সাহিত্যিকা

সত্যজিতের সঙ্গীত (তৃতীয় পর্ব)

সত্যজিতের সঙ্গীত (তৃতীয় পর্ব)
© সুকান্ত রায়, ১৯৭৭ ইলেকট্রনিকস ও টেলি কমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং

আগের পর্বের লিংক
https://sahityika.in/2026/05/29/%e0%a6%b8%e0%a6%a4%e0%a7%8d%e0%a6%af%e0%a6%9c%e0%a6%bf%e0%a6%a4%e0%a7%87%e0%a6%b0-%e0%a6%b8%e0%a6%99%e0%a7%8d%e0%a6%97%e0%a7%80%e0%a6%a4-%e0%a6%a6%e0%a7%8d%e0%a6%ac%e0%a6%bf%e0%a6%a4%e0%a7%80/

কলকাতার বিজ্ঞাপন সংস্থা ডি জে কেমারে কাজ করার সময় সত্যজিতের আলাপ হয়েছিল বিভূতিভূষণের সঙ্গে। সালটা বোধহয় ১৯৪০ হবে। বিভূতিভূষণের উপন্যাস পথের পাঁচালীর প্রচ্ছদ আর কয়েকটা ছবি আঁকার সময়ই বইটা প্রথম পড়েন সত্যজিত। বইটা পড়েই সেটা নিয়ে সিনেমা তৈরির কথা ভাবেন। বিভূতিভূষণ ১৯৫০ সালে মারা যান, সত্যজিতের ছবি তৈরির মিশন তখন সবে শুরু। পথের পাঁচালী তৈরির গল্পটা চরম প্রতিকূলতা ও ইচ্ছাশক্তির এক রুপকথা। তখন প্রায় সব বাংলা সিনেমার শুটিং হত ইনডোরে কিন্তু সত্যজিত ইনডোরে শুটিং করে ছবি করতে রাজি নন। প্রযোজকরাও আউটডোরে ছবি তৈরিতে বেঁকে বসলেন। শেষমেশ নিজের পয়সায়, ইন্স্যুরেন্স পলিসি ভেঙে, বিজয়ার গয়না বিক্রি করে চরম আর্থিক সংকটের মধ্যে, সরকারের কিছু সাহায্যে, অপেশাদার ক্রু ও অনামী অভিনেতাদের নিয়ে তৈরি এই ছবি ভারতবর্ষের শুধু সিনেমা নয়, সিনেমার সঙ্গীতের ইতিহাসও বদলে দিল।

প্রথা ভেঙে সঙ্গীত পরিচালনার দায়িত্ব দিলেন এক শাস্ত্রীয় সঙ্গীতশিল্পীকে। সুরকার হিসেবে রবিশঙ্করের মতো বিখ্যাত সেতারবাদকের সঙ্গে সিনেমার পরিচালকের গাঁটছড়া বাঁধা সেই প্রথম। ছবিতে সর্বজয়ার ভেঙে পড়ার দৃশ্যে সত্যজিতের উদ্ভাবনী শক্তির কথা আগেই লিখেছি। যেটা লেখা হয়নি, তা হল পথের পাঁচালীর মাধ্যমেই সত্যজিত দর্শককে বোঝালেন যে প্রাকৃতিক শব্দ – কু ঝিক ঝিক ট্রেনের আওয়াজ, জলে ঢিল পড়ার আওয়াজ, এমনকি গাছের পাতা পড়ার আওয়াজ পর্যন্ত সিনেমার ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকের কতখানি বাঙ্ময় একটা অংশ হতে পারে। ব্যাকগ্রাউন্ডে নীরবতা যে কত শক্তিশালী, দৃশ্যটা ফুটিয়ে তুলতে যে কতটা সাহায্য করে, সেটাও প্রথম আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখান সত্যজিত, তার এই ছবিতে। পরে এই নিয়ে এক সাক্ষাৎকারে সত্যজিত বলেছিলেন “আমি আমার ছবিতে সঙ্গীত যতটা সম্ভব কম ব্যাবহার করি। এমনকি আমি যদি আমার ছবির একমাত্র দর্শক হতাম, তাহলে হয়তো আমার ছবিতে আমি সঙ্গীত ব্যাবহারই করতাম না।”

