এ্যান্টারটিকা অভিযানে দুই বিক্কলেজিয়ান (ষষ্ঠ পর্ব)
© দীপ্ত প্রতিম মল্লিক, ১৯৮০ মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং
আগের পর্বের লিঙ্ক
ষষ্ঠ পর্ব
৩১ ডিসেম্বর ২০২৩- ফকল্যান্ড আইল্যান্ড
ভোরবেলা ঘুম ভাঙ্গল। গতকাল সারদিন অগাধ বিশ্রমের ফলে আর ঘুম হলই না। উঠে জানালার পর্দা সরিয়ে দেখি দূরে একগাদা দ্বীপপুঞ্জ দেখা যায়। তার মানে ফকল্যান্ড আইল্যান্ড প্রায় এসে গেল। সকাল আটটায় আসার কথা, তখন সাতটাও বাজেনি। ফকল্যান্ডের তটরেখা দেখে বার বার মনে পড়ছিলো আশির দশকে হাওড়া কলকাতার বিভিন্ন দেওয়াল লিখন আর পোষ্টারের কথা। সাম্রাজ্যবাদী শক্তি হাত ওঠাও- ফকল্যান্ড বাঁচাও, পুঁজিবাদ নিপাত যাক, ফকল্যান্ড বেঁচে থাক ইত্যাদি। পশ্চিম বাংলার বেশ কিছু রাজনৈতিক দল এই নিয়ে প্রচুর মিটিং মিছিল করেছিল। তখন জানতামই না এই ফকল্যান্ড কোথায়? বেশ কজন মিটিঙতে অংশগ্রহণকারীকে মিছিলে আটকে যাওয়া বাস থেকে গলা বড়িয়ে জিজ্ঞাসাও করেছিলাম, কিন্তু উত্তর মেলেনি। তখন তো আর গুগল ছিলো না, ছিল না ম্যাপ বই বা থাকলেও না দেখার অভ্যাস। তাই বহু বছর অজানা ছিল সেই ফকল্যান্ডের অবস্থান। আজ সেই ঐতিহসিক ফকল্যান্ড চোখের সামনে। ক-ঘন্টা পর তার বুকে আমাদের পা পড়বে- ভাবলেই কেমন যেন শিহরণ লাগে।
ফকল্যান্ড ১৮৮০ সাল থেকে ব্রিটিশদের দখলে। ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জে দুটি বড়ো দ্বীপ – পশ্চিম আর পূর্ব ফকল্যান্ড। আমাদের জাহাজ থামবে পূর্ব ফকল্যান্ডের স্ট্যানলীতে। স্ট্যানলী ফকল্যন্ডের রাজধানী। এই দুটি দ্বীপ ছাড়া আরো ছোট ছোট শ দুয়েক দ্বীপ আছে এই ফকল্যান্ডে। দ্বীপের প্রায় সবার ধমনীতেই ব্রিটিশ রক্ত বইছে। এখানের ভাষা ইংরাজি, মুদ্রা ব্রিটিশ পাউন্ড।

আর্জেন্টিনা স্পেনের থেকে স্বাধীনতা পায় ১৮১৬ সালে কিন্তু তখনও তাদের সীমানা স্থির হয় নি। সেটা স্থির হবার সময় থেকে মানে ১৯৬৫ সাল থেকে আর্জেন্টিনা দাবী তুলেছে এই দ্বীপ তাঁদের। কিন্তু দ্বীপের অধিকংশ লোকজন ব্রিটিশ বংশোদ্ভূত, তাঁদের ভাষা ইংরাজি, আত্মীয়স্বজন আছেন ইংল্যান্ডে, কাজেই তারা মানবে কেন? ফলে এই দ্বীপপুঞ্জ ব্রিটেনের সাথেই ছিল। অন্যদিকে আর্জেন্টিনার নিজ ভৌগলিক অবস্থানে নিজেদের প্রতাপ ক্রমেই বেড়েছে। যখন দেখল সোজা কথায় চিঁড়ে ভিজবে না, তখন মানে ১৯৮২ সালে ওরা আচমকা ব্রিটেন শাষিত ফকল্যান্ড আক্রমণ করে বসল, উদ্দেশ্য দখল নেওয়া- কিন্তু ব্রিটেন ছাড়বে কেন? দ্বীপে যে সব ব্রিটিশ সেনারা ছিল, তারা