সাহিত্যিকা

বাংলাদেশের দুর্গাপূজা

বাংলাদেশের দুর্গাপূজা
অসীম দেব, ১৯৭৭ ইলেকট্রনিকস ও টেলিকমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং

প্রচ্ছদের ছবিটি ঢাকেশ্বরী মন্দিরের পূজা

দুর্গাপূজার ইতিহাসে কলকাতা কেন্দ্রিক পূজাগুলির আদি কাহিনী যেভাবে জানা যায়, অবিভক্ত বাংলার পূর্ববঙ্গের ক্ষেত্রে এ সম্পর্কে তেমন বিশদভাবে জানা যায় না। অধুনা বাংলাদেশে কীভাবে এ পূজার শুরু সে বিষয়ে নানা কাহিনী প্রচলিত রয়েছে।

বাংলাদেশে প্রথম দুর্গা পূজার প্রচলন
বাংলাদেশে প্রথম কবে দুর্গা পূজা শুরু হয়, এবিষয়ে মতভেদ আছে। কিছু প্রচলিত মতে, পঞ্চদশ শতকে শ্রীহট্টের (বর্তমান সিলেট) রাজা গণেশ প্রথম দুর্গা পূজা শুরু করেন, যদিও এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানা যায় না। তবে বিভিন্ন গবেষকের লেখা থেকে জানা যায়, রাজশাহীর তাহেরপুর এলাকার রাজা কংস নারায়ণ প্রথম দুর্গা পূজার প্রবর্তন করেন।

ইতিহসের সূত্রে অবিভক্ত বাংলার দুর্গাপুজোয় প্রথমেই উল্লেখ করতে হয় ঢাকা শহরের ঢাকেশ্বরী মন্দিরের প্রসঙ্গ। এই পুজোর ইতিহাস প্রায় আট শতাব্দী আগের। এটি বাংলাদেশের ‘জাতীয় মন্দির’। এই মন্দিরে প্রথমে অষ্টভুজা প্রতিমা এবং পরবর্তী সময়ে দশভুজা দুর্গা প্রতিমা স্থাপন করা হয়। ঐতিহাসিকদের মতে, ঢাকেশ্বরী মন্দিরে পূজিতা দুর্গার আরেক রূপ দেবী ঢাকেশ্বরীর নামানুসারেই ঢাকা শহরের নামকরণ করা হয়েছে। আর বাংলাদেশে পাঁচশ বছরেরও বেশি পুরাতন কয়েকটি দুর্গাপুজোর উল্লেখ করা যায়।

উপরের ছবিটি তাহিরপুর রাজবাড়ি – বর্তমানে
৮৮৭ বঙ্গাব্দের আশ্বিন মাসের মহাষষ্ঠী তিথিতে অকালবোধনের সময় রাজশাহীর তাহিরপুর রাজবংশের রাজা কংস নারায়ণ রায় প্রথম দেবী দুর্গার প্রতিমা নির্মান করে প্রথম দুর্গাপূজা করেন। রাজা কংস নারায়ণ ছিলেন বাংলার বারো ভূঁইঞার একজন। ষোড়শ শতকে বাংলার দেওয়ান নিযুক্ত হন। উনি ছিলেন প্রভূত ভূ-সম্পত্তির অধিকারী। দেওয়ান হওয়ার পর কংস নারায়ণ মহাযজ্ঞ করতে চাইলেন। রাজার পুরোহিত রমেশ শাস্ত্রী রাজাকে বলেন, যে চার রকমের যজ্ঞ করার নিয়ম আছে, তার কোনটিও এ আমলে করা সম্ভব নয়। তিনি রাজাকে বরং দুর্গা পূজা করতে বলেন এবং তিনি দুর্গোৎসব কি পদ্ধতিতে হবে তাও লিখে দিয়েছিলেন। তখন সেইসময়ের রাজন্যকুলে নিজের সামাজিক প্রতিপত্তি বাড়ানোর উদ্দেশ্যেই রাজা কংস নারায়ন এই পুজোর আয়োজন করলেন। ওই একই বছরে বসন্তকালে রাজশাহীর ভাদুরিয়ার রাজা জয় জগৎ নারায়ণও বেশ জাঁকজমকভাবে বাসন্তী পুজোর আয়োজন করেন। তিনি কংস নারায়ণকে টেক্কা দেওয়ার জন্য সেই পুজোয় প্রায় নয় লক্ষ টাকা খরচ করেন।

