দুটি গল্প, “যদি এমন হতো?”
© শান্তনু দে, ১৯৮৯ মেটালার্জিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং
কবিগুরু ও শার্লক
কয়েকদিন আগে কলেজের সিনিয়র, বড়ভাইপ্রতিম অসীম দেব’দা কলেজের সাহিত্য পত্রিকা ‘সাহিত্যিকা’র জন্য লেখা চাইলেন। অর্ডারি লেখা—তাও কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের ওপর লিখতে হবে। শুনেই তো আমার, যাকে বলে, আত্মারাম খাঁচা ছাড়া। তবে দাদা খুবই ভালো; আমার সমস্যা বোঝেন, তাই আমি কিছু বলার আগেই রিলিফও দিয়ে দিলেন—
“আরে, সিরিয়াস লেখা তোকে দিয়ে যে হবে না, সে আমি জানি। ফেসবুকে তুই যেমন নিয়ম করে আলতু-ফালতু লিখিস—যা প্রায় কেউই পড়ে না, বা অনেকে (বা হয়তো সবাই) না পড়েই লাইক বা কমেন্ট করে দেয় (কারণ ওদের পোস্টও তুই না পড়েই লাইক বা কমেন্ট করিস)—সেরকমই কিছু একটা লিখে দিস। পত্রিকার পাতা তো ভরাতে হবে।”
শুনে খুব ভরসা পেলাম।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে আমার সম্পর্ক বেশ ব্যথা দিয়েই শুরু—অন্যদের সহজপাঠ দিয়ে শুরু হয়। সত্তরের প্রথম দিকে বিয়েতে এই মোটা একটা ‘সঞ্চয়িতা’ উপহার দেওয়ার চল ছিল। মনে আছে, এমনই এক বিয়েবাড়ি যাওয়ার সময় বইয়ের দোকানে ‘সঞ্চয়িতা’ কেনার সময় “আমাকে দাও, আমাকে দাও” বলে কাড়াকাড়ি করতে গিয়ে নিজের পায়ে ফেলে দিয়েছিলাম। সেই ব্যথা অনেকদিন ছিল। তাছাড়া ঠাকুর মাটিতে পড়ে যাওয়ায় পিঠেও দু-চার ঘা পড়েছিল—হালকা মনে পড়ে। তাই ওঁর ছোটগল্প, গান, এমনকি প্রবন্ধ ভালো লাগলেও, পড়তে পড়তে পায়ের পাতাটা মাঝে মাঝেই চিনচিন করে।
ধরুন, কেউ গাইছে—“আমি চিনি গো চিনি গো তোমারে, ওগো বিদেশিনী”—আমার বুকে নয়, পায়ের পাতায় কেমন একটা চিনচিনে ব্যথা শুরু হয়। এমনকি ওঁনাকে আমি স্বপ্নেও দেখি। এই যেমন সেদিন দেখলাম—এরকমই কোনো মে মাসের দুপুর। শান্তিনিকেতনে লু বইছে। গুরুদেব জোব্বা খুলে রেখে, স্নান করে ভিজে গামছা পরে, মেঝেতে একটা ভিজে গামছা পেতে শুয়ে শুয়ে The Return of Sherlock Holmes পড়ছেন। এই জায়গাটায় এসে চোখটা ঘুমে একটু ঢুলে এলো ওঁর—
“There were no footmarks.”
“Meaning that you saw none?”
“I assure you, sir, that there were none.”
“My good Hopkins, I have investigated many crimes, but I have never yet seen one which was committed by a flying creature. As long as the criminal remains upon two legs, so long must there be some indentation, some abrasion some trifling displacement which can be detected by the scientific searcher.”