প্রথম আক্রমনটা রুখে দিল, শীঘ্রই তাদের সাথে যোগ দিল ব্রিটেনের নৌবহর, বিমান বহর আর প্রচুর সেনা। ফলে সাত সপ্তাহেই যুদ্ধ শেষ, আর্জেন্টিনা পিছু হটল আর ফকল্যন্ড রইল ব্রিটেনেরই। পরে আন্তর্জাতিক চুক্তি হয়, তাতে ভৌগলিকভাবে ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ আর্জেন্টিনার সীমানায় ও রাজনৈতিকভাবে ব্রিটেনেরই থেকে যায়। এইভাবেই চলে আসছে সেদিন থেকে।
যুদ্ধর কথা থামিয়ে ফকল্যান্ড ভ্রমণে ফিরে আসি। এখানে সর্বদাই তীব্র হাওয়া চলে। এ্যান্টারটিকার কাছে – তাই হাওয়া আসতে কোনো বাধা নেই। গড় তাপমাত্রা থাকে ৩-৪ ডিগ্রী। এই তীব্র হাওয়ায় ও ঠান্ডায় চাষ আবাদ প্রায় নেই। প্রধান জীবিকা ভেড়াপালন ও ট্যুরিজম।
এখানে প্রচুর পেঙ্গুইন আছে। কিং পেঙ্গুইন, ম্যাজেলান পেঙ্গুইনের কলোনী আছে প্রচুর। আমরা তাই উত্তেজিত – এই ট্রিপে পেঙ্গুইন প্রচুর দেখলেও এরকম সামনা সামনি যে দাঁড়িয়ে দেখতে পাব পেঙ্গুইন- তা ভাবি নি। অনিবৌদি, ঘন্টাদা সহ আমরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছি, কখন আসবে সেই দুর্লভ মুহূর্ত।
ঘন্টদারা দেখলাম তৈরী। সবাই মিলে ওয়ার্ল্ড ফুডে ব্রেকফার্স্ট খাচ্ছি আর দেখছি ফকল্যান্ড আইল্যান্ডের বিচিত্র রূপ। এখানে বড়ো পোর্ট নেই, তাই জাহাজ টেন্ডারিং করছে। মানে পাড় থেকে শ পাঁচেক মিটার দূরে নোঙ্গর করছে। জাহজের যে কটা নিজস্ব মোটর বোট আছে, সেগুলো এবার কাজে লাগবে ওয়াটার শাটল হিসাবে। দু হাজার লোক জাহাজে যাতে সুষ্ঠ ভাবে যেতে পারে তাই এবারেও জাহাজ কতৃপক্ষ শাটল বোটের টিকিট ইসু করছেন। আমরা খাওয়ার পর ওপরে গিয়ে শাটলের টিকিট আনলাম। আমাদের বোট নাম্বার ১৭ মানে ষোলোটা ট্রিপের পর আমাদের পালা। অতএব হাতে সময় আছে- ওয়ার্ল্ড ফুডেই বসলাম। দেখছি অজস্র পেঙ্গুইন জল থেকে পাড়ে উঠছে, আবার অনেকে জলে ঝাঁপও দিচ্ছে। অনিবৌদি বলল আমাদের খাওয়ার আগেই শাটলের টিকিট আনা উচিত ছিল, তাহলে আরো আগে যেতে পারতাম। ঘন্টাদা বলল, চিন্তার কিছু নেই সারাদিন সময় আছে, আমাদের বোটের পালা সকাল দশটার আগেই হয়ে যাবে।
সাড়ে নটায় বোট নাম্বার পনেরোর ডাক আসতে আমরা নীচে গেলাম। তিনতলার ডেক থেকে বোটে উঠতে হবে। ঘন্টাদা বলল, বলেছিলাম না, তাড়াতাড়ি হয়ে যাবে। ছ খানা মোটর বোট এদের, প্রত্যেকটায় শ খানেক লোক ধরে, কাজেই তাড়াতাড়ি হবে এটি স্বাভাবিক। তিনতলায় জাহাজের দরজা খোলা, ওখানে বোট দাঁড়িয়ে। সেফটি অফিসাররা প্রত্যেককে ধরে ধরে বোটে তুললেন। মিনিট পনেরো লাগল পাড়ে যেতে। পথে চোখে পড়ল অনেক পেঙ্গুইন সাঁতার দিচ্ছে। একটা ডলফিনের দল আমাদের বোটের পাশে ডিগবাজি খেতে খেতে চলল। জেটিতে নামার আগে চোখে পড়ল খান তিনেক সীল মাছ পাশের জেটিতে শুয়ে রোদ পোয়াচ্ছে। হ্যাঁ, আমাদের কপাল ভালো, আজ এখানে ঝকঝকে আবহাওয়া।
