২২-শে শ্রাবণ:
বাংলা সাহিত্যের চিরস্মরণীয় উজ্জ্বলতম নক্ষত্র, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আজ, এই দিনেই দেহত্যাগ করেছিলেন। বাংলা ১৩৪৮ সালের ২২ শ্রাবণ, খ্রিস্টীয় ১৯৪১ সালের ৭ আগস্ট, নিজ পিতৃভূমি কলকাতার জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়িতে শ্রাবণের এক বর্ষণসিক্ত দিনে সকলকে বিদায় জানিয়ে চলে যান ভারতবর্ষ তথা পৃথিবীর এক শ্রেষ্ঠ মনীষী।
পিতা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ও মাতা সারদাসুন্দরী দেবীর কনিষ্ঠ পুত্র রবীন্দ্রনাথের শৈশবে মাত্র আট বছর বয়সেই রচনার সূচনা, আর ১৩ বছরেই ‘তত্ত্ববোধিনী’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয় ‘অভিলাষ’ নামের প্রথম কবিতা। প্রথম কাব্যগ্রন্থ কবিকাহিনী প্রকাশিত হয় ১৮৭৮ সালে। এর পরবর্তী সময়ে বাংলা সাহিত্যের প্রতিটি ধারায় যেমন, ছোটগল্প, উপন্যাস, কবিতা, সংগীত, নাটক ও গীতিনাট্য, প্রবন্ধ, চিত্রকলা, …… প্রতিটি ক্ষেত্রেই নিজের সৃষ্টির অম্লান স্বাক্ষর রেখে গেছেন। ১৯১৩ সালে ‘গীতাঞ্জলি’র জন্য নোবেল পুরস্কার অর্জন করেন, ও একটি ভারতীয় প্রাদেশিক ভাষাকে বিশ্বসাহিত্যের দুয়ারে উন্মোচিত করেন। পরবর্তী সময়ে বিশ্বের বহু দেশের বহু ভাষায় ওনার সাহিত্য অনুদিত হয়েছে, তাঁর লেখনীতে বর্নিত মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা, দুঃখ-সুখ, সমাজসংস্কার এবং প্রকৃতির পরিবর্তনশীল ও চিরন্তন বিবর্তন বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষনায় স্থান পেয়েছে। সর্বপরি তাঁর রচিত দুটি গান দুটি দেশের জাতীয় সঙ্গীতের মর্যাদায় স্থান পেয়েছে।
১৯০১ সালে তিনি শান্তিনিকেতনে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। গ্রামোন্নয়নের উদ্দেশ্যে সেখানেই গড়ে তোলেন শ্রীনিকেতন। জমিদারি দেখাশোনার সময় প্রজাদের কল্যাণে কাজ করেছেন শিলাইদহ, পাবনা, নাটোর, ওড়িশায়— আর সেই প্রান্তরের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য তাঁর সৃষ্টিকে করেছে গভীরতর।
জীবনের অন্তিম সময়ে শারীরিক অসুস্থতা সত্বেও তাঁর চিন্তার দীপ্তি ও কলমের গতি থামেনি। মৃত্যুর কয়েক মাস আগেও তিনি লিখে গেছেন ‘সহজী কাব্য’, শেষ গল্প ‘ল্যাবরেটরি’, শেষ প্রবন্ধ ‘Crisis in Civilization’। বলেছিলেন মৃত্যুকে তিনি বরণ করবেন ঈশ্বর সৃষ্ট শারীরিক রূপান্তরের অঙ্গ হিসেবে। লিখেছেন “মৃত্যু দিয়ে যে প্রাণের মূল্য দিতে হয়, সে প্রাণ অমৃতলোকে মৃত্যুকে করে জয়।”
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এক আলোকবর্তিকা। মানবজীবনের যত ঘটনা, ভাব-বৈচিত্র্যের সমারোহ ও প্রকৃতির প্রতিটি অভিজ্ঞতার মাঝে মিশে আছে রবীন্দ্রনাথ, তার সমগ্রটাই তিনি ধারণ করেছেন তার গল্প, কবিতা, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ, গান, স্মৃতিকথা আর দর্শনে। রবীন্দ্রনাথ এখনও আছেন শিশুর প্রথম পাঠে, তাঁর আবৃত্তিতে, প্রেমিকের গানে, নদীর কলতানে, পাঠকের মনের গভীরে। তাঁর সৃষ্টি— জীবনের মৃত্যুতে নয়, সে জীবিত থাকে তাঁর সৃষ্টিতেই। কবি শঙ্খ ঘোষ লিখেছিলেন— “যখন রবীন্দ্রনাথ থাকেন না, তখনও তিনি থাকেন।” আজকের দিনেও রবীন্দ্রনাথ আমাদের পথ প্রদর্শক, শতবর্ষ আগে তাঁর রচনাগুলি আজও প্রাসঙ্গিক।
তাই ২২-শে শ্রাবণ বিদায়ের দিন নয়— এ দিন আবার নতুন করে জেগে ওঠার দিন, চেতনার অমর শিখা প্রজ্বলনের দিন।

যখন পড়বে না মোর পায়ের চিহ্ন এই বাটে
আমি বাইবো না মোর খেয়াতরী এই ঘাটে গো
চুকিয়ে দেব বেচা কেনা, মিটিয়ে দেব লেনাদেনা
বন্ধ হবে আনাগোনা এই হাটে.
তখন আমায় নাইবা মনে রাখলে
তারার পানে চেয়ে চেয়ে নাইবা আমায় ডাকলে
তখন কে বলে গো সেই প্রভাতে নেই আমি
সকল খেলায় করবে খেলা এই আমি
আহা কে বলে গো সেই প্রভাতে নেই আমি
নতুন নামে ডাকবে মোরে,
বাধবে নতুন বাহু-ডোরে,
আসব যাব চিরদিনের সেই আমি.
তখন আমায় নাইবা মনে রাখলে
তারার পানে চেয়ে চেয়ে নাইবা আমায় ডাকলে
কৃতজ্ঞতা স্বীকার:
ফেসবুক বারুইপুর
ফেসবুক কিছু কথা II কিছু সুর
********






Add comment