প্রবাসে দৈবের বশে
© প্রদীপ্ত কুমার সিংহ, ১৯৭৪ মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং
জানুয়ারী ১৯৭৬। আমার কর্মজীবনের শুরু সুদূর তামিলনাড়ুর তিরুচিরাপল্লীস্থিত BHEL কর্মশালায়। নির্ভেজাল এক বঙ্গসন্তান যে বাংলা ছাড়া কিছুই বলতে জানে না, পারে না, তাঁকে এখন যেতে হবে এমন এক জায়গায় যেখানে এক বর্ণও বাংলা চলবে না। আর হিন্দি? নৈব নৈব চ। আমার হিন্দি জ্ঞান ‘মাসিমার রাষ্ট্রভাষা’ জ্ঞানের মতই সীমিত। অনেকটাই ‘চোখের মাথা খায়া হ্যায়?‘ গোছের আর ইংরেজি যদিও বা পড়তে পারি, বুঝতে পারি, কিন্তু ইংরেজিতে কথা বলাটা তখনও শিক্ষানবিশ পর্যায়েই বলা যায়। বাংলা মিডিয়াম ‘কান্দী রাজ উচ্চ বিদ্যালয়’ আর কলেজ ‘বঙ্গীয় কারিগরি মহাবিদ্যালয়, শিবপুর’। যেটুকু জানি পুরোটাই আর বন্ধুদের পাল্লায় গ্যাস খেয়ে দলবেঁধে এন্টার দ্যা ড্রাগন, বা সেইরকম কিছু। ইংরেজিতে কথা বলার সুযোগটা কোথায়? আবহাওয়া, সংস্কৃতি, খাওয়াদাওয়া, পোষাক পরিচ্ছদ, আদব কায়দা, ভাষা, সবই একদম আলাদা। আমাদের ব্যাচে জনা পঁয়ষট্টি উত্তর ভারতীয় (তারমধ্যে ন’জন বঙ্গসন্তান) থাকায় তামিল ভাষা শেখার তাগিদ উপলব্ধি করিনি। তবে সবাই বলতো আমার হিন্দি শুনে উত্তর ভারতীয় বন্ধুরা নাকি বাংলা ভাষাটা ভালো রপ্ত করে নিয়েছিল।
আমাদের ট্রেনিং পর্ব শেষ হতে না হতেই ১৯৭৭ এর জানুয়ারিতে নতুন গ্র্যাজুয়েট ইন্জিনীয়ার ট্রেনীর দল এসে হাজির। ঐ দলে আবার ছ’জন বাঙালি। তার মধ্যে চারজন শিবপুরের। আমাদের আর পায় কে? মারো গোলি তামিল। হাটেবাজারে, রাস্তাঘাটে হৈহৈ করে বাংলা বলছি। তামিলরা কি বলে আমরা বুঝি না, আমরা কি বলি ওরা বোঝে না। ওরাও হাসে, আমরাও হাসি। মনের আনন্দে ভালোই কাটছে দিনগুলি। আর হাতে চার অঙ্কের মাইনে। আমাদের কাছে ‘BHEL’ তখন ‘Be Happy and Enjoy Life.’ স্বাভাবিকভাবেই বিয়ের বাজারে সকলের বাজার দর চড়চড় করে উঠছে। প্রতিমাসেই একজন দু’জন করে লজ্জাবনত নববধূর আগমন শুরু হলো। Owner’s pride, neighbour’s envy. বৌ তো আনবে কিন্তু রাখবে কোথায়? সুতরাং নতুন কলোনি তৈরী হলো, Probationers’ Hostel ..সংক্ষেপে PH মানে এক একটি স্টুডিও ইউনিটে ৬’x৩’ সাইজের দুটি খাট (সুটকেশ ইত্যাদি খাটের তলায়) রাখার মত একটি বেডরুম। তারই মধ্যে মুখ ধোয়া, দাড়ি কামানোর জন্য একটি আয়না (বৌয়ের ড্রেসিং টেবিল) সহ ছোট একটি বেসিন। সব কাজ সেরে বেড়িয়ে আসার জন্য একটি বাথরুম। আমরা নাম দিয়েছিলাম Bathroom with attached Bedroom ..আর ছোট্ট একটি রান্নাঘর।
১৯৭৮ এর জানুয়ারির শেষাশেষি গুনে গুনে চৌদ্দটি লটবহর সঙ্গে তানপুরা রন্জিত গীতবিতান হস্তে আমার সর্বক্ষণের সঙ্গিনী মৈত্রেয়ীকে নিয়ে নামলাম তিরুচিরাপল্লী জংশনে। প্রায় সব বঙ্গবন্ধুরাই স্টেশনে হাজির ছিল PH কলোনির প্রথম বঙ্গবধূকে অভ্যর্থনা জানানোর জন্য। শুরু হলো নতুন অধ্যায়। না গ্যাস, না ফ্রিজ ..সম্বল বলতে Indian Oil এর দুটো কেরোসিনের স্টোভ (বাজারে সদ্য এসেছে, high flame low kerosene consumption ..IOCL এর marketing gimmick ..এক একটির দাম ৩৫ টাকা) আর বিয়েতে পাওয়া কিছু বাসনপত্র। তাই দিয়েই পাতা হলো নতুন সংসার।
