জ্ঞানাঞ্জন শলাকায়াঃ
© বন্দনা মিত্র, ১৯৮৬ মেটালার্জিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং
আমাদের ছোটবেলার সময়টা, মানে বিগত শতাব্দীর ৭০ এর দশকটা, ছিল অন্যরকম। তখনকার দিনে লোকে ছেলে মেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে অত চিন্তিত ছিল না, স্বচ্ছন্দে সরকারী বাংলা মিডিয়াম স্কুলে ভর্তি করে দিত। আর সে সব স্কুল থেকে পাশ টাস করে ছেলেমেয়েরা দিব্যি “এ বিশ্ব জগত মাঝে যার যেথা স্থান,” খুঁজে নিত, সসম্মানে যে যার আসন আলোকিত করে বসে থাকত। ব্যতিক্রম অবশ্যই ছিল, তবে সেটা ব্যতিক্রমই।
সেইসব দিনের মাষ্টারমশাইরাও যেন ছিলেন একটু ছিটিয়াল, ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানোতেই তাঁদের সহজাত প্রতিভা ছিল। রাস্তায় দিদিমণিদের সঙ্গে দেখা হয়ে গেলে পায়ে হাত দিয়ে ঢিব ঢিব করে প্রণাম করতে হত, নয়তো বাড়িতে বকুনি খেতাম। কারণ সেটাই ছিল শিষ্টাচার, বই থেকে শেখা নয়, বাড়িতে ব্যাবহারিক শিক্ষা। আর শিক্ষকেরাও আমাদের মতন ছাত্রছাত্রীদের রাস্তায় পেলে সাধারণত একটু বকাঝকা না করে ছাড়তেনই না। শুধু পড়া নয় – যেকোন ব্যাপারে, বেশবাস, চালচলন – সবেতেই শাসন করার যাকে বলে পুরো রাইট নিজেদের হাতে তুলে নিয়েছিলেন সেকালের শিক্ষককুল। আর অভিভাবকদের সম্পূর্ণ সায় ছিল এ ব্যাপারে। তা বলে ভাববেন না যেন যে সে সময় পৃথিবীতে সত্যযুগ চলছিল এবং ছাত্রছাত্রীর দল ছিল নিষ্পাপ, সরল, কোমলমতি বালক বালিকা ছিল সব। স্কুলের ছেলেমেয়েরা এখনও যেমন হয় তখনও তেমন, সুযোগ পেলেই আপন আপন পুচ্ছটি উচ্চে তুলিয়া মহানন্দে নাচাইত। শিক্ষকেরাও সবাই ঠিক বুনো রামনাথ ছিলেন না; বরং খুঁজলে প্রহ্লাদকুলে দৈত্য যে দু’ চারজন পাওয়া যেত না তা নয়। তবে কি না তখনও বাঙালি বিশ্বাস করত “লেখাপড়া করে যে / গাড়ি ঘোড়া চড়ে সে।” আর বাড়িতে গুরুজনেরা সুযোগ পেলেই শোনাতেন, “স্বদেশে পূজ্যতে রাজা/বিদ্বান সর্বত্র পূজ্যতে।“ পরীক্ষায় ভাব সম্প্রসারণ আসত “বিদ্যা রত্নম মহা ধনম।” তাই সেইযুগের মানুষেরা “মাস্টারমশাই”দের সমাজ একটু আলাদা চোখে দেখত। যে কোন সভা-সমিতিতে প্রধান অতিথির আসনটি সাধারণত তাঁদের জন্যই রাখা থাকত।

আমি নিজে ছিলাম নৈকষ্য বাংলা মাধ্যমের ছাত্রী। আমরা ছোটবেলা থেকেই শুনে এসেছি যে, বাংলা মাধ্যমের ছাত্রছাত্রীরা ইংরেজি’তে অসম্ভব “উইক” হয়। ইংরেজিতে কথাবলা তো অনেক দুরূহ ব্যাপার। সুতরাং ঘরেবাইরে যাকে বলে ঠেসে ইংরেজি পড়ানো হতো। ক্লাসে নেসফিল্ডের ব্যকরণ থেকে বাড়িতে স্টেটসম্যান। যখন তখন যত রাজ্যের উদ্ভট শব্দের অর্থ ও বানান ধরা, দুমদাম রবীন্দ্রনাথ বা শরৎচন্দ্রের বড় বড় সুকঠিন বাক্যের ইংরেজি ট্রানশ্লেসন দেওয়া – এসব ছিল আমাদের গুরুজনদের নিত্য কর্তব্যকর্ম। আত্মীয় প্রতিবেশী যে ই হোক, আমাদের ইংরেজি শেখানোর মহান দায়িত্ব সবাই এক কথায় মাথায় তুলে নিয়েছিল। লাইব্রেরি থেকে ভাল ভাল দাঁতভাঙা ক্লাসিক এনে দেওয়া হত, ইংরিজি সাহিত্যের সঙ্গে পরিচয় করাতে। বলা বাহুল্য ওগুলো যেমনটি আসত তেমনটিই ফেরত যেত, পাতাটাও উল্টে দেখা হত না। তাই দেব সাহিত্য কুটিরের সুধীন্দ্রনাথ রাহার অনুবাদ পড়েই দুধের স্বাদ ঘোলে মেটাতাম। অবশ্য ইংরিজি বই পড়তে শিখিয়েছিলেন আগাথা ক্রিস্টি, হেডলি চেজ, পি জি উডহাউস, এবং কন্যান ডয়েল।

