সত্যজিতের সঙ্গীত (চতুর্থ পর্ব)
© সুকান্ত রায়, ১৯৭৭ ইলেকট্রনিকস ও টেলি কমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং
সত্যজিতের শাখা-প্রশাখা সিনেমাটি দুটো বিপরীতধর্মী থিমের সমন্বয়, যে থিম বা বিষয় বারে বারে সিনেমাতে ফিরে আসে। এই বিষয় দুটির একটি হলো ধনী শিল্পপতি আনন্দ মজুমদারের বিশাল দ্বন্দে জর্জরিত ভারতীয় পরিবারের হতাশা, আর দ্বিতীয়টি হলো মজুমদারের ছেলে প্রশান্তর মানসিক ভারসাম্যহীনতার ফলে আবেগ আর মেজাজ বদলানো। এই দুটি থিম সত্যজিত নিজের প্রতিভাবলে আমাদের বোঝালেন বাখ আর বেথোভেনের সঙ্গীতের সুন্দর ও পরিমিত ব্যবাহারে। সিনেমার এক প্রধান দৃশ্যে প্রশান্ত যখন গ্রেগরিয়ান মন্ত্র ‘কিরিয়ে এলিসন’ শুনছে তখন ব্যাকগ্রাউন্ডে বাজছে ‘বিপদে মোরে রক্ষা করো’ ব্রহ্মসঙ্গীত। সিনেমায় আনন্দ মজুমদার যখন পক্ষাঘাতে শয্যাশায়ী এবং তার চারজন ছেলের নৈতিক অবক্ষয় ঘটেছে তখন গ্রেগরিয়ান মন্ত্র ও ব্রহ্মসঙ্গীতের অসামান্য ফিউশন এই ভাবনাকেই ফুটিয়ে তোলে যে কেবল ঈশ্বরই এই ক্ষতবিক্ষত পরিবারটিকে সুস্থ করতে পারেন।
অবিশ্বাস্যভাবে সত্যজিত তাঁর ১৯৬৪ সালের ধ্রুপদী চলচ্চিত্র ‘চারুলতা’ র সুরের মূল কাঠামোটি মোৎজার্টের বিখ্যাত ‘স্ট্রিং কুইন্টেট ইন জি মাইনর’ এর আদলে তৈরি করেছিলেন। চারুলতার ট্র্যাজিক গল্পের পাঁচটি চরিত্রকে পাঁচটি তারযন্ত্রের (string instruments) মাধ্যমে উপস্থাপিত করেছিলেন। দুটি ভায়োলিন, দুটি ভায়োলা আর একটিমাত্র চেলো এদের সুরের বৈচিত্র্য আর সংলাপের মধ্যে দিয়ে চারুলতায় ফুটে উঠেছে। চারুলতার একেবারে শুরুর দৃশ্য যখন উদ্বোধনী কৃতিতের লেখাগুলো পর্দায় মিলিয়ে যায়, সেতারে রবীন্দ্রনাথের একটা জনপ্রিয় গানের সুর ভেসে ওঠে, যা সিনেমার মূল উৎস, রবিঠাকুরের ছোটগল্প নষ্টনীড়ের সাথে যোগ নির্দেশ করে। একই সাথে সিনেমার একটা গভীর পূর্বাভাসও পাওয়া যায়, গানটির তালের চলা নিয়ে। ‘তা তা থৈ থৈ’ হল নর্তকীদের শেখানো একটি হারমনিক তালের বোল, কিন্তু চারুর পরিস্থিতির বিপরীত। অমলের সাথে চারুর তালের অমিল এবং একটি জাঁকজমকপূর্ণ প্রাসাদে নিজেকে একা খুঁজে পাওয়ার যে নিস্ক্রিয়তা, সুরটি সেখানে একটি সূক্ষ্ম কিন্তু বিদ্রুপাত্মক ভাব হয়ে কাজ করে। সামান্য একটি বিষয় কিন্তু বারবার সিনেমাটি দেখলে এটা ধরা পড়ে আর সিনেমাটির উপলব্ধি আরও বাড়িয়ে তোলে। তিনকন্যা এবং চারুলতা দুটিই রবিঠাকুরের গল্প নিয়ে নির্মিত, কিন্তু এই ধরনের খুঁটিনাটি বিষয়গুলিই দুটি ছবির মধ্যে জমিন আসমান ফারাক তৈরি করে দেয়।