পাশ্চাত্য সঙ্গীত ও ভারতীয় ধ্রুপদী সঙ্গীতের সঙ্গে সম্যক পরিচয থাকা স্বত্ত্বেও সত্যজিত যে নিজে সঙ্গীত সৃষ্টি করবেন বা কম্পোজার হবেন, এমন কথা তিনি পথের পাঁচালী করার সময় ভাবেননি। তাই তাঁর প্রথম ছ’টি সিনেমা – পথের পাঁচালি, অপরাজিত, পরশপাথর, জলসাঘর, অপুর সংসার ও দেবী – সঙ্গীত পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন প্রথম তিনটিতে রবিশঙ্কর, বিলায়েৎ খান, আবার রবিশঙ্কর ও শেষটিতে আলী আকবর খান। সত্যজিতের চতুর্থ ছবি জলসাঘর আমার দেখা সবদিক দিয়ে একটি সম্পূর্ণ, near flawless সিনেমা। ছবি শুরুর আবহসঙ্গীত থেকে climax scene অবধি। আবহসঙ্গীত ও বিভিন্ন দৃশ্যে রাগভিত্তিক সুরের মিশ্রণ বিশ্বম্ভর রায়ের অহংকার ও পতনের আবহ তৈরি করেছে। সঙ্গে বিশ্বম্ভরের ভালো সময়ে ঝিনঝোটি রাগ আর ঝড়ের রাতে মিঁয়া কি মলহারের চরম উত্তেজনা ও ভয়। এ ছাড়া আছেন বেগম আখতার, সালামত আলি খান ও রোশন কুমারী। গল্পের মধ্যে গান, নাচ অনায়াসে ঢুকে গেছে। জলসাঘর সিনেমার সঙ্গীত শুধু গান-বাজনা নয়, চরিত্রের মনস্তত্ত্ব ও গল্পের নাটকীয়তা তুলে ধরতে সক্ষম। এবার আসি জলসাঘরের সঙ্গীতে সত্যজিতের কথায়। মনে আছে সেই দৃশ্যটি যখন নেশায় চুর বিশ্বম্ভর চার দেওয়ালের ছবিগুলো আর ঝাড়বাতিটার দিকে তাকিয়ে নিজের পতনের কথা ভাবছেন? তার মনে চিন্তার ঝড় বইছে। সেই দৃশ্যটার ভুতুড়ে ভাব ও উত্তেজনা ফুটিয়ে তুলতে সত্যজিত বিলায়েতের সেতারের সঙ্গে মিলিয়ে দিলেন ফিনিশ কম্পোজার জ্যঁ সিবেলিয়াসের তৈরি একটা সুর, তাও উল্টো করে, মানে শেষ থেকে শুরুর দিকে। পাশ্চাত্য সঙ্গীত (অপেরা) ও ভারতীয় মার্গ সঙ্গীতের ওপর সত্যজিতের অসামান্য জ্ঞানের পরিচয় এটি।
এর ফলও সত্যজিতকে ভুগতে হয়েছে। নামী দামী রক্ষণশীল শিল্পীরা কখনই তাদের কাজে এধরনের ফিউশন পছন্দ করবেননা, তাও আবার এমন একজনের থেকে যার ভারতীয় মার্গসঙ্গীতের ওপর কোনো দখলদারির কথা তখন কারো জানা নেই। সিনেমার পরিচালক হিসেবে কিছুটা খ্যাতি অবশ্য ততদিনে হয়েছে কিন্তু সেটা সমান্তরাল ছবির ব্যাপারে। বাণিজ্যিক ছবি তিনি তো করেনইনা, উল্টে দশহাত দূর দিয়ে যান। মনান্তর হতে তাই সময় বেশি লাগেনি। একমাত্র রবিশঙ্কর ছাড়া বাকি দুজনের সঙ্গে সত্যজিতের সম্পর্কে ফাটল ধরল। তারা সত্যজিতকে সঙ্গীত পরিচালকের কাজে অহেতুক হস্তক্ষেপের দায়ে অভিযুক্ত করলেন। শেষের জন বলেও বসলেন যে ভারতীয় সঙ্গীত এবং রাগ, রাগিনী ও স্বরলিপি সম্বন্ধে সত্যজিতের জ্ঞান অত্যন্ত সীমিত। আদ্যন্ত ভদ্রলোক সত্যজিত সব শুনলেন, তাঁর গোঁ বেড়ে গেল। পরবর্তী ছবিতে নিজেই সঙ্গীত দেবেন ঠিক করলেন।

এ ছাড়াও সত্যজিতের নিজে সঙ্গীত পরিচালনার কারন দুটো। এক, সত্যজিত বুঝতে পারছিলেন যে তাঁর ছবিতে সঙ্গীত পরিচালনার জন্য, বিশেষ করে তার খুঁতখুঁতানির জন্য, একজন সঙ্গীত পরিচালকের যতটা সময় দেওয়া তিনি চান, নামী শিল্পীরা সেই সময় দিতে পারছেননা। সেজন্য কিছু অপ্রীতিকর পরিস্থিতিরও শিকার হচ্ছেন তিনি। ছবিও নষ্ট হচ্ছে, সম্পর্কও। তাই এটা এড়ানো দরকার।

