সাহিত্যিকা

সত্যজিতের সঙ্গীত (পঞ্চম পর্ব)

সত্যজিতের সঙ্গীত (পঞ্চম পর্ব)
© সুকান্ত রায়, ১৯৭৭ ইলেকট্রনিকস ও টেলি কমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং

আগের পর্বের লিংক: https://sahityika.in/2026/07/30/%e0%a6%b8%e0%a6%a4%e0%a7%8d%e0%a6%af%e0%a6%9c%e0%a6%bf%e0%a6%a4%e0%a7%87%e0%a6%b0-%e0%a6%b8%e0%a6%99%e0%a7%8d%e0%a6%97%e0%a7%80%e0%a6%a4-%e0%a6%9a%e0%a6%a4%e0%a7%81%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%a5/

গুগাবাবা আসছে
সত‍্যজিতের সঙ্গীত সৃষ্টিতে ‘গুপী গাইন বাঘা বাইন’ আর ‘হীরক রাজার দেশে’ নিঃসন্দেহে এক উল্লেখযোগ্য মাইলফলক (মাইলস্টোন)। তার কারন ‘গুগাবাবা’ সিরিজের তিনটি সিনেমাতেই গান ও সুর কেবল আবহ হিসেবে নয়, পুরো সিনেমাগুলোকে চালিয়ে নিয়ে গেছে। সিরিজের প্রথম দুটো সিনেমা সত‍্যজিতের পরিচালনায় হলেও শেষ সিনেমাটির (গুপী বাঘা ফিরে এলো) পরিচালক সন্দীপ রায়, সুরকার সত‍্যজিত রায়। সিনেমায় সঙ্গীত সম্বন্ধে সত‍্যজিতের ধারনার আমূল পরিবর্তন আমরা দেখতে পাই ‘গুগাবাবা’ থেকেই। তার কারন এটা ছিল ছোটদের জন‍্য তৈরি সত‍্যজিতের প্রথম সিনেমা। ভাবলে অবাক হই যে তরুন সত‍্যজিত একবার তার একটা সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, তিনি যদি তার ছবির একমাত্র দর্শক হতেন, তাহলে ছবিতে কোন সঙ্গীত রাখতেন না। ছবিতে সঙ্গীত তিনি দিয়েছেন দর্শকদের কথা মাথায় রেখে। সেই সত‍্যজিতই পরিণত বয়সে ছোটদের জন‍্য একটা সিরিজ তৈরি করে ফেললেন যার সিনেমাগুলো পুরোপুরি সঙ্গীতনির্ভর, ছবির গান ও সুরই সিনেমার এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হয়ে ছবিগুলোকে জনপ্রিয়তার শিখরে তুলে দেয়। সুর, তাল ও লয়ের ওপর কতোখানি জ্ঞান ও দখল থাকলে এটা সম্ভব, আমি জানিনা।

গুগাবাবা সিরিজের সঙ্গীত সম্বন্ধে লিখতে গেলে আমার মাথায় টান পড়বে আর কাগজ কালিও ফুরিয়ে যাবে। ইনফ‍্যাক্ট, শুধু ওই বিষয়টা নিয়েই একটা আস্ত বই লিখে ফেলা যায়। সে ক্ষমতা আমার নেই তাই ছোট করে দু’চার কথা লিখি। আগেই বলেছি যে এই সিরিজের সুর ও গানগুলো কেবল দৃশ্য ফুটিয়ে তোলার জন‍্য নয়, বরং ভূতের রাজার দেওয়া গুপী ও বাঘার অলৌকিক ক্ষমতার বহিঃপ্রকাশ। গান গেয়ে ভূতকে খুশি করা, বাঘকে বন্দি করা এবং যুদ্ধ থামানো এই গানের মাধ্যমেই বিশ্বাসযোগ্য হয়ে ওঠে। এই সিরিজে সত‍্যজিত ভারতীয় ধ্রুপদী সঙ্গীত, লোকসঙ্গীত এবং পাশ্চাত্য সঙ্গীতের এক অভূতপূর্ব সমন্বয় ঘটিয়েছেন, যদিও এই তিনটে ধারার মধ‍্যে প্রথম দুটোরই প্রাধান্য বা প্রভাব বেশি। ‘দেখরে নয়ন মেলে’ গানের মধ্যে যেমন একটা ভক্তিরস ও মেঠো সুর মিশে আছে, তেমনি আছে ‘মহারাজা তোমারে সেলাম’ এ রাজকীয় জাঁকজমক। অনুপ ঘোষাল তখনও তেমন নাম করেননি গানের জগতে। গুপীর জন‍্য তাকেই বাছলেন সত‍্যজিত শুধু চরিত্রের সারল‍্য ও মাধুর্যকে ফুটিয়ে তুলতে। যুদ্ধের ময়দানে গান গেয়ে বৃষ্টি নামানোর দৃশ্য বা ‘আয়রে তবে খাওয়া যাক, মন্ডা মিঠাই খাওয়া যাক’ -এ আর এরকম আরও অগুন্তি দৃশ‍্যে গানের মাধ্যমে সুরের যে মূর্চ্ছনা স‍ত‍্যজিত সৃষ্টি করেছেন, তা ভোলা যায়না।

