অ্যাসিস্ট্যান্ট হেডস্যার গোপীনাথ কুণ্ডু
© হিমাংশু পাল, ১৯৯০ কম্পিউটার সায়েন্স ও টেকনোলজি
গ্রামবাংলার স্কুলগুলিতে অনেকসময় কয়েকজন আধুনিকমনস্ক ও ছাত্রদরদী শিক্ষকের নজির মেলে যাঁরা ছাত্রদের ভবিষ্যতের জন্য নিস্বার্থভাবে চিন্তা কএন, যাঁরা ছাত্রদের জন্য পাঠ্যক্রমের বাইরেও অনেক কিছু করেন; যাঁদের বিদ্যালয় অন্ত প্রাণ। আমার সময়ে, মানে বিগত শতাব্দীর ৮০’র দশকে, এরকম দু’জন শিক্ষকের কথা আমার খুবই মনে পড়ে। একজন হলেন সালেপুর গ্রাম-নিবাসী বড় ডোঙ্গল হাই স্কুলের হেডমাস্টারমশাই শঙ্কর কুণ্ডু। আর অন্যজন আমাদের পরম শ্রদ্ধেয় রামনগর হাই স্কুলের অ্যাসিস্ট্যান্ট হেডমাস্টার গোপীনাথ কুণ্ডু। শিক্ষকতাকে জীবিকা গ্রহণ করে যারা জীবন উৎসর্গ করেছেন, তাঁদের প্রতি শ্রদ্ধা ও প্রণাম নিবেদন করে এই প্রবন্ধের শুরু করছি।
গোপীনাথবাবুর কথা লিখতে বসে একসঙ্গে অনেক কথাই ভিড় করে আসছে। প্রত্যেকটা ঘটনাই সমান গুরুত্বপূর্ণ, অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনটা দিয়ে শুরু করি …
গোপীনাথবাবুর যে চরিত্রটি সকলকে সবথেকে বেশি আকর্ষণ করে সেটা ওনার বাগ্মিতা, ওনার ব্যাক্তিত্ব। সৌম্যকান্তি চেহারার সঙ্গে ওনার কথা বলার ভঙ্গি সকলকে মুহূর্তের মধ্যেই মন্ত্রমুগ্ধ করতে পারে। ওনার যুক্তিও ওনার তর্কের কাছে সকলের মাথা নুইয়ে পড়ে পরম শ্রদ্ধায়, পরম ভক্তিতে। এই গুণের জন্য বিভিন্ন সময়ে নানা সঙ্কট ও সঙ্ঘাতে আত্মীয়স্বজন ও গ্রামবাসী স্যারের শরণাপন্ন হতেন। যে কোন বিবাদ, পারিবারিক বা রাজনৈতিক ঝামেলার মীমাংসার জন্য ওনারই ডাক পড়ে। বাদী ও প্রতিবাদী দুইপক্ষই সহজে স্যারের সালিশি পরামর্শ মেনে নেয়। দুস্থ ও মেধাবী ছাত্রদের কলেজে ভর্তি ও উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি স্বয়ং যেতেন ও কলেজ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে ছাত্রের থাকা খাওয়া ও বইপত্র, কলেজ ফী মুকুব ইত্যাদি সব কিছুর ব্যবস্থা করে দিয়ে আসতেন। অন্যদিকে আমাদের গ্রামের ও পার্শ্ববর্তী আরো কয়েকটি গ্রামের বিবাহঅনুষ্ঠানে তিনিই ছিলেন সর্বশ্রেষ্ঠ হোতা – হয় পাত্রপক্ষ নয় কন্যাপক্ষ, কোনো কোনো বিয়েবাড়িতে তিনি ছিলেন দুই পক্ষেরই কাছের মানুষ। আমাদের পৈত্রিক বাড়ি গোষ্ঠ ভবনের বিভিন্ন সঙ্কটে- তিনি সর্বদাই প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভূমিকা নিতেন। শুনেছি, আমার বাবা কোনোপ্রকার সাংসারিক দুঃখের বিষয় থাকলে স্যারকে বলেই স্বস্তি পেতেন। আমাদের একান্নবর্তী পরিবারের সর্বময় কর্তা গদাধর পাল আসতেন সাংসারিক শলাপরামর্শ নিতে। স্যারের কাছে শুনেছি, আমাদের বাড়ির বড়দা একই স্কুলের শিক্ষক সচ্চিদানন্দ পাল’ তাঁর “গোপীদা”র সঙ্গে নানা বিষয়ে আলোচনা করে নিতেন।
