মধ্যপ্রাচ্যের দুর্গাপুজা – আমার চোখে
© ময়ূখ দত্ত, ১৯৯০ সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং
আরবদেশে আমার অনেকগুলি বছর কেটে গেল!! এই ‘আরবদেশ’ কথাটা শুনলেই ছোটোবেলার সেই নিষিদ্ধ “সহস্র এক আরব্য রজনী” র কথা মনে পড়ে যায় আর তার সাথে আমার বাবার কথা… ২০১০ সালে বাবা প্রথমবার বিদেশ যাওয়ার ও ছেলের কাছে আসার আনন্দে পাড়ার রিটায়ার্ড / বয়ষ্ক লোকজনদের মর্নিং ওয়াক গ্রুপে জিজ্ঞাসা করেছিল “… আরবদেশে যাচ্ছি, ছেলের কাছে। কি আনব আপনাদের জন্য?” চোখে মুখে খুশীর ঝিলিকে ভরা বাবার মুখের ওপরে নাকি কয়েকজন নাকি উত্তর দিয়েছিলেন “… যাচ্ছেন তো ঐ মরুভূমির দেশে… ঊট, খেজুর ছাড়া আর কি পাবেন? যাই হোক, জিজ্ঞাসা করলেনই যখন, দুটো খেজুরই না হয় নিয়ে আসবেন!!” বাবা নাকি খুব মুষড়ে পেড়েছিল!! পরে ঝাঁ-চকচকে দুবাই-শারজা-আবুধাবি ঘুরে গিয়ে বাবা নাকি ঐ প্রৌঢ় বন্ধুদের ‘মুখের ওপরে জবাব’ দিয়েছিলেন!!… ..সে আর এক গল্প!!
যেটা বলছিলাম – এই আরবদেশ বা মুসলমান শাসিত দেশ নিয়ে প্রচুর ঠিক বা ভুল ধ্যানধারনা আমাদের অনেকের মধ্যেই আছে। সবকটি দেশের ব্যাপারে আমার কথা বলাটা কতটা ঠিক হবে, জানি না, কারণ আমি ওমান আর সংযুক্ত আরব আমীরশাহী (দুবাই/শারজা/আবুধাবি ইত্যাদি) এই স্থানগুলিতেই থেকেছি, তাই আমার যাবতীয় গল্প এই দুটি দেশ নিয়েই, তবে যেটুকু খবর রাখি তাতে সাধারনভাবে “আরবদেশ” নিয়ে লেখাই যায়…।
আজকালকার গ্লোবাল দিনযাপনে অভ্যস্ত, ইন্টারনেট স্যাভী সমাজে অনেক পরিবর্তন হয়েছে বা হচ্ছে প্রতিদিন, তাও প্রায়শই প্রশ্ন শুনি যে “…তোদের / তোমাদের ওখানে পুজো হয়”? খুব মুশকিলে পড়ি এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে…কি করে সবাইকে বোঝাই যে এইসব দেশেও অনেক পুজো হয়, সবাই খুব আনন্দ করে, তবে তার মাধুর্য ব্যাতিক্রম, একটু অন্যরকম, কলকাতা / বাংলার থীম পুজো বা প্যান্ডেল হপিং হয়ত এখানে নেই, নেই স্পন্সরদের বিজ্ঞাপনে মুখ ঢেকে যাওয়া অলি-গলি বা হাজারটা “পাড়ার সেরা পুজো / “বনেদী বাড়ির সেরা পুজো””র প্রতিযোগিতা, কিন্তু বাঙালী উন্মাদনা আছে পুরোমাত্রায়, ফেসবুক জুড়ে পুজোর আগে “দুবাইতে কোথায় পুজো হচ্ছে, কেউ জানাবেন?” টাইপের আহরহ পোস্ট, সবই আছে, হয়ত একটু অন্যরকম স্বাদের…

মাস্কাটে থাকার সময়ে দেখেছি, স্থানীয় শিবমন্দিরে আমাদের বঙ্গীয় পরিষদের পুজো হত এবং যাবতীয় নিয়ম-কানুন, দিন-ক্ষন মেনেই। আমেরিকা বা ইংল্যান্ডে অনেক যায়গাতেই শনি-রবি এই দুদিনেই চারদিনের পুজো করতে হয় যাতে সপ্তাহের অন্যদিনে মানে অফিসের দিনে সবাই কাজে যেতে পারে, কাজের বা ব্যাবসার ক্ষতি কেউই চায় না। পাঁজি-পুথি সব ওলট-পালট হয়ে যায় মানুষের পেটের ভাত যোগাড়ের প্রাধান্যে। এই কারণেই মাস্কাটের দিন-ক্ষন মেনে পুজোর কথাটা এখানে হয়ত বিশেষভাবে উল্লেখ্য!! সকালের পূজা, সন্ধ্যারতি থেকে শুরু করে, ফলকাটা, ছোট্ট মন্দির হলটা সাজানো সবেতেই আমরা নিজেরাই, যেন নিজেরই বাড়ির কোনো অনুষ্ঠান। ওপরওয়ালা কিছু ভেবেই আমার দৈহিক উচ্চতা সাধারন গড়পড়তা বাঙালীর থেকে কয়েক ইঞ্চি হয়ত বেশী দিয়েছেন, তাই একটু উঁচু কোনো জায়গায় কিছু লাগাতে হলেই আমার ডাক এসে যেত!! ছোট্ট হলঘরে কার শাড়িটা লেটেস্ট ডিজাইনের, কার সাজটা সামঞ্জস্যহীন, এসব পিএনপিসি চলতেই থাকে, সাথে সন্ধ্যের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান- বাংলার যে কোনো পুজোর সাথে মিলে যায়!!
