সাহিত্যিকা

ময়দানের মস্তান সুভাষ ভৌমিক

ময়দানের মস্তান সুভাষ ভৌমিক

আমাদের কয়েকজন পাঠক জানিয়েছেন যে সাহিত্যিকা যদিও মূলত সাহিত্য পত্রিকা, তাহলেও বাঙালিদের কিছু আবেগের বিষয়; যেমন ফুটবল, ক্রিকেট, গান, সিনেমা, নাটক, সাহিত্য, এগুলো নিয়ে যদি একটি নিয়মিত বিভাগ চালু করা যায়। আমরা পাঠকের চাহিদাকে সন্মান জানাই। পত্রিকা তো পাঠকদের জন্যই, তাঁদের ভালো লাগাতেই আমাদের প্রকাশনার সার্থকতা। সুতরাং পাঠকের চাহিদা মেনে নিয়ে ফুটবল, ক্রিকেট, গান, সিনেমা, সাহিত্য, ইত্যাদি বিষয়ে প্রাক্তনীদের লেখা যদি না পাই, তহলে অন্য কোনো উৎস (source) থেকে লেখা নিয়ে আমরা এখানে প্রকাশ করবো এবং অবিকৃতভাবে, সুচিপত্রে সেটিই হবে একমাত্র ব্যাতিক্রমী প্রকাশ, যা আমাদের প্রাক্তনীদের কলম থেকে নয়।

আমাদের এই সংখ্যায় নিবেদন, ময়দানের মস্তান “ভোম্বল” সুভাষ ভৌমিক।

********

ময়দানের মস্তান সুভাষ ভৌমিক
ময়দানের মস্তান সুভাষ ভৌমিকের আত্মজীবনী ‘গোল’ পড়ে শেষ করলাম এই তিনদিনে। দুবছর আগে বইমেলায় পুরনো বইয়ের স্টল থেকে পঞ্চাশ টাকায় কিনেছিলাম। পড়তে এতদিন লেগে গেল, কারণ কাগজের বই হাতে ধরে পড়ার অভ্যেসটা হারিয়েই ফেলেছি প্রায়। ইবুক পড়া বেড়েছে অনেক। বেশ কিছু কিনে রাখা বই পড়া হয়ে ওঠেনি, আবার ছোটবেলার মত টেবিল ল্যাম্প জ্বালিয়ে পড়তে বসেছি। মাঠের কথা পড়তে এমনিই ভালো লাগে, গতিশীল গদ্যে প্রথমদিনেই ১১২ পাতা অবধি পড়েছিলাম। আজ শেষ হয়ে গিয়ে একটু ফাঁকা লাগছে।

আমি জানিনা আমার বন্ধুবৃত্তে কজন বইটি পড়েছেন। মাত্র চার বছর আগে মারা যাওয়ার মাসখানেক আগে এই বইয়ের কাজ সম্পন্ন করেছিলেন তিনি। ডায়ালিসিস চলাকালীন ফোন করে একটা চ্যাপ্টার লিখিয়েছিলেন অনুলেখক সুপ্রিয় মুখোপাধ্যায়কে দিয়ে। চেয়েছিলেন, বাইশের বইমেলায় যেন প্রকাশিত হয় তাঁর বইটি। সে বছরের জানুয়ারিতে চলে গেলেন। বই বেরল, কিন্তু হাতে ধরা হল না।

ষাট সত্তরের দশকে বাংলার ফুটবলের দাপট বোঝার জন্য এই বই একটা অন্যতম আকর। পড়তে পড়তে একটু কষ্টই হবে যে মাত্র তিন চার দশক আগেও বাংলার ফুটবল কী অপরিসীম উচ্চতায় পৌঁছেছিল যে ভারতীয় দল ভর্তি থাকত বাঙালিতে। এবং সেই রত্নখচিত ভারতীয় দল একাধিক আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে উজ্জ্বল কৃতিত্বের সাক্ষর রেখেছে। মহম্মদ হাবিব, ইন্দর সিং, তুলসীদাস বলরাম, সমরেশ চৌধুরী, জার্নাল সিং, আমৃত্যু পরম বন্ধু সুকল্যাণ ঘোষদস্তিদার, সুধীর কর্মকার, গৌতম সরকার, প্রদীপ চৌধুরি, শ্যামল ঘোষ, অশোকলাল ব্যানার্জি, স্বপন সেনগুপ্ত, মনোরঞ্জন ভট্টাচার্য, প্রসূন ব্যানার্জি ও আরও কত কত নাম, কী অপূর্ব স্মৃতিচারণ। আত্মজীবনীতে অকপট হতে হয় তাই সুভাষ গোপন করেন নি তাঁর বড় ম্যাচের আগে নারীসঙ্গের কথা, নিজের অমিত মদ্যপানের কথা, সিগারেটে আসক্তির কথা। ক্রিকেট-ফুটবল-টেনিস-হকি চারটে খেলাই সাবলীল দক্ষতায় খেলতে পারা চুনী গোস্বামীকে তিনি যেমন ভারতের শ্রেষ্ঠ অ্যাথলিট মেনেছেন, তেমনই অস্বীকার করেন নি স্টেডিয়ামে চুনীকে তাঁর তাড়া করে মারতে যাওয়ার ঘটনার কথা। এজন্য অনুতাপের কথাও বারবার বলেছেন। চুনী গোস্বামীর শেষ গোল সুভাষ ভৌমিকের পাস থেকেই। পিকে ব্যানার্জি তাঁর চিরকালীন গুরু। অশেষ শ্রদ্ধা, ভালোবাসা তাঁর প্রতি। ১৯৬১ তে কাটিহারে প্রথম পিকে ব্যানার্জিকে দেখেন সুভাষ। হাতে ছিল সদ্য কেনা স্পোর্টস ম্যাগাজিন। কিশোর সুভাষের বাড়িয়ে দেওয়া সেই ম্যাগাজিনে সই দিলেন পিকে, বড় হাতের P, যার নীচের লম্বা দাঁড়ি ধরে বড় হাতের K, তারপর ব্যানার্জি, তার তলায় লিখলেন Captain, 1960 Rome Olympics.. সুভাষের মাথায় আর কিছু রইল না একটাই স্বপ্ন ছাড়া, এঁর মত বড় ফুটবলার হতে হবে। বাড়ি থেকে পালিয়ে এলেন ফুটবলের নেশায়। আবার এই সুভাষই, পিকে তাঁকে কয়েকটা ম্যাচে না নামিয়ে একটা গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে হারতে থাকা পজিশনে নামানোর কথা বলায় সটান গুরুকে বলেছিলেন, বাবাকে বুট পরতে বলুন! পিকে খাপ্পা হয়ে বলেছিলেন বাপের ব্যাটা হলে নেমে গোল করে দেখা। তোর জুতো মুখে নিয়ে ঘুরব। নামার পাঁচ মিনিটের মধ্যে গোল করে কোচকে দেখিয়ে বুট খুলতে শুরু করেছিলেন সুভাষ ভৌমিক।