‘ছাত্র-দরদী’ ভাবটি তিনি অনেক ছাত্রের মতো আমার উপরেও প্রয়োগ করেছিলেন। এবং সুতীব্রভাবেই! এক পেটরোগা ছেলেকে তিনি নিজের মতো করে যত্ন দিয়ে, শিক্ষা দিয়ে যেন মানুষ করার ব্রত নিয়েছিলেন। সেই ছাত্রের জীবনে যা কিছু সামান্য সাফল্য, যা কিছু উন্নতি, বা পরিচিতি, সবকিছুতেই ভিত গড়ে দিয়েছিলেন আমার সেই গোপীনাথবাবু, এখানেই আমার জিবনে উনার বিশাল অবদান। ক্লাস ফাইভ থেকে আমি স্কুলে পড়লেও ক্লাস নাইন থেকে স্যারের প্রথম ক্লাস।
ইংরেজি ও বাংলা বিষয়ে নবম ও দশম শ্রেণীতে পড়াতেন। তখন ‘ছাত্র দরদী’ শব্দটির সাথে অতটা পরিচয় ছিল না, তবুও বুঝতাম যে স্কুলের গণ্ডীর মধ্যে তিনি যেন আমার ছাত্রবন্ধু। ‘স্কুলের বাইরেও গোপীনাথবাবু প্রাইভেট টিউশনি করতেন, এজন্য যথার্থ টিউশনি ফীও উনি নিতেন। এটাই নিয়ম। কিন্তু এই নিয়মের ব্যতিক্রম করে তিনি আমাকেও ভর্তি করে নেন ওনার টিউশনি ক্লাসে, সম্পূর্ণ বিনা বেতনে। অবশ্য আমার দিদি সুষমাকেও তিনি বিনা বেতনেই টিউশনি পড়িয়েছিলেন।
ছাত্রদরদী’ বা ‘ছাত্রবন্ধু’ শব্দটির যথার্থ মর্ম আজ বুঝতে পারি। তিনি আমাদের ব্যাচের ছেলেদের জন্য যেন অনেকটাই বেশি যত্ন নিয়েছিলেন। মাধ্যমিকে যাতে আমরা ভালো ফল করতে পারি, সেজন্য তিনি বাংলা, ইংরেজি ছাড়াও ভূগোল ও ইতিহাস পড়াতেন। অনেক পরিশ্রম করে, অনেক সময় ব্যয় করে, অনেক শাসন ও অনুশাসনের মাধ্যমে, এবং অনেক স্নেহে আমাদের ব্যাচটিকে মাধ্যমিকের ফাইনাল পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত করালেন। সেই বছর আমাদের স্কুলের ফল খুবই ভালো হয়। আরামবাগ সাবডিভিশনে আমি প্রথম স্থান অর্জন করি। স্কুলে একই ব্যাচের দুজন ছাত্র প্রথম ন্যাশনাল স্কলারশিপ পাই , ছ’টি ফার্স্ট ডিভিশন। পাশাপাশি অন্য কয়েকটি স্কুলের থেকে ফল অনেক ভালো হওয়ার কারণে রামনগর অবিনাশ উচ্চ বিদ্যালয়ের নাম বিভিন্ন গাঁয়েগঞ্জে ছড়িয়ে পড়ে। আর এই সার্বিক সাফল্যের সিংহভাগ অবদান আমাদের স্যার গোপীনাথবাবুর।
মাধ্যমিকে আমাদের ব্যাচের ফল যে ভালো হবেই এতটাই ভরসা তিনি করেছিলেন। তাই পরীক্ষার ঠিক পরেই, সময় যেন নষ্ট না হয়, সে জন্য তিনি আমাদের ব্যাচের কয়েকজনকে উচ্চমাধ্যমিকের গণিত ও পদার্থবিদ্যা বিষয়ে টিউশনিতে ভর্তি করিয়ে দিলেন। আরামবাগের দেববাবু তিরোলের মাস্টারমশাই। ম্যাথমেটিক্স ও ফিজিক্স বিষয়ে টিউশনি পড়াতেন। গোপীনাথবাবুর দূরদৃষ্টিতেই আমরা কয়েকজন উচ্চ মাধ্যমিকের ভর্তির আগেই ম্যাথমেটিক্স ও ফিজিক্সে অনেকটাই এগিয়ে যাই।
