সাহিত্যিকা

আমাদের প্রাক্তনীদের লেখা বই (রাজায় রাজায়)

আমাদের প্রাক্তনীদের লেখা বই (রাজায় রাজায়)
© মনোজ কর, ১৯৮০ ইলেকট্রনিকস ও টেলি কমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং

প্রাককথন – লেখকের নিবেদন
‘আর কী অবাক! ইতিহাসে দেখি সব লুটেরা দস্যুর জয়গানে ঠাসা প্রশস্তি, বহিরাগত তস্করের নামে নানারঙে পতাকা ওড়ায়।‘- রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লাহ
‘জেনো ইতিহাস হাসফাঁস করছে রাজাদের ভারে
জেনো মানুষের শ্রম লুটে আলো জ্বলে রাজ দরবারে’ – কবীর সুমন

একটি কাল্পনিক কাহিনী দিয়ে শুরু হলেও রাজায় রাজায় কোনও গল্প বা উপন্যাস নয়। রাজায় রাজায় একটি সময়কালের ইতিহাস। প্রচলিত যে ইতিহাস আমরা পড়ি বা আমাদের পড়ানো হয় সে ইতিহাস রাজাদের বীরগাথা। সে ইতিহাস রাজাদের প্রজাবাৎসল্য আর মহত্বের কাহিনী, যুদ্ধের আর রাজ্যজয়ের গল্প, সম্ভোগ আর বিলাসব্যসনের মাহাত্ম্যকীর্তন, লুণ্ঠিত অর্থ, অলঙ্কার এবং অপরিসীম বৈভবের নির্লজ্জ গৌরবগাথা। কিন্তু প্রকৃত সত্য এই যে প্রচলিত ইতিহাসের অন্তরালে রয়েছে আর এক ইতিহাস। সে ইতিহাস হিংসা আর লোভের। সে ইতিহাস লুন্ঠন আর হত্যার। সে ইতিহাস চক্রান্ত, প্রতিহিংসাপরায়ণতা এবং বিশ্বাসঘাতকতার। রাজা এবং প্রজাবাৎসল্য শব্দ দুটি বিপরীতার্থক। স্তরে স্তরে রাজস্ব আদায় এবং অন্যথায় অত্যাচারের ওপর স্থাপিত রাষ্ট্রশাসনের অনুক্রম এবং ইতিহাস। নিজের রাজ্যে বাহুবলে অথবা নানা ছল চাতুরি এবং কৌশলে প্রজাদের কাছ থেকে খাজনার পরিমাণ ক্রমাগত বাড়িয়ে এবং যুদ্ধের মাধ্যমে অন্য রাজ্য আর রাজকোষ দখল করে রাষ্ট্রের সীমানা এবং রাজকোষের সম্পদ বৃদ্ধি করাই রাজশক্তির এক এবং অন্যতম উদ্দেশ্য। শোষণ, হত্যা এবং লুন্ঠন এই উদ্দেশ্যসাধনের হাতিয়ার। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শাসনতন্ত্রের রূপ পাল্টালেও উদ্দেশ্য এবং উদ্দেশ্যসাধনের পদ্ধতিগুলি অপরিবর্তিত রয়ে গেছে। একটি নির্দিষ্ট ভূখন্ডে একটি নির্দিষ্ট সময়কালের প্রেক্ষাপটে এই অন্তরালবর্তী সত্যকে উদ্ঘাটন করে প্রকৃত ইতিহাসকে পাঠকের দরবারে পেশ করার আন্তরিক প্রয়াসই এই রচনার মুখ্য উদ্দেশ্য।