বেপরোয়া ভাবটা ওঁর রক্তে ছিল। তখন স্কুল টুর্নামেন্টকে অত্যন্ত সিরিয়াসলি নেওয়া হত। বাংলা তথা ভারতকে বহু ভালো খেলোয়াড় দিয়েছে স্কুল টুর্নামেন্ট। বাড়ি থেকে পালিয়ে সটান চেতলা বয়েজের হেডমাস্টারকে বলেছিলেন আমায় ক্লাস টেনে ভর্তি নিয়ে নিন। আমি কিন্তু কোন ফি দিতে পারব না। শৈলেন ব্যানার্জি একটুও না চটে জানতে চেয়েছিলেন, তোমার কী এমন আছে যে তোমায় নিতে হবে? ফুটবল খেলে প্রমাণ দিয়েছিলেন সুভাষ। বিনা মাইনেতে ভর্তি তো হলেনই রোজ সন্ধ্যায় শৈলেনবাবু আলাদা করে টিউশন দিতে শুরু করলেন সুভাষকে, সকালে খেলা থাকে যেহেতু। সেবারের স্কুল টুর্নামেন্টে সেমিফাইনাল ফাইনাল দুটোতেই হ্যাটট্রিক করে বাংলার সেরা ফুটবলার হলেন সুভাষ। পরের দিন স্কুলে এলেন তখনকার বিখ্যাত ক্রীড়া সাংবাদিক চিরঞ্জীব, বড় গাড়িতে করে সুভাষকে আনন্দবাজার দফতরে নিয়ে আসবার জন্য যাঁকে পাঠিয়েছিলেন মতি নন্দী।

জুনিয়র ইন্ডিয়ার হয়ে একটাও ম্যাচ না খেলে সিনিয়র ইন্ডিয়া টিমে খেলা এবং নক্ষত্র হয়ে ওঠার এক বিরল দৃষ্টান্ত সুভাষ ভৌমিক। সত্তর সালে প্রথম এশিয়ান গেমসের বড় ম্যাচ। ব্যাঙ্ককে ম্যাচ। থাইল্যান্ডের সঙ্গেই আবার খেলা। মাঠ থাই সমর্থকে ভর্তি। প্রথম হাফে ইন্ডিয়া ০-২ হারছে। প্রথমার্ধের বিরতিতে উইং কম্যান্ডার অর্জুন সিং ভারতীয় ড্রেসিংরুমে ঢুকে বলে গেছেন জীবনে এত ভীতু ভারতীয় দল দেখিনি। সেকেন্ড হাফে নামার আগে মহম্মদ হাবিব বললেন, মোটু কুছ তো করনা হি হ্যায়। দুটো গোলই শোধ করেন সুভাষ ভৌমিক। হ্যাটট্রিকের সুযোগ মিস না করলে ভারত জিতে মাঠ ছাড়ত। ম্যাচের পর রাজেশ খান্না স্টাইলের গুরু পাঞ্জাবি গায়ে সুভাষ বেরিয়েছেন থাইল্যান্ড ঘুরতে, ইচ্ছে সে সময়ের বিখ্যাত ব্যানলন গেঞ্জি কেনা। নিজের জন্য একটা, আর বন্ধু সুকল্যাণের জন্য আরেকটা। কিন্তু হোটেলে ফিরতেই ভারতের কোচ পিকে চেপে ধরলেন, হাতে কী? গুরুদক্ষিণা দিয়ে যাও নাহলে কিন্তু গোল করা আটকে দেব। বন্ধু সুকুর জন্য কেনা হলুদ ব্যানলনের গেঞ্জি নিজের জিম্মায় নিয়ে ছাড়লেন প্রবাদপ্রতিম প্রদীপ কুমার ব্যানার্জি!

