ছোট মাস্টারমশাই
© মনোজ কর, ১৯৮০, ইলেকট্রনিকস ও টেলিকমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং
সময়টা তখন ১৯৬৩-৬৪ হবে। স্কুলে ভর্তি হইনি তখনও। আমাদের ছিলো যৌথ পরিবার। বাবারা চার ভাই। বাবা সকলের ছোট। জেঠতুতো দাদা দিদিরা স্কুলে যেত। আর আমাদের তিন ভাইএর মধ্যে আমার দুজন যমজ ভাই ছিলাম সবার থেকে ছোট।
বাড়িশুদ্ধ আটজন দাদা-দিদি সবাই স্কুল চলে গেলে আমরা দুজন এঘর, ওঘর, দালানে, বাগানে ঘুরে বেড়াতাম আর ভাবতাম কবে ওদের মতো ভোরবেলা উঠে তৈরি হয়ে পিঠে ব্যাগ নিয়ে স্কুলে যাব। মাকে বারবার জ্বালাতন করতাম যে আমাদের দুজনকেই তাড়াতাড়ি স্কুলে ভর্তি করে দাও। মাও রেগে গিয়ে বলত –তোরা ভর্তি হলে আমি যে একটু শান্তি পাই! তোদের পিছনে দৌড়তে দৌড়তেই আমার সারাদিন কেটে যায়। যেদিন খুব জ্বালাতন করতাম সেদিন বাবা ফিরলেই বলত ‘ওদের এবার তুমি স্কুলে ভর্তি করে দাও। আর পারিনা সামলাতে। ওদের পিছনে কি আমি দৌড়তে পারি?’
আমাদের দুজনকে সামলানোর জন্য বড় জেঠিমার কড়া হুকুম ছিল মা যেন বাড়ির আর কোনও কাজ না করে। এমনি করেই চলছিল। এক রবিবার বিকালে বাবা আমাদের দুজনকে ডেকে বলল, “শোন, কাল সকালে তোদের দুজনকে স্কুলে ভর্তি করতে নিয়ে যাব“। শুনেই একছুটে মাকে খবরটা দিতে গিয়ে দেখলাম মায়ের মুখ ভার। খুব অবাক লাগল। এমন ভাল খবর শুনে মা’র মুখভার হল কেন? আমরা দুজনেও চুপ করে গেলাম। পরিবেশটা কেমন যেন ভারি হয়ে গেল। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই মেঘ কেটে গেল। মা’র মুখের হাসি ফিরে এল। আজ বুঝতে পারি আমাদের ছেড়ে অতক্ষণ থাকতে হবে সে কথা ভেবেই মায়ের চোখের কোনে সেদিন জল এসেছিল।
পরের দিন মহানন্দে সকালে জুতো জামা পরে বড়দের প্রণাম করে, ঠাকুর নমস্কার করে, মায়ের দেওয়া ফুল পকেটে নিয়ে বাবার সঙ্গে রিক্সা চড়ে আমরা দু’ভাই বেড়িয়ে পরলাম বিশ্ববিজয়ে। খুরুট রোডের সেই বহু আকাঙ্ক্ষিত স্কুলবাড়ির সামনে রিক্সা থেকে নেমে হাঁ করে তাকিয়ে রইলাম কিছুক্ষণ। এই রাস্তা দিয়ে যেতে যেতে কতবার ঘুরে ঘুরে দেখেছি এই বাড়িটা আর ভেবেছি কবে গেট খুলে ঢুকব এই বাড়িটার ভেতরে।
আজ আমাদের সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। বাবার পিছনে পিছনে গুটিগুটি চললাম দুই ভাই। সিঁড়ি দিয়ে উঠে একটা দালান। সেই দালান ধরে একটু এগোতেই দেখা হয়ে গেল একেবারে ধবধবে সাদা ধুতি সার্ট পরা এক মানুষের সঙ্গে। কিঞ্চিৎ খর্বকায়, গভীর এবং উজ্জ্বল দুটি চোখ , মুখে স্মিত হাসি। হাত বাড়িয়ে বাবার হাতটা ধরে বললেন, “এসো।“ মনে হল বাবার সঙ্গে যেন কোনও আত্মীয়ের বাড়ি এসেছি। এমন আন্তরিকভাবে হাসিমুখে বাবাকে আসতে বললেন যে মনে হল যেন আমাদের অতি পরিচিত এই মানুষটি। বাবা আমাদের দেখিয়ে বলল, “বিষ্টুদা, এদের কথাই বলেছিলাম। আজ থেকে আপনার হাতে দিয়ে গেলাম“। বাবা এবার আমাদের বলল, ’এনাকে প্রণাম কর। ইনি আমাদের সকলের প্রণম্য হেডমাস্টারমশাই।‘