দ্বিতীয় কারনটা হল তখনকার দিনে যারা কম্পোজার এবং সুরকার, তারা পাশ্চাত্যসঙ্গীতের স্বরলিপি বুঝতেন না এবং অনুসরণ করতেননা। সত্যজিত ছিলেন প্রাচ্য এবং পাশ্চাত্য সঙ্গীতের মিলনের প্রতিনিধি। তার সঙ্গীত সম্বন্ধে তিনি একবার বলেছিলেন যে তার সঙ্গীত জীবনের মতো। আমাদের জীবন যেমন একাধারে প্রাচ্য এবং পাশ্চাত্য সংস্কৃতির ধারক, তার সঙ্গীতও তেমনি। এবার এটা করতে গিয়ে পাশ্চাত্য সঙ্গীতের স্বরলিপিগুলো তাকে অনুবাদ করে সঙ্গীত পরিচালককে বোঝাতে হত। সেটা ছিল সময়সাপেক্ষ বিরক্তিকর। তাছাড়া ভারতীয় সঙ্গীতের স্বরলিপি সম্বন্ধে সেই সময় সত্যজিতের জ্ঞান অত সম্যক ছিলনা। ফলে তারও এই অনুবাদ করতে একটু অসুবিধা হত। অনুবাদ করার লোক যে ছিলনা তা নয়, কিন্তু তাদের পেছনে দৌড়োতেও অহেতুক সময় নষ্ট। তাই ‘তিনকন্যা’ থেকেই আমরা সত্যজিতকে পাই এক নতুন রুপে।

তিনকন্যাতে যাবার আগে তার আগের ছবিগুলোর সম্পর্কে কিছু কথা বলি। সঙ্গীতের ব্যাবহারের এই খুঁটিনাটি জিনিসগুলোই সত্যজিতের সঙ্গীতকে অনন্য করে তোলে। যদিও তার দেওয়া সুরে একদিকে বেথোভেন, মোৎজার্ট, বাখ ইত্যাদি পাশ্চাত্যের দিকপাল সঙ্গীতজ্ঞ, অন্যদিকে ভারতীয় মার্গসঙ্গীতের রাগ রাগিনী, লোকসঙ্গীত, রবীন্দ্রসঙ্গীত ইত্যাদি সবরকমের গান বা সুরের ব্যাবহার আছে কিন্তু তাদের পরিমিত প্রয়োগ, মিশ্রণ ও সিকোয়েন্স শুনলেই বোঝা যায় যে এটা সত্যজিতের দেওয়া সুর। অনেকক্ষেত্রেই দৃশ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে স্বরলিপি ভেঙেচুরে তিনি যে সুরের সৃষ্টি করেছেন তা একান্তই তার নিজস্ব এবং সবার থেকে আলাদা। এমনকি সিনেমাটা না দেখে চোখ বন্ধ করেও সেই সুর শুনলে বোঝা যায় এটা সত্যজিতেরই কারিকুরি, তা সঙ্গীত পরিচালক যেই হোন না কেন। ১৯৬০ সালে তৈরি দেবী ছবিটিতে সঙ্গীতের প্রধান বৈশিষ্ট্য হল সুরের মাধ্যমে এক গম্ভীর ও ভুতুড়ে পরিবেশ তৈরি করা। ছবিটার অন্ধ ভক্তিকুসংস্কার এবং দয়াময়ী রুপে রুপান্তরের মানসিক যন্ত্রণাগুলোকে সুরের মাধ্যমে অত্যন্ত নিপুণ ভাবে ফুটিয়ে তোলা। যখন বৃদ্ধ শ্বশুর কালীকিঙ্কর দয়াময়ীকে মা বলে প্রণাম করছেন তখন ব্যাকগ্রাউন্ডে আলী আকবরের সরোদে যে গভীর ও বিলম্বিত একটা সুর ওঠে সেটা কোন আনন্দের অনুভূতি দেয়না। বরং একধরণের অস্বস্তি ও আসন্ন ট্র্যাজেডির ইঙ্গিত দেয়। সত্যজিত রায় সোসাইটির সদস্যরা মনে করেন যে এই সুরটা সাধারণ এক কিশোরীর ওপর জোর করে দেবত্ব চাপিয়ে দেওয়ার মানসিক চাপকে চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তুলেছে।