মাধ্যমিক পরীক্ষা শেষ হয়ে গেলেও আমরা কিছু ছাত্র স্যারের বাড়িতে দেখা করতে যেতাম। স্যারের ঘরের লাইব্রেরি থেকে কখনো শরৎ রচনাবলী, কখনো রবীন্দ্র রচনাবলী ও আরো সবপাঠ্য পুস্তকের বহির্ভূত গল্প ও উপন্যাসের বই নিয়ে পড়তে থাকি। মাঝে মধ্যে উনি আমাকে বর্ধমানে নিয়ে যেতেন। সীতাভোগ, মিহিদানা ও অনেক সুস্বাদু খাবার কিনে খাওয়াতেন। ওনার দৌলতেই আমি বর্ধমান শহর প্রথম দেখি। মাধ্যমিক পরীক্ষার পর এই লম্বা ছুটি ওনার সহচর্যে উপভোগ করি।
মাধ্যমিকের রেজাল্ট বেরুনোর পর উচ্চমাধ্যমিকে ভর্তির ব্যাপারে আলোচনা করার জন্য উনি আমার মামাতো দাদা অশোককে ডেকে পাঠান। মেধাবী ছাত্র অশোকদা তখন বেলুড় বিদ্যামন্দির থেকে খুব ভালো ফল করে যাদবপুর ইউনিভার্সিটিতে ইলেকট্রনিক্স নিয়ে সেকেন্ড ইয়ারে পড়ে। নরেন্দ্রপুর, বেলুড়, সেন্টজেভিয়ার্স ও আরো অনেক কলেজের আলোচনা প্রসঙ্গে তখনই ‘ইনফেরিওরিটি কমপ্লেক্স’ কথাটির সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় হয়। অশোকদা সতর্ক করে দেয় যে অনেক ভালো ভালো কলেজে ভর্তি হয়েও ভালো-ভালো ছাত্ররা কিভাবে বিপথে চলে যায়। হেডমাস্টার শঙ্করবাবু এসেছিলেন আমাদের বাড়ি, ছোটকাকার সঙ্গে আলোচনা করতে। ওনার ইচ্ছা আমি যেন ওনার স্কুলে ভর্তি হই। কিন্তু গ্রামের ইস্কুলে পড়ানোর ব্যাপারে গোপীনাথবাবুর কোনো উৎসাহ ছিল না। উনি ভেবেছিলেন যে রামকৃষ্ণমিশনের স্কুল-কলেজ হবে আমার জন্য উপযুক্ত পরিবেশ। তাই তিনি অশোকদাকে বলে রামকৃষ্ণ মিশনের কলেজগুলিতে এডমিশন ফর্ম তুলে জমা দিতে বলেন। কয়েকদিন যাদবপুর ইউনিভার্সিটির হোস্টেলে থেকে অশোকদার সঙ্গে কলেজেগুলোতে ফর্ম জমা দিয়ে আসি। কিছুদিনপরে এডমিশন টেস্টের রেজাল্ট বেরোলে স্যার নিজে সঙ্গে করে আমাকে রামকৃষ্ণ মিশন কলিকাতা বিদ্যার্থী আশ্রমে নিয়ে আসেন। শিবেন মহারাজের কাছে পরীক্ষার ফলাফল দেখিয়ে আশ্রমে ভর্তি করিয়ে দেন। তারপর ওইদিন ট্রেন ধরে রহড়া মিশন কলেজে ভর্তি হয়ে আমরা মিশনেই রাত্রিবাস করি। ‘খণ্ডন ভব বন্ধন’ প্রার্থনা সঙ্গীতটি আমি রহড়া মিশন বয়েজ হোমের মন্দিরে প্রথম শুনি, স্যারের সঙ্গে। কথাগুলি তখন ঠিক বুঝতে না পারলেও সঙ্গীতের ওই পবিত্র ধ্বনিশুনে শিহরিত হই। যেন এতকাল ধরে অন্তরের অন্তস্থলে অনাহত হয়ে ওই পবিত্র ধ্বনি বেজে এসেছে। যেন এটাই আমার সারা জীবনেরএকমাত্র প্রার্থনা সঙ্গীত!