বিভিন্ন ঐতিহাসিক এবং কিছু প্রচলিত স্থানীয় সূত্র অনুসারে, কংস নারায়ণের প্রথম দুর্গাপুজোটি হয় রাজবাড়ি সংলগ্ন প্রধান ফটকের পাশেই একটি বেদীতে। ১৪৮০ সালে সেখানের রামরামা গ্রামে সেই পুজোর আয়োজন করা হয়। নদীর পাশেই তিনি নির্মাণ করেন প্রথম দুর্গা মন্দির। দেবীর সকল গহনা ছিল স্বর্ণ ও মণি-মুক্তা নির্মিত। লোকশ্রুতি অনুসারে, সম্রাট আকবরের (১৫৫৬-১৬০৫) শাসনকালে এই পুজোয় রাজা কংস নারায়ণ ব্যয় করেছিলেন প্রায় ৮-৯ লক্ষ টাকা। রাজপ্রথা বিলুপ্ত হওয়ার আগে পর্যন্ত ওই মন্দিরে দুর্গাপুজো হত। দেশ বিদেশের বিভিন্ন এলাকার মানুষ আসতেন সেখানে। তবে এখন সেই জায়গাটি ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয়েছে। সেখানে এখন মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ এবং একটি পুকুর ছাড়া আর কিছুই দেখা যায় না।

উপরের ছবিটি সাতক্ষীরার কলারোয়ার মঠবাড়িয়ার নবরত্ন মন্দির – বর্তমানে
আঠারো শতকে দেশের দক্ষিণের জেলা সাতক্ষীরার কলারোয়া থানার মঠবাড়িয়ার নবরত্ন মন্দিরে দুর্গাপুজো হতো বলে বিভিন্নজনের লেখায় পাওয়া যায়। অর্থনীতিবিদ ভবতোষ দত্ত তার আত্মজীবনীতে উল্লেখ করেন যে, ১৮৩০ সালের পুরনো ঢাকার সূত্রাপুর অঞ্চলের ব্যবসায়ী নন্দলাল বাবু নিজের মৈসুন্ডির বাড়িতে ঢাকার সবচেয়ে বড় দুর্গাপুজোর আয়োজন করেছিলেন। প্রতিমাটি প্রায় দ্বিতল উঁচু ছিল বলেও লেখক উল্লেখ করেন।

১৮৫৭ সালের সিপাহি বিপ্লবের সময় বিক্রমপুর পরগনার ভাগ্যকূল জমিদার বাড়ির রাজা ব্রাদার্স এস্টেটে এবং সাটুরিয়া থানার বালিহাটির জমিদার বাড়ির দুর্গা পূজার আয়োজনের ব্যাপকতা বেশ প্রসিদ্ধ ছিল। সেইসময় সিদ্ধেশ্বরী জমিদার বাড়ি ও বিক্রমপুর হাউসেও জাঁকজমকপূর্ণ দুর্গা পূজার আয়োজন হতো বলে নানা তথ্য পাওয়া যায়। ১৯২২-২৩ সালে ঢাকার আরমানিটোলায় জমিদার শ্রীনাথ রায়ের বাড়ির পুজোও বেশ বিখ্যাত ছিল।