পাড়ে উঠে একটু এগিয়েই দেখি পেঙ্গুইন বাস স্ট্যান্ড। জাহাজের প্রেজেন্টেশন থেকে জানি এখান থেকে জিপসী কোভ যাওয়ার বাস পাওয়া যায়। জিপসী কোভ হচ্ছে ম্যাজেলান পেঙ্গুইনের এক কলোনী। যাতায়াতের টিকিট কুড়ি ডলার প্রতি জনা। টিকিট কেটে বাসে বসলাম। প্রতি আধঘন্টা অন্তর বাস যাচ্ছে ও ফিরছে। বিকাল পাঁচটায় শেষ বাস, কাজেই হাতে অগাধ সময়। সমুদ্রর ধার ঘেঁসে বাস চলল, পাঁচ কিলোমিটার রাস্তা, তবে বেশ কিছু চড়াই উৎরাই আছে। আধ ঘন্টায় এসে গেলাম জিপসী কোভ।

এটা সমুদ্রর ধারে এক বীচ বলা যায়। অনেকটা জায়গা দড়ি দিয়ে ঘেরা- ওটা শুধুমাত্র পেঙ্গুইনদের জন্য। তারপর হচ্ছে ইয়র্ক বে। বীচের গা থেকে পাহাড়, বেশি উঁচু নয়, পঞ্চাশ থেকে শ খানেক ফুট উঠেছে। পাহাড়ের গা বেয়ে রাস্তা বানানো আছে- সমুদ্রর দিকটা দড়ি দিয়ে আটকানো। খানিকটা দর্শকদের নিরাপত্তার জন্য আর তার চেয়েও বেশি পেঙ্গুইনদের কথা ভেবে, যাতে ওদের কেউ বিরক্ত না করে।
পাহাড়ি পথ দিয়ে এগুচ্ছি, আচমকা বৌদি দেখালো, গর্তর মাঝখান থেকে উঁকি মারছে এক পেঙ্গুইনের ছানা। দড়িতে ভর দিয়ে মুখ বড়িয়ে দেখতে গেছি, ও বাবা, পিছনের গাছের আড়াল থেকে মা পেঙ্গুইন গটগট করে এসে গর্তর মুখে দাঁড়িয়ে গেল- ভাবখানা হচ্ছে, আমার বাচ্চাকে কে কি করে দেখি! বাচ্চাকে আর দেখতে না পেলেও মাকে ভাল করে দেখলাম। এমন সময় দূর থেকে ঘন্টাদার ডাক- কি একটা পেঙ্গুইনের পিছনে পড়ে আছিস – ওপরে উঠে আয়, এখানে শ খনেক পেঙ্গুইনের ছড়াছড়ি। শ খানেক! রইল পড়ে মা বাচ্চা- আমরা এগিয়ে চললাম রাস্তা ধরে। শ’খনেক মিটার যেতে না যেতেই দেখি শ’খানেক পেঙ্গুইন, সবাই মিলে ক্যাচর ক্যাচর করছে। অনেকে দেখি সাঁতার কেটে জল থেকে ওপরে উঠছে আর এই গাছপালা ঘেরা পাহাড়ি জায়গায় আসছে। ঘন্টাদা বলল, এখানে গর্তর মধ্যে ওদের বাচ্চা আছে আর তাদের জন্য খাবার নিয়ে আসছে মা বাবারা। সেটাই হবে কেননা এটা ব্রিডিং এর সময়।
পাহাড়ি রাস্তাটা প্রায় এক কিলোমিটার লম্বা। পাহাড়ের গা বেয়ে বেয়ে কখনও উঠছে কখনো বা নামছে। ঘন্টা দুই ওখানে থেকে পেঙ্গুইনদের বিভিন্ন কাজ কারবার দেখে বাজল দুপুর সাড়ে বারোটা। ঘন্টাদা বলল এখানে দেখা শেষ, চল, এবার অন্য যা কিছু আছে, তার সন্ধানে যাওয়া যাক।