*********
আসি আমাদের ত্রিচির প্রথম দুর্গাপূজার কথায়।
এতক্ষণ ইতিহাস লিখছিলাম যে কিভাবে সেই প্রবাসে বঙ্গসন্তানগুলি একত্র হয়েছি, অনেকেই সস্ত্রীক। অনেক নরক গুলজার হয়েছে; এবার কী কিছু উৎসব হবে না? চলো দেখা যাক কী করা যায়? বাংলা নববর্ষের ক্যালেন্ডার বাজারে বেরুলেই সারা ভারতবর্ষ জুড়ে বাঙালিদের প্রথম কাজ ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টে দেখা ‘এবার দূর্গা পুজো কবে?’ (** এখন মাঝে মাঝে ভাবি ১৯৭৬ থেকে ১৯৮৫ পর্যন্ত এই ১০ টা বছর সুদূর তামিলনাড়ুর তিরুচিরাপল্লীতে আমরা বাঙালিরা দূর্গাপুজো ছাড়া কি করে বেঁচে ছিলাম?) প্রথম দিকে নবাগত বাঙালিদের অনেকেই পুজোর ক’টা দিন ছুটি নিয়ে নিজেদের বাড়ি চলে যেত। ছেলেমেয়েরা স্কুলে ভর্তি হয়ে গেলে সেটা আর সম্ভবপর হতো না। কেননা তামিলনাড়ুর স্কুলে পুজোর ছুটি বলে কিছু ছিল না। মনে পড়ে প্রথমে যখন এসেছিলাম, তখন দেবীপক্ষ শুরু হতেই রেডিওতে আকাশবাণী কলকাতা কেন্দ্র থেকে পুজোর ক’দিন ঢাকের বাজনা বাজানো হতো অনুষ্ঠানের ফাঁকে ফাঁকে? ঢাকের বাজনা আর পুজোর ক’দিন নতুন জামাকাপড় পরে পালা করে সন্ধে থেকে কারুর বাড়িতে আড্ডা আর খাওয়াদাওয়ার মধ্যেই আমাদের পুজোর আনন্দ সীমিত থাকতো। নিজেদের মধ্যেই বলাবলি করতাম ‘আজ মহাষ্টমী‘, ‘আজ মহানবমী‘ ..
আমাদের কৈলাসপুরম টাউনশিপে নিয়মিত সরস্বতী পুজো উদযাপন হতো। কিন্তু দুর্গাপুজো ব্যাপারটা চিন্তার বাইরে ছিল। ১৯৮৬ সালের এপ্রিল মাস। নতুন আর্থিক বছরের শুরু। বছরের শুরুতে কাজের চাপ সাধারণত থাকে না। এক উইকএন্ডে পাঁচবন্ধু মিলে সপরিবারে আড্ডা মারছি। কথায় কথায় কথা উঠলো ‘এবার দূর্গাপুজো করলে কেমন হয়?’ গিন্নীরাও নেচে উঠলেন, আমাদের নাচিয়েও দিলেন। দুর্গাপুজোর ভাবনায় প্রথম উপকরণগুলি হলো তিনটে ‘প’। পুজো মন্ডপ, প্রতিমা, পুরোহিত। যেই ভাবা সেই কাজ। প্রথমেই চতুর্থী থেকে একাদশী আর লক্ষ্মীপুজো সব মিলিয়ে ন’দিনের জন্য আমাদের টাউনশিপের কমিউনিটি হল বুক করে দিলাম। খবর পেলাম প্রতিবছর ব্যাঙ্গালোরের Bengal Association-এ কুমারটুলি থেকে একজন প্রতিমা শিল্পী আসেন আর association complex-এ ব্যাঙ্গালোর, মাইশোর ও আশপাশের দুর্গাপুজোর জন্য গোটা সাত আটেক প্রতিমা তৈরী করেন। ওখানেই আমাদের প্রতিমারও বায়না দিয়ে দিলাম। প্রথম পর্বের পরিসমাপ্তি।