তখন ‘গুগাবাবার’ চিত্রনাট‍্য প্রায় শেষ। ঘটনাচক্রে সত‍্যজিত নিজের কাজে একবার দিল্লি যান। দিল্লিতে সে সময় চলছিল চলচ্চিত্র উৎসব। সেই উপলক্ষে তার এক বন্ধুর অনুরোধে দুজনে শুনতে যান কর্ণাটকী শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের অনুষ্ঠান। সেই অনুষ্ঠানে একটি বিশেষ বিভাগ ‘তানি আবর্তনম’ -এ মূল যন্ত্রশিল্পীরা যখন বিশ্রাম নিচ্ছিলেন তখন একদল বাদক পারকাশন ইনস্ট্রুমেন্ট বাজিয়ে শোনান। এই সুরহীন ছন্দপ্রধান ধারাটা শুনেই সত্যজিৎ ভাবতে থাকেন যে সুর মানেই একধরণের আভিজাত্য বা মার্জিত ভাব, যা বনের ভূতেদের আদিম ও অলৌকিক পরিবেশের সঙ্গে একেবারেই মানায়না। শুরু হল ভূতের নাচের সঙ্গীত বাঁধা। সাড়ে ছয় মিনিটের সেই কালজয়ী ভূতের নাচের দৃশ্যটি বিশ্ব চলচ্চিত্রে অনন‍্য। বারোটা সম্ভাব‍্য বাদ‍্যযন্ত্রের মধ‍্যে শুধু চারটি বেছে নিলেন সত‍্যজিত, সুরের একঘেয়েমি প্রকট করার জন‍্য। সেগুলোর নাম মৃদঙ্গম (রাজা ও যোদ্ধাদের রাজকীয় ছন্দের জন‍্য), ঘটম (সাহেব ভূতেদের আড়ষ্ট ও যান্ত্রিক চলন বোঝাতে কলসীর মতো খটখট বাজনা), মোরসিং (মোটা ভুঁড়িওয়ালা ভূতেদের হাস‍্যকর ভঙ্গি ফুটিয়ে তুলতে) আর গঞ্জিরা (সাধারন ভূতেদের জন‍্য বাঘার মতো একটা ঢোল)। ভূতের নাচের মাঝ‍্যমে শুধু সঙ্গীত বা বাদ‍্যযন্ত্রের ইমপ্রোভাইজেশনের মধ্যেই থেমে থাকেননি সত‍্যজিত, নাচের দৃশ‍্যের মাধ‍্যমে ভারতীয় সমাজব্যবস্থা ও ইতিহাসেরও এক রূপক তুলে ধরেন তিনি। নাচের শেষের দিকে সত‍্যজিত দেখান যে উঁচুতলার ভূতগুলো একে অন‍্যকে ধ্বংস করছে আর শেষ দৃশ্যে সামাজিক স্তরবিন‍্যাস উল্টে দিয়ে সাধারণ ভূতেদের ওপরে আর ভুঁড়িওলা পুরোহিত ভূতেদের নিচে স্থাপন করেন। ভূতেদের নাচ রেকর্ড করা হয়েছিল মুম্বইয়ের এক স্টুডিওতে ‘শ‍্যাডো পাপেট্রি’ বা ছায়াপুতুল নাচের কৌশলে।