১৯৪৭ এর দেশ বিভাগের পর এককভাবে পূজা করাটা বেশ ব্যয়সাপেক্ষ হয়ে ওঠে। এইসময় অভিজাত এবং বিত্তশালী হিন্দুদেরও প্রভাব-প্রতিপত্তি কমতে শুরু করে। ফলে সারা বাংলাদেশে একক দুর্গাপূজা থেকে প্রথমে বারোয়ারি এবং পরবর্তীকালে সার্বজনীন পূজার চল শুরু হয়। সার্বজনীন হওয়ার পর থেকেই দুর্গোৎসব বাঙালির জাতীয় উৎসবে পরিণত হতে শুরু করে।

তবে অনেকেই মনে করেন, অবিভক্ত বাংলায় দুর্গাপুজো শুরু সপ্তদশ শতাব্দীতে, রাজা নবকৃষ্ণ দেবের আমলে। বিংশ শতকের শুরুর দিকে বাংলাদেশে দুর্গাপুজো সমাজের বিত্তশালী এবং অভিজাত হিন্দু পরিবারদের মাঝেই সীমাবদ্ধ ছিল। গত শতাব্দীর শেষের দিকে দুর্গাপুজো সর্বজনীন রূপ পায়। বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে, বিশেষ করে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, রাজশাহী এবং চট্টগ্রামের মতো শহরগুলোতে দুর্গাপূজা জাঁকজমকপূর্ণভাবে উদযাপন করা হয়।

বাংলাদেশের প্রধান দুর্গাপূজাগুলি:
ঢাকা
ঢাকেশ্বরী মন্দির: ঢাকার ঐতিহ্যবাহী হিন্দু মন্দিরগুলির মধ্যে ঢাকেশ্বরী মন্দির অন্যতম। এখানে দুর্গাপূজার আয়োজন অত্যন্ত জাঁকজমকভাবে হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হল পূজা মন্ডপ।
রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশন: ঢাকার গোপীবাগে অবস্থিত এই মঠে প্রতি বছর দুর্গাপূজা অনেক ভক্তের সমাগমে পালিত হয়।
রমনা কালী মন্দির
বনানী পূজা মণ্ডপ: প্রতিবছর বনানী খেলার মাঠে অস্থায়ী পূজা মণ্ডপ তৈরি করা হয়। ব্যয়বহুল জাঁকজমকপূর্ণ এই পূজা মণ্ডপে অনেকেই আসেন।
খামারবাড়ি পূজা মণ্ডপ: কৃষিবিদ ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ (কেআইবি) এর পাশেই খামারবাড়ি পূজা মণ্ডপ। আলোকসজ্জা, প্রতিমার সৌন্দর্য, প্রবেশদ্বার, আভ্যন্তরীণ কাঠামোশৈলী ও প্যান্ডেলের কারণে আলোচিত খামারবাড়ি পূজা মণ্ডপ।
পুরান ঢাকার পূজা মণ্ডপ।
শ্রী শ্রী সিদ্ধেশ্বরী কালী মন্দির: মৌচাক বাজারের কাছে সিদ্ধেশ্বরী এলাকার অভ্যন্তরে অবস্থিত।

চট্টগ্রাম
চৌমুহনী সার্বজনীন বিজয়া দুর্গা মন্দির: নোয়াখালীর এ মন্ডপে ৭১ ফুট উচ্চতার বাংলাদেশের উচ্চতম দুর্গা প্রতিমা নির্মিত হয়েছিল।] আনন্দময়ী কালীবাড়ি মন্দির: চট্টগ্রামে এই মন্দির দুর্গাপূজার জন্য বিখ্যাত। হাজার হাজার ভক্ত এখানে পূজার সময় জড়ো হন।

রংপুর
রীঁ শ্রী শ্রী করুণাময়ী কালীবাড়ি, রংপুর সদর
মদন মোহন ঠাকুরবাড়ি, পালপাড়া, রংপুর
সিন্দুরমতি সার্বজনীন দুর্গা মন্দির, লালমনিরহাট
সেনপাড়া কালির পাঠ সার্বজনীন দুর্গা মন্দির
শ্রীশ্রী রাধা-গিরিধারী মন্দির, বানিয়ার দিঘী, লালমনিরহাট