আমাদের মন্দির এক্কেবারে ওমানী পাড়ার মধ্যে অবস্থিত, ঘিঞ্জী যায়গাতে, ছোট্ট গলির মাঝে…আমাদের মত বাইরের দেশ থেকে আসা expat-রা সাধারনত এই ধরনের ‘ওমানী পাড়া’তে থাকে না। নতুন শাড়ি-জামা পরে কলরবলর করতে থাকা বাঙালীরা ঐ কদিন যেন ঐ পাড়াটা দখল নিয়ে নিত!! তবে কোনোদিনই স্থানীয় সাধারন ওমানী বাসিন্দাদের সাথে কোনো ঝামেলা হয়নি।
সরকারীভাবে স্বীকৃত একটি মুসলিম দেশে স্বাভাবিকভাবেই কিছু ভিন্ন নিয়মকানুন থাকে। পুজোর তিথি যে বছর রমজানের সময়ে পড়ে যেত, স্থানীয় মুসুমান আচার/ধর্ম মেনে দিনের বেলা প্রকাশ্যে জল বা খাবার না খাওয়ারই চেষ্টা করতাম, অনেকবছর বসবাসের পরে ভিন্নধর্মী হিসেবে এটা বুঝেছি যে এটা যতটা না সংখ্যাগরিষ্ঠের ধার্মিক নিয়মকে মেনে চলার একটা অনুশাসন, তার থেকে বেশী সারাদিন নির্জলা উপোস করে থাকা অন্য ধর্মের মানুষের প্রতি সহমর্মিতার প্রকাশ, তাদের ধার্মিক আচারকে সম্মান জানানো!! আমাদের মন্দিরের গার্ড ছিলেন এক ওমানী মুসলমান। কোনো একবছর রমজানের সময়ে দূর্গাপুজা পড়েছিল, তাই ঠিক করা হল যে সেই বছরে অষ্টমীতে পাত পেড়ে বসে খিচুড়িভোগ খাওয়ানো হবে না, তার বদলে সবাইকে প্যাকেট ভোগ দিয়ে দেওয়া হবে, যে যার বাড়িতে নিয়ে গিয়ে খিচুড়িভোগ খাবে। আমরা, ভলেন্টিয়াররা প্যাকেট ভোগ বিলি করছিলাম, একসময়ে দেখি রমজান মাসে সেই উপোসী ওমানী মুসলমান গার্ডও এসে আমাদের সাথে হাত লাগিয়েছেন, ভোগ বিলি করতে, আমাদের সাহায্য করতে!! মনে হল ধর্মের বাঁধন ছেড়ে আমাদের পুজো আক্ষরিক অর্থেই সার্বজনীন হয়ে উঠল!!
