সাহিত্যিকা

আমার শিক্ষক

আমার শিক্ষক
@ মানস ঘোষ, শিশির কুমার ঘোষের পুত্র

**********
এই লেখার মাঝপথে আরেক পরম শিক্ষক যমরাজ মহাশয় আমায় মিসড কল করেন। হালকা হার্ট অ্যাটাক হয়। তারপর অপারেশন। একটা লেখার জন্য “আদেশ” ছিল, কিন্তু হাসপাতাল থেকে ফেরার পর বাধানিষেধের জন্য আর সময় পাচ্ছিলাম না। আজ ২৭শে আগস্ট পাঠাচ্ছি এ লেখা। জানিনা এ সংখ্যায় এটা প্রকাশ করা সম্ভব হবে কিনা।
**********

১৯৭০ সালে আমার জন্মের একবছরের মধ্যেই বাবা শিশির কুমার ঘোষের বদলি হন বি ই কলেজের P. W. D (Electrical) অফিসে। সেই থেকে দীর্ঘ আঠারো বছর আমাদের পরিবারটি ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে যায় এই ক্যাম্পাসের পরিবেশ, মানুষ, উৎসব, ও সুখ দুঃখের সাথে। অনেক জ্ঞানী গুণী মানুষের সাহচর্য ও প্রতিবেশীদের আন্তরিক ব্যবহার বাবাকে পরিপূর্ণ ও সামাজিক ভাবে খুবই সক্রিয় করে তুলেছিল। কো-অপারেটিভ হোক বা কালীপূজা, দুর্গোৎসব হোক বা নাটকের মহড়া সবেতেই তাঁর ছিল সমান উৎসাহ। অসমবয়সী বন্ধু প্রদীপকাকু (সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং) ছিলেন সবেতেই তাঁর সঙ্গী। আর এই সময়েই আমি একটু একটু করে বড় হচ্ছিলাম।

কবি সুনির্মল বসু একটি অমোঘ লাইন লিখে গেছেন, – ‘বিশ্বজোড়া পাঠশালা মোর, সবার আমি ছাত্র যে!’ শিক্ষকদিবস নিয়ে কিছু লিখতে গেলে বারবার এই কথাটাই মনে পড়ে। কাকে ছেড়ে কার কথা বলি, সে এক ভারি মুশকিল। আসলে আধারটা একেবারেই খালি ছিল তো, তাই প্রথাগত শিক্ষক ছাড়াও বহু মানুষের কাছে বহু কিছু শিখতে হয়েছে। এখনও শিখে চলেছি। তবে এই স্বল্প পরিসরে সেই সকল শিক্ষকদের কথা বলা সম্ভব নয়। তাই আজ শুধু কয়েকজন প্রথাগত শিক্ষক, অর্থাৎ স্কুল কলেজে আমাদের যাঁরা পড়িয়েছেন তাঁদের নিয়েই দু’চার কথা বলবো।

বাবার চাকরির সূত্রে আমার ছোটবেলা কেটেছে বিই কলেজের ক্যাম্পাসে। তখন আশেপাশের ছোটরা মোটামুটি সকলেই বি, ই, কলেজ ক্যাম্পাসের ভেতরেই মডেল স্কুলে পড়ে। আর আমারও সৌভাগ্য যে আমি ক্লাস ওয়ান থেকে টুয়েলভ পর্যন্ত বি, ই, কলেজ মডেল স্কুলে পড়ার সুযোগ পেয়েছি।

প্রথমেই মনে পড়ে, ভারি প্ৰিয় ছিলেন আমাদের বাংলা দিদিমনি। হ্যাঁ, প্রাইমারিতে বাচ্চাদের জন্য এরকমই বলার দস্তুর ছিল। পোশাকি নাম, রেবা ব্যানার্জী। আমাদের সবার প্ৰিয় রেবা দিদিমনি। খুব সুন্দর ফ্রেমের একটি হাই পাওয়ার চশমার আড়ালে একজোড়া উজ্জ্বল সহাস্য চোখ। মনে হত যে সবসময়ই মুখে একগাল হাসি লেগে রয়েছে। আমাদের সময় ছাত্রছাত্রীদের দু চার ঘা দেওয়া একেবারেই কোনো গর্হিত অপরাধ ছিল না, কিন্তু রেবা দিদিমনি কাউকে কখনো মারছেন বলে দেখিনি। জোরে ধমক দেবার সময়ও মনে হত হালকা একটা হাসি যেন মুখে লেগে আছে। চেহারায়, স্বভাবে আমার মায়ের একটা আদল ছিল। হয়ত সেই কারনেই…। নাহলে দীনেশ স্যারও আমার ফেভারিট হতে পারতেন, ওঁর মতো এত সুন্দর করে ইংরাজি পড়ানো, বিশেষত ওই বয়সী বাচ্চাদের, এখনো ভাবলে অবাক লাগে। রানু দিদিমনি হতে পারতেন, বাইরে শক্ত, ভেতরে নরম, অংকের ভিত গড়ে দিয়েছিলেন, শৃঙ্খলার প্রথম পাঠ ওনার কাছেই। আসলে সে সময়টাই অন্যরকম ছিল। শিক্ষকের যে সমালোচনা করা যেতে পারে তা আমরা স্বপ্নেও ভাবতে পারতাম না। শিক্ষক মানেই শ্রদ্ধেয়, তারই মধ্যে বিশেষ কারনে কেউ হয়ত বেশি প্ৰিয়।