কুমিল্লা
নানুয়া দীঘির পাড়: কুমিল্লায় দুর্গাপূজার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। এখানকার পূজার মণ্ডপগুলো অত্যন্ত সুন্দরভাবে সাজানো হয়।

শ্রীহট্ট, বা সিলেট

শ্রীহট্টের মৌলভীবাজারের রাজনগর উপজেলার পাঁচগাঁওয়ে পূজিত হন লালবর্ণের দেবী। এই পুজো প্রায় ৩০০ বছরের পুরনো। এই উপমহাদেশে এখানেই একমাত্র রক্তবর্ণ দুর্গার পূজা হয়।
গোয়াইনঘাটে বিভিন্ন মন্দির সিলেট অঞ্চলে দুর্গাপূজার উৎসব অত্যন্ত আন্তরিকতার সাথে পালিত হয়।

রাজশাহী
রাজশাহী শহরের বিভিন্ন মন্দিরে দুর্গাপূজা ব্যাপকভাবে পালিত হয় এবং বিশেষ করে রাজশাহী শহরের কেন্দ্রীয় মন্দিরগুলোতে বড় আকারের পূজা হয়।

খুলনা
শিকদার বাড়ি পূজা মন্ডপ: বাগেরহাট সদর দক্ষিণ হাকিমপুর শিকদার বাড়ির পুজোয় ২০২৩ সালে ৫০১টি প্রতিমা দিয়ে পুজো মণ্ডপ সাজানো হয়েছিল। আয়োজকরা প্রতিমার সংখ্যার দিক দিয়ে এই মণ্ডপকে এশিয়া মহাদেশের মধ্যে সবচেয়ে বড় মণ্ডপ বলে দাবি করেছিলেন ।
গোপালগঞ্জের মঠ: খুলনা অঞ্চলে এই মঠে দুর্গাপূজা অত্যন্ত ধুমধামের সাথে পালিত হয়।

বরিশাল
মাধবপাশার দুর্গাপূজা: বরিশাল অঞ্চলে মাধবপাশার দুর্গাপূজা ঐতিহ্যবাহী ও সুপরিচিত।

উপরের ছবিটি ২০১৩ সালে রামকৃষ্ণ মিশনের দুর্গাপুজা

উনিশ শতকের ত্রিশ চল্লিশের দশকের সময়কালে বাংলায় গ্রাম গঞ্জে ব্রাক্ষ্মণবাদের বিরুদ্ধে জাগরণ ঘটে, তখন অনেক দুর্গাপুজার নিয়ন্ত্রণ বাবুদের হাতে আর থাকে না। অধ্যাপক যতীন সরকার একটি ঘটনার বিবরণ দেন, তাঁর নিজের গ্রাম নেত্রকোনার চন্দপাড়ায় দেবেন্দ্র দাস নামে একজন অব্রাহ্মণ উপনয়ন ধারণ করে নিজেকে ব্রাহ্মণ বলে ঘোষণা করেন। ফলে সমস্ত ব্রাহ্মসমাজ তাকে একঘরে করার চেষ্টা করে। আর দেবেন্দ্র তখন নিজেই প্রতিমা নির্মাণ করেন, নিজেই পৌরহিত্যে নিজ বাড়িতে পূজা শুরু করেন এবং তার বাড়ির পূজা ১৯৫৮ সাল পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হয়েছিল। তারই দৃষ্টান্তে অনুপ্রাণিত হয়ে আরও কয়েকজন অব্রাহ্মণ বিদ্রোহ করেন এবং পুরোহিত ছাড়াই তাঁরা দূর্গাপূজার অনুষ্ঠান শুরু করেছিলেন। এটি একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নাকি বাংলাদেশের অন্যান্য অঞ্চলে এমনটি ঘটেছিল তা জানা যায়নি। তবে ব্রাহ্মণ্যবাদের বিরুদ্ধে অন্য হিন্দুরা বিভিন্ন সময় প্রতিবাদ করেছিলেন তার বিভিন্ন প্রমাণ পাওয়া যায়। দেশভাগের সময় সাম্প্রদায়িক অত্যাচারে অনেক হিন্দু পরিবার পশ্চিম বাংলায় চলে আসেন। ফলে পারিবারিক বা একক উদ্যোগের পূজা উদযাপন কঠিন হয়ে পড়ে। এরপর পঞ্চাশের দশকে বহু ক্ষেত্রে ব্রাহ্মণ ও অব্রাহ্মণ একত্রিত হয়ে সার্বজনীন পূজার আয়োজন করে। পাকিস্তান আমল ও বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর সবই ছিল সার্বজনীন দুর্গাপূজা। এর কেন্দ্র হয়ে ওঠে ঢাকেশ্বরী মন্দির। কিন্তু ব্যক্তি বা পরিবার কেন্দ্রিক পূজো যে হয়নি তা কিন্তু নয়।