কেবল গান বা নাচই নয় ভূতের রাজার গলা শুনিয়েও সত‍্যজিত প্রমাণ করেছেন যে শুধু দামি যন্ত্র নয়, কল্পনাশক্তি দিয়েও কিভাবে চিরস্মরণীয় শব্দ সৃষ্টি করা সম্ভব। সেসময় কম্পিউটার বা আধুনিক ভয়েস মডুলেটর ছিলনা। কি করলেন রায় সাহেব? নিজের গলাতেই রেকর্ড করলেন ডায়লগ। রেকর্ডিং এর সময় খেয়াল রাখলেন যে ভূতের রাজার কথা বলার ধরনটা ছিল ছড়াবন্দী আর প্রতিটি বাক্যের শেষে একটা বিশেষ ঝোঁক। এই বলার ধরনটাও বেরিয়েছিল তারই মাথার থেকে। রেকর্ডিং শেষ হবার পর দিলেন রেকর্ডারের স্পুলের গতি বাড়িয়ে আর ফ্রিকোয়েন্সি একটু বদলে। নিজের গলাকে আরও গম্ভীর ও রহস‍্যময় করতে সাউন্ড মিক্সিং এর সময় জুড়ে দিলেন হালকা ইকো (প্রতিদ্ধনি)। তৈরি হল এমন একটা গলা যা আমাদের অন‍্য জগতে নিয়ে যায়।

সিরিজের দ্বিতীয় ছবি হীরক রাজার দেশের সঙ্গীত সৃষ্টি ছিল সত্যজিতের সূক্ষ পরিকল্পনা ও অবজারভেশন (তীক্ষ্ণ দৃষ্টি) এর এক অনন্য ফসল। এই সিনেমার সঙ্গীত শুধু বিনোদনের জন‍্য নয়, তীব্র শ্লেষাত্মক এবং স্বৈরাচার বা একনায়কতন্ত্রের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের প্রতিবাদ ও মুক্তির গান। আসলে হীরক রাজার দেশের গানগুলো যেন একেকটা ধারালো তলোয়ার, যা সুরের ছলে শাসকের মুখোশ খুলে দেয়। ‘আহা কি আনন্দ আকাশে বাতাসে’ গানটায় খুশির সুর থাকলেও যখন গুপী বাঘা গায় ‘মোদের পেটে টান পড়লে পরে রাজা বলে নেইকো ভয়’, তখন সেটা সরাসরি সাধারণ মানুষের ক্ষিদের জ্বালাকে বিদ্রূপ করে। আবার রাজসভায় গাওয়া ‘বলো হীরক রাজার জয়’ গানটি কোনো সাধারণ স্তুতি নয়, বরং স্বৈরাচারের এমন এক রূপক যেখানে জোর করে জনগণকে দিয়ে রাজার গুণগান গাওয়ানো হয়। এখানে ছন্দ ও বাজনার ব‍্যাবহার এমনভাবে করা হয়েছে যা অনেকটা সম্মোহন বা মগজ ধোলাইয়ের মতো কাজ করে। এই সিনেমায় সত‍্যজিত একটি অসাধারণ বাউল গানও লিখেছিলেন ‘কতোই রঙ্গ দেখি দুনিয়ায়’। গানটা বাউল রীতিতে তৈরি কিন্তু মূল সুর একটি প্রতিবাদী সঙ্গীতের মতো। সত‍্যজিত অত‍্যন্ত চালাকির সাথে বাউলের সুর, ছন্দ এবং কাব‍্যিক উপাদান গ্রহন করেছেন এবং সেগুলো দিয়ে অর্থনৈতিক বিভাজন সম্বন্ধে একটি তীক্ষ্ণ মন্তব্য তৈরি করেছেন। যতোবার সিনেমাটা দেখেছি, আমার মনে হয়েছে হীরক রাজার দেশে সত‍্যজিতের সবচেয়ে রাজনৈতিক ভাবে প্রভাবিত ছবি, বিশ্বের সেরাদের জায়গায় স্থান পাবার যোগ‍্য এবং আজকের দিনেও এটি হাস‍্যরসের খোলসে প্রাসঙ্গিক।

