পচাদা ও শুন্যর হিসেব
© ময়ূখ দত্ত, ১৯৯০ সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং
পচাদা গত ২৯ বছর ধরে কেরানীর চাকরীতেই বেশ খুশী, টাকা-পয়সা নিয়েও বিন্দাস!! বৌদিরও খুব একটা অভাব অনুযোগ ছিল না, দুজনের মফস্বলের সাধারন জীবনযাপনই ছিল বেশ সুখের … রূপছায়া হলে ব্যালকনীতে বসে মাসে একটা করে সিনেমা, সাথে পাড়ার অশোকা রেস্ট্যুরেন্টে মোগলাই খাওয়া, ঘরে ডাল-ভাত-কাটাপোনা, রবিবারে মাংস এসব নিয়েই শান্তিতে দিন কাটছিল দুজনের…
কিন্তু এত বছর বাদে কয়েকসপ্তাহ আগে হঠাৎই বৌদির ইচ্ছে হলো নিজের জীবনে কিছু নতুন ধারার বৈচিত্রের প্রয়োজন। এক সন্ধ্যেবেলায় পচাদা অফিস থেকে ফিরে চা খাচ্ছে, এমন সময় বৌদি জানালো: “হ্যাঁ গো, আমাদের পাড়াতে জানো একটা কিটি পার্টি ক্লাব চালু হচ্ছে!! রমা বৌদি আমাকে খুব করে ধরেছে ঐ ক্লাবে মেম্বার হওয়ার জন্য।”
শুনেই পচাদা প্রায় লাফিয়ে ওঠে। চায়ের কাপ হাত থেকে পড়ে যায় আরকি।
– আরে? না না, কিটি পার্টি ফার্টি একদম নয়, সেসব তো বড়োলোকেদের বৌদের ব্যাপার।
– কি যে বলো!! রমা বৌদিরা কি আর এমন বড়োলোক? দাদা তো সাধারন চাকরী করে!!”
– কিন্তু ওর ওনেক উপরি থাকে …
তবে পচাদা বউকে অনেক ফ্রিডম দেয়। জানালো, “ঠিক আছে, আমি তো কোনোদিন তোমার কোনো ইচ্ছেতে বাধা দিই না। তোমার সারাদিনের কাজ সামলে ম্যানেজ করতে পারলে কিটি পার্টির মেম্বার হয়ে যেও…
(গদগদ মুখে) “তুমি কি ভাল…”
সেই রাতেই পচাদা দেখল রুটি আর আলু-ফুলকপির তরকারির সাথে পাতে এক্সট্রা দুটো সাদা ফুটফুটে রসগোল্লা!!
কিছুদিন আগেই বৌদি কিটি পার্টিতে জয়েন করেছে। আর পচাদা খেয়াল করেছে যা কাকতলীয়ভাবে কেমন যেন মাছের ঝোলে নুন কম-বেশী হচ্ছে, যা আগে কোনোদিন হত না (এখানে জানিয়ে রাখি যে ভালো রান্না জানেন বলে পাড়ায় অনেক সুনামের তিনি অধিকারিণী।) পচাদা খেয়াল করেছে, দিন দুই আগে স্টোর রুম থেকে কোনাভাঙা একটা পুরোনো ফুলদানী টেবিলের ওপরে চলে এসেছে। টিভিতে দজ্জাল শাশুড়ি-দজ্জাল ননদ আর পাষাণপ্রতিমা বৌ, আর দেওর আর তিন-চারবার বিয়ে হওয়া নায়িকার সিরিয়াল ছেড়ে মোবাইলে এখন বিভিন্ন রীল দেখা, ইন্সটা লাইভ দেখা খুব বেড়ে গেছে। পচাদা একদিন অবাক যে এক মহিলা বাড়িতে ঝাঁট দেওয়ারও লাইভ করছে- কিভাবে সুন্দর করে ঝাঁট দিতে হয়!! পচাদা বেশী কিছু জিজ্ঞাসা করতে ভয় পায় – কে জানে এটা আবার “সচ ভারত” প্রকল্পের আওতায় পড়ে কিনা কে জানে!!