এবার মিশন পুরোহিত। গরমের ছুটিতে সপরিবার কান্দি গিয়ে আমার মেজকাকাকে (বাবু’দা নামেই অধিক পরিচিত) পুরোহিতের ব্যাপারটা বিহিত করতেই উনি এক কথায় জানালেন, ‘শঙ্করকে নিয়ে যা। আমার SDO অফিসের সহকর্মী। কথা বলে নোবো।’ একদিন অফিস ফেরত কাকার সঙ্গে শঙ্কর কাকা @ কুমারেশ রায় এলেন। ত্রিচি যেতে রাজীও হলেন। সঙ্গে ভাগ্নে @ রাধামাধব চট্টোপাধ্যায় কাকাও যাবেন। রাধামাধবকাকা আমাদের জীবধরপাড়ার পুরোনো বাসিন্দা ছিলেন। আমার কাকা আশ্বাস দিলেন যে পুজোর যাবতীয় উপকরণ কুমারেশ কাকাদের হাত দিয়ে পাঠিয়ে দেবেন। শুধুমাত্র নবপত্রিকা বাঁধার জন্য যেসব গাছগাছরা লাগে সেগুলি আমাদের ত্রিচি থেকেই যোগাড় করতে হবে। মিশন পুরোহিত সম্পন্ন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্বের পরিসমাপ্তি। নবপত্রিকা ব্যাপারটা ঝুলে রইলো।
লিস্ট এলো যথাসময়ে। ‘নবপত্রিকা‘ বাংলার দুর্গাপূজার একটি বিশিষ্ট অঙ্গ। এই শব্দটির আক্ষরিক অর্থ নয়টি গাছের পাতা। তবে বাস্তবে নবপত্রিকা নয়টি পাতা নয়, নয়টি উদ্ভিদ। কদলী বা রম্ভা (কলা), কচু, হরিদ্রা (হলুদ), জয়ন্তী, বিল্ব (বেল), দাড়িম্ব (ডালিম), অশোক, মানকচু, ধান ও শ্বেত অপরাজিতার লতা। বোঝো ঠ্যালা। তামিল দেশে লোকজনকে অশোক, মানকচু, জয়ন্তী, শ্বেত অপরাজিতার লতা এসব বস্তু বোঝাই কি করে? কথিত আছে মায়ের পুজো মা নিজেই করিয়ে নেন। একদিন The Hindu পত্রিকায় নজরে পড়লো ‘Miss Aruna Basu IFS, is posted as District Forest Officer, Tiruchirappalli, নিজ দায়িত্বে ফোন করলাম। সুদূর ত্রিচিতে ফোনের অন্য প্রান্তে সদ্য আসা এক বঙ্গকন্যা ফোনে বাংলা কথা শুনে যারপরনাই বিস্মিত ও আনন্দিত। একদিন চায়ের নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে এলেন। বাচ্চা মেয়ে। Botany Hons নিয়ে প্রেসিডেন্সি কলেজের স্নাতক, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এম এস সি। চা বিস্কুট খাইয়ে নবপত্রিকার লিস্টটা ধরিয়ে দিলাম। যথা সময়ে উনি সব কিছু বস্তাবন্দি করে পৌঁছে দিলেন। এরপর থেকে প্রতিবছর নিয়ম করে সেগুলি যথাসময়ে পাঠিয়ে দিতেন।
ত্রিচিতে BHEL, আর Ordnance Factory মিলে বাঙালি কর্মীসংখ্যা জনা পঞ্চাশ আর NIT ত্রিচির জনা চল্লিশ বাঙালি ছাত্র। সবাইকে এক ছাতার তলায় নিয়ে এলাম। স্ত্রী-পুত্র-কন্যা সব মিলিয়ে আমাদের সংখ্যাটা দাঁড়ালো শ’দেড়েক। দুর্গাপুজো একবার শুরু করলে পরপর তিনবছর করতেই হয়। তার ফলস্বরূপ আমাকে ‘৮৬-‘৮৮ তিন বছর তিরুচিরাপল্লী সর্বজনীন পুজো কমিটির সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করতে হয়েছিল।
দক্ষিণ ভারতে খুব ধূমধামের সঙ্গে ‘নবরাত্রি‘ পালিত হয়। একটা উৎসবের বাতাবরণ থাকে। মহানবমীর দিন আমাদের কারখানার এ প্রত্যেক shop floor এ ‘আয়ূধা পুজো‘ (চারহাতের সরস্বতী, বাহন ময়ূর, দক্ষিণের বিশ্বকর্মা) পুজো হতো। ঐদিন সকল জনসাধারণের জন্য অবারিত দ্বার। টাউনশিপে প্রথম দূর্গাপুজোয় সবার কাছ থেকে অভূতপূর্ব সাড়া পেলাম। স্থানীয় তামিল, তেলেগু, মালয়ালম সমাজের লোকজনদের জন্য মহাসপ্তমী, মহাষ্টমীর দু’টি সন্ধেতে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান নির্দিষ্ট করা হলো। আর বাঙালিদের জন্য রইলো মহাষষ্ঠীতে আগমনী আর মহানবমীতে বিবিধ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। সে কি উন্মাদনা। বিশেষকরে বৌ বাচ্চাদের। পূজোর আগে মাস দেড়েক প্রত্যেক দিন কারুর না কারুর বাড়িতে নাচগানের রিহার্সাল আর আমাদের ছেলেদের মিটিং। সেইসঙ্গে চা তারসঙ্গে টা বলতে ঘুগনি। শেষকালে আমি গান বাঁধলাম ‘দুরন্ত ঘুগনির এই লেগেছে পাক ..’।