কলকাতা লিগে সর্বোচ্চ গোলদাতাদের তালিকায় প্রথমজন চুনী, দ্বিতীয়জন আবিদ, তৃতীয় সুভাষ ভৌমিক। ইস্টবেঙ্গল মোহনবাগান দুটো দলেই চুটিয়ে খেলা সুভাষের কলকাতা লিগে মোট গোল ১১২, তাঁর গুরু পিকে ব্যানার্জির থেকে ঠিক এক গোল বেশি করেছিলেন সুভাষ। হাইড্রোকর্টিজেন ইঞ্জেকশন দিয়ে হাঁটু নষ্ট হয়ে যাওয়ার পর মোহনবাগান তাঁকে বেতো ঘোড়া বলে তাড়িয়ে দেয়। ইস্টবেঙ্গলে বহু বিরোধিতা সহ্য করেও ছাত্র সুভাষকে মারাত্মক পুনর্জন্ম দিয়েছিলেন পিকে ব্যানার্জি। দুবছর বিয়ার ছোঁবেন না, এই চুক্তি হয়েছিল। দেশের হয়ে তিনটে টুর্নামেন্টে ১৪ গোল সুভাষের। ব্যাঙ্ককে ব্রোঞ্জ, মারডেকায় তৃতীয় এবং ১৯৭১ এর পেস্তা-সুকান ট্রফিতে যুগ্ম চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল ভারত। ইস্টবেঙ্গলে সুভাষ সম্ভবত একজনই, যিনি ফুটবলার ও কোচ দুই চরিত্রেই ক্লাবের হয়ে এক ডজন করে ট্রফি জিতেছেন। এছাড়া কোচ হয়ে ট্রফি দিয়েছেন মোহনবাগান ও চার্চিলকে। এত ঝলমলে উদ্দাম ফুটবল মাঠের সেসব দিন, যতই লিখব যেন তৃপ্তি হবে না। ১৯৭৩ এ পাঁচে পাঁচ করেছিল ইস্টবেঙ্গল, পরপর কলকাতা লিগ আইএফএ শিল্ড রোভার্স কাপ ডিসিএম ট্রফি ও বরদলৈ ট্রফি জিতে। সেটাই সেই বেতো ঘোড়া নামে বাতিল হয়ে মোহনবাগান থেকে ইস্টবেঙ্গলে আসার বছর। ২৪ গোল করে সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়েছিলেন সুভাষই, ভীষণ রাগে সে মরসুমে সব ডার্বিতেই লাল হলুদ জার্সি গায়ে সবুজ মেরুন জালে বল ঢুকিয়েছিলেন। আবার ২০০২-০৩ সালে ইস্টবেঙ্গল পাঁচটা ট্রফি জেতে একই মরসুমে, কোচ আর কে? সেই সুভাষ ভৌমিক!