অনেকের কাছে ব্যাপারটা একটু আশ্চর্যের হলেও এটা হয়ত জানানো দরকার যে এই ধরনের মুসলিম শাসিত দেশগুলোতে অন্য ধর্মের মানুষজনের নিজস্ব ধর্মাচারন করার ক্ষেত্রে খুব একটা বাধানিষেধ নেই, ব্যক্তিগত ধর্মাচারণে কোনো বাধা দেখি না… আমরা দৈনন্দিন জীবনে খুব একটা কিছু পার্থক্য বুঝি না। মন্দির, গীর্জা সবই আছে, তবে হঠাৎ কারুর খেয়াল হলো আর একটা গাছের তলায় পাথর রেখে তাতে সিঁদুর পরিয়ে, একটা প্রনামীর বাক্স রেখে এক শনিবারে পূজো চালু করে দিলাম – এটা হবে না, সরকারের থেকে প্রসাশনিক অনুমোদন দরকার!! অথবা ঢাক-ঢোল বাজিয়ে রাস্তায় মিছিল করে গনেশ ঠাকুর বিসর্জন করতে গেলেও প্রশাসনিক বাধা আছে।
বহূবছরের পুরোনো দুবাই মন্দিরের দূর্গাপুজোতে কোনো প্রতিবন্ধকতা নেই কোনোদিনই, যথাযত সরকারী অনুমোদনের সাথেই পুজো হত, এখনো হয়, কিছু ক্লাব বা সংস্থা প্রসাশনিক ঝুট-ঝামেলা এড়িয়ে পুজোর আয়োজন করে সাধারন “শারদ উৎসব” (“autumn festival”) নামে, . সেসব ক্ষেত্রে প্রশাসন হয়ত কিছুটা চোখ বন্ধ করেই থাকে!! ঢাক বাজিয়ে, কাঁসর-ঘন্টা বাজিয়ে পুজো অনেকসময়েই হয়ত একটু রেখে-ঢেকে হয়, যাতে কারুর কাছে সেই শব্দ ইত্যাদি কোনোপ্রকার “দূষন” হিসেবে বার্তা বয়ে না নিয়ে আসে, কেউ যেন কোনো অভিযোগ না করে। কিছু সময়ে পুজো কতৃপক্ষের তরফে অনুরোধ থাকে যে পুজো চলাকালীন ফেসবুক লাইভ করা যাবে না বা পুজোর ছবি দশমীর আগে ফেসবুক/ইন্সটা তে দেওয়া যাবে না ইত্যাদি!!



চারদিন এই বিদেশে বসে পুজোর অনাবিল আড্ডা- খাওয়াদাওয়া, গানবাজনা, ছবি তোলা ইত্যাদি সব বন্ধুবান্ধব, চেনা-পরিচিতদের সাথে শেয়ার করার আনন্দে মত্ত সাধারন বাঙালীদের কাছে ওইসব ছোটোখাটো জিনিস!! সন্ধ্যেতে পুজো দেখে, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান দেখে বা তাতে অংশ নিয়ে আবার পরের দিনে সবাই হাসিমুখেই অফিসে বা কাজের যায়গাতে যায় (এই দেশে তো দূর্গাপুজোতে কোনো ছুটি নেই!!), কেউ কেউ অবশ্য তাদের মহার্ঘ বাৎসরিক ৩০ দিনের পাওনা ছুটির কয়েকটা এই সময়েই নিয়ে নেয়, এই কদিন সপরিবারে আনন্দঘন কয়েকটা দিন একসাথে কাটাবে বলে। এই দেশে সব মিলিয়ে নাকি এখন ২৯ টা পুজো হচ্ছে, বেশ কিছু তো রীতিমতো বিজ্ঞাপন দিয়ে, ঢাকঢোল পিটিয়ে, ঢ্যাংকুড়কুড় বাদ্যি বাজিয়ে। বারোয়ারী পুজোও চালু হয়ে গেছে, কিছু আবার ‘সনাতনী’ শব্দবন্ধ সহ। এখন লোকে কিছুটা হলেও “প্যান্ডেল হপিং” এর আনন্দ নিতে শুরু করেছে!! সকাল বেলা বাস ভাড়া করে অনেকে ২০০ কিমি দূরত্ব পার করে শারজা থেকে আবুধাবি গিয়ে ঠাকুর দেখে আবার রাতে ফিরে এসে শারজার পুজোতে আনন্দ করছে!! সুতরাং এটা বুঝছি যে গ্লোবালাইজেশনের যুগে এই ধরনের মুসলমানপ্রধান দেশও তার ধ্যানধারনা, তার চিরাচরিত প্রসাশনিক চিন্তাধারায় উদার হয়েছে, মানুষের উৎসব জিতে যাচ্ছে প্রতিবছর….