চরিত্রের মানসিকতা এবং একাধিক চরিত্রের অন্তর্দ্বন্দ্বকে প্রকাশ করতে সত্যজিত সবসময়ই রচনা করেছেন ‘পলিফনিক কম্পোজিশন’, অর্থাৎ মূল সুর বা মেলোডির ওপর দিয়ে হারমনি এবং কাউন্টারপয়েন্ট। এটিকে বলা হয় ‘পলিফনি’। মজা হলো এই, পাশ্চাত্য ধ্রুপদী ঢংয়ের কম্পোজিশনে সত্যজিত নিয়ে এলেন ভারতীয় সুর আর যন্ত্র। এতোদিন ভারতীয় অর্কেস্ট্রা সমবেতভাবে শুধু একটিই সুর বা মেলডি বাজাতো। এবার ভারতীয় সিনেমার সঙ্গীতে এল ‘পলিফনিক’ বৃন্দবাদন, যা চরিত্রের নাট্যমূহুর্তের জটিলতাকে সঙ্গীতের মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলতে পারে।
এবার একটা অন্য গল্প বলি। চিড়িয়াখানা ছবির নায়ক উত্তমকুমার শ্যুটিংয়ের সময় হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন। ছবির সেটগুলো ভেঙে ফেলতে হয় এবং উত্তমকুমার সুস্থ হবার পর আবার সেগুলো নতুন করে তৈরি করতে হয়। ফলে ছবির গান রেকর্ডিং এর সময় প্রযোজকের পয়সার টানাটানি পড়ে। তাই যখন প্রযোজক রেকর্ডিং এর জন্য আরও টাকা দিতে অসহায়তা প্রকাশ করেন, তখন সত্যজিত তাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন যে সত্যজিতের গ্র্যান্ড হোটেলে পুরো একটি দিন কাটানোর খরচ প্রযোজক দিতে পারবেন কিনা। তিনি রাজি হলে সত্যজিত তখন একটি সুটকেসে জাইলোফোন এবং আরও কিছু পারকাশন বাদ্যযন্ত্র যা তাঁর কাছে ছিল সেগুলো গুছিয়ে সত্যজিতের চিরবিশ্বস্ত ‘উহের’ (Uher) টেপ রেকর্ডার নিয়ে গ্র্যান্ড হোটোলের উদ্দেশ্যে যাত্রা করলেন। গ্র্যান্ড হোটেলে দিনরাত কাটিয়ে সত্যজিত তার সুরগুলো উহেরে রেকর্ড করে বাড়ি ফিরে এলেন। বাড়িতে আরও কয়েকটি পিয়ানোর টুকরো রেকর্ড করে উহেরে সেগুলির গতি পরিবর্তন (speed change) করেন। রেকর্ড করা অংশগুলো পর্যায়ক্রমে উহের থেকে অপটিক্যাল ট্রাকে স্থানান্তরিত করে ছবির সাথে মেলানো হয়। এভাবেই চিড়িয়াখানার সঙ্গীত রেকর্ডিং সম্পন্ন হয়, শুধুমাত্র একটি গান ছাড়া। সত্যজিতেরই সুর দেওয়া ‘ভালোবাসার তুমি কি জানো’ স্টুডিওতে রেকর্ড করা হয়েছিল। সত্যজিত তনয় সন্দীপ একবার বলেছিলেন “বাবা একাই একটা পুরো ব্যান্ড দলের সমান ছিলেন।”
১৯৬৬ সাল। জেমস আইভরি, সত্যজিত আর শশী কাপুর একে অপরের খুবই ঘনিষ্ঠ ছিলেন, তাই সত্যজিত স্বাভাবিকভাবেই রাজি হয়ে যান। বিখ্যাত পরিচালক এই ছবিটির জন্য চমৎকার কিছু সঙ্গীত রচনা করেছিলেন যা মেজাজ ও ধরনে ছিল একেবারেই ভিক্টোরিয়ান। ‘শেক্সপিয়র ওয়ালা’ সিনেমাটি ভবিষ্যত প্রজন্মের কাছে প্রমাণ করে যে সত্যজিত পাশ্চাত্য ধ্রুপদী সঙ্গীতের বিভিন্ন রুপ এবং ধারা সম্পর্কে কতোটা অভিজ্ঞ ছিলেন। শেক্সপিয়র ওয়ালা’ তে অসাধারণ কিছু স্ট্রিং কম্পোজিশনের পাশাপাশি অন্যান্য বাদ্যযন্ত্রের কাজও ছিল। ভায়োলিনে সত্যজিতের তৈরি করা সুরগুলি শুনলে নির্বাক হয়ে যেতে হয়। সত্যজিতের প্রিয় বেহলাবাদক স্ট্যানলি গোমেজ সেগুলি সিনেমায় বাজিয়েছিলেন।