মিশনের আশ্রমিক পরিবেশে আমাকে রেখে এসে অনেকটা নিশ্চিন্ত হলেও, পড়াশোনার ব্যাপারে নিয়মিত খোঁজ খবর নিতেন, আনুষঙ্গিক সমস্ত ব্যাপারেও আলোচনা করতেন, পরামর্শ দিতেন। আমাদের ব্যাচকে নিয়ে তাঁর গর্বের শেষ নেই। উচ্চমাধ্যমিক পাশ করে সন্দীপ প্রেসিডেন্সি কলেজে আর ওনার আর এক প্রিয় ছাত্র বেঁটে মানে অতনু নরেন্দ্রপুর রামকৃষ্ণ মিশনে ভর্তি হয়। তবে তিনি সবচেয়ে বেশি গর্বিত হয়েছিলেন যখন ওনার আর এক প্রিয় ছাত্র, পেটরোগা ছেলেটা জয়েন্ট এন্ট্রান্স পরীক্ষায় ভালো র্যাঙ্ক করে খুব ভালো কলেজে ডাক্তারি পড়ার সুযোগ পায়। তিনি গ্রামের বসন্ত ডাক্তারকে নেমন্তন্ন করে নিয়ে আসেন এ ব্যাপারে পরামর্শ নেওয়ার জন্য। ডাক্তারকে খবরটা জানিয়ে বলেন, “গোবিন্দ পালের ছোট ছেলে আমাদের হিমাং ডাক্তারিতে চান্স পেয়েছে। শুনেছেন নিশ্চয়? হ্যাঁ, গ্রামের প্রথম ছাত্র যে ডাক্তারি পড়ার চান্স পেয়েছে।”
“খুবই গর্বের কথা গোপীনাথ, আর তুমি ওদের মাস্টার।” একটু বিরতি নিয়ে ডাক্তারবাবু বললেন, “ডাক্তারি পড়ার চান্স পেয়েছে ঠিক কথা, ডাক্তারি পাশ করে বেরুতে পারবে তো? ডাক্তারি পড়া খুব কঠিন।”
স্যারের প্রত্যুত্তর “না ডাক্তারবাবু না, ডাক্তারি পাশ করার কথা ভাবছি না, খুবই মেধাবী ছাত্র আমাদের হিমাং। কিন্তু জানেন তো ডাক্তারি পড়ার খরচ অনেক, কোথায় পাবে অত টাকা?”