এসবের সাথে সাথে যাবতীয় সেলিব্রিটি সংক্রান্ত খবরাখবর নিয়ে পচাদার বাড়ি এখন সদাই আপডেটেড ও সরগরম। বৌদি এখন সকালে গুড মর্নিং বলে, অফিসে যাওয়ার সময় ফ্লাইং কিস দেয় (বৌদি গালে সোজা চুমু দিতে পারে না, কেমন যেন লজ্জা করে)
সারাদিন অফিস করে ক্লান্ত হয়ে সোফাতে গা ছেড়ে দিতে দিতে পচাদাকে বিরস বদনে প্রতিদিনই কিছু কিছু শুনতে হয়…অদ্ভুত অদ্ভুত সব প্রশ্ন বৌদির…
“হ্যাঁ, গো, প্রচুর রীলে দেখি যে আজ দীপিকা রোমে বেড়াতে যাচ্ছে, কাল করিনা কাপুর মালদ্বীপে যাচ্ছে, কি আজেবাজে সব জামা-কাপড় পরে এরা, ঢোলা-ঢাপকান, পায়ে হাওয়াই চটি… কেন গো? এদের তো প্রচুর পয়সা!!”
– আরে ধুর, তুমি আর মানুষ হলে না!! এসব “এয়ারপোর্ট লুক”, ফ্লাইটে, অতক্ষনের জার্নি, হালকা, ঢোলা জামাকাপড়ে কম্ফর্টেবল লাগে তাই… আর পায়ে ওটা আমাদের নীল-সাদা হাওয়াই চপ্পল নয়!! ওটাকে ‘ফ্লিপফ্লপ’ বলে… এখন তো ক্রকস বলে একটা কোম্পানীর জুতোও খুব চলছে, দাম প্রায় ৫০০০-৭০০০ টাকা!!
বউদি অবাক। “কি যে বলো!! হাওয়াই চটির দাম ৭০০০ টাকা!! আর “এয়ারপোর্ট লুক” আবার কি? সুষমাবৌদির ছেলে – ওমানে চাকরী করে, বছর বছর বাড়ি আসে স্যুট, টাই, কোট পরে…ও তো ফ্লাইটেই আসে!!!!”
– কোথায় সিনেমা স্টার, আর কোথায় গাল্ফে চাকরী করা সুষমাবৌদির মিস্ত্রি ছেলে!! তুমি পারোও বটে…
“আচ্ছা, আচ্ছা। তাহলে আমরাও এবারে এরকম ড্রেস কিনব? আমরাও তো বেড়াতে যাওয়ার প্ল্যান করছি পুজোতে…”
– দীঘা-পুরী-মন্দারমণি বেড়াতে ওই ‘এয়ারপোর্ট লুক’ লাগবে কেন? আমরা তো ট্রেনে যাব, ঝালমুড়ি খেতে খেতে…
“(এবার একটু দমে গিয়ে) আচ্ছা, ‘ট্রেন লুক’ বা ‘বাস লুক’ বলে কিছু হয় না?
পচাদা বুঝতেই পারল না এটা বৌদি খোঁটা দিল কিনা …তাই কোনো উত্তর না দিয়ে স্নানে চলে গেল…
আর একদিন…
“হ্যাঁ গো, সব সিনেমাস্টাররা এয়ারপোর্টে ছবি তোলে, সাথে কোনো মালপত্র দেখি না কেন? সবাই কি সুন্দর খালি হাতে… অথচ আমরা কোথাও বেড়াতে গেলে তো কত মালপত্র / স্যুটকেস থাকে … ট্রলি, কাঁধে ঝোলানো ব্যাগ, হাতব্যাগ, সামলাতেই হিমসিম খেতে হয়!! তার মধ্যে তুমি আবার ১৫ মিনিট বাদে বাদে লাগেজ গুনতে থাকো…”
পচাদা বোঝালো, “ওদের অনেক পয়সা, কুলিরাই ওদের মালপত্র বয়ে দেয়”
“সিনেমাতে তো ঝাঁ চকচকে এয়ারপোর্ট দেখি!! লাল-নীল জামা পরা কুলি কোনোদিন দেখি নি তো!!”