পায়ে পড়ি বাঘমামা
সত্যজিত পাশ্চাত্য ধ্রুপদী সঙ্গীতের রেটিং এবং পর্যালোচনার নিয়মিত খোঁজ রাখতেন। তিনি পেঙ্গুইন এবং গ্রামোফোন কোম্পানির ক্যটালগ প্রায়শই খুঁটিয়ে দেখতেন। মূলত পেঙ্গুইন ক্যাটালগের ওপরই তাঁর বিশেষ নজর থাকতো এবং সেখান থেকেই সত্যজিত তাঁর সংগ্রহের জন্য প্রয়োজনীয় ধ্রুপদী সঙ্গীতগুলির একটি তালিকা তৈরি করতেন। তাই এরপর যখনই তিনি বিদেশে যেতেন, তার কাছে ঠিক কোন অ্যালবাম বা মিউজিক টেপগুলো কিনতে হবে তার একটা সুনির্দিষ্ট তালিকা থাকতো। সেই সময় পাশ্চাত্য ধ্রুপদী সঙ্গীতের যাদুকরকে সাহায্য করার জন্য আজকের মতো ইন্টারনেট ছিলনা। এরপর যখন সত্যজিত একটা উহের (Uher) টেপ রেকর্ডার কেনেন, তখন সুর তৈরির সময় এই টেপ রেকর্ডার নিয়ে প্রচুর পরীক্ষা নিরীক্ষা শুরু করেন। উহের এর স্পুলের গতি চারভাবে বদলানো যেত। এই গতি পরিবর্তনের ব্যাপারটি সত্যজিতকে গান বা সুর বাজানোর সময় ইম্প্রোভাইজ বা তাৎক্ষনিক উদ্ভাবনারও এক বড় সুযোগ করে দেয়। মিউজিক রেকর্ডিং সেশন শেষ হবার পর সত্যজিত সমস্ত মিউজিক টেকগুলি উহের এ স্থানান্তরিত (transfer) করে তারপর নিজের পড়ার ঘরে বসে চারটি ভিন্ন গতিতে সেগুলো বাজিয়ে তাঁর সঙ্গীতের বিভিন্ন বৈচিত্র তৈরি করতেন। ‘সোনার কেল্লা’ তে নকল ডঃ হাজরা মুকুলকে হিপনোটাইজ করার সময় ব্যাকগ্রাউন্ডে যে সুর শোনা যাচ্ছিল, সেটি উহের-এ অত্যন্ত ধীর গতিতে বাজানো একটা প্রচলিত গানের সুর।
পছন্দমতো সুরসৃষ্টিতে সত্যজিতের সামনে প্রায়ই একটা বড় বাধা আসতো। কোনো নির্দিষ্ট সুরের জন্য তিনি যে বিশেষ পাশ্চাত্য বাদ্যযন্ত্রটি ব্যাবহার করতে চাইতেন, সেটি সবসময় তার কাছে থাকতো না। যেমন ‘ওবো’ (Oboe) নামের একটি বাদ্যযন্ত্র, যা অনেকটা আমাদের বাঁশির মতো ফুঁ দিয়ে বাজাতে হয়, কিন্তু বাঁশির থেকে অনেক আলাদা তার সুর এবং বাজানোর টেকনিক। বেহালা বাজানোর পারদর্শিতার অভাব এদেশে ছিলনা কিন্তু ওবো, ট্রোম্বান, ব্যাসুন, ট্রাম্পেট বা হর্ণের মতো পাশ্চাত্য বাদ্যযন্ত্র বাজানোর লোকের আকাল ছিল। ‘গুগাবাবা’তে গুপী আর বাঘা জুতো পরীক্ষা করতে যখন হঠাৎ চতুর্দিকে বরফের মধ্যে নামে, সেই দৃশ্যে সত্যজিত ব্যাবহার করেছিলেন ‘ট্রোম্বোন’। আবহসঙ্গীত যদি পাশ্চাত্য ধারার, তাহলে তো গোদের ওপর বিষফোঁড়াসম। একবার সত্যজিতকে মিউজিক দেবার জন্য চেন্নাই থেকে একজন চেলোবাদক আনিয়ে নিতে হয়েছিল।