প্রথম নজরে মনে হবে হীরক রাজ‍্যে সবকিছুই উল্টে গেছে কিন্তু দর্শকের দৃষ্টিভঙ্গি যখন নতুন রেফারেন্স ফ্রেমের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেয়, তখন দর্শক বুঝতে শুরু করে কিভাবে উল্টে যাওয়া দৃষ্টিভঙ্গিই একমাত্র বৈধ দৃষ্টিভঙ্গি হয়ে উঠেছে। তাই যখন একজন মোটা, বুড়ো চাষা মুখ কুঁচকে বলে ওঠে “এটা কখনই ভালো ধারনা নয় / করের ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়া / যদি আমরা অনাহারেও থাকি / আমাদের রাজকীয় করের প্রতি আক্ষেপ করা উচিত নয়” তখন সে মোটেও রসিকতা করছে না। গুপী গাইন ও হীরক রাজার দেশের মধ‍্যবর্তী সময়কাল ছিল স্বাধীনতা-উত্তর ভারতের এক অস্থির সময়। সেই দশকে ছিল ব‍্যাপক শহুরে ও গ্রামীণ অসন্তোষ, ক্রমবর্ধমান সামাজিক উত্তেজনা, বাংলাদেশ যুদ্ধ এবং ফলে সৃষ্ট শরণার্থীদের বিশাল সমস‍্যা। এর সাথে ছিল নকশাল বিদ্রোহ, এর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের সহিংস প্রতিরোধ, ইন্দিরা গান্ধীর জরুরি অবস্থা এবং জরুরি অবস্থার তীব্র দমনমূলক রাজনৈতিক শাসন। হীরক রাজার দেশে সিনেমায় সেই অস্থির দশকের যুগান্তকারী ভাবধারাকে ছোটদের দেখার উপযোগী করে অত‍্যন্ত স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে। কমিকাল স‍্যাটায়ারের মাধ্যমে দেখানো হয়েছে একটা রাজনৈতিক শাসনব্যবস্থা যেখানে শাসকেরা মনে করে যে সাধারণ মানুষের কোনো ধরনের স্বাধীনতার ব‍্যবহার খুব কমই থাকা উচিৎ। তারা স্বাধীন হয়েও পরাধীন, রাজশক্তির ইচ্ছেই তাদের ইচ্ছে, সেটাই তারা বিশ্বাস করে এবং সেটা মেনেই তারা চলে।

সত‍্যজিতের সঙ্গীত পাশ্চাত্য ভাবধারায় প্রভাবিত হলেও একথা ভাবলে ভুল হবে যে ভারতীয় সঙ্গীতের ঐতিহ্য রক্ষার ক্ষেত্রে তিনি উদাসীন ছিলেন। এ সম্বন্ধে তার ভাবনা জেনে নেওয়া যাক তার নিজের কথাতেই। রবীন্দ্রসঙ্গীতে ভাববার কথা নামে তার এক প্রবন্ধে সত‍্যজিত লিখছেন “আজকের চিত্রশিল্পীর কাছে অজন্তার কি কোনো মূল‍্য নেই? সঙ্গীত যখন গুহার দেওয়ালে আঁকা থাকেনা তখন তাকে ওস্তাদের হাত দিয়ে ছাড়া বাঁচিয়ে রাখা যাবে কি করে? আর আমাদের দেশের যে ওস্তাদ তার কাজ তো শুধু পুনরাবৃত্তি নয়, তাকে তো সৃষ্টিও করতে হয়। শাস্ত্রে যা লেখা আছে সেতো কেবল সঙ্গীতের সূত্র, তাকে তো আর রচনা বলা যায়না। রচনা শুধু ওস্তাদরাই করেন।”