প্রথাগত ভজন বা গানের বদলে সত্যজিত নিজেই দেবীতে ‘এবার তোরে চিনেছি মা’ গানটা লিখে ফেলেন ও সুর দেন, গানটি গেয়েছিলেন পৃথ্বীশ মুখার্জি। সত্যজিতের লেখা ও সুর দেওয়া প্রথম গান এটি। সিনেমার শুরুতে বিভিন্ন সন্ধিক্ষণে এই শ্যামাসঙ্গীতটার ব্যাবহার করেছেন সত্যজিত। যখন কালীকিঙ্কর ঘোরের মধ্যে দয়াময়ীকে দেবী হিসেবে দেখছেন, তখন এই গানটি একটি ভক্তির এক অন্ধ ও আচ্ছন্ন পরিবেশ সৃষ্টি করে। সত্যজিতপুত্র সন্দীপ তার এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন যে তাঁর মনে হয়েছে এই গানের কথাগুলো একদিকে যেমন ভক্তি প্রকাশ করে, অন্যদিকে দয়াময়ীর হারিয়ে যাওয়া ব্যাক্তিগত স্বত্তার ইঙ্গিত দেয়। আরও একটা জিনিস আমার চোখে লেগেছে, সেটা হল স্তব্ধতা ও শব্দের পরিমিত ব্যাবহার। দয়াময়ীর স্বামী ঊমাপ্রসাদ যখন ফিরে আসে এবং তার স্ত্রীকে মূর্তির মতো সাজানো অবস্থায় দেখে, সেখানে সত্যজিত সঙ্গীতের চেয়ে নিস্তব্ধতাকে, সুরের চেয়ে শব্দের ব্যাবহারকে বেশি প্রাধান্য দেন, দর্শকদের মনে এক ভয় ও শূন্যতা তৈরির জন্য।

পরশপাথরে সত্যজিত প্রচলিত ভারতীয় মার্গসঙ্গীতের ধারা থেকে সরে এসে পাশ্চাত্যসঙ্গীতের অর্কেস্ট্রা এবং বাজনাগুলোর ওপর ঝোঁকেন। কারন হল বইতে হাসির ও জাদুর নাটকীয়তা ফুটিয়ে তোলা। পরশপাথরে সত্যজিত প্রথমবার আবহসঙ্গীত এবং ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিককে শুধু সুর হিসেবে নয়, বরং সিনেমার একটা ‘সাউন্ড এফেক্ট’ বা চরিত্র হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন। যখন পরেশবাবু প্রথমবার পাথরটি দিয়ে লোহার বলটা ছুঁয়ে দেখেন আর সেটা সোনা হয়ে যায়, সেই দৃশ্যে ‘টিঙ্কলিং’ (tinkling) বা ঝনঝনানি শব্দের মতো সুর ব্যাবহার করেছিলেন সত্যজিত, একাধারে যাদুর আমেজ আর পরেশবাবুবর বিস্ময়কে ফুটিয়ে তোলার জন্য। তার থেকেও আমার অবাক লেগেছে ছবির শুরুতে বৃষ্টির সঙ্গে সেতারের সুর। বৃষ্টি পড়ার ছন্দের সাথে মিলিয়ে কখনও ঢিমে, কখনও দ্রুত লয়ে সেতার বাজানো। এই পরশপাথরেই আমরা প্রথম দেখেছি পরিচিত সুরের ভাঙন, পরে সেটা আবার দেখি চারুলতায়। কোনো পরিচিত রবীন্দ্রসঙ্গীত বা শাস্ত্রীয় রাগ অবিকৃতভাব ব্যাবহার না করে সেগুলোকে ভেঙে নতুনভাবে অর্কেস্ট্রা হিসেবে ব্যাবহার করা হয়েছে একই সাথে মুক্তির আনন্দ ও বেদনার ভার বহন করার জন্য। পরেশবাবুর স্ত্রী যখন আলমারিতে সোনা দেখছেন তখন ‘আজি ঝড়ের রাতে তোমার অভিসার’ গানটির সুর অর্কেস্ট্রায় ব্যাকগ্রাউন্ডে বাজানো হয়। আপাতদৃষ্টিতে এই গানটি দৃশ্য বা পরিবেশের সঙ্গে একেবারেই বেমানান, আর এখানেই সত্যজিতের কৃতিত্ব। প্রথম, তিনি গানটি গাওয়াননি (গানটির কথা এইদৃশ্যে মানানসই নয় বলে) এবং দ্বিতীয়, সুরটাকে একটু ভেঙে তার অর্কেস্ট্রেশন করে পাশ্চাত্য বাদ্যযন্ত্রের সাহায্যে সেটা বাজিয়ে যে এফেক্ট তৈরি করেছেন তাতে গানের কথা ভুলে গিয়ে দর্শক দৃশ্যের নাটকীয়তা, ঝোড়ো পরিস্থিতি এবং পরেশবাবুর জীবনের নতুন মোড় ফুটিয়ে তোলার প্রশংসা করেছে। রবীন্দ্রসঙ্গীত নিয়ে তাঁর এই পরীক্ষা-নিরীক্ষা তার পরবর্তী অনেক ছবিতেই আমরা দেখতে পাই, কিন্তু সেকথা পরে। প্রসঙ্গত বলে রাখি পরশপাথর সিনেমাটি আমার একাধিকবার দেখার কারন এই দৃশ্যটি এবং পরেশবাবুর (তুলসী চক্রবর্তী) অভিনয়।