জেটি থেকে নামার আগে ভিজিটার্স সেন্টার থেকে ম্যাপ আনা হয়েছিল। ফিরতি বাসে সেটা দেখে বোঝা গেল যে আমাদের টাউন সেন্টার যেতে হবে। ওখানে অনেক কিছু দর্শনীয় আছে। পেঙ্গুইন বাসের স্টপ এসে গেল মানে যেখান থেকে উঠেছিলাম। ওখান থেকে আবার হাঁটা দিলাম।

একটু এগিয়ে দেখি সামনে বিরাট এক চার্চ নাম ক্রাইষ্টচার্চ ক্যথিড্রাল। খানিক তার ভিতরে বসে বিশ্রাম নেওয়া হল। এর পাশেই তিমির এক বিরাট কঙ্কাল বানানো আছে নাম হোয়েল বোন আর্চ। এটা দেখে সমুদ্রর ধার দিয়ে হেঁটে একটা পার্কের মত বিরাট জায়গাতে এলাম। অনেক গাছ, তাতে শকুনির মত বিরাট বিরাট পাখি বসে। সামনে এক বহু পুরানো জাহাজের মাস্ট (Mast) রাখা, সামনে সমুদ্র, পিছনে একশ বছরেরে বেশি পুরানো জাহাজের ধ্বংসাশেষ, অনেকেই ছবি তুলছে এখানে।
আবার চলেছি এগিয়ে। সামনে পড়ল পোস্টাপিস। এখান থেকে গ্রীটিংস পোস্টকার্ড ইংল্যান্ডে পাঠালাম। এক সুন্দর ছবির পোষ্টকার্ড তাতে ততোধিক সুন্দর ডাকটিকিট মেরে এই কার্ড পাঠাতে ব্রিটেনের মতই খরচা পড়ল- যেন এটা ব্রিটেনের ডোমেস্টিক মেল।
আরও একটু এগিয়ে ডক ইয়ার্ড মিউজিয়াম, সেটা ঘুরে দেখছি। এখানে একটা জিনিষ দেখছি, সব কিছুই ব্রিটেনের মত- লোকজন, আচার ব্যবহার সব পরিচিত আর লোকেরা অতি বন্ধুত্বপূর্ণ। এখানে বসে কফি খাওয়া হল। মাঝে একবার ঝিরঝিরিয়ে বৃষ্টিও হয়ে গেল।
এদিকটায় দেখা শেষ। উল্টোদিকে হাঁটা দিলাম এবারে। খানিকটা গিয়ে প্রথমে পেলাম মার্গারেট থ্যাচারের স্ট্যাচু, তারপর লিবারেশন মনুমেন্ট। ওখানে সমুদ্রর পাড় থেকে দুশো মিটার দূরে এক পুরানো জাহজের ধ্বংসাশেষ পড়ে আছে। জাহাজের নাম ঝিলম। বহু বছর আগে এই জাহাজ ডুবে গিয়েছিল- তারপর ঢেউ এর তোড়ে পাড়ের কাছে আটকে গেছে। ওভাবেই পড়ে আছে বহু বছর।
ওখানে সমুদ্রর ধারে দুখানি বেঞ্চ দেখে বসার লোভ সামলানো গেল না। সামনে সমুদ্রর অনন্ত রূপ, পেঙ্গুইন আর সীল মাছ দেখা যাচ্ছে মাঝে মাঝে। আর পাড়ের কাছে জেলিফিশ আর ঝিনুকে ভর্তি। বৃষ্টির পর রোদও উঠেছে ভাল তাই আরামও লাগছিল।
ঘন্টা খানেক ওখানে বসে এবার ফেরার পালা। জাহাজে ঢুকলাম তখন প্রায় বেলা পাঁচটা। সীলরা দেখি তখনও শুয়ে আছে। ঘন্টাদা বলল- এই হল জীবন, কি রকম আরামে শুয়ে আছে দেখ।
সন্ধ্যা সাতটায় জাহাজ ছাড়ল। পরপর দুদিন এখন জাহাজ চলবে। কোনো স্টপ নেই। তারপর আসবে অন্তিম স্টপ উরুগুয়ের মন্টেভিডিও। তারপরই হবে আমাদের স্বপ্নের ক্রুজের পরিসমাপ্তি।
*******






Add comment