“আরে তুমি তো দেখছি কিস্যুই জানো না!! কিসের কিটি পার্টি করো তোমরা? কিসের এত হাজার হাজার রীল দ্যাখো? এয়ারপোর্টের কুলিরাও আমাদের মতই জামা-প্যান্ট পরা কুলি হয়, কেউ কেউ আবার টাইও পরে থাকে!! চিনতে পারবে না!!”
আর একদিন বাড়ি ফিরতেই হঠাৎ জিজ্ঞাসা:
“আচ্ছা, রাম্বানীর কত রোজগার গো?”
পচাদা বহূ বছর ধরে চেষ্টা করে যাচ্ছে, বৌদিকে ইনভেস্টমেন্ট শেখাতে, টাকা কি করে বাড়ে সেসব শেখাতে, ৭২ এর রুল শেখাতে… এত বছরের চেষ্টাতে বৌদি শুধু শিখেছে ব্যাংকের এটিম থেকে কিভাবে টাকা তুলতে হয়, ব্যাস এইটুকুই!!
এহেন বৌ এর মুখে রাম্বানীর নাম শুনে বা তার কত রোজগার এসব প্রশ্ন শুনে পচাদা কেমন যেন অবাক চোখে তাকিয়ে রইল কয়েক সেকেন্ড!!
“তা, হঠাৎ এই প্রশ্ন?
“আহা, বলই না!!”
“আদার ব্যাপারী আমি, জাহাজের খবর নিয়ে কি করব?”
বৌদি খুব একটা খুশি হলো না।
“এইজন্যই আমাদের কিছু হয় না!! সীমার স্বামী বলেছে আগের সপ্তাহে রাম্বানীর পকেট থেকে নাকি কয়েকটা ৫০০ টাকার বান্ডিল পড়ে গিয়েছিল!! রাম্বানী নাকি ফিরেও দেখেন নি”
“সে আবার কি? আমি তো যতদূর জানি উনি হিসেবী গুজরাটি, অনেক কষ্ট করে তিল তিল করে বাবার ব্যবসাকে কতদূর নিয়ে গেছেন …টাকা পয়সাকে যথেষ্ট সম্মান করেন, উনি একরম বেহিসেবী হবেন? নিশ্চই এসব সোস্যাল মিডিয়ার গল্পগাছা!!
“আরে সেই জন্যই তো!! সীমা বলল যে ওনার এক সেকেন্ডের আয় নাকি কয়েক লক্ষ টাকা, তাই নীচু হয়ে টাকার বান্ডিল ওঠাতে ওনার যে সময় লাগবে সেই সময়ে নাকি উনি ১০০ গুণ রোজগার করে ফেলতে পারেন!! তাই ঝুঁকে পড়ে ৫০০ টাকার বান্ডিল ওঠাতে উনি রাজী নন!! এসব সত্যি?
এই সব ক্যাপিট্যালিস্ট আলোচনা পচাদার দু’চোখের বিষ!!
(একটু ঝঁঝিয়ে উঠে) “তুমিই শেখো এসব শুনে!! বাড়িতে প্রায়ই দেখি পকেট থেকে টাকা মাটিতে পড়া অবধিও কেউ অপেক্ষা করো না, পকেটে ভুল করে কোনোদিন টাকা থেকে গেলে সেসব হাওয়া হয়ে নিমেষের মধ্যে কোথায় যেন মিলিয়ে যায়।“
জবাব এলো হিমশীতল গলায়। “হ্যাঁ, তারপর তুমি দু ঘন্টা ধরে আমাকে জেরা করতে থাকো – কোথায় গেল ১০০ টাকার নোটটা!! রম্বানী হলে সেই ১২০ মিনিটে তুমি কত কোটি টাকা আয় করতে পারতে চিন্তা করেছ? সবই আমার কপাল!!”
পচাদা হঠাৎ করে কেমন যেন চুপসে গিয়ে ১২০ মিনিট × ৬০ সেকেন্ড × ১ লাখ টাকা হিসেব করতে গিয়ে শুন্যর অংকতে জেরবার হয়ে আর্যভট্টকে গালাগালি দিতে দিতে শেষে বাজারের ব্যাগ হাতে বাটা মাছ কিনতে চলে গেল।
-ময়ূখ/ ডিসেম্বর’২৫

Illustration: Gemini AI






Add comment