সিনেমার জাম্পকাট ও ফ্ল্যসাব্যকের মতো এবার ফিরে যাই আমার প্রিয় ছবি জলসাঘরে। তবে এবার সঙ্গীত নিয়ে নয়, ছবি তৈরির সময়কার কিছু টুকরো টুকরো ঘটনা নিয়ে। কাল বন্ধু তস্য ওরফে হিমাই আমার লেখা পড়ার পর জিজ্ঞেস করেছিল জলসাঘরের লোকেশন আইডেন্টিফাই এর গল্প জানা আছে কিনা। সেটাই অনুপ্রেরণা, তাই ওই দিয়ে শুরু করে চলে যাবো আমার আরেক প্রিয় ছবি পরশপাথরে। জলসাঘর ও পরশপাথর দুটি ছোটগল্প অবলম্বনে সিনেমা, যা তখনকার দিনে বিরল ছিল। প্রথমটির লেখক তারাশঙ্কর, দ্বিতীয়টি পরশুরামে (রাজশেখর বসু)। জলসাঘর ছবির জন্য সত্যজিত পাগলের মতো রাজবাড়ী খুঁজে বেড়াাচ্ছেন। যেটাই দেখছেন, হয় তার অথবা তারাশঙ্করের পছন্দ হচ্ছেনা। অনেক খোঁজাখুঁজির পর অবশেষে নিমতিতার চৌধুরিবাড়ি দেখে সত্যজিতের পছন্দ হল। ফিরে এসে ফোন করলেন তারাশঙ্করকে এবং জানালেন তার পছন্দের কথা। তারাশঙ্কর কিছুক্ষন শুনে বললেন “কি আশ্চর্য, আমি তো নিমতিতার চৌধুরিদের কথা ভেবেই বিশ্বম্ভরকে তৈরি করেছিলাম।” শুরু হয়ে গেল জলসাঘর।

জলসাঘরের পরের ছবি পরশপাথরের শুরুটাও ইন্টারেস্টিং। হয়তো পরশপাথর শুরু হয়েছিল জলসাঘরের জন্যই। কে জানে? কিন্তু এটা জানতে একটু পিছিয়ে যেতে হবে আমাদের কলেজেরই এক প্রাক্তনী বিভূতিভূষণ লাহিড়ীর কথায়। বিভূতিভূষন শান্তিপুরের ছেলে, ছোটবেলায় বাবা, মা দুজনকেই হারিয়ে বিই কলেজ থেকে পাশ করে কয়লার খোঁজে সোজা চলে যান মধ্যপ্রদেশের (এখন ছত্তিশগড়ের) কোরিয়া জেলায়। সেখানকার রাজার আনুকূল্যে চিরিমিরি অঞ্চলে রেজিং কন্ট্র্যাকটরের কাজ পেলেন বিভূতিভূষন। সেই শুরু, আর ফিরে তাকাতে হয়নি। বিভূতিভূষনকে লোকে জানতো ‘বিবিএল’ বলে। তার মেজপুত্র প্রমোদকুমার বাবার সঙ্গে মিলে ফেঁদে বসলেন ‘বিবি এল ফিল্মস’ নামে এক ফিল্ম প্রোডাকশনের কোম্পানি। লৌহকপাট ছবির কাজ চলছে এমন সময় প্রমোদের কানে খবর এলো জলসাঘর ছবির শুটিং বন্ধ হয়ে গেছে। হঠাৎ ছবি বিশ্বাস কিছুদিনের জন্য বিদেশ গেছেন, সত্যজিত রায় খুব সমস্যায় পড়েছেন। এ সুযোগ ছাড়লেননা প্রমোদকুমার। সত্যজিতের সঙ্গে দেখা করে বললেন যে তাঁর একটা ছবি প্রমোদ প্রযোজনা করতে চান। সত্যজিতের ইউনিট তখন বসে, হাত খালি। সত্যজিত রাজি হয়ে গেলেন, তবে বললেন তিনি একটা নতুন ধরনের ছবি করতে চান। এ ছবি দর্শকরা কতোটা নেবেন তা বলা মুশকিল। এর মধ্যে ঋত্বিক ঘটক প্রমোদবাবুকে বললেন তাঁর একটা ছবি প্রযোজনা করতে। পিঠোপিঠি দুটো ছবি প্রযোজনা করায় দেখা দিল পয়সার টানাটানি। প্রমোদবাবু তাঁদের দুটি প্রেস, একটি মধ্যপ্রদেশে ও একটি কোলকাতায়, বিক্রি করে পয়সা জোগাড় করলেন। শুরু হল ‘পরশপাথর’ ও ‘অযান্ত্রিক’। পরশপাথর সত্যজিতের তৈরি প্রথম কমেডি ছবি।