এরপর মাধ্যমিকের গন্ডি পেরিয়ে হায়ার সেকেন্ডারিতে ভর্তি হলাম কলেজে, দিদিমণিরা সবাই স্নাতকস্তরে পড়িয়ে অভ্যস্ত, ক্লাসে ইংরেজিতেই লেকচার দিয়ে থাকেন। ততদিনে ইংরেজি লেখা পড়াটা মোটামুটি চলনসই ম্যানেজ হয়েছিল, কিন্তু লেকচার শুনে বুঝতে পারা ছিল একটু চাপের। নোটস নিতে অসুবিধা হত খুব, বুঝতেই পারছি না, তো শ্রুতলিপি কি নেব? দিদিমণিরা সমস্যাটা বুঝতেন – বুঝবেন না কেন? কিন্তু পাত্তাই দিতেন না। একই পাঠ বারবার পুনরাবৃত্তি করতেন কিন্তু ইংরেজিতে, বাংলায় নয়।
বেশি দিন নয়, একমাস – তারপর দেখলাম, ভাষা নয়, ক্লাসে আমি বিষয়ের দিকেই নজর দিচ্ছি। মানে ভাষাকে উপেক্ষা করে বিষয়ের ওপর মন দিতে পারছি, কোন ভাষায় পড়ানো হচ্ছে সেটা আর অত জরুরী নয়, কি পড়ানো হচ্ছে সেটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কৃতিত্বটা অবশ্যই তখনকার দিদিমণিদের – যাঁরা জানতেন যে, বিষয়টা যদি আকর্ষণীয় করে পড়ানো যায়, ভাষার মাধ্যমটা গৌণ হয়ে যায়।
এবার জাম্পকাট করে চলে আসি কয়েক দশক পরে।
কলকাতা থেকে বদলি হলাম অন্য রাজ্যে। আমার মেয়ের বয়স তখন ছ’সাত বছর। কলকাতার বেশ ভাল স্কুলে পড়ত, ছাড়িয়ে নিয়ে গেলাম। ওখানে ভর্তি হতে গেলে হিন্দি পরীক্ষায় পাশ করতে হবে। এদিকে ওর তো হিন্দির অক্ষর পরিচয় অবধি নেই। সব স্কুলের আ্যডমিশন টেস্টে হিন্দিতে সাদা খাতা জমা দিয়ে আসে আর ফেল করে। আমি পড়লাম মহা সমস্যায়। শেষ অবধি একদিন একটা স্কুলে যাকে বলে গেট ক্র্যাশ করে মেয়েশুদ্ধু ঢুকে পড়লাম প্রিন্সিপালের চেম্বারে। তখন আমি মরীয়া। প্রিন্সিপাল এক পাঞ্জাবী ভদ্রমহিলা। অসম্ভব ব্যক্তিত্ব সম্পন্না সুদর্শিনী। তিনি নিজে ডক্টরেট। ধৈর্য ধরে আমার কথা শুনলেন। বেল বাজিয়ে একজনকে ডেকে বললেন মেয়ের পরীক্ষা নিতে। আমার মেয়ে যে ক্লাসে ভর্তি হতে চায় তার শেষ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র – অঙ্ক, ইংরেজি ও হিন্দি থেকে কিছু প্রশ্ন বেছে এক ঘন্টার পরীক্ষা। পরীক্ষা শেষে আমাকে বললেন পরের দিন আসতে। পরের দিন দুরুদুর বুকে ওঁর চেম্বারে গেলাম। আমি তো জানি কি হবে! এবারেও পারবে না, বাতিল হবে। যা দেখছি শেষ অবধি কোথাও কোনো বোর্ডিং স্কুলে মেয়েকে রাখতে হবে। মা কে ছেড়ে থাকবে কি করে ঐটুকু মেয়ে? প্রিন্সিপাল ম্যাডাম বেশ গম্ভীরভাবে বলতে শুরু করলেন – “আপনার মেয়ে হিন্দিতে সাদা খাতা জমা দিয়েছে। “আমি দুর্বলভাবে সাফাই গাইতে গেলাম -“ও কলকাতায় তো হিন্দি পড়ে নি।” উনি আমাকে থামিয়ে দিয়ে যা বললেন তার বাংলা করলে দাঁড়ায় – ও হিন্দি জানে না, তাতে অসুবিধা নেই, শিখে যাবে। আমাদের টিচাররা আছেন, তাঁরাই শেখাবেন। সেইজন্যই তাঁরা আছেন। কিন্তু ও অন্যান্য বিষয়ে যথেষ্ট ভাল করেছে, আপনার মেয়ে যদি আমাদের স্কুলে ভর্তি হয় তবে আমরা খুব খুশি হব। “
“ও যেটা জানে না, শিখে যাবে, আমরা শিক্ষিকারা তো সেইজন্যই আছি” – এক শিক্ষকের সেই চিরন্তন অভয়বার্তা-
“ওঁ অজ্ঞান তিমিরান্ধস্য জ্ঞানাঞ্জন শলাকায়াঃ
চক্ষুরুন্মীলিতং যেন তস্মৈ শ্রীগুরবে নমঃ।”
শিক্ষক দিবসের প্রাক্কালে বলি “স্মরণীয় যারা বরণীয় তাঁরা”

********






Add comment