মধ্যপ্রাচ্যের এই দেশগুলিতে ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্থান, ফিলিপাইন এর মত দেশ গুলো থেকেই বেশীরভাগ শ্রমিকশ্রেণী আসে “blue collar” কাজ করার ক্ষেত্রে। তার সাথে সাথে আমাদের মত “white collar” শ্রেণীও আসে কিছুটা পয়সার জন্য, কিছুটা হয়ত লাইফস্টাইলের জন্য। এই দেশগুলিতে বাংলাদেশের বাঙালীরা সাধারনত “blue collar” কাজে যুক্ত আর পশ্চিমবঙ্গের বাঙালীরা বেশীরভাগই “white collar” কাজের সাথে যুক্ত!! এই কারনেই কিনা জানি না আমরা অনেকেই যারা পশ্চিমবঙ্গের বাঙালী, তারা বাংলাদেশের বাঙালীদের থেকে নিজেদের সামাজিকভাবে একটু উঁচুস্তরের মনে করি!! এই ব্যাপারটা দৃষ্টিকটুভাবে নজরে আসে প্রথমে মাস্কটে এবং তারপরে দুবাই আসার পরেও। দুর্গাপুজো তো সার্বজনীন, সেখানে ধর্ম, রাজনৈতিক কারনে ভুখন্ডের ওপরে তারকাঁটার বেড়া, এসবে কি এই জীবনের উৎসবকে আটকে রাখা যায়? তাই সব গোষ্ঠীর মানুষই সব পুজোতে যাতায়াত করে। এখানেই একটা অদ্ভুত অনুভুতি এসেছিল মাস্কটে ২০০৭ সালে এবং এখনো দেখি প্রায়শই যে পশ্চিমবঙ্গীয় বাঙালী আয়োজিত দূর্গাপুজোতে কোনো বাংলাদেশের মানুষ আসলে কেউ বারন করে না বা আটকায় না, কিন্তু সেভাবে হয়ত আমরা ওদের আপন করেও নিই না। অন্যদিকে আমরা মানে পশ্চিমবঙ্গের লোকেরা যখন বাংলাদেশীদের আয়োজিত পুজোতে যাই, ওরা এত আপ্যায়ন করে, বারবার ভোগ খেয়ে যেতে বলেন, অনেক যায়গাতেই বাকি সবাইকে হঠিয়ে আমাদের আদর করে বসিয়ে পাত পেড়ে খাওয়ারের ব্যাবস্থা করেন, আদর যত্নে – খুব লজ্জা পেয়ে যাই, প্রতিবারই, আমাদের নিজেদের মনের সংকীর্ণতার পরিচয় পাই প্রতিবারে!! একটা কাঁটাতারের বেড়া কিভাবে আমাদের মনকে দূষিত করে দেয়, অর্থনৈতিক স্তরের বিষমতা কতভাবে আমাদের সামাজিকভাবে আলাদা করে দেয় তার পরিচয় পাই এই মানুষের উৎসবের মাঝেও. তাই প্রতিটি পুজো আমার কাছে যেন সেদিক দিয়ে মানবতার দিকে উত্তরনের এক একটা অধ্যায়…
আজকাল অনেকেই বলেন যে ভারতের মত ধর্মনিরপেক্ষ, সহনশীল দেশেও সংখ্যাগরিষ্ঠের মতবাদই নাকি মেনে চলা উচিৎ – এই ধরনের মতের একটা বিজ্ঞাপন চালানো হয় প্রতিদিন!! মতের অমিল হলেই “… এখানে না পোষালে পাকিস্থান চলে যান…” ধরণের মন্তব্য প্রায়শই কানে আসে। এই পরিস্থিতিতে দুবছর আগে দেখেছিলাম এখানকার একটা দূর্গাপুজো অনুষ্ঠিত হচ্ছে “পাকিস্থান রিক্রিয়েশান সেন্টার”-এ। ধর্মের ভিত্ততে ভাগ হয়ে যাওয়া দুটো দেশ, তিনটে যুদ্ধ, সর্বদা ছায়াযুদ্ধ খেলতে থাকা দুইদেশের রাজনৈতিক কূটনীতির আওতার বাইরে দুদেশকে মেলানোর অনেক চেষ্টা চলে – সদ্ভাবনা যাত্রা, ক্রিকেট, লতা মংগেশকার, মেহেদী হাসান সব চেষ্টাই বিফলে যায়…শারজার পাকিস্থান সেন্টারে আয়োজিত দূর্গাপুজো দেখে একটাই জিনিস আবার মনে হল – মানুষ আগে, ধর্ম পরে, যেখানে মানুষের উৎসব, সেখানে কাঁটাতারের বেড়াতেও হয়ত কোনো একদিন লাল গোলাপ ফুটবে, গোলাপ কাঁটা যুদ্ধ করবে সীমানা নির্ধারন করা বেড়াতারের কাঁটার সাথে…এই আশাতেই তো আমরা বাঁচি!!
