“শরৎ তোমার অরুণ আলোর অঞ্জলি” – গ্রাম বাংলায় দুর্গাপুজা
© হিমাংশু পাল, ১৯৯০ কম্পিউটার সায়েন্স ও টেকনোলজি
হাওয়ায় যখন প্রথমবার হিমের পরশ অনুভূত হয়, গ্রাম বাংলার ঋতুচক্র জানিয়ে দেয় দেবীপক্ষের আর বেশি দেরি নেই। আমাদের শৈশবে গ্রামবাংলার ঋতুবৈচিত্র্য ছিল খুবই প্রকাশ্য ও বর্ণময়। একেকটা ঋতুর পরিবর্তনের সঙ্গে তার রূপ আকাশে, বাতাসে, জলে, স্থলে, সমগ্র পরিবেশের আয়নায় প্রতিফলিত হত। সেইসঙ্গে শিশু ও কিশোর মনের অন্তরের অন্তঃস্থলেও সুগভীর দীর্ঘস্থায়ী ইম্প্রেশন পড়ত। শুধু ভালো লাগা বা শুধু মন খারাপ করা নয়, বিশেষ ঋতুর বিশেষ ক্ষণে কোনো এক বিশেষ ঘটনা এক কিশোর বা সদ্য-যুবার মনে গেঁথে যাওয়ার এমন এক বিচিত্র অভিজ্ঞতা কোনো ভাষা বা সাহিত্যে, বা ছবি এঁকেও প্রকাশ করা সম্ভবপর ছিল না। অথচ কয়েক দশক পরেই সেই সুপ্ত স্মৃতি উপযুক্ত পরিস্থিতিতে অঙ্কুরিত হয়ে আবার সেই বিচিত্র অনুভূতির বৃত্তিসমূহ কয়েক মুহূর্তের জন্য ফেলে আসা সেই শৈশবে টেনে নিয়ে যায়।
আজ সুদূর এই প্রবাসে শৈশব ও কৈশোরের দুর্গাপুজোর স্মৃতি বিজড়িত অতীত রোমন্থন করতে গিয়ে বড্ড নষ্টালজিক হয়ে পড়ছি। অসংখ্য স্মৃতি একসঙ্গে ভিড় করে আসছে। আবেগে ভাসছি, আপ্লুত হয়ে পড়ছি। চিন্তা-ভাবনাগুলো এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। সেই দিনগুলো “যেদিকে তাকাই সোনার আলোয় দেখি যে ছুটির ছবি”। পুজোর ছুটি মানেই টানা একমাসেরও বেশি ছুটি। আশ্বিনের শারদপ্রাতে ভোর জাগা রেডিওতে মহালয়ার “মহিষাসুর মর্দিনী” দিয়ে শুরু। তারপর পঞ্চমী-ষষ্ঠী-সপ্তমী-অষ্টমী-নবমী-বিজয়া দশমী হয়ে লক্ষ্মী পুজো, কালী পুজো পার করে ভাইফোঁটার পর দিন পর্যন্ত। উৎসবই উৎসব, আনন্দই আনন্দ।

এই আনন্দ শুধুমাত্র কিশোর কিশোরীর ছুটির আনন্দ নয়, প্রকৃতির অনলে অনিলে চির নভোনীলে ভূধর সলিল গহনে – সর্বত্রই এই আনন্দের প্রকাশ। আমাদের গ্রামের পশ্চিম পার ঘেঁষে সতত প্রবাহমান আমাদের ছোট নদীটির নাম দ্বারকেশ্বর। সেই নদী আপনবেগে ভরা বর্ষায় টইটুম্বুর বাঁধ উপচে দিয়ে আজ সেও ছুটি নিয়েছে। আর তার দুই তীর সাদা সাদা কাশফুলের প্রলম্বিত রূপে অনিন্দ্য শোভা বর্ধন করেছে। সেই ছোট থেকেই দেখচি, নদীর পাশে অটল দাঁড়িয়ে আছে লম্বা লম্বা দেবদারু গাছের সারি। মাথার উপর ভেসে চলেছে শ্বেত শুভ্র মেঘের ভেলা। গ্রামের যত্র তত্র বাতাসে ভেসে আসছে ভোরে ফোটা শিউলি ফুলের সুবাস। প্রকৃতির এই প্রাকৃতিক সৌন্দর্য সবই যেন শারদীয়ার শুভেচ্ছা বাণী। ছুঁয়ে যায় এক হৃদয় থেকে অন্য হৃদয়ে। মানব হৃদয়ের স্পন্দনের সঙ্গে শারদীয়া প্রতিধ্বনির এক অপূর্ব ঐকতান।