এক ছাত্রের উপর এক মাস্টারের এতটা ভরসা, এতটা বিশ্বাস দেখে গ্রামের প্রসিদ্ধ ডাক্তার কিছুক্ষণের জন্য হলেও হতবাক হয়ে যান।
শেষ পর্যন্ত ঠিক হয় শিবপুর বি. ই. কলেজ, কম্পিউটার সাইন্স নিয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার। ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজগুলিতে কম্পিউটার সাইন্স বিভাগ তখন খুবই নতুন। শিবপুর বি. ই. কলেজে তখন পনেরোটি মাত্র সিট, যাদবপুরেও পনেরোটি। বাকি কিছু সিট অন্যান্য প্রদেশের ছাত্রছাত্রীদের জন্য সংরক্ষিত। গ্রামের ছেলে ডাক্তারি পড়ার সুযোগ পেয়েও শুধুমাত্র আর্থিক কারণে ডাক্তার হতে পারছে না জেনে ওনার মনের মধ্যে কী চিন্তাভাবনা এসেছিল জানি না, তবে চার বছর ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ে চাকরির নিশ্চয়তার কথা ভেবে তিনি একপ্রকার সন্তুষ্টই হয়েছিলেন।
এই চারবছর খুব তাড়াতাড়িই কেটেছিল। কিন্তু যখনই ছুটিছাটাতে বাড়ি আসতাম স্যারের বাড়ি যেতাম দেখা করতে। বেশিরভাগ সময় রাত্রের খাওয়া সেরে বাড়ি আসতাম। একবার বি. ই. কলেজের বন্ধু ও কলেজের ইলেকট্রিকাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড নারায়ন চৌধুরীর ছেলে ভাস্কর আমার সঙ্গে আমাদের বাড়ি বেড়াতে এসে স্যারের সঙ্গে কত গল্প করে। সহপাঠী শুভাশিস আর শান্তনুও স্যারের সঙ্গে অনেক গল্প করে যায়। কলেজের গল্প, তাদের বাড়ির গল্প, তাদের চিন্তাধারা ও দর্শন সব বিষয়ে গল্প জমিয়ে দিতেন স্যার। গ্রামের স্কুলের এক গ্রাম্য শিক্ষকের বাগ্মিতায় শহুরে ছেলেগুলো অভিভূত হয়ে যেত, পরম শ্রদ্ধায় মাথা অবনত হয়ে যেত তাদের।
তারপরেও জীবনের বিচিত্র ক্ষণে, সময়ে অসময়ে সবসময়ই আমাদের স্যারকে কাছে পেয়েছি। আমার ছোটবোন সুলেখার বিবাহ উপলক্ষে ওনার অবদান আমরা কখনো ভুলব না। আমি তখন অনেকটাই পরিণত। শুনেছি আমাদের পরিবারের অন্যান্য অনেক দিদির বিয়েতে তিনি মধ্যস্থতা করেছিলেন। কখনো প্রত্যক্ষভাবে, কখনো পরোক্ষে। এসব ব্যাপারে তিনি ছিলেন আরো একজন অভিভাবক। এমন কি নিজের সন্তানসম এই পিতৃহারা ছাত্রটির জন্যও তিনি পাত্রী নির্বাচন করে রেখেছিলেন, আমাদের বিয়ের অনেক আগে থেকেই।
আমার মতো কয়েকশত ছাত্রের মঙ্গল সাধন করেছিলেন তিনি। কোনো কোনো ছাত্রকে বিশেষ কিছুই করতে হয়নি। তবুও তাদের তরফ থেকে শ্রদ্ধা ও সম্মানের কোনো অংশে কম পড়েনি। একদা গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রধান রঘুপতি বারুই, যখনই ওনাকে স্যার ডেকে পাঠিয়েছেন, উনি সমস্ত দ্বন্দ্ব কাটিয়ে তৎক্ষণাৎ এসেছেন স্যারের সঙ্গে দেখা করতে। নবকুমার মণ্ডল ও বিশ্বনাথ চক্রবর্তী দুজনেই উচ্চ পদস্থ। আবার দুজনেই স্যারের যাকে বলে, মোস্ট ফেভরিট স্টুডেন্ট। ওনাদের সঙ্গে স্যারের গভীর সম্পর্ক আছে, এখনও। কিছু কিছু নিন্দুক ছাত্রকে বলতে শুনেছি স্যার কোনো কোনো ছাত্রকে একটু বেশিই ভালোবাসেন, অহেতুক। যেমন আমাদের ব্যাচের বেঁটে কিংবা আগের ব্যাচের সমীরণ। তা ভালোবাসতেই পারেন। কিন্তু আমার এরকম কোনোদিন মনে হয়নি। এজন্যই রঘুপতি বারুই, নবকুমার মণ্ডল ও বিশ্বনাথ চক্রবর্তীকে আমার খুব ভালো লাগে। নিজের গুরুভাই মনে হয়!