প্রাইমারির পর ক্লাস ফাইভ থেকে টুয়েলভ ছিল অন্য জগত। সেখানেও আমাদের পড়ানোর ব্যাপারে প্রত্যেক শিক্ষক শিক্ষিকার নিষ্ঠা ও আন্তরিকতা ছিল দেখার মতো। আমি যে ফাঁকিবাজ ছাত্র ছিলাম সে আলাদা কথা। স্মার্ট, সবসময় টিপটপ থাকা, উত্তর লেখার ব্যাপারে পারফেকশনিস্ট রবীনস্যারকে পছন্দ করার যথেষ্ট কারণ ছিল, কিন্তু সেই বাংলাতে এসেই আটকালাম।

জয়ন্ত স্যার আর শ্যামলী দিদিমনি। শ্যামলী দিদিমনি বহু বহু ব্যাচের ছেলেমেয়েদের কাছে খুব জনপ্রিয় ছিলেন। বেশ মজা করে কথা বলতেন, তবে জয়েন্ট এন্ট্রান্সের প্রতি তীব্র আকর্ষণকে নিয়মিত ব্যঙ্গ করার ফলে উঁচু ক্লাসের ফার্স্ট বেঞ্চের কোনো কোনো aspirant খানিক রুষ্ট হত বৈকি। তারাই আবার জয়ন্তস্যার বাংলা বা ইংরাজি পড়াতে পড়াতে টেক্সট বুকের বাইরে অন্য প্রসঙ্গে চলে যেতেন বলে ক্ষুব্ধ হতো। আর ঠিক সে জন্যই জয়ন্তস্যার ছিলেন আমার প্ৰিয় শিক্ষক। টেক্সট বইয়ের বাইরে আলাদা এক জগত খুলে যেত আমার সামনে। প্রমথনাথ বিশী সহ অনেক প্রথিতযশা সাহিত্যিক ও শিক্ষাবিদের ছাত্র হওয়ার সুবাদে তাঁদের সম্পর্কে কিছু মজার গল্প বলতেন। বলার ভঙ্গিটাও ছিল মনে রাখার মত। শব্দ দিয়ে রচিত হত দৃশ্যকল্প। এখনো চোখ বুজলে দেখতে পাই, পি বি শেলীর মৃত্যু দৃশ্য… নীল.. নীল… আরো নীল…। স্কুলবয়সে তিনি আমার মননকে পুষ্ট করেছেন। তার ফল পেয়েছি পরবর্তী জীবনে। আর কবছর বাদেই নব্বই হবে। তবু ছ’ফুট দু ‘ইঞ্চির টানটান আদৰ্শবাদী জয়ন্ত স্যার এখনও সমান সক্রিয়। এই দুবছর আগেও শিক্ষানীতির সংস্কার চেয়ে পুস্তিকা লিখে বিলি করেছেন বিভিন্ন জায়গায়। এখনও বিদ্যাসাগরের জন্মদিনে বা ভাষাদিবসে তাঁকে দেখা যায় প্রধান বক্তার জায়গায়। ব্যক্তিগত জীবনেও আপস করতে চাননি কখনো। তাই হয়ত অনেকের কাছে অপ্রিয়।

তা হোক। স্কুলবেলা থেকে সেই দীর্ঘ সময়ের পরীক্ষা পার করে উনিই আমার প্ৰিয় শিক্ষক।

*********

Sahityika Admin

2 comments

  • মানসবাবু তাঁর প্ৰিয় শিক্ষকদের গুণাবলী অন্তরের অনুভূতি থেকে বলেছেন।আমরা জানি “Style is the man”।বক্তার রুচি,বলার ভঙ্গি থেকে তাঁকে চেনা যায়।লেখকের ব্যক্তিত্ব মনোযোগী পাঠক ঠিকই ধরেছেন।প্রকৃত শিক্ষক তো এমন ছাত্রই তৈরী করেন।

    • স্যার, আমার প্রণাম নেবেন 🙏
      আপনাকে হয়ত আমরা স্কুলে খুব কম সময়ের জন্য পেয়েছি। তবু আজ পর্যন্ত আমার মতো অনেকের মধ্যে আপনার ব্যক্তিত্বের প্রভাব রয়ে গেছে।