শুধু তাই নয়, ১৯৭৬ সালে আনন্দবাজার পত্রিকায় ‘অবসর’ নামে এক প্রবন্ধে সত‍্যজিত জানিয়েছিলেন তিনি তার পরবর্তী সিনেমায় ঠুংরি সংযোজনের কথা ভাবছেন। ১৯৭৭ সালে মুক্তি পায় ‘শতরঞ্জ কে খিলাড়ি’ আর ১৯৭৮ এ ‘জয় বাবা ফেলুনাথ’। দুটি ছবিতেই সত‍্যজিতের ঠুংরি ব্যবহারের চিন্তা বাস্তবরূপ পায়। অবসর প্রবন্ধেই সত‍্যজিত লিখছেন, পূজোর ছুটিতে বসে মউজুদ্দিন খাঁ, কেশরবাই কেরকর, কস্তুরীবাই ও জোহরাবাঈ আগ্রেওয়ালীর ঠুংরিই তিনি বারবার শুনছেন। জয় বাবা ফেলুনাথে আমরা কেশরবাই ও জোহরাবাই দুজনের গানই পাই। ছবির একটা দৃশ‍্যে ফেলুদা, তোপসে আর জটায়ুকে অম্বিকাবাবুর সঙ্গে আলাপ করাতে নিয়ে যাচ্ছেন উমানাথ। সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে ভেসে আসে ঠুংরি কেশরবাইয়ের ভৈরবীতে ‘কাহে কো দরি’। উমানাথ জানান তার ঠাকুরদা শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের বড় ভক্ত। এই সিনেমারই আরেকটা দৃশ‍্যে দেখা যায়, রাতের ঘোষালবাড়ি, সেখানে থমথমে এক পরিবেশ অদ্ভুত শ্বাসরোধী সেই দৃশ‍্য। গ্রামোফোনের পাশে ধ‍্যানস্থ হয়ে বসে আছেন উমানাথের পিতামহ, অশীতিপর, মুন্ডিতকেশ, ধ‍্যানমগ্ন এক বৃদ্ধ। টেবিলে পড়ে আছে জেনোফন রেকর্ড, বাতাসে ভাসছে জোহরাবাইয়ের বিখ্যাত গজল ‘পি কে হমতুম চলে’। জোহরাবাইয়ের সেই গজল জয় বাবা ফেলুনাথ এর ওই দৃশ‍্যটিকে অন‍্য উচ্চতায় নিয়ে যায় আর এখানেই পরিচয় পাওয়া যায় সত‍্যজিতের শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের অসামান্য মুন্সীয়ানার।

তবে জয় বাবা ফেলুনাথ এর সঙ্গীতের বিষয়ে আলোচনায় রেবা মুহুরির নাম না করলে তা অসম্পূর্ণ। ঘোষাল বাড়ির দৃশ‍্যে যেমন ওতোপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছেন কেশরবাই, জোহরাবাইরা, ঠিক তেমনই মছলিবাবার দৃশ‍্যে ‘মোহে লাগি লগন গুরু চরনন কি’ আর ‘পগ ঘুংরু বাঁধ মীরা নাচিরে’ -র মতো ভজনগুলো বোধহয় বাঙালি দর্শক কোনোদিন ভুলতে পারবেনা। রেবা মুহুরি সেখানে অমরত্ব পেয়েছেন। এর মধ‍্যে প্রথম ভজনটি আমি এখনও মাঝে মাঝে শুনি এবং সত‍্যজিতের সিনেমায় আমার প্রিয় গানগুলোর মধ‍্যে একটা। সবমিলিয়ে ফেলুদার রহস‍্য রোমাঞ্চ সিরিজের এই দ্বিতীয় ভাগটি যতোটা গোয়েন্দা কাহিনী হিসেবে সার্থক, ঠিক ততোটাই লঘু শাস্ত্রীয় গজল ও ভজনের প্রয়োগের এক উৎকৃষ্ট নিদর্শন। বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে যাওয়া দুই কিংবদন্তি শিল্পী কেশরবাই ও জোহরাবাইকে সত‍্যজিত তার নিজস্ব ভঙ্গিতে তুলে ধরেছিলেন রহস‍্য কাহিনীর আবহসঙ্গীতে নেপথ‍্য মোড়ক হিসেবে। দূর্ভাগ‍্য আমরাই চিনতে পারিনি।