স্যার ছিলেন ইংলিশে এম.এ। কলেজের অধ্যাপনাকে উপেক্ষা করে, বিলাসবহুল শহুরে জীবনের পথে না গিয়ে তিনি নিজের গ্রামে থেকে নিজের গ্রামের স্কুলের শিক্ষকতা স্বীকার করেন। তিনি তাঁর গ্রামকে ভালোবাসতেন, তেমনি ভালবাসতেন স্কুলকে, স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের। গ্রামের স্কুলেই তিনি অবসর গ্রহণ করেন।
শুধুছাত্র দরদী নয়, তিনি একজন সমাজদরদীও। গ্রামের, পাশের আরো কয়েকটি গ্রাম, এমনকি দূরদূরান্তের গ্রাম থেকে রোগীরা আসতেন স্যারের কাছে। কাউকে ভেলোর হাসপাতালে নিয়ে যেতেন, কাউকে বেঙ্গালুরু বা চেন্নাইয়ের নামকরা হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে ভর্তি করতেন। চিকিৎসা-পরিষেবার সুযোগ দিয়ে সুস্থ করে নিয়ে আসতেন। গ্রামের বেশিরভাগ লোকই ইংরেজি ভাষায় কথা বলতে পারে না, এমনকি অনেকে বাংলা কথা ছাড়া অন্য ভাষা বুঝতেই পারে না। তাদের কাছে স্যার হলেন ভগবানের আশীর্বাদস্বরূপ। এমন কতশত রুগি ও তাদের পরিবার এমন মহৎ মানুষের সংস্পর্শে এসে উপকৃত হয়ে ধন্য হয়েছেন তার ইয়ত্তা নেই। তাঁর অবদান অসীম।
একজন নগণ্য ছাত্র হিসাবে আমাদের পরম শ্রদ্ধেয় অ্যাসিস্ট্যান্ট হেডমাস্টার শ্রী গোপীনাথ কুণ্ডুকেআমার ভক্তিনম্র প্রণাম জানাই। আমাদের সকল দোষ-ত্রুটি যেন সন্তানস্নেহে মাফ করে দেন।

*******
এই লেখার প্রসঙ্গে আমার রহড়া মিশন বয়েজ হোম নিয়েও কিছু উল্লেখ করি। ২০২১ সালের ১৬ই জুন এটি লিখেছিলাম (অনাথ আশ্রম ৩)।
“খণ্ডন-ভব-বন্ধন জগ-বন্দন বন্দি তোমায়।” এরকম মধুর ও পবিত্র প্রার্থনা সংগীত এই জীবনে প্রথম শুনি একদল অনাথ বালকের সমবেত কণ্ঠে, রহড়া মিশন বয়েজ হোমে। প্রার্থনার এ হেন সমধুর ধ্বনি শুনে মন্ত্র মুগ্ধের মত মন্দিরেই বসে পড়ি, যেন এক পবিত্র ভাইব্রেশন সারা শরীর ও মন শিহরিত করেছিল। সমগ্র দেবালয় যেন কয়েক মুহূর্তের জন্য এক চিন্ময় ধাম বলে অনুভূত হয়েছিল। তখনও জানতাম না যে এই মহা মন্ত্রের সঙ্গে আজীবন অবিচ্ছেদ্য সম্পর্কের বন্ধন ঘটবে!