পাশ্চাত্য ধ্রুপদী সঙ্গীত, বিশেষ করে ‘সোনাটা’ ফর্মের ওপর সত্যজিত অত্যন্ত শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। সোনাটা এমন এক সঙ্গীত কাঠামো যা সাধারণত কোনো রচনার প্রথম অংশে দেখা যায়, যার মধ্যে থাকে এক্সপোজিশন (সূচনা), ডেভেলপমেন্ট (বিস্তার) এবং একটি রিক্যাপিচুলেশন (পুনরাবৃত্তি)। সোনাটা ফর্মের এই অনুকরণ সত্যজিতের ক্ষেত্রে দুটি স্তরে দেখা যায়। অবশ্যই তাঁর সিনেমার আবহসঙ্গীতে এবং তার গল্পের কাঠামোতেও যা সম্ভবত সোনাটার রুপরেখা দ্বারা অনুপ্রাণিত ছিল। সত্যজিতের কিছু চরিত্র-কেন্দ্রিক সিনেমা যেমন ‘অরণ্যের দিনরাত্রি’, যেখানে আপাতদৃষ্টিতে তেমন ঘটনা কিছু ঘটেনা, সেখানেও অসীম, অপর্ণা, জয়া, সঞ্জয় যেন মোৎজার্টের কোনো কম্পোজিশনের আলাদা আলাদা মিউজিক্যাল মোটিফ। তাদের পারস্পরিক সম্পর্ক যেন সেই সুরগুলোর মেলডিক সংঘাত (conflict), পরত (layer) সৃষ্টি, রুপান্তর (transformation) এবং সুরের চড়াই-উতরাই (ধাপ)। গল্পের জটিলতাগুলো যেন ত্বরান্বিত crescendo (উচ্চগ্রামের সুর), যেখানে সুর ও বেসুরো ছন্দের সহাবস্থান এবং সবশেষে ঘরে ফেরার সেই গাড়ির যাত্রা যেন এক প্রশান্ত সংকেত, যা সুরের মূল কেন্দ্রে ফিরে আসার মাধ্যমে এক সুমধুর সমাপ্তি টানে।
সত্যজিতের সঙ্গীত পরিচালনার একটা বড় বৈশিষ্ট্য হলো তিনি সুরকে কেবল ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক হিসেবে নয়, বরং একটি চরিত্র হিসেবে ব্যাবহার করতেন। ‘অশনি সংকেত’ ছবিতে গ্রাম্য পরিবেশ, দুর্ভিক্ষ ও আসন্ন বিপদকে ফুটিয়ে তুলতে সত্যজিত আবহসঙ্গীতে ব্যাবহার করেছেন মূলত ভারতীয় এবং লোকজ বাদ্যযন্ত্র ও সুর। সঙ্গত কারনেই দুর্ভিক্ষের ছবিতে কোন গান বা গানের সুর নেই। অশনি সংকেতে সেতার, বাঁশি ও ড্রাম বা তবলার ব্যাবহার সত্যজিতের অন্যান্য সিনেমা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা, পরিবেশের ভয়াবহতা ও শূন্যতা ফুটিয়ে তোলার জন্য। এই সিনেমার তিনটে উল্লেখযোগ্য থিম হলো ১) গঙ্গাচরন থিম, ২) ধর্ষনের পরবর্তী (aftermath of rape) থিম এবং ৩) অশনি সংকেত থিম। এবার দেখি থিমের বৈচিত্র্যের সাথে সাথে মিউজিকের পরিবর্তন। গঙ্গাচরন যখন চালের সন্ধানে এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে ঘুরছেন, তখন সেতারে একটা ধীর গতির একঘেয়ে সুর বাজে। সেটা বোঝায় শান্তি শেষ হয়ে আসছে, ভয়াবহ সময়ের শুরু। ছবির নাম অশনি সংকেত (Distant Thunder): আকাশে যুদ্ধবিমানের আওয়াজ আর নিচে মানুষের হাহাকার, এই দুটির মধ্যে সংযোগ ঘটাতে তিনি ড্রাম ও তবলার গম্ভীর আওয়াজ ব্যাবহার করেছেন। যখনই আকাশে জাপানী যুদ্ধ বিমান উড়ে