একটা সময় পর্যন্ত বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র ভোর চারটের সময়ে নাকি গঙ্গাস্নান করে শুদ্ধ হয়ে আকাশবানীভবনে গিয়ে বাকি সবাইকে নিয়ে “মহিসাসুরমর্দিনী লাইভ” করতে বসতেন, যা আমরা বছরের পর বছর ধরে শুনে আসছি। সেই প্রোগ্রাম আর দেবীপক্ষের সুচনা যেন সমার্থক আমাদের সবার কাছে!! আমার জানা নেই আর কোথাও এই “লাইভ মহিসাসুরমর্দিনী” দিয়ে দেবীপক্ষের সূচনা হয়েছে নাকি বা হয় নাকি। এই আরবদেশে আমরা দেখি নিজেদের চেনাপরিচিত মানুষজন একজোট হয়ে বিশুদ্ধ সংস্কৃত স্তোত্রপাঠে, গানে এই “লাইভ মহিসাসুরমর্দিনী” প্রায় প্রত্যেকবছর… কোনো কোনো বছর সন্ধ্যেবেলা, স্টেজে আবার সেই প্রোগ্রাম পরিবেশনা করা হয়, যারা লাইভ দেখতে পারেন নি তাদের জন্য!! শুধু এটুকু বললেই হয়ত এই আরবদেশের দূর্গাপুজার গল্প অনেকটাই বলা হয়ে যায়, অনেক ভ্রান্ত ধারনাই হয়ত দূর হয়ে যায়…।

আর একটি কথা না বললে হয়ত এই আরবদেশের দূর্গাপুজোর কথা অসমাপ্ত থেকে যায়। বাচ্চারা যারা বাংলার বাইরে, দেশের বাইরে জন্মাচ্ছে, বড় হচ্ছে – স্বাভাবিকভাবেই তাদের বাংলায় কথা বলা বা বাংলা পড়া/লেখার মধ্যে একটা আড়ষ্টতা থাকে, তার মাত্রাটা কম-বেশী হয়, যা তাঁদের বাবা-মায়ের প্রচেষ্টার ওপরেই অনেকটা নির্ভর করে…সব কিছু ছাপিয়ে পুজোর এই চারদিনে নতুন পাজামা-পাঞ্জাবী, শাড়ি-চুড়িদারে বাচ্চাগুলো যখন অনেক রিহার্সালের পরে স্টেজে নাচে-গানে-কবিতায় সুকুমার রায়, নজরুল বা রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে মেতে থাকে, চারদিকে ওদের উৎসাহিত করতে থাকা হাততালির স্রোতে ওদের নিষ্পাপ হাসিতে মন ভরে ওঠে… এসি ব্যাঙ্কোয়েট হলের কোনায় বা দেওয়ালে হাওড়া ব্রীজ, উত্তম-সুচিত্রা বা বেলুড় মঠের ছবিতে আমরা খুঁজে পেতে চাই ফেলে আসা স্মৃতিকথা, পুরোনো প্রেম বা বিরহব্যাথা….অনেক কিছু হারিয়ে গেলেও এই দূরদেশে, এই “বিধর্মী”দেশে সমস্ত প্রতিকুলতার মধ্যেও কোথাও যেন আমাদের বাঙালীমননে একটা সোনালী রেখা দেখতে পাই!!

আগের বছর পুজোর মধ্যেই আমার এক বন্ধু আমাকে জানাল যে দূর্গাপুজোর নাকি আলাদা করে কোনো মন্ত্র হয় না, অনেক মন্ত্রের সমন্বয় ঘটে এই পুজোতে বা আমরা যখন পুষ্পাঞ্জলি দিই। একইভাবে হয়ত সেই কারনেই এই “পুজো” আসলে আমাদের সবার কাছে সারা বছরের সব ক্লান্তি, গ্লানিকে জয় করে, সবকিছুর সমন্বয়ে নিজেদের পরিপূর্ণতার দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার দিকে কয়েকটা দিনমাত্র… প্যান্ডাল, মূর্তি, আলোকসজ্জা এসব তো শুধুমাত্র তার বাহ্যিক ব্যাবসায়িক আবরন মাত্র, এই “আরবদেশ” এর পুজো তার বাইরে বেরিয়ে এসে যেন এক আত্মীয়তার মেলবন্ধন ক্ষেত্র – জীবনের সব কষ্ট, সব টেনশান ভুলে কয়েকটা দিনের আনন্দঘন মুহূর্তসৃষ্টি, আমাদের বিশল্যকরণী!!

ফটোগুলি অরিন্দম তিওয়ারী’র সৌজন্যে
********






Add comment