ইতিহাসের একনিষ্ঠ পাঠকমাত্রেই জানেন যে এই সত্য যে কোনও ভূখন্ডে যে কোনও সময়কালেই প্রযোজ্য। তা সত্ত্বেও এই নির্দিষ্ট সময়কালটিকে বেছে নেওয়ার পিছনে আরও একটি উদ্দেশ্য আছে। সেটি হলো বাংলা, বিহার, উড়িষ্যায় মুর্শিদকুলি, সুজাউদ্দিন, আলিবর্দি, সিরাজউদ্দৌল্লাদের হাত থেকে ইংরেজদের হাতে ক্ষমতা চলে যাওয়ার ইতিবৃত্তও একইসঙ্গে পাঠকের সামনে তুলে ধরা। অষ্টাদশ শতকের দ্বিতীয় দশক থেকে ষষ্ঠ দশক অবধি বিস্তৃত এই ইতিবৃত্ত সীমাহীন লোভ, গভীর চক্রান্ত, চরম বিশ্বাসঘাতকতা, রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ, অজস্র গণহত্যা এবং বলপূর্বক ক্ষমতাদখলের রক্তাক্ত ইতিহাস।

অন্তিমে সংক্ষিপ্ত পরিসরে বাংলা, বিহার, উড়িষ্যার রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলের মধ্য দিয়ে ব্রিটিশদের যে ভারতজয়ের অভিযান শুরু হয়েছিল প্রায় এক শতাব্দব্যাপী সেই অভিযান কেমন করে সমগ্র ভারতবর্ষ দখলের মধ্য দিয়ে শেষ হলো তার এক সংক্ষিপ্ত চিত্র তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে।

প্রকাশক- পরম্পরা প্রকাশন
প্রাপ্তিস্থান: পরম্পরা প্রকাশন শো রুম, ২০এ বেনিয়াটোলা লেন
কলকাতা ৭০০০০৯
মূল্য: ৪০০ টাকা মাত্র

পুস্তক পর্যালোচনা:
এবারের বইমেলায় পরম্পরা থেকে প্রকাশিত মনোজ করের ‘রাজায় রাজায়’ বইটি হাতে এলো। বইটি মনোজের অন্যান্য রচনাগুলির থেকে একটু ভিন্ন প্রকৃতির। মনোজের প্রথম উপন্যাস ‘শতবর্ষে পানু রায়’ রম্যরচনা হিসাবে জনপ্রিয় হলেও পরবর্তীকালে তিনি ইতিহাসভিত্তিক উপন্যাসের পথেই হেঁটেছেন। স্বাধীনতার পঁচাত্তর বছর উদযাপন উপলক্ষ্যে রচিত মনোজের দুটি উপন্যাসই স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসের উপর ভিত্তি করে রচিত। এই ঐতিহাসিক রচনায় লেখক আরেকটু পিছিয়ে নবাব মুর্শিদকুলি খানের সময় থেকে শুরু করে আলিবর্দি খান, সিরাজৌদ্দৌল্লা, পলাশীর যুদ্ধ এবং যুদ্ধপরবর্তী ক্লাইভের সময়ের চিত্রটি সফলভাবে তুলে ধরেছেন। পড়েই বোঝা যায়, লেখক অনেক পড়াশোনা করেই এটি গ্রন্থনা করেছেন। সম্পূর্ণ তথ্যের ভিত্তিতে রচিত এই ঐতিহাসিক দলিলে লেখকের বলার স্টাইলটি বেশ সুন্দর। প্রথম থেকে শেষ অবধি বইটি পড়তে কোথাও বেগ পেতে হয়না। ভাষার গতি এতই স্বচ্ছন্দ যে একদমেই অনায়াসে প্রায় দু’শ পাতার বইটি পড়ে ফেলা যায়।

বইটিতে যে তথ্যগুলি ব্যবহার করা হয়েছে তার উৎসগুলির বিস্তারিত উল্লেখ থাকলে গবেষণাধর্মী এই রচনাটির বিশ্বাসযোগ্যতা হয়তো আরেকটু বৃদ্ধি পেত। তবে সে কারণে রচনাটির সাহিত্যগুণ যে বিন্দুমাত্র বিঘ্নিত হয়েছে এমন কথা বলা যায়না।

অরুণ দাস
বেহালা, কলকাতা।

********

Sahityika Admin

Add comment