মোরিনহো, ক্রুয়েফ, পেপ গুয়ার্দিওলা, অ্যালেক্স ফার্গুসনের কোচিংয়ের ভীষণ ভক্ত ছিলেন তিনি। ভারতে প্রকাশিত হওয়ার আগে তাঁদের বই বিদেশ থেকে আনিয়ে পড়তেন। আধুনিক ফুটবলের মনোজ্ঞ ছাত্র ছিলেন সুভাষ, জোর দিতেন শৃঙ্খলা ও ফিটনেসে। ট্রেনিংয়ের পর মাসল রিল্যাক্সেশনের জন্য সাঁতার কাটা তিনিই প্রথম বাধ্যতামূলক করেন। পেপ এবং বিশেষত ফার্গুসনের কথা বারবার সুভাষ বলেছেন তাঁর লেখায়। বলেছেন ইউনাইটেড যেদিন দুর্দান্ত খেলে জিতত, সেদিনও ফার্গুসন ম্যাচের পর শুধু মনে রাখতেন আজ কতগুলো মিসপাস হয়েছে। ভালোর কোন শেষ হয়না এবং ভেসে যাওয়া যে আত্মহত্যার শামিল, তা যদিও খেলোয়াড় জীবনে ইস্টবেঙ্গলের প্রাণপুরুষ জ্যোতিষ গুহর কাছে শিখেছিলেন সুভাষ। ১৯৬৯। প্রথম সিজন। প্রথম ডার্বি। দু গোল দিয়ে ফুরফুরে মেজাজে কুপারেজ মাঠ থেকে বেরনোর সঙ্গে সঙ্গে একটা বিরাশি সিক্কার চড়। ‘সিওর হ্যাটট্রিক মিস। জানো না আজ তুমি কী ফেলে এসেছ মাঠে। আর কোনদিন হবে কিনা কে জানে!’ কথাটা ভুল নয়। ডার্বির ইতিহাসে তারপর প্রথম হ্যাটট্রিক হয়েছিল সেদিনের আঠাশ বছর পরে, বাইচুং ভুটিয়ার পায়ে। পাঁচশো টাকা চেয়েছিলেন জ্যোতিষ গুহর কাছে সুভাষ, তখনকার দিনে। সটান না করে দিয়ে জ্যোতিষ বললেন, কী! দু গোল করে মাথা কিনে নিয়েছ নাকি? গেট আউট! পরের দিন সকালের প্রথম ফ্লাইটে কলকাতা ফিরে গেলেন জ্যোতিষ। মন খারাপ করে বসে আছেন সুভাষ। কর্মকর্তা সিনহাদা এসে বললেন কী রে? সুভাষ বললেন কোলাবায় একটা দোকানে দেখা জার্সির কথা। চল আমার সঙ্গে বলে নিয়ে গিয়ে সেই দোকান থেকে দুটো শার্ট দুটো ট্রাউজার কিনে দিয়ে বললেন, জ্যোতিষদা যাওয়ার আগে টাকা দিয়ে গেছেন, কিন্তু তোর হাতে দিতে বারণ করেছেন। টাকা পেলেই তুই বিয়ার খাবি। সুভাষ উত্তমকুমারের সঙ্গে চ্যালেঞ্জ করে রাত আড়াইটে অবধি মদ্যপান করেছেন একসঙ্গে, সে কথা তখন সবাই জানে। ইস্টবেঙ্গলে ঢোকার প্রথম দিকে ডাক পড়ল যাঁর চোখের দিকে তাকিয়ে পিটার থঙ্গরাজও কথা বলতে পারতেন না, সেই জ্যোতিষ গুহর ঘরে। সুভাষ ঢোকামাত্র বললেন এই ছোকরা তুমি সিগারেট খাও? মিথ্যে বলে লাভ নেই বুঝে সুভাষ বললেন হ্যাঁ। “এইটুকু ছেলে?” বলে সামনের কাঁচের টেবিলে সজোরে থাপ্পড় মারলেন জ্যোতিষ গুহ। ঝনঝন করে কাঁচ ভাঙল। হাত রক্তাক্ত। ভ্রূক্ষেপ নেই সেদিকে তাঁর। নির্দেশ এক্ষুণি ছাড়তে হবে। মাথা নীচু করে সুভাষ বললেন পারব না, বাথরুম হয় না। হতবাক জ্যোতিষ গুহ। “হুম!” কয়েক সেকেন্ড বাদে বললেন, “কী ব্র্যান্ড?”
– ফিল্টার উইল্স।
– ক-টা?
– দিনে দশ-বারোটা।
– না, ফাইভ ফিফটি ফাইভ খাবে। সিগারেটের আসল ক্ষতিকর ওর কাগজটা। প্লেয়ারকে লাংস বাঁচাতে বেস্ট কোয়ালিটি সিগারেট তাই খেতে হবে।
সুভাষ জানতে চাইলেন অত পয়সা কে দেবে? খেঁকিয়ে উঠে জ্যোতিষ গুহ বলেছিলেন কে দেবে আবার আমিই দেব!

ফুটবল মাঠের অসাধারণ বন্ধুত্বের কথা, খেলোয়াড়ি জীবনের মুন্সিয়ানার আশ্চর্য গল্পে ভরা এই বই। এতটা লিখেও কিছুই লেখা হয় নি। রোমন্থনে জেগে থাকবে সেগুলো। চামড়ার একটা গোল বল কত কত আখ্যানের যে জন্ম দিয়েছে বিশ্বজুড়ে, প্রজন্ম জুড়ে! নিজে খুবই বাজে প্লেয়ার ছিলাম, স্কুলে কলেজে অধিকাংশ সময়ই চান্স পাইনি, কিন্তু এই খেলাটার কাছে আমার অশেষ ঋণ।

সুভাষ ভৌমিকের ঝুলিতে আছে দুটো অনন্য নজির। ১৯৭০ সালে মারডেকায় ফিলিপিন্সের বিরুদ্ধে হ্যাটট্রিক করেছিলেন তিনি। প্রথম বাঙালি ফুটবলার যিনি দেশের হয়ে হ্যাটট্রিক করেন। সুভাষ ভৌমিক ভারতের একমাত্র কোচ যাঁর দুটো আলাদা ক্লাবকে কোচিং করিয়ে আই লিগ/জাতীয় লিগ জয়ের রেকর্ড রয়েছে – ইস্টবেঙ্গল ও চার্চিল ব্রাদার্স। আপোসহীন আমৃত্যু মস্তান সুভাষ ভৌমিক চরমতম অসুস্থতাতেও মেয়ের কিনে আনা লাঠি হাতে ধরতে চাননি। বলেছিলেন এটা আমি এখনই ভাঙব।
লাঠি নিয়ে খুঁড়িয়ে চলতে সবাই জন্মায় না। কেউ কেউ জন্মায় পায়ের ফুলকিতে রংমশাল জ্বালাতে, দিগন্তলীন মাঠে স্বাধীন ঘোড়ার মত ছুটে যেতে, ছুটেই যেতে…

ছবিতে বাঁ দিক থেকেঃ সুকল্যান ঘোষ দস্তিদার, ভবানী রায়, সুভাষ ভৌমিক।

সংগৃহীত ও কৃতজ্ঞতা স্বীকার:
ফেসবুক: Hindol Ganguly’s post

Disclaimer:
লেখাটি ফেসবুক থেকে সংগৃহীত, এবং সাহিত্যিকা পত্রিকা এর তথ্য যাচাই করেনি। লেখার বক্তব্য সম্পূর্নভাবে লেখকের।