তখনও আমাদের গ্রামে “ফ্রেন্ড অ্যাসোসিয়েশনের” ক্লাবের পুজো শুরু হয় নি। গ্রামে পুজো বলতে দুটো পারিবারিক পুজো। ঘটক বাড়ির একচালার পুজো আর হালদার বাড়ির ডাকের সাজের প্রতিমা। ঘটক বাড়ির ছেলে বামা আমার সহপাঠী, আমার খুব অন্তরঙ্গ বন্ধুও বটে। পুজোর ওই কদিন ঘটক বাড়ি থাকে আত্মীয় স্বজনে পরিপূর্ণ। সালকিয়া থেকে পিসিরা ও চণ্ডীতলা থেকে কাকিমা ও ছোট বোন এসেছে। সমবয়সী পিসতুতো বোন বামার সঙ্গে একটু বেশিই অন্তরঙ্গ, আর পিতৃহীন ছোট কাকিমার মেয়েকে সে খুবই স্নেহ করে। এমনিতে প্রাচীনপন্থী অভিভাবকেরা মামাতো-পিসতুতো ভাই-বোনদের মেলামেশা খুব একটা পছন্দ না করলেও পুজোর ওই কয়দিন বামা বাড়িতেই থাকে, আত্মীয় কুটুমদের কাছে, তাছাড়া বাড়ির পুজোতেও থাকে অনেক দায়িত্ব।
অষ্টমী ও নবমীর দিন আমরা চার বন্ধু মিলে আশেপাশের গ্রামগুলিতে প্রতিমা পরিদর্শনে যেতাম। পাশের গ্রাম সালেপুরে একটাই পুজো, কিন্তু খুবই জাঁকজমক করে পুজো হতো বারোয়ারি পুজো, কুমোরটুলি থেকে প্রতিমা আসত। আর নানারকম আলোকসজ্যা। প্রচুর ভিড় হয় এখানে, আশ পাশের দশ-বারোটা গ্রামের দর্শনার্থীদের ভিড়ে পুজো প্যান্ডেল পরিপূর্ণ। কিন্তু এত ভিড়েও আমাদের প্রিয় কিশোরী সহপাঠীদের খুঁজে পেতে অসুবিধা হত না। তারাও আসতো দলবেঁধে পুজো পরিক্রমা করতে। আলো-আঁধারি পরিবেশে সে এক অনির্বচনীয় আনন্দ, টান টান উত্তেজনা, আবেগ আর সেই প্রথমবার ভালোবাসার অনুভূতি। ওই বয়সে আমাদের গ্রামে কিশোর কিশোরীদের মধ্যে কথা-বার্তা ও আলাপ চারিতা নিষিদ্ধ ছিলো, কিন্তু ঠিক দেখা সাক্ষাত হয়ে যেত। তাতে কোন বাধা ছিল না। এমন ভাবে প্ল্যান পরিকল্পনা করা হত যে প্রত্যেকটা পুজো মণ্ডপে ঠিক দেখা হবেই। আর কিছু কিছু প্ল্যান মাফিক রাস্তায় মুখোমুখিও দেখা হয়ে যেত। মণ্ডপের দুর্গা প্রতিমার থেকেও এই সুসজ্জিত আকর্ষণীয় কিশোরী দুর্গাদের দেখা পাওয়া ছিলো অনেক বেশি আনন্দের। ছোটবেলার সেই কয়েকটা বছর আমরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষায় দিন গুনতাম এই পুজোর বিশেষ কয়টা দিনের জন্য।
বয়ঃসন্ধিকালে চোখ ধাঁধানো শহরের পুজো দেখতে যাওয়ার জন্য খুব ইচ্ছে হতো। আরামবাগ শহর মাত্র চার মাইলের পথ। সেখানে বেশ কয়েকটি পুজোমণ্ডপের তখন খুব নাম ডাক। বসন্তপুর মোড়ের পুজো, সিং পাড়ার পুজো ও গৌরহাটি মোড়ের পুজো। প্রতিটিই বড় বাজেটের পূজা, আর পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী। সেখানে অগণিত দর্শকের উপচে পড়া ভিড়। নানারকম আলোকসজ্জার প্রতিযোগিতা, কোন কোন প্যান্ডেলে আবার সিনেমার কায়দায় মহিষাসুর মর্দিনী দেখানো হত মিনিট পনেরো কুড়ির ইন্টারভালে। ইচ্ছে থাকলেও উপায় ছিল না। রূপনারায়ণ নদীর কোলে বাসট্যান্ড বন্দর থেকে গুটিকয়েক লোকাল বাস আমাদের গ্রামের উপর দিয়ে যাত্রী বোঝাই করে যেত আরামবাগ শহরে। পুজোর কদিন এত ভিড় হতো যে বাদুরঝোলা প্যাসেঞ্জার ভর্তি বাস গরুর গাড়ির মতো ঢিমেতালে চলে যেত, গ্রামে দু-তিনটে স্টপেজ থাকা সত্ত্বেও ওঠা যেত না।
