সাহিত্যিকা

সত্যজিতের সঙ্গীত (দ্বিতীয় পর্ব)

সত্যজিতের সঙ্গীত (দ্বিতীয় পর্ব)
© সুকান্ত রায়, ১৯৭৭ ইলেকট্রনিকস ও টেলি কমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং

আগের পর্বের লিংক
https://sahityika.in/2026/04/28/%e0%a6%b8%e0%a6%a4%e0%a7%8d%e0%a6%af%e0%a6%9c%e0%a6%bf%e0%a6%a4%e0%a7%87%e0%a6%b0-%e0%a6%b8%e0%a6%99%e0%a7%8d%e0%a6%97%e0%a7%80%e0%a6%a4/

পাশ্চাত‍্য সঙ্গীতের এনসেম্বলগুলি সত‍্যজিতকে এতোটাই প্রভাবিত করেছিল যে পরবর্তীকালে তার অনেক সিনেমাতেই এর প্রয়োগ আমরা দেখতে পাই। অরণ‍্যের দিনরাত্রি ছবিতে জঙ্গলের মধ‍্যে অসীম, সঞ্জয়, হরি, শেখর, অপর্ণা আর জয়া যখন গোল হয়ে বসে মেমরি গেম খেলার সময় (বিখ‍্যাত লোকেদের নামগুলি নিয়ে), শুরুতে একদল লোক হাঁটতে হাঁটতে ঢাকের যে সুরটি বাজায় সেটি আসলে একটি এনসেম্বল থেকে নেওয়া, ড্রামের বদলে ঢাক দিয়ে বাজানো গ্রামীন পটভূমি বোঝানোর জন‍্য। সেই ছোট্ট সুরটি আমার কাছে একটি দারুণ অ‍্যান্টি ক্লাইম‍্যাক্স, একটা মজার এবং আপাতদৃষ্টিতে সোজা খেলাকে সিরিয়াস ও কঠিন করে দেওয়ার ভূমিকা।

আমার দেখা সত‍্যজিতের চরিত্র নির্ভর ছবিগুলির মধ‍্যে অরণ‍্যের দিনরাত্রি একটি। এই সিনেমাটিতে ছ’টি চরিত্রের বিভিন্ন পরিস্থিতিতে তাদের মুখের অভিব্যক্তি (হতাশা, রাগ, ভালোবাসা, আবেগ, দুঃখ ইত্যাদি) বোঝানোর জন‍্য এমনকি তাদের পারস্পরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও সত‍্যজিত যেভাবে মোৎজার্টের কম্পোজিশন থেকে টুকরো টুকরো মোটিফের ব‍্যাবহার করছেন, তা একমাত্র সত‍্যজিতের পক্ষেই সম্ভব। এখানে কিন্তু তিনি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের ব‍্যাবহার করেননি কারণ চরিত্রগুলো শহুরে। অথচ দুলির বেলায় সম্পূর্ণ ভিন্ন সুর ও বাদ‍্যযন্ত্রের প্রয়োগ, কিন্তু সেকথা পরে।

সত‍্যজিতের ছবি তৈরির আগে বাঙলা এবং ভারতীয় সিনেমার সঙ্গীত (ব‍্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক) ছিল একটি ধাঁচে গড়া। ভারতীয় চলচ্চিত্রে তখনও ছিলেন এবং এখনও এমন অনেক সঙ্গীত পরিচালক আছেন যাঁরা সর্বদাই কতকগুলি গতে বাঁধা নীতি মেনে চটজলদি কাজ সারতে চান। মিলন দৃশ‍্যে হ‍্যপি মিউজিক, বিয়োগ দৃশ‍্যে স‍্যাড মিউজিক, উৎকণ্ঠার দৃশ‍্যে সাসপেন্স মিউজিক আর নাটকীয় দৃশ‍্যে ক্র্যাশ, এই বাঁধা ফর্মূলা তখনও ছিল, এখনও আছে। অনেক নামী পরিচালক সঙ্গীতের ব‍্যাপারে ততটা সড়গড় নন। সুতরাং তাঁরা ওই বিষয়টিকে নিজের ঘাড়ে রাখতে না চেয়ে একজন সঙ্গীত পরিচালক ঠিক করে দিয়েই খালাস।