দেখতে দেখতে আমাদের বহু আকাঙ্খিত দূর্গাপূজো এগিয়ে এলো। এখনও মনে পড়ে যেদিন ব্যাঙ্গালোর থেকে প্রতিমা নিয়ে ফিরলাম। ২ রা অক্টোবর। ছুটি থাকার জন্য সবাই বাড়িতে। কী ভীড় যে হয়েছিল প্রতিমা দর্শনের জন্য। এখন ভাবি মা’কে ব্যাঙ্গালোর থেকে একা কিভাবে নিয়ে এসেছিলাম? সবই মায়ের আশীর্বাদ। কুমারেশ কাকারাও নির্বিঘ্নে পৌঁছে গেলেন। শুরু হলো মায়ের পুজো। সেই পুজো এখনও চলছে। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে অনেকগুণ বড় হয়ে।
প্রথম দুর্গাপুজো। ভেল ত্রিচি ১৯৮৬। স্মৃতিতে অমলিন
I read comments from different persons. But none of them possibly know, the real story before the stage was set for this photo. How many sleepless nights Pradipta Sinha, the founder Secretary (1st Secretary of the Durga Puja at BHEL Trichy) had to pass through, what odds he had to endure. Some of us who stood behind him in those turbulent days are the witness, – but as I wrote “stood behind” literally means just stood behind – making it “Plural number” only. It was the single-handed effort and determination of Pradipta Sinha which made the above photo possible. Look at Pradipta’s face in the photo – it will tell you about the sleepless nights he suffered. Here, I must record the contributions and sacrifice made by Papan (Maitrei Sinha) who stood – not behind – but by the side of Pradipta like the real “Sahadharmini”. I was expecting to see some comments from BHEL Trichy guys of those days. Unfortunately, we have lost some senior people – Pranata Chakraborty – the 2nd Secretary and S K Guha – the decoration incharge. Me – the 3rd Secretary, is still ticking. I possibly got overwhelmed in sentiment seeing the photo. Excuse me.
– Tapan Mitra

ত্রিচি ১৯৮৭ দুর্গাপুজো
দাঁড়িয়ে ভদ্রলোক মজুমদার’দা। পুরোনো বাঙালি। আমার ১৯৮৬ র প্রথম দুর্গাপুজোর শেষে বিজয়ার কোলাকুলিতে জড়িয়ে ধরে ‘প্রদীপ্ত, তুমি লিডার। আমি মানছি।’ এখনও কানে বাজে কথাগুলো।
আমাদের সময় সকল দন্ডমুন্ডের কর্তা ছিলেন রামকৃষ্ণণ সাহেব। দীর্ঘদিন দুর্গাপুর স্টীলে কর্মজীবনের সুবাদে ত্রিচির দুর্গাপুজোকে সাফল্যমন্ডিত করার পিছনে উনার অবদান অনস্বীকার্য্য।
১৯৯২ সাল, ১৬ বছর থাকার পর বিদায় ত্রিচি
মুছে যাওয়া দিনগুলো আমায় যে পিছু ডাকে।
********






Add comment