করেন, দুটি মুখ্য ভুমিকায় ছিলেন উত্তমকুমার ও সুপ্রিয়া চৌধুরী।

বিশ্বজিৎ ভালো গান গাইতেন। ১৯৬৭ সালে নচিকেতা ঘোষের সুরে ‘বলাকা ও বলাকা দুচোখে স্বপ্ন আঁকা” গানটি হিট হয়। ১৯৬৯ সালে সলিল চৌধুরীর সুরে বিশ্বজিতের গলায় বাংলা গানের রেকর্ড ‘যায় যায় দিন’ আর ‘বাজে ঝনন ঝনন’ রিলিজ হয়। ১৯৭০ সালে রেকর্ড রিলিজ হয় নচিকেতা ঘোষের সুরে ‘তোমার চোখের কাজলে …… ‘।

কৃতজ্ঞতা স্বীকার:
১) উইকিপিডিয়া
২) The longest kiss – Kishwar Desai
ফেসবুক

Sahityika Admin

1 comment

  • বিশ্বজিৎ একসময়, ৬০ এর দশকে, বোম্বের ব্যস্ততম নায়কদের একজন, এবং তখনের ব্যস্ততম নায়িকাদের সাথে অনেক হিট বই দিয়েছেন। ওনার উপর পিকচারাইজ করা ওপি নায়ার আর রভি’জীর মিউজিকে অনেক হিট গান আমরা পেয়েছি।
    লেখাটি পড়ে অনেক অতীত স্মৃতি মনে পড়ে গেল।