বর্ষা বন্দনা – একা ঝরো ঝরো বারি ধারে
© বন্দনা মিত্র, ১৯৮৬ মেটালার্জিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং
সকালে একের পর এক বর্ষার গান শুনছিলাম। এখন তো খুব সুবিধে। ইউ টিউবে যাও, স্ক্রল করো, আঙুল ছোঁয়াও – যা খুশি শুনতে থাকো। বছর দু তিন আগে হলেও এই সাত সকালে মেঘমন্দ্র আকাশ দেখে মেজাজ খিঁচড়ে যেত, জল কাদা ভেঙে ঠিক নটার মধ্যে অফিসে হাজিরা দিতে হবে, বাস পাবো না, অটো অসম্ভব ভাড়া চাইবে, আর ক্যাব ডাকলে তো কথাই নেই, এটিএম হয়ে বাড়ি ফিরতে হবে। কিন্তু এখন তো আমি “ছিন্ন শিকল পায়ে নিয়ে / ওরে পাখি, যা উড়ে যা উড়ে যারে একাকী”। তাই এমন “মেঘের পরে মেঘ জমেছে / আঁধার করে আসে” সকালে বারান্দায় বসে গান শোনার বিলাসিতা করতেই পারি।
বিলাসিতা লিখলাম যদিও, কিন্তু আসলে তো বেঁচে থাকার অক্সিজেন। এই ব্যস্ততার জীবনে, শিথিল আঙুলের ফাঁকে চকিতে গলে যাওয়া মূহুর্তগুলোকে মুঠো বন্দি করার আপ্রাণ চেষ্টা, প্রতিটি পলকের পার্থিব লাভ ক্ষতি হিসেব করতে করতে চলা, সোশ্যাল মিডিয়ায় স্ক্রল করতে করতে নজর রাখা কে কতটা আমার চেয়ে সুখে আছে, কার ভাগে কতটা বেশি পড়ল, কে ভাগ্যদেবীর প্রিয়তর সন্তান। এইসব আজ কাল পরশুর গল্প এতটাই আচ্ছন্ন করে রাখে যে তাকে পেরিয়ে আর দৃষ্টি চলে না। ভুলে যাই – ” ওগো সুদূর, বিপুল সুদূর / তুমি যে বাজাও ব্যাকুল বাঁশরী / মোর ডানা নাই, আছি একঠাঁই, সে কথা যে যাই পাসরি।”
আমি তো বহুকাল আগের মানুষ। তখন গান শুনতে হলে আকাশবাণীর অনুগ্রহ কবে হবে, সেই আশায় থাকতে হত। রেডিওতে হঠাৎ একটা পছন্দের গান বাজলে, সে যেখানেই থাকি, স্ট্যাচু খেলার মত স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে পড়তাম, শরীরের প্রতিটি রোমকূপ দিয়ে যেন শুষে নিতাম গানটা, কবে আবার শুনতে পাবো কে জানে! তখন এক আধবার শুনলেই মুখস্থ হয়ে যেত প্রিয় গানের কথা ও সুর। যেন পরে কখনো ইচ্ছে হলে মাথার ভেতর থেকে তুলে আনতে পারি গানটা, মনে মনে বাজিয়ে শুনতে পারি।
মনে আছে ক্লাস ফাইভ না সিক্সে আমার নিজের একটা ছোট্ট ট্রানজিস্টর রেডিও হল। সেও এক মজার গল্প। তখন স্কুলে রেজাল্ট মোটামুটি ভালো হলেও বাড়িতে তেমন পাত্তা দিত না, মানে, ওটুকু তো করাই উচিত, মধ্যবিত্ত ঘরে ভালো রেজাল্ট না করলে চলবে কেন? পড়াশোনা করে নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে তো! একবার কোন কারণে রেজাল্ট তেমন যাকে বলে সন্তোষজনক হয় নি। আমার বাবা, বকুনি দেওয়ার বদলে ঐ রেডিওটা কিনে দিয়েছিল, রেজাল্ট খারাপের প্রাইজ পেলে নাকি আমি লজ্জা পেয়ে আরো মন দিয়ে পড়ব! লজ্জা কতটা পেয়েছিলাম আজ আর মনে নেই, তবে মা’র রাগারাগি মনে আছে – “একেই পড়ায় মন নেই তার ওপর আদিখ্যেতা করে রেডিও কিনে দিল। সারাক্ষণ কানে লাগিয়ে বসে আছে। যেটুকু পড়ত, তাও রসাতলে।” সেই রেডিও ছিল আমার সারা জীবনের সবচেয়ে মহার্ঘ্য সম্পদ। আবিস্কার করলাম বিবিধ ভারতী, বিনাকা গীতমালা, বোরোলীনের সংসার। এখনও মনে পড়ে সন্ধেরাতে সামনে বই খুলে সাপ্তাহিক নাটক, কি ভালো ভালো সব নাটক হত তখন – একেবারে আস্তে, চুপিচুপি করে শোনা। আর মনে মনে ঠাকুর ডাকছি, যেন মা রাতের খাওয়ায় ডাক দেওয়ার আগেই নাটকটা শেষ হয়। সে সব এখন রূপকথা।
আরো কয়েক বছর পরে পেলাম এক রেকর্ড প্লেয়ার। অন্য কয়েকটার সঙ্গে দেবব্রত বিশ্বাসের লং প্লেইং একটা রেকর্ড ও কেনা হল। অনেক গানের সঙ্গে ছিল এই গানটি। প্রথমবার শুনে যেন কাঁটা দিয়ে উঠল গায়ে – হাওয়ায় যেন ভেসে আসছে মেঘের ওপার থেকে “ভেবেছিলেম, আসবে ফিরে”। কতটা আশা, উৎকণ্ঠা, প্রতীক্ষা ও আশা ভঙ্গের বেদনা, না ফেরার যন্ত্রণা জড়িয়ে আছে। ফাগুন শেষের ভরসা ও খুশি আজ ভরা বর্ষায় এসে সন্দিহান ও বিষণ্ণ। বসন্তের মিলন ও বর্ষার বিরহ যেন ওতপ্রোত লেগে আছে গানটির গায়ে। আজ বর্ষায় গানটা শুনতে শুনতে সেই ছোটবেলার বৃষ্টিস্নাত দিনের কথা মনে পড়ে গেল। – “একা ঝরো ঝরো বারি ধারে / ভাবি কি ডাকে ফিরাবো তোমায়”।
– ১০ জুলাই, ২০২৬

********






Add comment