সাহিত্যিকা

শিক্ষক দিবসের ছোটোখাটো দুর্ঘটনা

শিক্ষক দিবসের ছোটোখাটো দুর্ঘটনা
© প্রমীত বাসু, ২০০১ সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং

দুর্ঘটনা #১:
সময়কাল বিগত শতাব্দীর ৯০-এর দশকের মাঝামাঝি। স্কুলে ক্লাস ইলেভেনের স্ট্যাটিক্সটিক্সের ক্লাস চলছে। সিরিয়াস ক্লাস, জটিল স্ট্যাটিক্সটিক্স বলে কথা। ঠিক তখনই শিক্ষকমশাই পড়াতে পড়াতে দেখেন যে পিছনদিকে বসা একটি ছেলে মনের আনন্দে জানালা দিয়ে উল্টোদিকের কফি হাউসের মেয়েদের দেখে যাচ্ছে। শুধু তাই নয়, সেই ছেলে আবার তাঁর চারপাশের দু-তিন জনকে ডেকে ডেকে দেখিয়ে সে আনন্দও ভাগাভাগি করে নিচ্ছে। কো-রিলেশন আর রিগ্রেশনের তত্ত্ব তখন হাওয়ায় ভেসে দেওয়ালে ধাক্কা খাচ্ছে। শিক্ষকমশাইয়ের পুরো ব্যাপারটা ঠাউর করতে কিছুক্ষণ সময় লাগল। তারপর ওদের নাম ধরেই বললেন “ওহে, বাইরে যেটা দেখছ সেটা কনস্ট্যান্ট, আর এখানে বোর্ডে যেগুলো লিখছি এগুলো ভেরিয়েবল। মনটা এদিকে থাকলে একটু উপকার হবে।” সারা ক্লাসে তখন ৫ মিনিটের অট্টহাস্য। ছেলেগুলো লজ্জা লজ্জা মুখ করে “আচ্ছা স্যার, বুঝতে পেরেছি” বলে আবার বাস্তবে ফিরে আসে।

দুর্ঘটনা #২:
ক্লাস এইটের বিজ্ঞানের ক্লাস। রাশভারী শিক্ষকমশাই প্রায়ই পড়া ধরেন। না পারলে কাঠের স্কেলের বাড়ি হয় পিঠে নয়তো বা হাতের উপর পড়ে। ক্লাসে সবাই জানে যে সেই স্কেলের আমদানি হয় একটি নির্দিষ্ট ছেলের থেকে। সে বেচারা স্কেল আনে খাতায় রুল টানার জন্য। কিন্তু সেই স্কেলের এই অমানবিক প্রয়োগ সে কিছুতেই আর আটকাতে পারে না। একদিন ক্লাস শুরু হওয়ার আগেই কিছু ছেলে তার ব্যাগ থেকে স্কেলটা সরিয়ে রাখল। শিক্ষক মশাই এসে স্কেল চাইতেই সেই ছেলেটি ব্যাগ খুলে দেখালো যে সেখানে কিছু নেই। উনি তখন ক্লাসে ঘুরে ঘুরে বাকিদের জিজ্ঞেস করছেন যে অন্য কারোর কাছে কোনো স্কেল আছে কিনা! বেশ কিছু ওস্তাদ ছোকরা তখন জ্যামিতি বাক্সের ৬ ইঞ্চির প্লাস্টিকের স্কেল দেখিয়ে বলে ‘স্যার, যা আছে এইই আছে।’ উনি আর কথা বাড়ালেন না। কিছুক্ষণ এদিক ওদিক জিজ্ঞেস করার পর ওনার চোখে পড়ল যে দরজার পিছনেই রাখা আছে আমাদের সকলের চাঁদা তুলে কেনা সেই লম্বা কাঠের ব্যাট। ওটা হাতে নিয়ে বললেন ‘বাহ্, এই তো পেয়ে গেছি! এবার পড়া ধরতে শুরু করি। প্রথমেই যারা আমাকে প্লাস্টিকের স্কেল দেখিয়েছে, তাদেরকে ধরব।’
ব্যাস, সেদিনের বাকীটা ইতিহাস।

দুর্ঘটনা #৩:
স্কুল থেকে ফেরার সময় ভীড় বাসে একটি ছেলে দেখে যে স্কুলের এক স্যারও সেই বাসেই উঠেছেন। স্যার বসার জায়গা পান নি, কিন্তু ছাত্রটি পেয়েছে। স্যার ছাত্রটিকে দেখতে পেয়ে হয়ত কিছু না ভেবেই চেনা ছাত্রের সামনে এসে দাঁড়িয়েছেন। কিছুক্ষণ কথাবার্তা চালানোর পর চক্ষুলজ্জার খাতিরে অত্যন্ত অনিচ্ছায় ছেলেটি সিট ছেড়ে উঠে বলেন, ‘স্যার, বসুন।’ স্যারও তৎক্ষণাৎ সেই প্রস্তাবে রাজি হয়ে বসে পড়লেন। ছেলেটা ভেতরে ভেতরে ফুঁসে চলেছে, কারণ এই ঘটনাটা আগেও বেশ কয়েকবার ঘটেছে। ভাবল আজ একটা এসপার ওসপার করতে হবে। বাস থেকে নামার সময় (সে স্যারের আগে নামে) কন্ডাকটর টিকিট চাইতে বলে ‘ওই যে পেছনে আমার দাদু বসে আছে, দাদুই আমারটা দিয়ে দেবে।’ এই বলে স্যারের দিকে একবার হাত নেড়ে বাস থেকে নেমে গেল। আর ওই স্যারও কিছু না বুঝে প্রত্যুত্তরে একবার হাত নেড়ে দিলেন।