উনি আমাদের মাথায় হাত দিয়ে আশীর্বাদ করলেন। তারপর পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একজনকে বললেন, “এদের প্রার্থনার লাইনে নিয়ে যাও। আর প্রার্থনার পর ক্লাস ওয়ান এ বসিয়ে দিয়ে এস। নন্দবাবুকে বলা আছে।‘ বাবাও ওনার সঙ্গে এসে প্রার্থনায় দাঁড়াল। আমাদের বলল,’ আমি প্রার্থনার পর চলে যাব। স্কুল ছুটির পর অপেক্ষা করবি। আমি এসে নিয়ে যাব। গেটের বাইরে যাবি না ।‘
প্রার্থনার পর লাইন দিয়ে ক্লাসে গেলাম। ক্লাসঘরের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন এক দীর্ঘদেহী, টকটকে ফর্সা, মেদহীন মানুষ। পরণে সাদা ধুতি, পাঞ্জাবি। পাঞ্জাবির হাতা কনুই অবধি গোটানো। বুঝলাম উনিই নন্দবাবু যাঁর কথা হেডমাস্টারমশাই বলছিলেন। ক্লাসঘরে ঢুকে বেঞ্চিতে বসলাম। এক একটা বেঞ্চিতে চারজন করে। সবাই বসার পর উনি নিজের জায়গায় এসে দাঁড়ালেন। তারপর এক এক করে সবাইকে নিজের নাম আর বাড়ির ঠিকানা বলতে বললেন। তারপর ক্লাসের নিয়মাবলী, আচরণবিধি এবং স্কুলের রুটিন সবাইকে বুঝিয়ে দিলেন। নিয়মের অবমাননা বা আচরণবিধিভঙ্গের শাস্তি জানিয়ে দিলেন বিস্তারিত ভাবে। একথাও জানালেন যে তিনবার শাস্তিযোগ্য অপরাধ করলে স্কুল থেকে বিতাড়িত হতে হবে। প্রথম দিনের প্রথম ঘন্টায় বুঝতে পারলাম এ বড় কঠিন ঠাঁই। বাইরে থেকে স্কুলের সম্বন্ধে যা ভেবেছিলাম তার সঙ্গে আসলের যে কী বিস্তর ফারাক তা পরিস্কার করে বুঝিয়ে দিলেন নন্দবাবু। এক মিশ্র অনুভূতির মধ্য দিয়ে শুরু হয়ে গেল আমার স্কুলজীবন, হাওড়া বিবেকানন্দ ইন্সটিটিউশন।

প্রায় দিন পনের পর এক শনিবার বিকালে খেলার মাঠ থেকে আমাদের ডাক পড়ল যে এক্ষুনি বাড়ি যেতে হবে – জরুরি তলব। দৌড়ে গিয়ে সদর ঘরে ঢুকতেই দেখি বসে আছেন নন্দবাবু। পাশের চেয়ারে বাবা আর একটু দূরে দাঁড়িয়ে মা। ওনাকে এভাবে এইখানে দেখে আমরা তো হতবাক। ভয়ে হাত-পা কাঁপছে। ভাবলাম কী এমন করলাম যে একেবারে বাড়ি অবধি চলে এসেছেন উনি। ভাবলাম সেইজন্যই কি সকলকে বাড়ির ঠিকানা জিগ্যেস করেছিলেন প্রথমদিন। ধাতস্থ হলাম ওনার মুখের হাসি দেখে। বললেন, “ভয় পাওয়ার কিছু নেই। তোমাদের নামে অভিযোগ করতে আসিনি। আমি এ বাড়িতে নতুন নই। বছর পাঁচেক আগে আসতাম রোজ। তখন তোমরা খুব ছোট ছিলে। আমি আবার আসব কাল থেকে প্রতিদিন –রবিবার ছাড়া। তোমরা দু’ভাই রোজ বিকেল সাড়ে পাঁচটা থেকে সাতটা পর্যন্ত পড়াশুনা করবে আমার সামনে বসে। আমি তোমাদের সাহায্য করব।“ খানিক থেমে হেসে বললেন,’ কি রাজি তো?’ আমরা চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলাম। উনি বললেন, “তোমরা যেতে পারো। সোমবার দেখা হবে বিকেল সাড়ে পাঁচটায়।“
