সাহিত্যিকা

ইতালির এটা সেটা (তৃতীয় পর্ব)

ইতালির এটা সেটা (তৃতীয় পর্ব)
© অঙ্কিতা মজুমদার, ২০০৯ ইলেকট্রনিকস ও টেলি কমিউনিকেশন ইনিনিয়ারিং

আগের পর্বের লিঙ্ক

ইতালির এটা সেটা (দ্বিতীয় পর্ব)

দো লাবজো কী হ্যায়
******************
মিলান থেকে সক্কাল সক্কাল ভেনিস যাওয়ার বাস। আমরা ভোর থাকতে উঠে পড়ে রেডি হয়ে হাতে অনেকটা সময় রেখে বেরিয়ে পড়েছি। একেই আগেরদিন বাস পেতে বিস্তর ঝক্কি পোহাতে হয়েছে, তার উপর সাতসকালে যদি মেট্রো পেতে ঝামেলা হয়!

ভিসা পাওয়ার জন্য যাতায়াতের টিকিট দিতে হয়। আমরা যখন ফ্রান্স ভিসার জন্য আবেদন করছি, যেহেতু তখন এপয়েন্টমেন্ট স্লটের আকাল, আমরা একটা টেম্পোরারি বাসের টিকিট কেটেছিলাম রিটার্ন, ফ্লিক্সবাসে। ইউরোপে ফ্লিক্সবাসের বেশ রমরমা। গুগল করে, বন্ধুদের সাথে কথা বলে মনে হয়েছিল ক্যানসেল করলে এরা রিফান্ড করে দেয়। এরকম অনেকেই করেছে এবং টাকাও পেয়েছে। তা আমাদের এমন ফাটা কপাল, যখন ফাইনালি ভিসা এল এবং আমরা আসল ফ্লাইটের টিকিট কাটলাম আর তারও পরে ফ্লিক্সবাসের টিকিট ক্যানসেল করলাম, তখন জানতে পারলাম তারা রিফান্ড করবে ভাউচারে। যা দিয়ে তাদের সাইট থেকে যখন খুশী বাসের টিকিট কাটা যাবে। টানা তিন দিন আমাদের আর কোথাও যাওয়ার নাই, আমরা এইখানে থাকব না, ভাউচারটা নষ্ট হবে, ইত্যাদি নানান কিছু বোঝানোর পরও তারা জানাল আমি যখন খুশী টিকিট কাটতে পারি, চাইলে আমার বন্ধু এবং অন্যদেরও ভাউচার দিয়ে দিতে পারি। কিন্তু তারা খুবই দুঃখিত, তারা কোনোমতেই আমায় টাকা দিতে পারবে না। অগত্যা সেই ভাউচার দিয়ে আমরা ভেনিস যাওয়ার টিকিট কাটলাম এবং এক বন্ধু জানাল ফ্লিক্সবাস মন্দ না।

কোনোমতে কানে হেডফোন গুঁজে ঘুমিয়ে আর অভির সাথে ভাঁট বকে দুপুর নাগাদ ভেনিস পৌঁছালাম। শেষের দিকের রাস্তাটা ভারী মজার। পর পর অনেকগুলা লেন। সবচাইতে বাঁ দিকের লেনটা আসলে ট্রেনলাইন। আর অন্যগুলা বাস আর গাড়ি রাস্তা। যে বড় বাস টার্মিনালে বাস থামে, সেখান থেকে আরেকটা ওয়াটার বাস নিয়ে শহরের ভিতর ঢুকতে হয়। ভেনিস শহরে কোনো গাড়ি চলে না। সেখানে হয় ওয়াটার বাস, ক্যাব কিংবা গন্ডলা করে ঘুরে বেড়াতে হয়। আমরা নেহাতই গরিব মানুষ। বাসই ভরসা। এও আবার আরেক মজা। ওয়াটার বাসে যেখানেই যান না কেন, ভাড়া ৯ ইউরো। আর নামে যেমন বাস, আচার আচরণও ঠিক আমাদের লোকাল বাসের মত। মানুষ গিজগজ করছে। মাঝখানের প্যাসেজে সারি দিয়ে মানুষ দাঁড়িয়ে পড়ছে। তফাৎ বলতে রাস্তার বদলে জল।
এ আমার অদ্ভুত লেগেছে। একটা শহরে জলের রাস্তা।