বাতাসে শিউলি ফুলের গন্ধ, ছোট ছোট বালক-বালিকার নতুন নতুন জামা কাপড়ের গন্ধ আর বাড়িতে মা কাকিমা জেঠিমাদের রান্না করা সুস্বাদু খাবারের গন্ধ সব মিলিয়ে বেশ পুজো পুজো গন্ধ ছোটবেলার স্মৃতিগুলিকে চিরস্মরণীয় করে দিয়েছে। চোখ বুজলেই সেই গন্ধকে মনের সংলগ্ন সংরক্ষিত চিত্তে নতুন করে সন্ধান পাওয়া যায়। অষ্টমীর দিনের ছোলার ডাল আর ঘিয়ে ভাজা লুচি, সামান্য পরিমাণ মিষ্টান্ন ছিলো আমাদের একান্নবর্তী পরিবারের মেনু, আর নবমীর দিন পাঁঠার মাংস। দশমীর দিন বিজয়ার শুভেচ্ছা, গুরুজনদের প্রণাম করে পেয়ে যেতাম আশীর্বাদের নারকেল নাড়ু। প্রথমে আমরা সব ভাই বোন মিলে ঠাকুরমার বাঁধানো ফটোতে প্রণাম করে বয়স অনুযায়ী একের পর এক গুরুজনদের আশীর্বাদ নিয়ে চলে যেতাম পাড়ার অনান্য বাড়িতে, হরেকরকম মিষ্টান্ন সংগ্রহ করতে। অনেকটা মার্কিন দেশের হ্যালোইন-র মতো।
দুটো বিশেষ ঘটনা দিয়ে উপসংহার টেনে নিয়ে শেষ করছি ছেলেবেলার এই স্মৃতিচারণা। কোন এক বছরের পুজোয় নবমীর সন্ধ্যায় গিয়েছিলাম বন্ধু বামাদের বাড়িতে। দালানে মা দুর্গা আলো করে বসে আছেন। মহিলারা সুসজ্জিতা হয়ে পুজোর যোগাড় করছেন। ব্রাহ্মণ ঠাকুর সবেমাত্র সন্ধারতীর কাজ সমাপন করেছেন, হঠাৎই কেন জানি আমার মনে হয়েছিল মা দুর্গা স্বয়ং আবির্ভূতা হয়েছিলেন বামাদের এই ছোট পারিবারিক দুর্গা দালানে। খুবই অল্প সময়ের জন্য, কিন্ত আমার মনে হয়েছিল। এখনও ভাবি ওটা কি সত্যি মনের ভুল না কিশোর মনের জমাট বাধা আবেগের হঠাৎই বহিঃপ্রকাশ। পরে জেনেছি, শাস্ত্রবর্ণিত “অস্তি-ভাতি-প্রিয়”র অত্যন্ত গভীর এবং গুরুত্বপূর্ণ আধ্যাত্মিক তত্ত্ব। শাস্ত্রে আছে, যে কোনও পুজো-উৎসব সার্থক হয় প্রধানত তিনটি গুণে:
প্রতিমার মূর্তি সুন্দর হওয়া চাই,
পুজোরি ব্রাহ্মণের আচার ও নিষ্ঠা,
গৃহস্বামীর ও পরিবারের দেবদ্বিজে ভক্তি।
যেখানে এই পবিত্র ত্রয়ীর সংমিশ্রণ ঘটে, সেখানেই এক অপূর্ব আধ্যাত্মিকতার প্রবাহ বিদ্যমান হয় যে শুদ্ধমতি কিশোরের ঈশ্বরীয় রূপদর্শনও কিছুমাত্র বিচিত্র নয়।
আরও এক বিশেষ স্মৃতি অষ্টমীর দিনে “একফালি কুমড়োর ছক্কা” কে কেন্দ্র করে। ঘটনাটা এতটায় ব্যক্তিগত, তুলে রাখি বহু সযত্নে, মনের মণিকোঠায়।


********






Add comment