*********

আমাদের কয়েকজন পাঠক জানিয়েছেন যে সাহিত্যিকা যদিও মূলত সাহিত্য পত্রিকা, তাহলেও বাঙালিদের কিছু আবেগের বিষয়; যেমন ফুটবল, ক্রিকেট, গান, সিনেমা, নাটক, সাহিত্য, এগুলো নিয়ে যদি একটি নিয়মিত বিভাগ চালু করা যায়। আমরা পাঠকের চাহিদাকে সন্মান জানাই। পত্রিকা তো পাঠকদের জন্যই, তাঁদের ভালো লাগাতেই আমাদের প্রকাশনার সার্থকতা। সুতরাং পাঠকের চাহিদা মেনে নিয়ে ফুটবল, ক্রিকেট, গান, সিনেমা, সাহিত্য, ইত্যাদি বিষয়ে প্রাক্তনীদের লেখা যদি না পাই, তহলে অন্য কোনো উৎস (source) থেকে লেখা নিয়ে আমরা এখানে প্রকাশ করবো এবং অবিকৃতভাবে, সুচিপত্রে সেটিই হবে একমাত্র ব্যাতিক্রমী প্রকাশ, যা আমাদের প্রাক্তনীদের কলম থেকে নয়।

আমাদের এই সংখ্যায় নিবেদন, ময়দানের মস্তান “ভোম্বল” সুভাষ ভৌমিক।

********

ময়দানের মস্তান সুভাষ ভৌমিক
ময়দানের মস্তান সুভাষ ভৌমিকের আত্মজীবনী ‘গোল’ পড়ে শেষ করলাম এই তিনদিনে। দুবছর আগে বইমেলায় পুরনো বইয়ের স্টল থেকে পঞ্চাশ টাকায় কিনেছিলাম। পড়তে এতদিন লেগে গেল, কারণ কাগজের বই হাতে ধরে পড়ার অভ্যেসটা হারিয়েই ফেলেছি প্রায়। ইবুক পড়া বেড়েছে অনেক। বেশ কিছু কিনে রাখা বই পড়া হয়ে ওঠেনি, আবার ছোটবেলার মত টেবিল ল্যাম্প জ্বালিয়ে পড়তে বসেছি। মাঠের কথা পড়তে এমনিই ভালো লাগে, গতিশীল গদ্যে প্রথমদিনেই ১১২ পাতা অবধি পড়েছিলাম। আজ শেষ হয়ে গিয়ে একটু ফাঁকা লাগছে।

আমি জানিনা আমার বন্ধুবৃত্তে কজন বইটি পড়েছেন। মাত্র চার বছর আগে মারা যাওয়ার মাসখানেক আগে এই বইয়ের কাজ সম্পন্ন করেছিলেন তিনি। ডায়ালিসিস চলাকালীন ফোন করে একটা চ্যাপ্টার লিখিয়েছিলেন অনুলেখক সুপ্রিয় মুখোপাধ্যায়কে দিয়ে। চেয়েছিলেন, বাইশের বইমেলায় যেন প্রকাশিত হয় তাঁর বইটি। সে বছরের জানুয়ারিতে চলে গেলেন। বই বেরল, কিন্তু হাতে ধরা হল না।

ষাট সত্তরের দশকে বাংলার ফুটবলের দাপট বোঝার জন্য এই বই একটা অন্যতম আকর। পড়তে পড়তে একটু কষ্টই হবে যে মাত্র তিন চার দশক আগেও বাংলার ফুটবল কী অপরিসীম উচ্চতায় পৌঁছেছিল যে ভারতীয় দল ভর্তি থাকত বাঙালিতে। এবং সেই রত্নখচিত ভারতীয় দল একাধিক আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে উজ্জ্বল কৃতিত্বের সাক্ষর রেখেছে। মহম্মদ হাবিব, ইন্দর সিং, তুলসীদাস বলরাম, সমরেশ চৌধুরী, জার্নাল সিং, আমৃত্যু পরম বন্ধু সুকল্যাণ ঘোষদস্তিদার, সুধীর কর্মকার, গৌতম সরকার, প্রদীপ চৌধুরি, শ্যামল ঘোষ, অশোকলাল ব্যানার্জি, স্বপন সেনগুপ্ত, মনোরঞ্জন ভট্টাচার্য, প্রসূন ব্যানার্জি ও আরও কত কত নাম, কী অপূর্ব স্মৃতিচারণ। আত্মজীবনীতে অকপট হতে হয় তাই সুভাষ গোপন করেন নি তাঁর বড় ম্যাচের আগে নারীসঙ্গের কথা, নিজের অমিত মদ্যপানের কথা, সিগারেটে আসক্তির কথা। ক্রিকেট-ফুটবল-টেনিস-হকি চারটে খেলাই সাবলীল দক্ষতায় খেলতে পারা চুনী গোস্বামীকে তিনি যেমন ভারতের শ্রেষ্ঠ অ্যাথলিট মেনেছেন, তেমনই অস্বীকার করেন নি স্টেডিয়ামে চুনীকে তাঁর তাড়া করে মারতে যাওয়ার ঘটনার কথা। এজন্য অনুতাপের কথাও বারবার বলেছেন। চুনী গোস্বামীর শেষ গোল সুভাষ ভৌমিকের পাস থেকেই। পিকে ব্যানার্জি তাঁর চিরকালীন গুরু। অশেষ শ্রদ্ধা, ভালোবাসা তাঁর প্রতি। ১৯৬১ তে কাটিহারে প্রথম পিকে ব্যানার্জিকে দেখেন সুভাষ। হাতে ছিল সদ্য কেনা স্পোর্টস ম্যাগাজিন। কিশোর সুভাষের বাড়িয়ে দেওয়া সেই ম্যাগাজিনে সই দিলেন পিকে, বড় হাতের P, যার নীচের লম্বা দাঁড়ি ধরে বড় হাতের K, তারপর ব্যানার্জি, তার তলায় লিখলেন Captain, 1960 Rome Olympics.. সুভাষের মাথায় আর কিছু রইল না একটাই স্বপ্ন ছাড়া, এঁর মত বড় ফুটবলার হতে হবে। বাড়ি থেকে পালিয়ে এলেন ফুটবলের নেশায়। আবার এই সুভাষই, পিকে তাঁকে কয়েকটা ম্যাচে না নামিয়ে একটা গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে হারতে থাকা পজিশনে নামানোর কথা বলায় সটান গুরুকে বলেছিলেন, বাবাকে বুট পরতে বলুন! পিকে খাপ্পা হয়ে বলেছিলেন বাপের ব্যাটা হলে নেমে গোল করে দেখা। তোর জুতো মুখে নিয়ে ঘুরব। নামার পাঁচ মিনিটের মধ্যে গোল করে কোচকে দেখিয়ে বুট খুলতে শুরু করেছিলেন সুভাষ ভৌমিক।