‘শতরঞ্জ কে খিলাড়ির’ ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। লক্ষ্নৌও ঠুংরির জন‍্য কম বিখ‍্যাত নয়। নবাব ওয়াজিদ আলি শাহ- এর রাজদরবারে বিরজু মহারাজের গলায় ভৈরবীতে ‘কানহা ম‍্যায় তোসে বারি’ এবং সঙ্গে শাশ্বতী সেনের কত্থক ওই সময়ের সাঙ্গীতিক আবহকেই ফুটিয়ে তোলে। সত‍্যজিতের সিনেমায় রবীন্দ্রসঙ্গীতের যে অসামান্য প্রয়োগ – চারুলতার ‘মম চিত্তে নিতি নৃত‍্যে এবং ঘরে বাইরে তে ‘একি লাবন‍্যে পূর্ণ প্রানে’ -র কথা আগেই বলেছি। এবার আসা যাক সত‍্যজিতের ছবিতে লোকসঙ্গীতের ব‍্যাবহারে। প্রধানত তিনটে সিনেমার কথা বলতে চাই – কাঞ্চনজঙ্ঘা, সোনার কেল্লা ও আগন্তুক। কাঞ্চনজঙ্ঘাতে একটি পাহাড়ি শিশুর গলায় আমরা ওই মন কেমন করা পাহাড়ি ধুন শুনতে পাই। সিনেমার প্রায় শেষের দিকে বাচ্চা ছেলেটি যে সুরটি গায়, সেটিই প্লে-আউটে ডিজলভ করে দিয়ে সত‍্যজিত শটের পারস্পেকটিভটা অদ্ভুত ভাবে প্রসারিত করে দিয়েছেন।

সোনার কেল্লায় রামদেওরা স্টেশনে যখন ফেলুদা অ‍্যান্ড কোং অপেক্ষা করছে, তখন সেই অন্ধকার শীতের রাতে স্টেশনে একদল গ্রাম‍্য লোক গান-বাজনা করছিল। ওই একই গান আমি জয়সলমের বেড়াতে গিয়ে শুনেছি। সেই সিনেমাতেই আরেকটি দৃশ‍্যে দেখা যায় এক স্থানীয় মহিলা একটি রাজস্থানের তারের যন্ত্র বাজিয়ে বাজিয়ে গান করছেন। রাজস্থানী লোকসঙ্গীত যে ধরনের সুরের ওপর আধারিত তার সঙ্গে আমাদের শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের একটা রাগ মান্দ -এর খুব মিল আছে। অনেকে মনে করেন রাগ মান্দ রাজস্থানী লোকসঙ্গীত থেকেই এসেছে।

আগন্তুক সিনেমার শেষের দিকে বোলপুরের সাঁওতালী মেয়েদের নাচ, সঙ্গে সাঁওতালী গান, মাদল ইত্যাদি সবকিছুর মধ‍্য দিয়েই সত‍্যজিত যেন সভ‍্যতার আদিম প্রকৃতির প্রতি কিছুটা ঝুঁকে পড়েছেন। ছবির মধ‍্যেই এক জায়গায় ছবির প্রধান চরিত্র মনমোহন মিত্রের মুখে দীর্ঘ মনোলগে বলা হয় সভ‍্য এবং অসভ‍্য এই দুই শব্দের আপাত অর্থের প্রতি তার আপত্তি এবং আদিমতার প্রতি তার আকর্ষণ। ফলে যে কথা ছবির সংলাপে বলতে চাইছেন, সে কথাই জোরালো করে তুলেছেন আদিম সুরের ব‍্যাবহারে, আদিম তালযন্ত্রের ছন্দে।