বাংলাদেশে পুরনো ঢাকার পূজা মানেই অন্যান্য সকল পূজার তুলনায় স্বতন্ত্র। পুরনো ঢাকার তাঁতিবাজার আর শাঁখারি বাজারের পূজা দেশের অন্য সব পূজার চেয়ে বেশ অনন্য এবং বৈচিত্র্যপূর্ণ। শাঁখারি আর তাঁতি বাজারের রাস্তাগুলি প্রশস্ত নয়, মাত্র দশ-পনেরো ফুটের রাস্তা। সেই রাস্তার উপরেই নির্মিত হয় বাঁশ-কাঠের নানা বৈচিত্র্যপূর্ণ অস্থায়ী মণ্ডপ। এখানে ২০/২৫-টির মতো পূজা হয়। বাংলাদেশের কোথাও এক জায়গায় এতগুলি পূজার আয়োজন করা হয় না। বাহাদুর শাহ পার্কের সামনে থেকে দশ-পনের ফুট চওড়া গলিতে ঢুকে যেতে হয়। মণ্ডপের নিচে দর্শনার্থীদের হাঁটার পথ। চল্লিশ থেকে পঞ্চাশ গজ দূরত্বে একটার পর একটা পূজা দেখার সুযোগটা হাতছাড়া করতে চান না অনেক দর্শনার্থীরাই। এই বিশাল আয়োজনকে ঘিরে এখানে মেলাও বসে যায়।

চট্টগ্রামের রাজাপুকুর লেন, দক্ষিণ নালাপাড়া, টেরিবাজার, হাজারি লেন কিংবা আগ্রাবাদের একতা গোষ্ঠী বা গোঁসাইডাঙার বারোয়ারি পূজা মণ্ডপগুলোতে বিষয়ভিত্তিক বা থিম পূজার ব্যাপক প্রসার ঘটেছে। সেই থিম পূজাগুলো বেশ বৈচিত্র্যপূর্ণও।

কোথাও মা দুর্গার বিভিন্ন রূপ, কোথাও সামাজিক সমস্যা, কোনো কোনো পূজা মন্ডপের থিম ‘গাছ বাঁচাও, মানুষ বাঁচাও’ আবার কোথাও রয়েছে এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের অপার রহস্যের গল্প। এভাবে বাংলাদেশের বিভিন্ন বিভাগীয় শহর, জেলা, উপজেলা কিংবা গ্রামের পূজাগুলোয় এখন সাবেকী ঐতিহ্যের পাশাপাশি বিষয়ভিত্তিক পূজার প্রচলনও শুরু হয়ে গেছে।