বেপরোয়া ভাবটা ওঁর রক্তে ছিল। তখন স্কুল টুর্নামেন্টকে অত্যন্ত সিরিয়াসলি নেওয়া হত। বাংলা তথা ভারতকে বহু ভালো খেলোয়াড় দিয়েছে স্কুল টুর্নামেন্ট। বাড়ি থেকে পালিয়ে সটান চেতলা বয়েজের হেডমাস্টারকে বলেছিলেন আমায় ক্লাস টেনে ভর্তি নিয়ে নিন। আমি কিন্তু কোন ফি দিতে পারব না। শৈলেন ব্যানার্জি একটুও না চটে জানতে চেয়েছিলেন, তোমার কী এমন আছে যে তোমায় নিতে হবে? ফুটবল খেলে প্রমাণ দিয়েছিলেন সুভাষ। বিনা মাইনেতে ভর্তি তো হলেনই রোজ সন্ধ্যায় শৈলেনবাবু আলাদা করে টিউশন দিতে শুরু করলেন সুভাষকে, সকালে খেলা থাকে যেহেতু। সেবারের স্কুল টুর্নামেন্টে সেমিফাইনাল ফাইনাল দুটোতেই হ্যাটট্রিক করে বাংলার সেরা ফুটবলার হলেন সুভাষ। পরের দিন স্কুলে এলেন তখনকার বিখ্যাত ক্রীড়া সাংবাদিক চিরঞ্জীব, বড় গাড়িতে করে সুভাষকে আনন্দবাজার দফতরে নিয়ে আসবার জন্য যাঁকে পাঠিয়েছিলেন মতি নন্দী।

জুনিয়র ইন্ডিয়ার হয়ে একটাও ম্যাচ না খেলে সিনিয়র ইন্ডিয়া টিমে খেলা এবং নক্ষত্র হয়ে ওঠার এক বিরল দৃষ্টান্ত সুভাষ ভৌমিক। সত্তর সালে প্রথম এশিয়ান গেমসের বড় ম্যাচ। ব্যাঙ্ককে ম্যাচ। থাইল্যান্ডের সঙ্গেই আবার খেলা। মাঠ থাই সমর্থকে ভর্তি। প্রথম হাফে ইন্ডিয়া ০-২ হারছে। প্রথমার্ধের বিরতিতে উইং কম্যান্ডার অর্জুন সিং ভারতীয় ড্রেসিংরুমে ঢুকে বলে গেছেন জীবনে এত ভীতু ভারতীয় দল দেখিনি। সেকেন্ড হাফে নামার আগে মহম্মদ হাবিব বললেন, মোটু কুছ তো করনা হি হ্যায়। দুটো গোলই শোধ করেন সুভাষ ভৌমিক। হ্যাটট্রিকের সুযোগ মিস না করলে ভারত জিতে মাঠ ছাড়ত। ম্যাচের পর রাজেশ খান্না স্টাইলের গুরু পাঞ্জাবি গায়ে সুভাষ বেরিয়েছেন থাইল্যান্ড ঘুরতে, ইচ্ছে সে সময়ের বিখ্যাত ব্যানলন গেঞ্জি কেনা। নিজের জন্য একটা, আর বন্ধু সুকল্যাণের জন্য আরেকটা। কিন্তু হোটেলে ফিরতেই ভারতের কোচ পিকে চেপে ধরলেন, হাতে কী? গুরুদক্ষিণা দিয়ে যাও নাহলে কিন্তু গোল করা আটকে দেব। বন্ধু সুকুর জন্য কেনা হলুদ ব্যানলনের গেঞ্জি নিজের জিম্মায় নিয়ে ছাড়লেন প্রবাদপ্রতিম প্রদীপ কুমার ব্যানার্জি!