আমাদের বাড়ির বাইরের গেটের তালা খোলা হয় বিকেল চারটার সময়। তালা খোলার মুহুর্তেই আমরা দুজন ছুটে বেরিয়ে পাশের খেলার মাঠে পৌঁছে যাই প্রতিদিন। এই নিয়মের কোনও ব্যতিক্রম নেই। এখন বুঝলাম আমাদের খেলার সময়সীমা কাল থেকে কমে যাবে, মাত্র এক ঘন্টা তিরিশ মিনিট। সন্ধ্যেবেলা বারবার ডেকে আমাদের বাড়ি ফেরানোর যে গুরুদায়িত্ব সেজদা বা দাদাভাই এতদিন পালন করে এসেছে সে দায়িত্ব থেকেও এখন তাদের অব্যাহতি। এখন থেকে সাড়ে পাঁচটার আগেই বাড়ি যেতে হবে আর তার চেয়ে কঠিনতর সমস্যা হল সময়ের খেয়াল রাখা।
খেলতে খেলতে সময়ের কোনও হিসেব কি কখনও রাখা যায়? কিন্তু উপায় কী? এইসব সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে সোমবার কিছুতেই খেলায় মন দিতে পারছিলাম না। বন্ধুরা বলল, “কী হয়েছে রে তোদের? এক মিনিট অন্তর মাঠের বাইরে গিয়ে ক্লাবঘরে ঘড়ি দেখছিস?” বললাম, “সাড়ে পাঁচটায় বাড়ি যেতে হবে তাই।“
ক্লাবের ঘড়িতে তখন পাঁচটা পঁচিশ। ঘড়ি দেখে যেই মাঠমুখো হতে যাব দেখি সাইকেলে করে নন্দবাবু আসছেন। দেখেই পড়িমরি করে ছুটে বাড়িতে ঢুকেই হাত পা ধুয়ে ভিজে হাত পায়ে ঘর্মাক্ত শরীরে বইয়ের ব্যাগ নিয়ে সদর ঘরে। আমাদের দুর্দশা দেখে বললেন, ’যাও হাত পা মুছে, জামাপ্যান্ট বদলে এসো। কাল থেকে খেলতে খেলতে বার বার ঘড়ি দেখতে যাওয়ার দরকার নেই। আমায় দেখতে পেলেই বুঝবে খেলা শেষ। তারপর তাড়াতাড়ি বাড়ি এসে পরিস্কার হয়ে জামাপ্যান্ট পালটিয়ে ব্যাগ নিয়ে পাঁচমিনিটের মধ্যে চলে আসবে। ওই পাঁচমিনিট আমি অপেক্ষা করব।“
আমরা অবাক। ইনি কি অন্তর্যামী? উনি আমাদের দিকে তাকিয়ে আছেন। মুখে স্মিত হাসি, চোখে স্নেহের দৃষ্টি। এক মুহূর্তে জয় করে নিলেন আমাদের হৃদয়। তখন বুঝতেও পারিনি কী অপেক্ষা করে আছে আমাদের জন্য। উনি বলতে শুরু করলেন, “প্রথমে বলি তোমরা আমাকে কী বলে ডাকবে। আমি ছোটবাড়ির মাস্টারমশাই। তোমরা যখন ক্লাস ফাইভে উঠবে তোমরা ছোট বাড়ি ছেড়ে বড়বাড়িতে চলে যাবে। ওখানে সব মাস্টারমশাই আলাদা। তোমরা আমাকে ছোট মাস্টারমশাই বলে ডাকবে। তোমরা ছোট তাই আমি ছোট মাস্টারমশাই।