আমাদের হোটেল সেন্ট মার্ক স্কয়ারের একদম কাছে। অভিই লোকেশন সিলেক্ট করেছে যাতে আশেপাশেই সব থাকে। আমাদের ভেনিসে তেমন কোনো প্ল্যান নাই। আমার একটু গ্রান্ড ক্যানেলের ধার দিয়ে হাঁটার ইচ্ছা, আর ওই স্কয়ারে ঘোরাঘুরি, অভির রিয়ালটো ব্রিজ যাওয়ার ইচ্ছা আর জলের ধারে খাওয়ার। ব্যাস এই! বিভিন্ন ব্লগে গন্ডলা খুবই দামী পড়ার পর গন্ডলা আমরা বাদই দিয়েছিলাম। আসার কয়দিন আগে তালহা দা বলায় আবার গন্ডলা যুক্ত হয়। যেমন আমরা ভেবেছিলাম অতটাও দামী নয়। আমরা চারজনে একটা গন্ডলা বুক করেছিলাম প্রাইভেট। বোধহয় আশি বা একশো ইউরো মত লেগেছে। যতই আমি গন্ডলা দামী হলে চড়বো না স্থির করি না কেন, গন্ডলা চড়বো স্থির হওয়া মাত্র মনের ভেতরে বাকম বাকম। ছবি উঠবে তো! অভির পাশে বসে দো লাবজো কী হ্যায় গাইতে হবে না! আকাশ আর জলের সাথে মিলিয়ে এবার জন্মদিনের আকাশনীল জামাটাও ঠিক হয়ে গেছে। সাথে অভিরও নীল সাদা চেক শার্ট। ছবিতে ভালো লাগতে হবে তো!

দুপুর দুইটার সময় গন্ডলা রাইড বুক করা। আমাদের হোটেল থেকে কাছেই। আমরা ভেবেছি হোটেল যেহেতু ওয়াটার বাস স্টপ থেকে কাছে, আমরা হোটেলে গিয়ে ব্যাগ রেখে, খাবার দাবার খেয়ে ধীরে সুস্থে গন্ডলা চড়তে যাব। তবে ভেনিস শহর যে কী প্রকান্ড গোলোকধাঁধাঁ! গুগল ম্যাপ হোটেলের যে লোকেশন দেখাচ্ছে, সেখানে ওই নম্বরের কোনো বাড়িই দেখা যাচ্ছে না। বাস স্টপ থেকে আসার পুরো রাস্তাটাই সরু সরু গলি। দুপাশে দোকানপাট। আর রাস্তায় কাতারে কাতারে লোক। দুনিয়ার সব মানুষ বুঝি সামারে ভেনিস চলে এসেছে। ঠিক আমাদের দিঘার মত। চারপাশে অজস্র গিফ্ট শপ আর পিজ্জার দোকান।

আধ ঘন্টাখানেক একই জায়গায় ঘুরপাক খেয়ে, একই পিজ্জার দোকান পাঁচবার পেরিয়ে এক দোকানের এশিয়ান কর্মচারীকে জিজ্ঞেস করে যখন হোটেল খুঁজে পেলাম, ততক্ষণে সূর্য চো চো করে সব শক্তি শুষে নিয়েছে! একটা দুই বিছানার এপার্টমেন্ট। অন্ধকার। বড় বড় কতগুলা জানালা আছে বটে খোলার ব্যবস্থা নেই। তবে হ্যাঁ, এসি আছে। একটা রাজকীয় সাজ দেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা হয়েছে। ভালোই! চেয়ারের হাতল ধরামাত্র খুলে আসে। টেবিল সরাতে গেলে পা ল্যাকপ্যাক করে। তবে এসি চলে। নিজের ইচ্ছায় চলে, তবে চলে।
কোনোরকমে ব্যাগ রেখে, চোখেমুখে জল দিয়ে বেরিয়ে একগাদা পিজ্জার দোকান পার হয়ে আমরা গন্ডলার কাছাকাছি কিছু খেয়ে নেব বলে চলে এসেছি। ভেবেছি সেখানে নিশ্চয়ই খাবার পাওয়া যাবে। আবার দেরি হয়ে যাওয়ার ভয়ও থাকবে না। আইডিয়া ভালো। তবে অলক্ষ্যে কারা যে বারবার মুচকি হাসে! গন্ডলা রাইডের স্পটটা দেখে নিয়ে এগিয়ে চলছি তো চলছিই। কোথায় সেইসব খাবারের দোকান! এদিকে ঘড়ির কাঁটা দেড়টা ছুঁই ছুঁই। ভাগ্যবশত, দুটো ক্যাফে পাওয়া গেল। একটায় ঢুকে গেলাম অথচ খাবার তো কিছুই চিনিনা ওই পিজ্জা আর পাস্তা ছাড়া। পাস্তা অর্ডার দিতে জানা গেল তাতে সময় লাগবে। ইংলিশ জানা এক স্টাফের পরামর্শ মত খাবার এল। আমি আলু দিয়ে বানানো ব্রেড মত কী একটা যেন খেলাম। নাম বোধহয় ফোকাচিও। খেলাম, কিন্তু সে ভালো না মন্দ বুঝিনি। খালি আমার পরিচিত স্বাদের থেকে খুব আলাদা। কোনোমতে নাকে মুখে গুঁজে ঠা ঠা রোদ মাথায় নিয়ে দৌড়ে দৌড়ে গন্ডলার কাছে পৌঁছালাম দুপুর ঠিক দুইটায়। গন্ডলা এল।