কলকাতা লিগে সর্বোচ্চ গোলদাতাদের তালিকায় প্রথমজন চুনী, দ্বিতীয়জন আবিদ, তৃতীয় সুভাষ ভৌমিক। ইস্টবেঙ্গল মোহনবাগান দুটো দলেই চুটিয়ে খেলা সুভাষের কলকাতা লিগে মোট গোল ১১২, তাঁর গুরু পিকে ব্যানার্জির থেকে ঠিক এক গোল বেশি করেছিলেন সুভাষ। হাইড্রোকর্টিজেন ইঞ্জেকশন দিয়ে হাঁটু নষ্ট হয়ে যাওয়ার পর মোহনবাগান তাঁকে বেতো ঘোড়া বলে তাড়িয়ে দেয়। ইস্টবেঙ্গলে বহু বিরোধিতা সহ্য করেও ছাত্র সুভাষকে মারাত্মক পুনর্জন্ম দিয়েছিলেন পিকে ব্যানার্জি। দুবছর বিয়ার ছোঁবেন না, এই চুক্তি হয়েছিল। দেশের হয়ে তিনটে টুর্নামেন্টে ১৪ গোল সুভাষের। ব্যাঙ্ককে ব্রোঞ্জ, মারডেকায় তৃতীয় এবং ১৯৭১ এর পেস্তা-সুকান ট্রফিতে যুগ্ম চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল ভারত। ইস্টবেঙ্গলে সুভাষ সম্ভবত একজনই, যিনি ফুটবলার ও কোচ দুই চরিত্রেই ক্লাবের হয়ে এক ডজন করে ট্রফি জিতেছেন। এছাড়া কোচ হয়ে ট্রফি দিয়েছেন মোহনবাগান ও চার্চিলকে। এত ঝলমলে উদ্দাম ফুটবল মাঠের সেসব দিন, যতই লিখব যেন তৃপ্তি হবে না। ১৯৭৩ এ পাঁচে পাঁচ করেছিল ইস্টবেঙ্গল, পরপর কলকাতা লিগ আইএফএ শিল্ড রোভার্স কাপ ডিসিএম ট্রফি ও বরদলৈ ট্রফি জিতে। সেটাই সেই বেতো ঘোড়া নামে বাতিল হয়ে মোহনবাগান থেকে ইস্টবেঙ্গলে আসার বছর। ২৪ গোল করে সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়েছিলেন সুভাষই, ভীষণ রাগে সে মরসুমে সব ডার্বিতেই লাল হলুদ জার্সি গায়ে সবুজ মেরুন জালে বল ঢুকিয়েছিলেন। আবার ২০০২-০৩ সালে ইস্টবেঙ্গল পাঁচটা ট্রফি জেতে একই মরসুমে, কোচ আর কে? সেই সুভাষ ভৌমিক!