১৯৮৩ সালের ওই দিনটি ছিল আমার জীবনের সবথেকে সৌভাগ্যের দিন। ওই পুন্ দিনে একের পর এক কয়েকটি ঘটনা আমার জীবনের গন্তব্য অনেকটাই সুনির্দিষ্ট করে দিয়েছিল। ওই শুভদিনেই প্রথমে স্টুডেন্টস হোমে ভর্তি হয়ে সোজা চলে যাই রহড়া ভি সি কলেজে, একাদশ শ্রেণীতে ভর্তি হওয়ার জন্য। টানটান উত্তেজনায় এডমিশন লিস্টে নিজের নাম খুঁজতে থাকি। একশোটা সিট, তাছাড়া আরো কুড়ি পঁচিশ জনের ওয়েটিং লিস্ট। নামটা খুঁজে পেলাম প্রথম লিস্টেই, আমার উপরে আরো আটজন। সঙ্গে সঙ্গে কলেজ ভর্তি হয়ে গেলাম।
কলেজ ভবনের স্নিগ্ধতা ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ আমাকে মুগ্ধ করেছিল। সমস্ত ক্লাস রুম, হল, অফিস ঘর এবং পরিষ্কার, পরিছন্ন মার্বেল পাথরে মোড়া প্যাসেজ। আমাদের স্কুলের অ্যাসিস্ট্যান্ট হেডমাস্টার গোপীনাথ বাবুই আমাকে নিয়ে এসেছিলেন মিশন ও কলেজে ভর্তি করাতে। তিনি মার্বেল পাথরের মেঝেতেই পা ছড়িয়ে আরাম করে বসে পড়লেন। খানিক বিশ্রাম নিয়ে বলেন, “কি ঠান্ডা মেঝে, বেশ শোয়া বসা যায়! আর একটু বসলেই ঘুম এসে যাবে।” মেঝেতে বসেই ভর্তির ফর্ম পূরণ করে অফিসে জমা দিলাম।
শিশির’মামা তখন রহড়া মিশনে ছোট ছোট অনাথ শিশুদের ওয়ার্ড সুপারিনটেনডেন্ট, মিশনের হাই স্কুলে পার্ট টাইমও করেন। ওনার সঙ্গে দেখা করার জন্য মিশনের দিকে রওনা হলাম। “রামকৃষ্ণ মিশন বয়েজ হোম, রহড়া”! প্রতি বছর মাধ্যমিকের পরীক্ষার রেজাল্ট বেরুনোর সময় যে স্কুলের খবর প্রতি বছর শুনে এসেছি, খবরের কাগজে প্রথম পৃষ্ঠায় দেখে এসেছি, আজ সেই মিশনের গেট পেড়িয়ে ভিতরে প্রবেশ করছি। আশ্রমিক পরিবেশের এই সৌন্দর্যের সাক্ষাৎ পরিদর্শন এক গ্রাম্য কিশোরের কম ভাগ্যের কথা নয়। স্যারের সঙ্গে মিশন ক্যাম্পাসটা ঘুরে ঘুরে বেড়িয়ে দেখি। আধ্যাত্মিকতা ও সৌন্দর্য্যের সমাবেশে এক নৈসর্গিক পরিবেশ! সন্ধ্যার সময় শিশিরমামার নির্দেশে হাত মুখ ধুয়ে প্রর্থনা করতে মন্দিরে যাই, আর তখনই সেই মাহেন্দ্র ক্ষনে সেই পবিত্র প্রার্থনা সঙ্গীতের মধুর ধ্বনি প্রথম শুনি, যে প্রার্থনা রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের সমস্ত শাখা ও প্রতিষ্ঠানের মন্দিরে দিনের পর দিন ধ্বনিত হয়ে আসছে। বলা বাহুল্য সেই অনাথ আশ্রমেই নৈশ ভোজে ঠাকুরের প্রসাদ দ্বিতীয় বার গ্রহণ করার সৌভাগ্য হয়।
(শ্রীশ্রীঠাকুর ও শ্রীশ্রীমায়ের পদপ্রান্তে – সৌভাগ্য তিন)
********






Add comment