সত‍্যজিতের সিনেমায় সঙ্গীত কার্যকরী, সাজসজ্জার জন‍্য নয়। তাঁর সমসাময়িকদের সিনেমায় গানগুলি গল্পের মূহুর্তগুলির মাঝে সঙ্গীতের মধ‍্যবর্তী অংশ হিসেবে ব‍্যাবহৃত হত। গল্পের প্লট বা চরিত্রকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কোনো দায় তাদের (গানগুলোর) ছিলনা। অন‍্যদিকে সত‍্যজিতের সঙ্গীত সংযোগকারী, তার সঙ্গীত গল্পের ও চরিত্রের পরিপূরক হয়ে গভীর আবেগকে উস্কে দেয়। সঙ্গীত একই সাথে সত‍্যজিতের সিনেমার ভেতর এবং বাইরে, বাস্তব এবং অবাস্তবের মাঝে ঝুলন্ত। সঙ্গীত একই সাথে সিনেমার টেপেস্ট্র্রির এতোটাই অপূরনীয়ভাবে মিশে যায় যে চরিত্র এবং গল্পের বিকাশ থেকে এটিকে আলাদা করা অসম্ভব। সঙ্গীতের এই অদ্ভুত শক্তিকে সত‍্যজিত চিনেছিলেন। তাই তিনি তার সিনেমায় সঙ্গীত এমনভাবে ব‍্যাবহার করেছিলেন যা গল্প, চরিত্র এবং দর্শকদের অনুভূতির মধ‍্যে ব‍্যবধান কমিয়ে দেয়।

সত‍্যজিত রায়ের সঙ্গীত সৃষ্টি ও তার ব‍্যবহার রবীন্দ্রোত্তর যুগে বাংলা সংস্কৃতির এক গুরুত্বপূর্ণ অধ‍্যায়। সত‍্যজিত চাইতেন সেলুলয়েডের মাধ‍্যমে তার মনের কথা সহজভাবে দর্শকদের কাছে নিয়ে যেতে। তার সেলুলয়েড বলতে গল্প, দৃশ‍্য, চরিত্র, সংলাপ, অভিনয় এবং সঙ্গীত। তার সঙ্গীত ছিল বাকি পাঁচটা বিভাগের একমাত্র যোগসূত্র, এমনই এক অদৃশ‍্য পরিশীলিত (subtle) বাঁধন যা তাকে এবং তার দর্শকদের অসীম আনন্দে ভাসিয়ে তার সিনেমাকে খ‍্যাতির চূড়ায় নিয়ে গেছে। সঙ্গীতকে নিখুঁত করার জন‍্য কঠোর পরিশ্রম করতেন সত‍্যজিত। সঙ্গীতের কাজ শুরু করতেন সিনেমা প্রযোজনার প্রথম দিকেই। রাতের পর রাত জেগে নোট লিখতেন আর পিয়ানোতে সেগুলো তুলে রাখতেন। তার স্মৃতিশক্তি ছিল অত‍্যন্ত প্রখর। গভীর পরিশ্রম ও অধ্যবসায় তাঁকে যতো না কষ্ট দিত, তার চেয়ে বেশি তিনি আনন্দ পেতেন। এই আনন্দ পাওয়ার কথা সত‍্যজিত লিখেছেন তার লেখায় “….. the pleasure of finding out that the music sounds as you had imagined it to, more than compensate the hard work that goes into it. The final pleasure, of course, is in finding out that it not only sounds right but is also right for the scene for which it was meant”

বিশিষ্ট সঙ্গীত সমালোচকরা হয়তো এই বিষয়ে রচনাতে ভারতীয় এবং পাশ্চাত্য ধ্রুপদী সঙ্গীতের প্রতি সত‍্যজিতের সমান আগ্রহ এবং প্রয়োগ দক্ষতার দিকে জোর দেবেন। কিন্তু আমার মনে হয়, গুপী বাঘার গান যেমন করে তার সঙ্গীতদর্শনের একটা বিশেষ দিক তুলে ধরে, তাকে বোধহয় ‘ছোটদের জিনিস’ বলে সরিয়ে রাখা যায়না। ভারতের এবং পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ প্রদেশের বড় বড় শিল্পীরা যা করতে পারলেন না, গ্রামবাংলার ভবঘুরে দুই ছেলে সহজ সরল সুরে গেয়ে আর ঢোল বাজিয়ে সেই সব কালোয়াতিকে ছাপিয়ে গেল। এইজন্যই বলতে হয় ‘মহারাজা, তোমারে সেলাম।’

সত‍্যজিতের সঙ্গীত সম্বন্ধে লিখতে গেলে সে লেখা শেষ করা খুব কঠিন। কিন্তু কোথাও না কোথাও একটা দাঁড়ি তো টানতেই হবে। তাই এবারের মতো ‘আমার কথাটি ফুরোলো, নটে গাছটি মুড়োলো’।

*******

 

Sahityika Admin

Add comment