বই বন্ধ করে গুরুদেব একটু ঘুমিয়েই নিলেন। মারাত্মক রকমের দুঃস্বপ্নও দেখলেন। দেখলেন, ওঁনার সাধের নোবেল চুরি গেছে। লন্ডনে শার্লক হোমসকে খবর দেওয়া হয়েছে। হোমস তৎক্ষণাৎ ফ্লাইটে চেপে কলকাতায় এলেন, সেখান থেকে শান্তিনিকেতন। এসেই তো খুব রাগারাগি শুরু করলেন—“ফুটপ্রিন্ট নেই কেন? ফুটপ্রিন্ট না থাকলে কীভাবে অপরাধীকে ধরা যাবে?”
গুরুদেব কাঁচুমাচু মুখে বললেন, “এ কি তোমাদের লন্ডন? সারা বছর বৃষ্টি নয়, তুষারপাত হবে! এই গরমে মাটি ফেটে যাচ্ছে—ফুটপ্রিন্ট আসবে কীভাবে!”

তারপরেই ওঁর ঘুম ভেঙে গেল। ঘুম থেকে উঠেই ভবিষ্যৎ শার্লকদের জন্য লিখে রাখলেন এই সমস্যা ও তার সমাধান:
“যখন পড়বে না মোর পায়ের চিহ্ন এই বাটে”
ও
“কুসুমে কুসুমে চরণচিহ্ন দিয়ে যাও।”
*********