বেড়ায়, তখনই মানুষের হৃদস্পন্দন (হার্টবিট) বেড়ে যাওয়া বোঝাতে সত্যজিত তাঁর সঙ্গীতের তালের গতি বাড়িয়ে দেন। আবার যখন সিনেমার একটা বিখ্যাত দৃশ্যে অনঙ্গ বউ (ববিতা) বনের ভেতর বুনো কচু বা আলু খুঁজছে, তখন সেই সময়ের হাহাকার ও একাকিত্বকে আরও তীব্র করে তুলতে সত্যজিত কোনো মিউজিকের ব্যবহার করেননি – শুধু ঝিঁঝি পোকার ডাক আর ববিতার দীর্ঘশ্বাসের শব্দ।
‘পায়ে পড়ি বাঘ মামা’ গানটির রেকর্ডিং হবে। সত্যজিত রাধাকান্ত নন্দীকে বললেন পাখোয়াজটা একটু দক্ষিণ ভারতীয় স্টাইলে মৃদঙ্গের মতো করে বাজাতে। রাধাকান্ত অমনি পাখোয়াজে দেশলাইয়ের কাঠি লাগিয়ে হুবহু মৃদঙ্গের আওয়াজ শুনিয়ে দিলেন। গানটিতে কিছুই নেই, শুধু অনুপ ঘোষাল গাইছেন আর পিছনে বীনার মতো এফেক্ট। সত্যজিত সবসময় মিউজিক রুমের পাশেই কনসোল রুমে কনসসোলের সামনে বসে থাকতেন। ফাইনাল টেক শুরু হলো, রাধাকান্ত সমেত উপস্থিত বাদকরা এমনকি সবাই ভাবছেন অনুপ ঘোষালের গলাটা একটু স্টেডি হলে, পিচটা একটু ওপরে হলেই ভালো হতো। রেকর্ডিং শেষে অনুপসহ সব বাদকরাই মনমরা, এমনকি আরেকটা টেকের জন্য তৈরিও হচ্ছেন সবাই, এমন সময় সত্যজিত “ওয়ান্ডারফুল, এক্সেলেন্ট” বলতে বলতে ঘরে ঢুকলেন। সবাই ভাবছে যে তাদের কানে গন্ডগোলটা ধরা পড়ল অথচ ওনার কানে লাগলো না। ব্যাপারটি বুঝতে পেরে সত্যজিত তাদের দৃশ্যের স্কেচ দেখিয়ে বললেন “শোনো, ওই বাঘটাকে দেখে ভয়ে গুপী এই গানটা গাইছে। গলা একেবারে স্টেডি হলে কি সেটা ঠিক হত?” সত্যজিত তার গানের লয় আগে থেকেই রেকর্ড করে রাখতেন। যে বাঘটাকে শটে দেখানো হয়েছিল, তার নিশ্বাস প্রশ্বাসের সঙ্গে মিলিয়েই সত্যজিত গানটার লয় বেঁধেছিলেন। এই ছিল তার কাজের ধরন।
পাশ্চাত্য সঙ্গীত থেকে সরে এসে গুপী গাইন সিরিজের তিনটে ছবির মোট বত্রিশটা গানে স্রষ্টা মিশিয়েছেন লোকসুর, বিভিন্ন রাগ, এমনকি কর্ণাটকি সুরও। গুপী বাঘা বিপদে পড়লেই তাঁদের স্রষ্টা তাঁদের গলায় তুলে দিয়েছেন কর্ণাটকি সুর। যেমন ‘গুগাবাঘা’ ছবিতে ‘ওরে বাঘা রে’, হীরক রাজার দেশেতে ‘পায়ে পড়ি বাঘমামা’ আর গুপী বাঘা ফিরে এলোতে (পরিচালক সন্দীপ রায়) ‘মোরা আসি ধেয়ে’ গানগুলোতে। অর্কেস্ট্রেশনের দিক দেখলে এই বত্রিশটি গানের তুলনা মেলা ভার। এই গানগুলিতে গায়কের মূল মেলোডির পেছনে রয়েছে বহুমাত্রিক হারমনি যা বাজতে থাকে পিছনে। ‘নাহি যন্ত্র’ গানটির ‘রাজা ধিক ধিক ধিক’ অংশটিতে মিলিত বেহালা, চেলো ও ডাবল বেস-এর কাউন্টারপয়েন্টের প্রয়োগ সত্যজিতকে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ কম্পোজারদের সঙ্গে এক সারিতে বসিয়ে দেয়।

*******






Add comment