সাদাফ আর তালহা দার কাছে ভেনিসই সবচেয়ে স্পেশাল দিন। সাদাফ গন্ডলার প্রচুর রীলস আর ছবি দেখে রেখেছে। তার অমন সব ছবি আর ভিডিও চাই। আমার কাছে ভেনিস সবচাইতে স্পেশাল না হলেও মাথার ভেতর দো লাবজো কী হ্যায় গানটা আছে। কেন আছে জানি না। আমি গন্ডলায় ছবি উঠবে বলে সেই ভোর রাতে উঠে একটা লম্বা জামা পরে, ম্যাচিং দুল আর ব্রেসলেট পরে পাগলের মত সেজেগুজে বাস ধরতে গেছি। মনে মনে কেউ না কেউ নিশ্চয়ই আমায় পাগল ভেবেছে। তবে এখানে লোকে খুব একটা ভাবে টাবে না। ঘুমানোর পাজামা পরে ঘুরে বেড়ানোও এখানে যেমন নর্মাল, তেমনি সাত সকালে মেকাপ করে, ফিটফাট ড্রেস পরে ঘুরে বেড়ানোও।

গন্ডলার যা দু একখান ছবি দেখেছি তাতে তো দেখি মানুষ গন্ডলার কোনামত মাথার কাছে বসে। অথচ আমরা সেই মাথার কাছের সিঁড়ি বেয়ে গন্ডলা চড়তেই মাঝিভাই থুড়ি গন্ডলা ভাই আমাদের উল্টোদিকের মাথার কাছে রাখা সিংহাসন দেখিয়ে দিল। তালহা দা আর সাদাফ সেই সিংহাসনে বসল আর আমরা দুইজন তাদের দুই পাশে মুখোমুখি দুই সিটে পারিষদের মত। খুব একটা চাপ নিইনি। জায়গা অদল বদল করে বসে যাবে। আধঘন্টা সময় আছে তো। এদিকে গন্ডলা দুলে দুলে চলতে শুরু করা মাত্রই সব ভুল নিমেষে ভেঙে গেল। গন্ডলা ভাই জায়গাবদল তো দূর, নড়াচড়া করলেই ইতালিয়ানে বকা দেয়। আর এদিকে অবস্থানে একটু বদল হলেই গন্ডলা এমন দুলুনি শুরু করে! তার মধ্যেই আমি সুযোগ পেয়ে কোনোমতে চালকের অনুমতি নিয়ে প্রায় হামাগুড়ি দিয়ে অন্য মাথার কাছের সিঁড়িতে পৌঁছাতে পেরেছি। ভাগ্যিস!

জল কেটে কেটে গন্ডলা যখন এগিয়ে যাচ্ছে তখন মাথার উপর গনগনে সূর্য আর নিচে ঘোলাটে জল। গন্ডলা যেখান থেকে ছাড়ছে সেখানে গিজগিজে ভীড় হলেও একটু গলিতে ঢুকতেই ভীড় কমে যায়। কোনো শহরের জল নিয়েই আমি আর কোনো প্রত্যাশা রাখি না। বাংলাদেশের বুড়িগঙ্গা দেখে যতই স্বপ্নভঙ্গ হোক, প্রত্যাশা না রাখলে যে খুব একটা চাপ হয় না, এ সত্যও শিখেছি বই কী! এইবার তাই স্বপ্ন তৈরিই হয় নি। মনে মনে দীর্ঘশ্বাসও পড়েনি। বরং এ গলি, ও গলির জলের ভেতর দিয়ে যাওয়ার সময় আশেপাশের সব পুরনো বাড়িঘরের ছায়া সূর্যের তাপ আড়াল করে দাঁড়িয়েছিল। উঁচু উঁচু বাড়ির ছায়া আর কালো ঘোলা জলের ভেতর দিয়ে গন্ডলা চড়ে ঘুরে বেড়ানোর সময় বাবার কথা মনে হচ্ছিল। বাবারা বোধহয় এরকম করেই ডিঙি নৌকা নিয়ে ইস্কুল যেত। এত উঁচু বাড়ি ছিল না। তাতে কী! জল ছিল। আশ্রয়ও।

সাদাফের স্বপ্ন বরং ভেঙে গেছে। বেচারি ছবি তুলতে পারেনি ভালো। কিভাবে হবে! ফটোগ্রাফার তো জায়গাই বদলাতে পারেনি। বেচারা অভি ছবি তুলতে তুলতে আশপাশ ভালো করে দেখতেই পায়নি। দেখা গেল লাভ হয়েছে একমাত্র আমার। পুরো আধঘন্টা জলের দেশে ভেসে বেড়িয়েছি, সাথে দারুন সব ছবি উঠেছে। কেবল গানের দৃশ্যর কাহানিটাই যা হয়নি! তবে কাহানি আলবাত হয়েছে।

View of the Grand Canal from Rialto to Ca’Foscari

**********

Sahityika Admin

Add comment