জটায়ুর বদলা
একুশ নম্বর রজনী সেন রোডে নতুন, ঝাঁ-চকচকে, চোখ-ধাঁধানো সবুজ জ্যাগুয়ারটা এসে দাঁড়াতেই আশেপাশের জানলা আর ব্যালকনিতে মুখের সারি। যদিও এদিকটায় দামি গাড়ি এখন নিত্যনৈমিত্তিক, কিন্তু জ্যাগুয়ার, তাও ক্যাটক্যাটে সবুজ!
গাড়ি থেকে নামলেন জিন্স, কালো টি-শার্ট আর ফেডোরা টুপি পরা এক ছোটখাটো, পেশিবহুল ভদ্রলোক। কলিং বেল বাজার আগেই তপসে দরজা খুলে দিয়ে বলল,
— “ফেলুদা এখন একটু ব্যস্ত আছেন। আপনি বসুন।”
ভদ্রলোক হেসে বললেন,
— “তপশে ভায়া, চিনতে পারলে না? আমি লালমোহনবাবু।”
তপসে প্রায় লাফিয়ে উঠল।
— “লালমোহনবাবু! আপনার এই লুক? আর জ্যাগুয়ার?”
— “সময় বদলেছে, ভাই। সময় বদলেছে। আমার ‘প্রখর রুদ্র’ সিরিজ বুঝলে, এখন বাজার কাঁপাচ্ছে। অরিন্দম শীল সব কপিরাইট কিনে নিয়েছেন। ব্যোমকেশ শেষ হলেই ব্যাস, ওটা শুরু। শুনে রাখো, আমার প্রখর রুদ্র হচ্ছে ভরুন ধাওয়ান। বাংলা সিনেমায় ডেবিউ!”
তপশে নির্বাক।
— “আর জ্যাগুয়ারটা?”
— “হ্যামিশ হ্যামিল্টন। পাঁচটা বইয়ের অনুবাদের ডিল সাইন করতেই গিফট। লেখককে একটু সম্মান দিতে জানে ওরা।”
তপসে হালকা গলায় বলল,
— “তা, আপনি তাহলে বেশ আছেন, বলুন?”
— “বছরে দুটো বেস্টসেলার, তার উপর পুজোয় আমেরিকা, গত পাঁচ বছর ধরেই এই রুটিন। ভক্তের অভাব নেই। তবে একটাই সমস্যা… প্রতিদিন কয়েকশ’ ‘উদীয়মান কবি’র কবিতা শুনতে হয়। কালচার ব্যাপারটা ওদিকেই চলছে কি না আজকাল। তবে বৈকুণ্ঠ মল্লিকের কবিতা সেই ছোটবেলা থেকে শুনে শুনে আমার ইমিউনিটি তৈরি হয়ে গেছে, … এসব সহ্য করে নিই।”
এবার একটু থেমে,
— “ফেলুবাবু কোথায়?”
— “পুজোয় বসেছে। ডাকি?”
ঠিক তখনই ফেলুদা বেরিয়ে এলেন। চেহারা শুকনো, পিঠ সামান্য ঝুঁকে গেছে। দু’হাতে গ্রহরত্নের আংটির ভার, হাতে হনুমান চালিশা।
লালমোহনবাবু ভ্রু কুঁচকে তাকালেন।
— “এ কী, প্রদোষবাবু! এই দশা?”
ফেলুদা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
— “সময় ঠিক ভালো যাচ্ছে না। পাঁচ বছর হলো হাতে একটাও পদের কেস নেই। যাও বা আসে, ওই নতুন এক একেনবাবু সব কুড়িয়ে নেয়। বলুন তো, ও আবার গোয়েন্দা! খালি খাওয়া আর বোকা-বোকা কথা … এই দিয়ে কেস সলভ হয়?”
— “তাই বলে আপনার আঙ্গুলে এই আংটি-টংটি?”
— “একটা শেষ চেষ্টা লালমোহনবাবু। টিভিতে বিজ্ঞাপন দেখে ভাবলাম হনুমান চালিশা যন্ত্র, দুঃখহরণ গ্রহরত্ন… যদি কিছু হয়।”
লালমোহনবাবু হেসে ফেললেন … সেই পুরোনো, খানিকটা নিষ্ঠুর হাসি।
— “মাফ করবেন, ফেলুবাবু, আপনি চিরকালই সেই মাঝামাঝিই রয়ে গেলেন। না শার্লক, না পোয়রো-মিস মার্পল … ডিডাকশন কোথায়? আবার চ্যান্ডলার-হ্যামেটের মতো হার্ড-বয়েলড দাপটও আপনার নেই। সবটাই দাঁড়িয়ে ছিল রায়বাবুর কলমের ওপর। তখন বাংলায় আপনার প্রতিদ্বন্দ্বী না থাকায় মাঠ ফাঁকা ছিল, আর আপনিও গোল দিয়ে গেছেন।”
ফেলুদার চোখ জ্বলে উঠল।
— “আপনি বলছেন, আমার সাহস নেই?”
— “সাহস? বেনারসে মগনলাল যখন অর্জুনকে দিয়ে আমার গায়ে ছুরি ছুঁড়ছিল, তখন কোথায় ছিল আপনার সাহস? একবারও এগিয়ে এলেন? না, আসেন নি। আপনি তখন সিগারেট টানতে টানতে থমথমে মুখ করে দাঁড়িয়ে রইলেন! নায়ক আপনি, আর আমি আপনার বন্ধু হয়ে টার্গেট …. বাহ!”

ঘরের মধ্যে হিরন্ময় নীরবতা।
— “সারা জীবন আপনারা তো আমাকে ব্যবহারই করলেন, এই আপনি আর আপনার সাইডকিক তপসে।“
খানিক দম নিয়ে, “যাই, আর দেরি করা যাবে না। অরিন্দম শীলের অফিসে যেতে হবে, ভরুন আজ স্ক্রিপ্ট শুনবে।”
উঠে দরজার দিকে হাঁটতে হাঁটতে থামলেন তিনি। পিছনে ঘুরে বললেন,
— “আপনি চালিশা পড়ুন, ফেলুবাবু। আমি আমার ক্যারিয়ারটা দেখি।”
জ্যাগুয়ারের ইঞ্জিন আবার গর্জে উঠল।
রজনী সেন রোডে আলো-ঝলমলে সবুজ রেখা টেনে গাড়িটা অদৃশ্য হয়ে গেল।
ঘরের ভিতর বসে ফেলুদা চুপচাপ নিজের হাতের আংটিগুলো ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখতে লাগলেন।

*******






Add comment