এ প্রসঙ্গে সত‍্যজিতের তিনটে সিনেমার কথা আমার মনে আসছে – পথের পাঁচালী, কাঞ্চনজঙ্ঘা আর মহানগর। পথের পাঁচালীতে দূর্গার মৃত‍্যুতে সর্বজয়ার কান্নায় ভেঙে পড়ার দৃশ‍্যটি মনে করি। একটি দৃশ‍্যে হরিহর শহর থেকে বাড়ি ফিরছে। সে দূর্গার মৃত‍্যুর খবর জানেনা। দূর্গার জন্য শাড়ি এনে হরিহর সর্বজয়াকে সেটা দেয়। সেই দৃশ্যে সর্বজয়ার মুখ ফিরিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়া ও কান্নার আওয়াজ বদলে শানাইয়ের মূর্ছনার প্রয়োগ। যদিও সিনেমাটির সঙ্গীত পরিচালক রবিশংকর, এই দৃশ‍্যটির সংগীতের কল্পনা কিন্তু সত‍্যজিতের, আর এই বদলানোটা হয়েছিল কান্নার আওয়াজ মিউট করে সেখানে রাগ পটদীপের ভিত্তিতে এস্রাজ জাতীয় ওই যন্ত্রটির আওয়াজ ওভারল‍্য‍াপে। ওই সুরের মাধ‍্যমে দূর্গার মৃত‍্যুতে সর্বজয়ার তীব্র শোক, অসহ‍্য বেদনা, একমাত্র মেয়ে হারানোর প্রচণ্ড মানসিক যন্ত্রণা সত‍্যজিত অনন‍্য ভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন।

আমার এক বন্ধু হিমাংশুর কথায়, দূর্গার মৃত্যুর খবরের দৃশ্যে সর্বজয়ার কান্নার সময়ে যে আবহ বেজেছিল সেটা তারসানাই। বস্তুটির নাম সে আগেও শোনেনি, পরেও না। কোনো ধারণা ছিল না। তবে সেতার নয়। এবং সেই লেখাতেই ছিলো তারসানাই এর পছন্দ সত্যজিৎ এর এবং রবিশংকরের সম্মতিতে। ওটা নাকি দ্রুত অক্টাভে উঠে যায়, তীব্র অনুভূতি আনে… ইত্যাদি। আমার শুধু আওয়াজটা মনে ছিল। ওর কথায় এবার আমি গুগল করে জানলাম যে সেটি এস্রাজ জাতীয় এক বাদ‍্যযন্ত্র (string instrument) নাম তার শানাই।

এরপর কাঞ্চনজঙ্ঘা সিনেমায় পাশ্চাত্যমনস্ক রায়বাহাদুর ইন্দ্রনাথ রায়ের চরিত্রের মনস্তত্ত্ব যে সঙ্গীতের সঙ্গে অভ‍্যস্ত, তার সঙ্গে পাহাড়িয়া সুরে এক অসাধারণ আবহ রচনা করেছিলেন সত‍্যজিত। আর মহানগর সিনেমায় মধ‍্যবিত্ত ঘরের এক গৃহবধূর হঠাৎ শহরের পথে চাকরি করতে বেরোনোর গল্প। শহরের পরিবেশ, সিনেমার প্রধান নারীচরিত্রের মানসিক দ্বন্দ্ব, এসবের কথা ভেবেই বেথোভেনের একটি কম্পোজিশনের সামান‍্য ভাঙাচোরা করে ছোটোখোটো পরিমিত সুরের ব‍্যাবহার সত‍্যজিত করেছিলেন। এখানে লক্ষনীয় শহরের পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর জন‍্য তিনি বেথোভেন (পাশ্চাত্য সঙ্গীত) কে বেছে নিয়েছিলেন, শাস্ত্রীয় সঙ্গীত, বাউল, ভাটিয়ালী, রবীন্দ্রসঙ্গীত বা কোনো লোকগীতিকে নয়।

ক‍্যামারে চাকুরিরত অবস্থায়, সিনেমা তৈরির অনেক আগে, ‘ভারতীয় সিনেমার সঙ্গীত’ নামক একটি ইংরেজি প্রবন্ধে তরুণ সত‍্যজিত লিখেছিলেন যে তিনি এই প্রচলিত সঙ্গীতের ঘোরতর বিরোধী কারন এর সঙ্গে সিনেমার কাহিনী, দৃশ‍্যপট বা চরিত্রের কোনো মিল আছে বলে তাঁর মনে হয়নি। তিনি মনে করতেন সঙ্গীত সিনেমার পরিপূরক, একটি বাদ দিয়ে অন‍্যটি কল্পনা করা অসম্ভব কাজেই সঙ্গীতের সঙ্গে সিনেমার মিল থাকা উচিত। কাহিনী, দৃশ‍্যপট, চরিত্র ইত্যাদিদের সঙ্গীতের মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা উচিত। এরা চলবে এক ধারায় আর গান-বাজনা সম্পূর্ণ অন‍্যদিকে নিজের ইচ্ছামতো, সেটা কানে লাগে। এতোই সূক্ষ্ম ছিল তার অনুভূতি যে বিরহের বা দুঃখের দৃশ‍্যে সরোদের ব‍্যাবহার তাঁর কানে লাগতো। এই নিয়ে প্রথ‍্যাত সরোদবাদক ওস্তাদ আলী আকবর খানের সঙ্গে তার মতবিরোধও হয়েছিল, কিন্তু আদ‍্যন্ত ভদ্রলোক সত‍্যজিত সেই বিরোধে না গিয়ে চুপচাপ নিজের মনে কাজ করে গেছেন।