তিন চার দিন পর স্কুলে স্যারের মুখোমুখি হতেই সে যখন পালাতে উপক্রম করে, স্যার তখন খপ্ করে ওর হাতটা চেপে ধরে বলেন ‘বসতে দিতে ইচ্ছে না হলে নাই বা দিতিস, টিকিটাও মুখ ফুটে বলতে পারতিস, আমি কেটে দিতাম। কিন্তু দাদু বলে পালানোর কি খুব দরকার ছিল! আমার ছেলে তোর চেয়ে মেরেকেটে পাঁচ বছরের বড় হবে। আর সেখানে আমি হয়ে গেলাম তোর দাদু! তোর শুনে বাসের কন্ডাকটরও তারপর থেকে আমাকে কাকুর জায়গায় দাদু বলে ডাকছে।‘

এরপরই স্বগতোক্তি করলেন, ‘কেন যে মরতে মাস্টারের চাকরি নিলাম!’

দুর্ঘটনা #৪:
অঙ্কের ক্লাস চলছে। মাস্টারমশাই বোর্ডে ছবি এঁকে জ্যামিতি শেখাচ্ছেন। তাই সামনের টেবিলে তিনটে বড় কাঠের স্কেল রাখা আছে। হঠাৎ দেখলেন যে, পিছনের বেঞ্চে বসা দুজন যেন গল্পে আত্মহারা। তাদের সামনে ডেকে এনে টেবল দেখিয়ে বলেন ‘বল, তোমরা কেমন ভাবে মার খেতে চাও? একটা স্কেল দিয়ে তিনবার, দুটো দিয়ে দুবার, নাকি তিনটে দিয়ে একবার।’
অমনি সামনের বেঞ্চে বসা একটি তেঁএটে ছোকরা ফস্ করে বলে বসে, ‘স্যার, অঙ্কটা একটু ভুল হয়ে গেল। হিসেব মতো দুটো স্কেল একবার, আর তার সঙ্গে একটা স্কেল একবার হলে অঙ্কটা মেলে।’
শুনে একটু থতমত খেয়ে তারপর সামলে নিয়ে মাস্টারমশাই বললেন ‘তোর দেখছি সুখে থাকতে বড্ড ভুতে কিলোয়, না রে! ঠিক আছে, আজ অঙ্কটা তোকে দিয়েই ঠিক করব। উঠে আয়। আর এসে বল, কটা খাবি! একটার বাড়ি ছটা, দুটোর বাড়ি তিনটে, নাকি তিনটের বাড়ি দুটো!’
বেহায়া ছাত্রটি হাসতে হাসতে বলে ‘স্যর, তিনটের বাড়ি দুবার। তাতে ইমপ্যাক্টটা কম হবে।’ বলে হাসতে হাসতেই দু-ঘা খেয়ে আবার বেঞ্চে এসে বসে পড়ল।

আমার স্কুলজীবনের এইরকম আরো প্রচুর ঐতিহাসিক মুহুর্ত আছে। কোনোটাই ভোলা যায় না। স্যারের প্রেমপত্র চুরি করে পড়া থেকে শুরু করে স্যারের মারের হাত থেকে বাঁচতে জামার তলায় পিঠে খাতা ঢুকিয়ে রেখে দেওয়া। মাস্টারমশাইদের কিছু জনপ্রিয় নাম দেওয়া হতো, পরবর্তীকালে দশকের পর দশক সেই নামেই তাঁদের পরিচয়, ওনাদের প্রকৃত নাম আমরা আজও জানি না। শুধু আমার সময়, মানে বিগত শতাব্দীর ৯০এর দশক নয়, মুজতবা আলীর ভাষায়, সেই ট্রাডিশন সমানে চলছে, আমার জন্মের বহু আগে থেকেই। এইসব ঘটনার কোনও শেষ নেই, এসব চলতে থাকে যুগে যুগে, কালে কালে। একদা যিনি ছিলেন অতীব ভয়ের প্রতিমূর্তি, পরে বুঝেছিলাম, তাঁরা সকলেই ছিলেন আমাদের শুভাকাঙ্ক্ষী। চাওয়া পাওয়ার যুক্তি তর্কের বাইরে অম্লমধুর এক চিরস্থায়ী সম্পর্ক।

*********

Sahityika Admin

Add comment