“ নিজের ভুমিকা শেষ করে এবার বললেন, “এই নব্বই মিনিটের নিয়মাবলী – প্রথম পনের মিনিট আমি তোমাদের হোমওয়ার্ক চেক করব। তোমাদের ভুলগুলো বুঝিয়ে দেব। তারপর একঘন্টা তোমরা আমার সামনে এবং আমার সঙ্গে অর্থাৎ আমরা একসঙ্গে পড়াশুনা করব। কোনদিন কী বিষয়ে পড়াশুনা করব সেটা স্কুলের রুটিনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ঠিক করে নেব। শেষ পনের মিনিট আমি তোমাদের নতুন হোম ওয়ার্ক বুঝিয়ে দেব। সেটা আমি পরেরদিন প্রথম পনের মিনিট চেক করব। আগামি চারবছর এই নিয়মের কোনও ব্যাতিক্রম হবে না। ব্যতিক্রম হলে কী হবে সে কথা আলোচনার প্রশ্নই ওঠে না। আজ শুরু অঙ্ক আর ইংরেজি দিয়ে……
শুরু হল পথ চলা। সময় কীভাবে কেটে যাচ্ছে বুঝতে পারছি না। সকালে ঘুম থেকে উঠে স্কুল। গুলেকাকার রিক্সা গেটে হাজির ঠিক ছ’টায়। গুলেকাকার রিক্সায় স্কুল থেকে ফেরা, তারপর স্নান, খাওয়া। আধঘন্টা পরে হোমওয়ার্ক শুরু। হোমওয়ার্ক শেষ করতে করতে বিকেল চারটে-চারটে দশ। এক দৌড়ে খেলার মাঠ। ছোট মাস্টারমশাইএর সাইকেল, পড়তে বসা। আধঘন্টা ব্রেক আবার দেড় ঘন্টা হোমওয়ার্ক। ঠিক ন’টায় রাতের খাবার। ঘুম না পাওয়া পর্যন্ত গল্পের বই …আবার সকালে ওঠা। একদিন …প্রতিদিন – ছুটির দিন ছাড়া।
একটা অদ্ভুত ব্যাপার লক্ষ্য করেছিলাম। বিকালবেলা কয়েকদিন হোমওয়ার্ক শেষ হয়ে যাচ্ছিল চারটে বাজার দশ-পনের মিনিট আগে। গেট খোলা অবধি যে সময়টা বাঁচত ঐ সময়টুকু হাঁদা-ভোঁদা, নন্টে- ফন্টে পড়তাম। কিন্তু দু-তিনদিন পরেই দেখি হোমওয়ার্ক শেষ করতে আবার চারটে দশ। যেন কোন নির্মম অদৃশ্যহাত আমার অজান্তে কেড়ে নিত আমার রুটিনভাঙার অবৈধ আনন্দ।
কিছু ঘটনার কথা আমার এখনও বেশ মনে আছে। একদিন আমরা বিকালে ফুটবল খেলছি। ম্যাচ চলছে পাশের পাড়া কাঁড়ারপুকুরের সঙ্গে। ম্যাচের সময় ৪-৩০ থেকে ৫-৩০। খেলা প্রায় শেষের দিকে। আমরা দু’জন ফরোয়ার্ডে খেলছি। ডানদিক বরাবর বল পায়ে দুর্দান্তগতিতে ছুটছি । ওদের বক্সের মাথায় পৌঁছে বলটা থ্রু করতে যাব দেখি সামনে সাইকেলে আসছেন ছোট মাস্টারমশাই। বল যেখানে ছিল সেখানে রেখেই দিক পরিবর্তন করে দৌড় শেষ করলাম বাড়িতে। তৈরি হয়ে যখন পড়তে বসলাম ছোট মাস্টারমশাই বললেন ,’ খেলাটা শেষ করেই আসতে পারতে। তিরিশ সেকেন্ড পরেই বাঁশি বেজে গেল। অতটা খারাপ মানুষ আমি নই।‘
চুপ করে রইলাম। মনে মনে ভাবলাম তাহলে মাঝে মধ্যে একটু নিয়মের ব্যতিক্রম এখন থেকে হয়ত সাংঘাতিক অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে না। বেশ কয়েকদিন পরে একদিন বিকেলে হোমওয়ার্ক কিছুটা বাকি রেখে বই-খাতা বন্ধ করে একটু হাঁদা-ভোদা পড়তে পড়তে ভাবলাম এক-আধদিন দু-চার পাতা কম হাতের লেখা বা দু-তিনটে অঙ্ক কম করলে কী ই বা আর হবে?
