সাহিত্যিকা

‘আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ শিক্ষক’

আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ শিক্ষক’
© সুদীপ রায়, ১৯৭০ মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং

অনিল বরণ চক্রবর্তী … সংক্ষেপে এবিসি। আমরা ছাত্ররা ডাকতাম এবিসি স্যার নামে। অন্যরা অনিল বাবু।

সরকারী স্কুল। আমরা যখন ক্লাস টেনে, তখন উনি পুরুলিয়া জেলা স্কুল থেকে বদলি হয়ে এলেন আমাদের হুগলী ব্রাঞ্চ স্কুলে পড়াতে। মূলত অঙ্কের মাস্টারমশাই। কিন্তু উপযুক্ত শিক্ষকের অভাবে দশম ও একাদশ ক্লাসে উনি আমাদের বাংলাও পড়িয়েছিলেন। শুনেছিলাম উনি ছিলেন বিএ, বিএসসি। পরিবারের বাইরে আমার এই এবিসি স্যার আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ শিক্ষক।

স্কুলে বরাবর পরীক্ষায় প্রথম হতাম। এজন্য একটা প্রচ্ছন্ন গর্ববোধও ছিল। ক্লাস টেনের হাফ ইয়ারলি পরীক্ষার রেজাল্ট আউট হবার পরে এবিসি স্যার একদিন স্কুল ছুটি হয়ে যাওয়ার পরে আমাকে ওনার কাছে টিচারস রুমে একান্তে ডেকে নিলেন।
‘তুমি তো এবারও ফার্স্ট হয়েছ ক্লাসে, তাই না?’
‘হ্যাঁ স্যার।’
‘অঙ্কে তো একশ পেয়েছ সেটা জানি।’
‘স্যার’
‘শোনো, আমি তোমার বাকি সাবজেক্ট গুলোর অ্যানস্যার পেপার পড়ে দেখেছি।’
চনমন করে উঠলাম। অন্য সাবজেক্টগুলোতেও মার্ক ভালোই ছিল।
এবিসি স্যার আমার দিকে স্থির দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন, তারপর বললেন।
‘ফার্স্ট হয়েছ ঠিকই, কিন্তু তোমার অ্যানস্যার পেপার পড়ে আমি হতাশ।’
ধাক্কা খেলাম। চুপ করে স্যারের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম।
একটু পরে স্যার বললেন
‘তোমার উত্তরপত্র পড়ে মনে হল যেন কোনো পাঠ্যবই পড়ছি।’
আমি কিছু না বুঝতে পেরে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলাম।
‘তোমার সমস্যা হল তুমি বই থেকে মুখস্থ করে, হুবহু তাই পরীক্ষার খাতায় উগরে দিয়েছ। সেখানে তোমার নিজস্বতা বা বইয়ের পাতার বাইরে কিছু পেলাম না। এরকম ভাবে উত্তর লিখলে তুমি ভালো নম্বর পাবে ঠিকই, কিন্ত তার বেশি কিছু নয়। বোর্ডের পরীক্ষায় প্রথম পঞ্চাশের মধ্যে থাকতে হলে নিজেকে বদলাতে হবে।’

আমার কাছে এটা একেবারে নতুন কথা ছিল। এতদিন পর্যন্ত স্কুলের শিক্ষকেরা আমার স্মৃতিশক্তির প্রশংসাই করে এসেছেন। উনি অন্যরকম বললেন।
‘শোনো, তুমি রোজ ছুটির পরে আমার কাছে এসো। আমি দেখিয়ে দেব মুখস্থ করেও কীভাবে অন্যভাবে লেখা যায় যাতে পরীক্ষক খুশি হয়ে অতিরিক্ত নম্বর দেবেন।’
এর পরে দিন পনেরো আমি এবিসি স্যারের কাছে পাঠ নিলাম, এবং কোনো ফি ছাড়াই। আমার চিন্তাধারাই বদলে গেল। ক্লাস টেনের ফাইনাল পরীক্ষার পরে ফলাফল দেখে উনি আমায় ডেকে বাহবা দিলেন। পরে বোর্ডের পরীক্ষায় প্রথম পঞ্চাশের মধ্যেই ছিলাম।

ওনার কাছে পড়াশোনার বাইরেও অনেক মূল্যবান উপদেশ পেয়েছি যা আমাকে পরবর্তী জীবনে সাহায্য করেছে সুনাগরিক হতে।
ওনার দেওয়া একটি বিশেষ উপদেশের কথার উল্লেখ করে আমার লেখা শেষ করছি।
এবিসি স্যার বলেছিলেন …
‘বড় লোক হতে হলে অনেক কিছু নিতে জানতে হয়।
বড় লোক হতে হলে অনেক কিছু দিতেও জানতে হয়।”
ভীষণ সত্যি কথা।

এবিসি স্যার …. বাবা, মা’র পরেই আমার জীবনে শ্রেষ্ঠ শিক্ষক।

*******

Sahityika Admin

Add comment