অতীতের পুজার নানা আনুষ্ঠানিকতা
সাতচল্লিশের দেশভাগের আগে ও পরে পূর্ববাংলা এবং পরবর্তীকালে স্বাধীন বাংলাদেশে আশির দশক পর্যন্ত দুর্গোৎসবে শারদীয় বিনোদনের প্রধান মাধ্যমই ছিল যাত্রাপালা, কীর্তন, কবিয়াল গান বা পালাগান। সে সময়ের বিভিন্ন মণ্ডপে যাত্রা বা পালাগানের আসর বসতো। সপ্তমী থেকে নবমী পর্যন্ত সন্ধ্যারতির পর শুরু হতো যাত্রাপালা বা পালা গানের আসর। যাত্রাপালা সম্রাট ব্রজেন্দ্র কুমার দে (১৯০৭-১৯৭৬) দুর্গাপূজার স্মৃতিকথায় লিখেছেন,
“সন্ধ্যাবেলা পালা আরম্ভ হতো। শেষ হতো ভোর বেলায়, কাক ডাকলে।… পালাগুলো ছিল অত্যাধিক দীর্ঘ। কেউ বক্তৃতা আরম্ভ করলে সহজে ছাড়তো না।”

বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ ড. মুনতাসীর মামুনের ‘দুর্গা পূজা’ শীর্ষক প্রবন্ধে এ অঞ্চলে দুর্গা পূজায় যাত্রাপালার ঐতিহ্য সম্পর্কে জানান যে, “বিগত শতাব্দীর চল্লিশের দশকে ময়মনসিংহের মুক্তাগাছা ও গৌরীপুর জমিদার বাড়িতে যে দূর্গা পূজার আয়োজন করা হতো তাতে প্রধান আকর্ষণই ছিল যাত্রা। সপ্তমী থেকে নবমী পর্যন্ত তিনদিন ধরে মন্দির চত্বরে বসতো যাত্রার আসর। দেশীয় যাত্রাদলের পাশাপাশি কোলকাতার দলগুলোকেও বায়না করে আনা হতো।”

ষাটের দশকে রাজবাড়ি জেলার রামদিয়া ও পার্শ্ববর্তী বহরপুর গ্রামে, ঢাকার কারওয়ান বাজারস্থ পাল পাড়া গ্রামে বারোয়ারি দুর্গা পূজায় যেমন সারারাত ধরে যাত্রা পালার আসর বসতো, ঠিক তেমনি দিনের বেলায় অনেক স্থানে নির্মলেন্দু লাহিড়ির কণ্ঠে সিরাজউদ্দৌলার অবিস্মরণীয় সেই রেকর্ডও শোনা যেতো।

১৯৬৯ সালে গণঅভ্যুত্থানের সময়ে সাহাবাড়ির দুর্গা পূজায় প্রথম বিপ্লবী পালা ‘একটি পয়সা’ মঞ্চস্থ হয়। ব্রিটিশ আমল থেকে শুরু করে বাংলাদেশ স্বাধীনতার পূর্বে এবং পরবর্তী সময়ে সিলেটের হাওড় অঞ্চল এবং বিভিন্ন চা বাগানের দুর্গা পূজায় যাত্রা গানের আসর বসতো।

আশির দশকের পর গ্রামীণ মানুষের বিনোদনের এ ধারার পরিবর্তন ঘটতে থাকে। যাত্রাপালা, পালা গান, কবিয়াল বা কীর্তনের মতো ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতির বদলে স্থান করে নেয় বাংলা সিনেমার গান আর আধুনিক বাংলা গান। এখন শহর তো বটেই, এমনকি গ্রামাঞ্চলের পূজামণ্ডপগুলোতেও উচ্চস্বরে মাইক বাজিয়ে হিন্দী কিংবা বাংলা রক ও ব্যান্ড গান বাজাতে শোনা যায়। ফলে সময়ের সাথে সাথে সেসব ঐতিহাসিক যাত্রাগান, কবিগান বা কীর্তনের আসর আস্তে আস্তে বাংলার সংস্কৃতি থেকে হারিয়ে যেতে বসেছে।

কৃতজ্ঞতা স্বীকার ও তথ্যসুত্র: ইন্টারনেটের বিভিন্ন ওয়েবসাইট।

*******

Sahityika Admin

Add comment