সুর ও গান থেকে একটু বাইরে বেরিয়ে দেখলাম। পাঠক নেবে কিনা বলা মুশকিল।

সত্যজিত একবার একটি সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন “আমি যদি একমাত্র দর্শক হতাম, তবে আমি সিনেমাতে সঙ্গীত ব্যাবহার করতামনা।” তিনি সবসময়ই মনে করতেন যে সিনেমা তৈরির ক্ষেত্রে সঙ্গীত একটা বাহ্যিক উপাদান এবং একজন ভালো পরিচালকের উচিত এটা ছাড়াই নিজেকে প্রকাশ করতে সক্ষম হওয়া। কিন্তু সত্যজিত ছিলেন একজন বাস্তববাদী। তিনি এটাও জানতেন যে তার সিনেমার শৈল্পিক দৃশ্যগুলো যদি শহুরে এমনকি মার্জিত রুচিসম্পন্ন দর্শকের কাছে গ্রহণযোগ্য করাতে হয়, তাহলে সিনেমায় ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক বা গান অপরিহার্য। এই কারনেই সত্যজিত তার সিনেমায় এই মাধ্যমটিকে (সঙ্গীত) অত্যন্ত সৃজনশীলভাবে এবং স্বল্পতম উপায়ে ব্যবহার করেছেন। বলা বাহুল্য যে এটাই তখনকার দিনের সিনেমা তৈরির প্রচলিত ধারনার মূলে কুঠারাঘাত করে তার থেকে আলাদা একটা অনেক বেশি কার্যকরী ধারনার শুরু। আগেই লিখেছি যে সত্যজিত তার সিনেমায় অত্যন্ত চমৎকারভাবে সম্পূর্ণ নীরবতা এবং বিশেষ করে গ্রামের দৃশ্যে অনেক প্রাকৃতিক শব্দ (যেমন গাড়ির হর্ন, পাখির গান, পাতার মর্মর ইত্যাদি) ব্যাবহার করেছেন। ‘বিষয় চলচ্চিত্র’ নামে তার লেখা একটি প্রবন্ধে এই কথাগুলো আবার লিখেছেন “যদি কোন কারন ছাড়াই আবহসঙ্গীত ব্যাবহার করা হয়, তবে তা চলচ্চিত্রের ক্ষতিই করে। পরিচালকের সতর্ক হওয়া উচিত যে চলচ্চিত্রে কোথায় সঙ্গীতের প্রয়োজন হবে, যদি ধরে নেওয়া যায় পরিচালক সঙ্গীত সম্বন্ধে জানেন।” এই একই প্রবন্ধে সত্যজিত লিখেছেন “সিনেমার ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকে সরোদ ব্যাবহার করা ঝুঁকিপূর্ণ কারন এর তারের ঝঙ্কার সংলাপের কঠিন ব্যাঞ্জনবর্ণের সাথে সংঘাত (conflict) ঘটাতে পারে, যার ফলে সঙ্গীতটি বিকৃত হয়ে যাওয়ার প্রবল সম্ভাবনা থাকে।”

