বর্ষার শুভেচ্ছা – সাহিত্যিকা ৫৬ তম সংখ্যা
© বন্দনা মিত্র, ১৯৮৬ মেটালার্জিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং
জানি না, বর্ষার শুভেচ্ছা কেউ জানায় কিনা।
হোক বা না হোক, ক্ষতি কি?
সাহিত্যিকার ৫৬ তম সংখ্যার পাঠক পাঠিকাদের জানাই বর্ষার শুভেচ্ছা।
আবার এসেছে আষাঢ় – ভেবেছিলাম এবছর আর এল না বুঝি।
কত প্রাচীন পিতামহ সমান গাছ কেটেছি, অভিভাবক সম পাহাড় চুরি করেছি, অবাধ অরণ্য বেচে খেয়েছি দু হাতে। বাঁধ দিয়েছি, গলা টিপে স্রোতস্বিনী নদীকে করেছি ফল্গু, সমুদ্রকে দিয়েছি যত ক্লেদ, গ্লানি। উন্নয়নের ঝনঝনে ঢাকা পড়েছে সেই মৃদু স্বর – অশ্বত্থ পল্লবে বৃষ্টি ঝরিয়া/ মর্মর শব্দে/ নিশীথের অনিদ্রা দেয় যে ভরিয়া / মর্মর শব্দে।”
সেই কোন ছোটবেলায় চৈত্র মাসের শেষ বিকেলে আকাশ কালো কুচকুচে, ভীষণ ভয়াল হয়ে উঠত। নারকেল গাছ, সুপুরি, খেজুর গাছ পাগলের মত মাথা নাড়ত, ছাদের ওপরে ডালপালা মেলে ধরা নিমগাছটা ঝিরঝির পাতায় শোঁ শোঁ ডাক দিত, কাকিনী মা তার বাসা সামলাতে চক্কর কাটত কা কা করে। মা চিৎকার করত – ওরে কালবৈশাখী আসছে, দরজা জানালা বন্ধ কর, ছাদের জামা কাপড় মেলা আছে তুলে নে, এখুনি কারেন্ট যাবে, হ্যারিকেনে তেল আছে কিনা দেখ। আমি ছাদে দাঁড়িয়ে দেখতাম, ধুলোয় ঢেকে যাচ্ছে পৃথিবী, মোটা মোটা ফোঁটা ফোঁটা জল পড়ছে গায়ে, একটা অদ্ভুত সুন্দর গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে চারিদিকে, করে জেনেছি একে বলে সোঁদা গন্ধ। আমি খোলা গলায় বলছি – “এপারে তে বৃষ্টি এল / ঝাপসা গাছপালা/ ওপারেতে মেঘের মাথায় একশ মাণিক জ্বালা।”
কড়কড় বাজ পড়ছে। এত মহা সমারোহ করে আসত আমাদের বর্ষা। কালবৈশাখীর পিঠে সওয়ার হয়ে, মেঘদূতের মন্দাক্রান্তা ছন্দে, রবীন্দ্রনাথের গানে, আকাশবাণীর ভেসে আসা অতুল প্রসাদের – “বঁধুয়া, নিদ নাহি আঁখি পাতে” শুনতে শুনতে, রাস্তার হাঁটু জলে কাগজের নৌকা ভাসিয়ে, ঝুম বৃষ্টিতে ভিজে স্কুলে রেনি ডে, হাফইয়ার্লি পরীক্ষায় প্রিয় ঋতুর প্রবন্ধ, স্কুলের বর্ষা মঙ্গল অনুষ্ঠানে মায়ের শাড়ি পরে, চুলে কদমফুলের মালা জড়িয়ে নাচ – রিমঝিম ঘন ঘন রে। আর কিশোরী বয়সে বৃষ্টির ছাঁট গায়ে মেখে, কোলে বৈষ্ণব পদাবলী খুলে অকারণে মন খারাপ।
বয়স বাড়ছে, পৃথিবী রুক্ষ হচ্ছে, আমরা কর্কশ, রূঢ়, প্রয়োজনীয় এক প্রজাতিতে বদলে যাচ্ছি – “গানের পালা শেষ করে দে / শেষ করে দে রে/ যাবি অনেক দূর।”

*********






বর্ষা ঋতুকে স্বাগত জানাই, নতুন একটি আইডিয়া। কয়েক লাইনের ছোট একটি সুন্দর ভূমিকা।
লেখিকার চিন্তাভাবনাকে অভিনন্দন।