যথাসময়ে ছোট মাস্টারমশাই এলেন। নিয়মমাফিক প্রথম পনের মিনিট হোমওয়ার্ক চেক। দেখলাম ছোট মাস্টারমশাইএর ফর্সা মুখ লাল হয়ে উঠছে। গর্জন করে উঠলেন, “বাকি হোমওয়ার্ক কোথায়? হাতের লেখা এত খারাপ কেন? মনে হচ্ছে যাহোক করে তাড়াতাড়ি লিখেছ।“ ছোট মাস্টারমশাইএর এমন রূপ আর গলার আওয়াজ আগে কোনওদিন দেখিনি। মা ভিতর থেকে দৌড়ে এসে জিগ্যেস করল, “কী হয়েছে, মাস্টারমশাই?” ছোট মাস্টারমশাই বললেন, “বৌদি, আজ আমি আসি। কী হয়েছে সেটা ওর কাছ থেকেই জেনে নিন।“ রাগে, দুঃখে, অপমানে চোখের জল বাধ মানেনি সেদিন। তারপর থেকে আর কোনও দিন নিয়মের ব্যত্যয় ঘটেনি।
দেখতে দেখতে ক্লাস ফোরের ফাইনাল পরীক্ষা আর বৃত্তি পরীক্ষা এসে গেল। পরীক্ষা শেষ হয়ে যাবার কয়েকদিন পরে ছোট মাস্টারমশাই এলেন এক সন্ধ্যায়। বাবা, মা বসেছিল। আমরা দু’ভাই এসে দাঁড়ালাম। বললেন, “আমার কাজ শেষ। তোমাদের সঙ্গে দেখা করতে এলাম। ভালো থেকো। এখন তোমাদের বড় বাড়ি যেতে হবে। স্কুলেও আর দেখা হবে না।“ প্রণাম করলাম। আমাদের দু’জনকে বুকে টেনে নিলেন। ওনার মুখের দিকে তাকিয়ে দেখলাম ওনার দু’চোখ জলে ভরে গেছে। আমরাও কান্না ধরে রাখতে পারলাম না।
প্রথম প্রথম বুঝতে না পারলেও কিছুদিন পরে বেশ বুঝতে পেরেছিলাম আমাদের অজান্তে এক কঠিন নিয়মানুবর্তিতায় আর শৃংখলায় বাঁধা হয়ে গিয়েছিল আমাদের জীবন। কোনও এক অদৃশ্য সুতোর টানে চালিত হচ্ছিল আমাদের প্রতিদিন। সে জীবনে কোনও সামরিক কায়দায় আদেশ নেই, কোনও চোখরাঙানো অনুশাসন নেই, কিন্তু প্রতিমুহূর্ত এক কঠিন নিয়মে বাঁধা না বলে বলা যেতে পারে এক ছন্দে বাঁধা। শৈশবজীবনের সমস্ত উপকরণ আছে এই জীবনে -খেলাধূলা, কবিতাপাঠ, গল্পের বই, বেড়াতে যাওয়া, আনন্দ উচ্ছ্বাস সবই আছে কিন্তু সবই সংযত, ছন্দোবদ্ধ। যে সময়ের যা সে সময়ে তাই।
তখন বুঝতে পারিনি কোন কারিগর এমন ছন্দে বেঁধে দিল আমাদের জীবন। অনেক পরে বুঝেছি ছোট মাস্টারমশাই আমাদের ’পড়াতে’ আসতেন না। আসতেন আমাদের শৈশবযাপনকে এমনভাবে চালিত করতে যাতে আমাদের পরবর্তী জীবন এক কঠিন ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে থাকতে পারে। শৈশবযাপনের সব উপকরণকে নির্দিষ্ট মাত্রা এবং অনুপাতে মিশিয়ে সময়ের বাঁধনে বন্দী করে এমন এক জীবনচর্যার সৃষ্টি করতে যার প্রভাব গভীর এবং সুদূরপ্রসারী। যা ভাষায় ব্যক্ত করতে আমাকে শত শত শব্দের ব্যবহার করতে হচ্ছে তা কী অনায়াসে, কী অদ্ভুত মসৃণতার সঙ্গে আমাদের জন্য সৃষ্টি করে গেছেন এই মানুষ গড়ার কারিগর তা ভাবতে সত্যি অবাক লাগে।