মোরিনহো, ক্রুয়েফ, পেপ গুয়ার্দিওলা, অ্যালেক্স ফার্গুসনের কোচিংয়ের ভীষণ ভক্ত ছিলেন তিনি। ভারতে প্রকাশিত হওয়ার আগে তাঁদের বই বিদেশ থেকে আনিয়ে পড়তেন। আধুনিক ফুটবলের মনোজ্ঞ ছাত্র ছিলেন সুভাষ, জোর দিতেন শৃঙ্খলা ও ফিটনেসে। ট্রেনিংয়ের পর মাসল রিল্যাক্সেশনের জন্য সাঁতার কাটা তিনিই প্রথম বাধ্যতামূলক করেন। পেপ এবং বিশেষত ফার্গুসনের কথা বারবার সুভাষ বলেছেন তাঁর লেখায়। বলেছেন ইউনাইটেড যেদিন দুর্দান্ত খেলে জিতত, সেদিনও ফার্গুসন ম্যাচের পর শুধু মনে রাখতেন আজ কতগুলো মিসপাস হয়েছে। ভালোর কোন শেষ হয়না এবং ভেসে যাওয়া যে আত্মহত্যার শামিল, তা যদিও খেলোয়াড় জীবনে ইস্টবেঙ্গলের প্রাণপুরুষ জ্যোতিষ গুহর কাছে শিখেছিলেন সুভাষ। ১৯৬৯। প্রথম সিজন। প্রথম ডার্বি। দু গোল দিয়ে ফুরফুরে মেজাজে কুপারেজ মাঠ থেকে বেরনোর সঙ্গে সঙ্গে একটা বিরাশি সিক্কার চড়। ‘সিওর হ্যাটট্রিক মিস। জানো না আজ তুমি কী ফেলে এসেছ মাঠে। আর কোনদিন হবে কিনা কে জানে!’ কথাটা ভুল নয়। ডার্বির ইতিহাসে তারপর প্রথম হ্যাটট্রিক হয়েছিল সেদিনের আঠাশ বছর পরে, বাইচুং ভুটিয়ার পায়ে। পাঁচশো টাকা চেয়েছিলেন জ্যোতিষ গুহর কাছে সুভাষ, তখনকার দিনে। সটান না করে দিয়ে জ্যোতিষ বললেন, কী! দু গোল করে মাথা কিনে নিয়েছ নাকি? গেট আউট! পরের দিন সকালের প্রথম ফ্লাইটে কলকাতা ফিরে গেলেন জ্যোতিষ। মন খারাপ করে বসে আছেন সুভাষ। কর্মকর্তা সিনহাদা এসে বললেন কী রে? সুভাষ বললেন কোলাবায় একটা দোকানে দেখা জার্সির কথা। চল আমার সঙ্গে বলে নিয়ে গিয়ে সেই দোকান থেকে দুটো শার্ট দুটো ট্রাউজার কিনে দিয়ে বললেন, জ্যোতিষদা যাওয়ার আগে টাকা দিয়ে গেছেন, কিন্তু তোর হাতে দিতে বারণ করেছেন। টাকা পেলেই তুই বিয়ার খাবি। সুভাষ উত্তমকুমারের সঙ্গে চ্যালেঞ্জ করে রাত আড়াইটে অবধি মদ্যপান করেছেন একসঙ্গে, সে কথা তখন সবাই জানে। ইস্টবেঙ্গলে ঢোকার প্রথম দিকে ডাক পড়ল যাঁর চোখের দিকে তাকিয়ে পিটার থঙ্গরাজও কথা বলতে পারতেন না, সেই জ্যোতিষ গুহর ঘরে। সুভাষ ঢোকামাত্র বললেন এই ছোকরা তুমি সিগারেট খাও? মিথ্যে বলে লাভ নেই বুঝে সুভাষ বললেন হ্যাঁ। “এইটুকু ছেলে?” বলে সামনের কাঁচের টেবিলে সজোরে থাপ্পড় মারলেন জ্যোতিষ গুহ। ঝনঝন করে কাঁচ ভাঙল। হাত রক্তাক্ত। ভ্রূক্ষেপ নেই সেদিকে তাঁর। নির্দেশ এক্ষুণি ছাড়তে হবে। মাথা নীচু করে সুভাষ বললেন পারব না, বাথরুম হয় না। হতবাক জ্যোতিষ গুহ। “হুম!” কয়েক সেকেন্ড বাদে বললেন, “কী ব্র্যান্ড?”
– ফিল্টার উইল্স।
– ক-টা?
– দিনে দশ-বারোটা।
– না, ফাইভ ফিফটি ফাইভ খাবে। সিগারেটের আসল ক্ষতিকর ওর কাগজটা। প্লেয়ারকে লাংস বাঁচাতে বেস্ট কোয়ালিটি সিগারেট তাই খেতে হবে।
সুভাষ জানতে চাইলেন অত পয়সা কে দেবে? খেঁকিয়ে উঠে জ্যোতিষ গুহ বলেছিলেন কে দেবে আবার আমিই দেব!

ফুটবল মাঠের অসাধারণ বন্ধুত্বের কথা, খেলোয়াড়ি জীবনের মুন্সিয়ানার আশ্চর্য গল্পে ভরা এই বই। এতটা লিখেও কিছুই লেখা হয় নি। রোমন্থনে জেগে থাকবে সেগুলো। চামড়ার একটা গোল বল কত কত আখ্যানের যে জন্ম দিয়েছে বিশ্বজুড়ে, প্রজন্ম জুড়ে! নিজে খুবই বাজে প্লেয়ার ছিলাম, স্কুলে কলেজে অধিকাংশ সময়ই চান্স পাইনি, কিন্তু এই খেলাটার কাছে আমার অশেষ ঋণ।

সুভাষ ভৌমিকের ঝুলিতে আছে দুটো অনন্য নজির। ১৯৭০ সালে মারডেকায় ফিলিপিন্সের বিরুদ্ধে হ্যাটট্রিক করেছিলেন তিনি। প্রথম বাঙালি ফুটবলার যিনি দেশের হয়ে হ্যাটট্রিক করেন। সুভাষ ভৌমিক ভারতের একমাত্র কোচ যাঁর দুটো আলাদা ক্লাবকে কোচিং করিয়ে আই লিগ/জাতীয় লিগ জয়ের রেকর্ড রয়েছে – ইস্টবেঙ্গল ও চার্চিল ব্রাদার্স। আপোসহীন আমৃত্যু মস্তান সুভাষ ভৌমিক চরমতম অসুস্থতাতেও মেয়ের কিনে আনা লাঠি হাতে ধরতে চাননি। বলেছিলেন এটা আমি এখনই ভাঙব।
লাঠি নিয়ে খুঁড়িয়ে চলতে সবাই জন্মায় না। কেউ কেউ জন্মায় পায়ের ফুলকিতে রংমশাল জ্বালাতে, দিগন্তলীন মাঠে স্বাধীন ঘোড়ার মত ছুটে যেতে, ছুটেই যেতে…

 

ছবিতে বাঁ দিক থেকেঃ সুকল্যান ঘোষ দস্তিদার, ভবানী রায়, সুভাষ ভৌমিক।

সংগৃহীত ও কৃতজ্ঞতা স্বীকার:
ফেসবুক: Hindol Ganguly’s post

Disclaimer:
লেখাটি ফেসবুক থেকে সংগৃহীত, এবং সাহিত্যিকা পত্রিকা এর তথ্য যাচাই করেনি। লেখার বক্তব্য সম্পূর্নভাবে লেখকের।

*********

 

Sahityika Admin

Add comment