সত্যজিতের কোনো প্রথাগত সঙ্গীত শিক্ষা ছিলনা, কিন্তু কোনো সুর গুনগুন করে বা শিস দিয়ে চমৎকার ভাবে ফুটিয়ে তুলতে পারতেন। পিয়ানোতে তার বাজনা ছিল একেবারে পেশাদারদের মতো। সেই পিয়ানো বাজিয়ে তার অর্কেস্ট্রার শিল্পীদের কাছে নিজের সঙ্গীতের ভাবনাগুলো তুলে ধরতেন। চারুলতা ছবিতে কিশোরকুমারের গলায় ‘আমি চিনি গো চিনি তোমারে’ রবীন্দ্রসঙ্গীতের ব্যাকগ্রাউন্ডে একটু ধীর লয়ে যে মিষ্টি এবং কোমল পিয়ানোর আওয়াজ আমরা শুনি, সেটি স্বয়ং সত্যজিতই বাজিয়েছিলেন। সত্যজিতের গলার আওয়াজ ছিল গভীর, যাকে বলে ব্যারিটোন ভয়েস, অনেকটা অমিতাভ বচ্চনের মতো। সেই গলায় সত্যজিত প্রায়ই ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের সামনে মোৎজার্টের অপেরা ‘দ্য অ্যাবডাকশন ফ্রম সেরাগ্লিও’ থেকে ওসমিনের আরিয়া গাইতেন। আবার মোৎজার্টেরই ‘দ্য ম্যাজিক ফ্লুট’ থেকে পাপাগানোর গান বা ইতালিয়ান কম্পোজার গ্যিউসেপে ভার্দির (Verdi) ‘রিকুয়েম’ থেকে ল্যাক্রিমোসো অংশটি গুনগুন করতেন। শাখা-প্রশাখা তে বেথোভেনের ভায়োলিন কনসার্তোর প্রথম মুভমেন্টের যে অংশটি বেথোভেন-পাগল প্রশান্তর (সৌমিত্র) মুখে শোনা যায় সেটাও সত্যজিতেরই গুনগুনানি। তার শেষ সিনেমা ‘আগন্তুক’ -এ সত্যজিত ভগবান কৃষ্ণের বিভিন্ন নাম উচ্চারণ করে একটা কীর্তন গান গেয়েছিলেন।

লেখাটা এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে, মাথায় অজস্র চিন্তা গিজগিজ করছে। তার একটা সংগঠিত, সুশৃঙ্খল ভাব দেওয়া দরকার। তাই ধান ভানতে শিবের গীত ছেড়ে ফিরে আসি সত্যজিতের সিনেমা ও সঙ্গীতের মূল প্রসঙ্গে। সত্যজিতের তিনকন্যা ছবিটি তার নিজের সুর দেওয়া প্রথম ছবি। রবীন্দ্রনাথের লেখা তিনটি গল্প – পোস্টমাস্টার, মণিহারা ও সমাপ্তি, এই তিনটি ভিন্ন স্বাদের গল্প নিয়েই তিনকন্যা। যেহেতু গল্পের স্বাদ ভিন্ন, কাজেই তাদের সঙ্গীত আলাদা হবে, এটাই স্বাভাবিক, শুধু এই নয় প্রতিটি গল্পের সঙ্গে চিত্রনাট্যেরও বিস্তর গরমিল। এই প্রসঙ্গে বলা যায় যে সিনেমায় দৃশ্য, শব্দ ও সঙ্গীত দিয়ে যেভাবে গল্প বলা যায়, গল্প লেখায় সেভাবে বলা যায়না। আবার গল্প বা উপন্যাসে বাক্য দিয়ে যত সহজে যে কোনো কিছু বলা যায়, সিনেমায় তা যায়না। গল্প বা উপন্যাসের হুবহু অনুকরণ করলে সিনেমা ঝুলে যায়। তাই গল্পগুলোর ভাবনা এবং নির্যাস ঠিক রেখে চিত্রনাট্যে সত্যজিত অনেক রদল-বদল ঘটিয়েছিলেন। রবিঠাকুরের পোস্টমাস্টার গল্পে পোস্টমাস্টারের কোনো নাম নেই, সত্যজিত তাঁর নাম দিলেন নন্দলাল। রতনের বয়স সত্যজিত কমিয়ে দিলেন গল্পের থেকে। এছাড়াও আরও অনেক পরিবর্তন চিত্রনাট্যে ঘটিয়েছেন সত্যজিত। শেষ দৃশ্যে রবিঠাকুরের গল্পে রতনের কান্নার মাধ্যমে যে নাটকীয়তা ফুটে ওঠে, সিনেমায় তা অনুপস্থিত। সত্যজিত রতনকে দেখান নির্লিপ্ত ভাবে নতুন পোস্টমাস্টারের কাজকর্ম করতে।