অনেকদিন পরে আরও একবার দেখা হয়েছিল ওনার সঙ্গে। স্কুল-কলেজের গণ্ডি পেরিয়ে তখন আমি চাকরি করতে যাব দিল্লিতে। মা অনেকদিন ধরে বলছিল, “যা, একবার ছোট মাস্টারমশাইএর সঙ্গে দেখা করে আয়।“ যাব যাব করে আমার যাওয়া হয়ে উঠছিল না। হঠাৎ একদিন সকালে মায়ের ডাকে নিচে নেমে এসে দেখি ছোট মাস্টারমশাই বসে আছেন। সেই চেহারা, সেই রঙ, সেই হাসি। প্রণাম করলাম। মাথায় হাত দিয়ে আশীর্বাদ করলেন। বললেন, “তোদের সব খবর পাই। সব জানি আমি। তুই চলে যাবি শুনে ভাবলাম একবার ঘুরে আসি। দাদা-বৌদির সঙ্গেও অনেকদিন দেখা হয়নি। যে চারাগাছ যত্ন করে বেড়া দিয়ে, জল দিয়ে, সার দিয়ে বড় করতে সাহায্য করেছি সে গাছ এখন কত বড় হল , কী রকম হল দেখতে চলে এলাম।“ মা বলল, “সাহায্য করেছি বলছেন কেন? বলুন -করেছেন। আমার মনে আছে আপনি বলেছিলেন –শুধু কাদের সঙ্গে মেলামেশা করে একটু খেয়াল রাখবেন। বাকিটা আমি সামলে নেব।“
‘আপনার সব মনে আছে দেখছি।“ এই বলে হো হো করে হেসে উঠলেন ছোট মাস্টারমশাই। আমি,ওনার অযোগ্য ছাত্র যে ওনার সঙ্গে যোগাযোগের কোনও চেষ্টা এতদিন করিনি সে অভিযোগ ওনার কথায়, হাবভাবে এতটুকু প্রকাশ পায়নি। এইসব মানুষেরা এরকমই হন। আমাদের সব ভুল, অযোগ্যতা ওনারা পরমস্নেহে হাসিমুখে ক্ষমা করে দেন, এতটুকুও মনে রাখেন না ।
আজও চোখের সামনে স্পষ্ট ভেসে ওঠে শেষ দিনের সেই ছবিটা। সাইকেলটা টেনে গেট থেকে বেরিয়ে উঠে বসলেন। তারপর আর পিছন দিকে না তাকিয়ে আস্তে আস্তে মিলিয়ে গেলেন খেলার মাঠের পাশ দিয়ে। কান্না ভেজা চোখে গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে আমার দুই ভাই। কাল থেকে আর আসবেন না ছোট মাস্টারমশাই। আজ বুঝি, এই ছোট মাস্টারমশাইরা এক বিরল প্রজাতির মানুষ যাঁরা মাঠের পাশের রাস্তা ধরে আস্তে আস্তে বিলীন হয়ে যাচ্ছেন। বিলীন হয়ে যাচ্ছেন এক একজন বিশ্বকর্মা যাঁরা নিঃশব্দে নিভৃতে নিদারুন নৈপুন্যে সৃষ্টি করে চলেছিলেন সত্যিকারের মানুষ, নির্মল চরিত্র, মানবিক মুল্যবোধ এবং সর্বোপরি লৌহকঠিন, ঋজু মেরুদণ্ড।
বিলীন হয়ে যাচ্ছে একটা যুগ, একটা সময়।
বিলীন হয়ে যাচ্ছে নিঃস্বার্থ সম্পর্কের দিনগুলো।

*********






Add comment