বাংলা এবং ভারতীয় সিনেমায় সঙ্গীতের এই বাঁধা গতটি ভেঙে সত‍্যজিতই প্রথম তাঁর সিনেমায় নিয়ে আসেন থিম মিউজিক বা আবহসঙ্গীত। সত‍্যজিত মনে করতেন দৃশ‍্য বা শটের গভীরতা দর্শকদের কাছে পৌঁছে দিতে গেলে আবহসঙ্গীতের প্রয়োজন গুরুত্বপুর্ন। আবহ যোগ না করলে দর্শকের সেই বিশেষ দৃশ‍্যটির অন্তর্নিহিত অর্থ বুঝতে অসুবিধা হয়। এ ব‍্যাপারে সত‍্যজিত সিনেমার সঙ্গে গানের গভীর মিলের কথা একাধিক সাক্ষাৎকারে ও প্রবন্ধে বারবার বলেছেন।

সত‍্যজিত বলতেন একটা বই টানা কিছুক্ষন পরপর পড়া যায়, এক নিঃশ্বাসে পড়ে ফেলা যায়, আবার একটু একটু করে বা বাদ দিয়েও পড়া যায়। অর্থাৎ পড়ার সময়ের দৈর্ঘ নির্ভর করছে পাঠকের ওপর। একটা পেইন্টিং দেখতে হলে সেটা খুব একটা সময়সাপেক্ষ নয়। কিন্তু একটা সিনেমা দেখতে গেলে ঘন্টা দু’তিন টানা সময় দর্শককে দিতে হবে। গানের অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রেও সেই একই কথা। এই দৈর্ঘ্যের তুলনা তিনি দিয়েছিলেন সিনেমার ও গান-বাজনার নাটকীয় ক্রমবিকাশের সঙ্গে মিল বোঝাবার জন‍্য। এজন্যই হয়তো সত‍্যজিত মনে করতেন যে সিনেমা দেখার সময়সীমার মধ্যে তার অন্তর্নিহিত সঙ্গীতের ছন্দকে ধরতে পারা এক দেখায় সম্ভব নয়। সিনেমাটি ভালো লাগলে, বারবার সেটি দেখলে তবেই তার অন্তর্নিহীত সাঙ্গীতিক ছন্দটি দর্শকদের কাছে ফুটে ওঠে।

এ বিষয়ে সত‍্যজিতের নিজের বক্তব্য “আসলে এই সঙ্গীতের ছন্দ বিষয়ের ওপরই নিহিত থাকে। তাই ফিল্মের বিষয় নির্বাচনের সঙ্গে সঙ্গে ফিল্মের সামগ্রিক সাঙ্গীতিক কাঠামোর একটা আভাস মনের মধ‍্যে হতে থাকে। আর সেই অস্পষ্ট আভাসের কাঠামোর ভেতরেই গল্পটা তৈরি হতে থাকে। আবার গল্পের এই তৈরি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই সাঙ্গীতিক কাঠামোটাও খানিকটা স্পষ্ট চেহারা নেয়। গল্পের শুরু, উত্থান, পতন, গতি, সেই সাঙ্গীতিক কাঠামোর সঙ্গতিতে প্রাসঙ্গিক হয়।”

(c) জ্ঞানের গন্ধর্ব

*******

Sahityika Admin

2 comments

  • দাদা, খুব ভাল হচ্ছে!!
    সত্যজিতের সিনেমায় বেশ কিছু “হটকে” জিনিস দেখতে পাই… রবিশংকর, কিশোরকুমার বা রেবা মুহূরী কে ব্যবহার করা থেকে গুগাবাবা তে ভুতের নাচের আবহসঙ্গীত বা ফেলুদা থীম মিউজিক বা জয় বাবা ফেলুনাথ এ বিখ্যাত ছোরা ছোঁড়ার ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক – অনন্য!!
    এসব পরের পর্বে পড়তে চাই!!

  • একটা ভালো লেখা পড়লাম।
    লেখকের উদ্যোগকে সাধুবাদ জানাই।