দ্বিতীয় গল্প মনিহারা রবিঠাকুরের লেখা একটি ভূতের গল্প। রবীন্দ্রনাথের মনিহারা গল্পের মূল চরিত্র ফনিভূষন আর সত্যজিতের সিনেমা এগিয়েছে মনিমালিকাকে কেন্দ্র করে। রবিঠাকুরের মনিমালিকা আটপৌরে, গৃহবধূ, ও সহজবোধ্য কিন্তু সিনেমায় সে সহজবোধ্য নয়। সিনেমায় বরং তার লালসার অভিব্যক্তি সত্যজিত বেশি করে ফুটিয়ে তুলেছেন। রবিঠাকুরের গল্পের আরেকটি অন্যতম চরিত্র মধুসূদন। সিনেমায় মধুসূদন লোভী, মেরুদণ্ডহীন এবং মনিমালিকার অতীতের সঙ্গে তার জড়িয়ে থাকার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। শেষ অংশে সবচেয়ে বড় রুপান্তর আমরা দেখি ফনীভূষনের মধ্য দিয়ে। গল্পের ফনীভূষন রক্তমাংসের মানুষ কিন্তু সিনেমাতে বাতাসে মিলিয়ে যাওয়া এক হাস্যকর ভূত।

শেষ গল্প সমাপ্তিতে মৃণ্ময়ী নির্ল্লজ্জ, ভয়হীন, হাবভাবহীন। সত্যজিত তার মৃণ্ময়ীকে গড়েছেন ডানপিটে ও বুদ্ধিমতী হিসেবে। গল্পের নায়ক অপূর্বর নাম পরিবর্তন করে সিনেমায় রাখা হয়েছে অমূল্য। গল্পে রবিঠাকুর অনেকগুলো চরিত্র এবং ধীরে ধীরে সেই চরিত্রগুলোর বিকাশ ঘটিয়েছেন। কিন্তু সত্যজিত অমূল্য-মৃন্ময়ীর সম্পর্ককে কেন্দ্র করে সিনেমা এগিয়েছেন। এরকম আরও অনেক পরিবর্তন সঙ্গত কারণেই করেছেন সত্যজিত।

তিনকন্যা তিনটি বিভিন্ন ধরনের গল্প বলেই তাদের প্রত্যেকের সুরের ভাব, লয় এমনকি বাদ্যযন্ত্রের প্রয়োগও আলাদা। এই সিনেমা থেকেই সত্যজিত ব্যবহার শুরু করেন থিম মিউজিকের। তিনকন্যায় সত্যজিতের সঙ্গীতের মুন্সিয়ানা বোঝানোর জন্য আমি তিনটে উদাহরণ দেব। পোস্টমাস্টার গল্পের শেষে যখন পোস্টমাস্টার গ্রাম ছেড়ে চলে যাচ্ছেন আর রতন তার পাশ দিয়ে কলসী নিয়ে হেঁটে যায় তখন আবহসঙ্গীতে একটা করুণ বাঁশির সুর ব্যবহার করা হয়েছে। সুরটা কোনো সংলাপ ছাড়াই রতনের অভিমান ও একাকীত্বকে আমাদের কাছে পৌঁছে দেয়। মনিহারা তে আমরা দেখি রবীন্দ্রসঙ্গীতের ভৌতিক রুপান্তর। মনিমালিকার গয়নার প্রতি আসক্তি ও তার রহস্যময় মৃত্যু বোঝাতে ‘বাজে করুন সুরে’ গানটিকে পিয়ানো, বেহালা ও চেলো দিয়ে এমনভাবে ভেঙেছিলেন যে একধরনের ভৌতিক শিরশিরে ভাব তৈরি হয়েছিল। লক্ষণীয় যে এখানেও গানের কথার সঙ্গে সিচুয়েশনের কোনো মিল না থাকায় গানটা গাওয়া হয়নি কিন্তু সুরটা ভেঙে বাজানো হয়েছে। সমাপ্তিতে মৃণ্ময়ী যখন গাছে চড়ছে বা গ্রামময় দৌড়ে বেড়াচ্ছে, তখন চরিত্রের বুনো এবং স্বাধীন স্বত্তাকে ফুটিয়ে তুলতে ব্যাকগ্রাউন্ডে তবলা ও বাঁশির দ্রুত ছন্দ ব্যাবহার ককা হয়েছে। আবার অমূল্যর শহর থেকে ফেরার পথে বাবুয়ানি বোঝাতে হালকা পিয়ানোর কাজ ব্যাবহার করেছেন সত্যজিত।

এতো স্বত্তেও বলি যে আমার দেখা সত্যজিতের সিনেমাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে দূর্বল এবং খারাপ সৃষ্টি ‘তিনকন্যা’।

********

 

Sahityika Admin

Add comment