সাহিত্যিকা

দুটি প্রাচীন দুর্গাপূজার ইতিহাস – দেশে বিদেশে

দুটি প্রাচীন দুর্গাপূজার ইতিহাস – দেশে বিদেশে
চন্দন গুহ, ১৯৭৭ ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং

দুর্গাপূজার ইতিহাস সুদীর্ঘকালের, এর শুরুর সঠিক ইতিহাস আজও অজানা। হিন্দু পুরাণে দুর্গাপূজার বিভিন্ন কাহিনী পাওয়া যায়। কথিত আছে, পুরাকালে রাজা সুরথ তার হারিয়ে যাওয়া রাজ্য ফিরে পাওয়ার জন্য বসন্তকালে দেবী দুর্গার পূজা করেন। সেজন্য এই পূজাকে বাসন্তী পূজাও বলা হয়। অন্যদিকে কৃত্তিবাসী রামায়ণে শ্রীরামচন্দ্র শরৎকালে লঙ্কাধিপতি রাবণের সাথে যুদ্ধের সময় ১০৮টি নীলপদ্ম সহযোগে দেবী দুর্গার পূজা করেছিলেন। শরৎকাল দেবতাদের নিদ্রাকালীন পর্ব, তাই শ্রীরামচন্দ্রের এই পূজাকে অকালবোধন বলা হয়। দেবীভাগবত পুরাণ, ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ, দেবীমাহাত্ম্যম্ ইত্যাদি উপাখ্যানে এই পূজার উল্লেখ আছে। ভারতীয় উপমহাদেশে প্রাচীনকাল থেকেই দেবী দুর্গার বিভিন্ন রূপে আরাধনা হয়। বাঙালিরা মূলত কৃত্তিবাসী রামায়ণের শ্রীরামচন্দ্রের অকালবোধন – আশ্বিন মাসের শুক্লপক্ষের ষষ্ঠ থেকে দশম দিন পর্যন্ত শারদোৎসব পালন করেন। বেলগাছতলায় মহাদেবের অনুমতি নিয়ে দেবীকে নিদ্রা থেকে জাগিয়ে বোধন পালন করা হয়।

অধুনা বাংলায় দুর্গাপূজা
প্রাপ্ত তথ্য এবং সংশ্লিষ্ট পরিবারগুলির দাবি অনুসারে, বাংলার প্রথম দুর্গাপূজা হয় ১৬০৬ সালে নদিয়ার জমিদার ভবানন্দ মজুমদারের পারিবারিক গৃহে। এরপরেই কলকাতা বা কলকাতা সংলগ্ন অঞ্চলের প্রাচীনতম দুর্গাপূজাটি হয় ১৬১০ সালে বড়িশার সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবারের আটচালা বাড়িতে। মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গীরের অনুদানরূপে আটটি পরগণার করমুক্ত জায়গীরপ্রাপ্তির পর, রায় লক্ষ্মীকান্ত গঙ্গোপাধ্যায় মজুমদার চৌধুরী (সাবর্ণ রায়চৌধুরী) ও তাঁর স্ত্রী ভগবতী দেবী আয়োজিত এই পূজাটি কলকাতার প্রাচীনতম পারিবারিক বা বনেদি বাড়ির দুর্গোৎসব হিসেবে স্বীকৃত। প্রথম যে কাঠামোয় প্রতিমাটি গড়া হয়েছিল সেই কাঠামোটিতেই আজও প্রতিমা গড়া হয়। দুর্গা মন্দিরের পশ্চিমে রাধাকান্ত মন্দির। আটচালায় আসার পথের দুপাশে আছে দ্বাদশ শিব মন্দির। গার্লস হাই স্কুলের কাছে রাধাকান্তের দোলমঞ্চ। রাধাকান্তকে সেখানে নিয়ে প্রতিবার দোল খেলা হয়। সেখানেই বসে রাসের মেলা।

সেই প্রথম পূজাটি হয় কলকাতা শহরের পত্তনেরও আগে, কারণ ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্মকর্তা জব চার্নক ১৬৯০ সালের ২৪ আগস্ট সুতানুটি গ্রামে বাণিজ্য কুঠি স্থাপন করেছিলেন। ভাগীরথী বা হুগলি নদীর তীরে সুতানুটি, কলকাতা ও গোবিন্দপুর – এই তিনটি গ্রাম নিয়ে কলকাতা শহরের ভিত্তি স্থাপন হয়।

ঋষি সাবর্ণির নামানুসারে সাবর্ণ গোত্র বা গোষ্ঠীর পরিচয়। তৎকালীন কাণ্যকুব্জ, অধুনা যা উত্তরপ্রদেশের কনৌজ নামে খ্যাত, সেখানেই ছিল তাঁদের বসবাস। সেকালের বাংলার ব্রাহ্মণেরা যজ্ঞকার্যে পারদর্শী না হওয়ায় কারণে রাজা আদিশূর যে পাঁচ ব্রাহ্মণকে কাণ্যকুব্জ থেকে এনেছিলেন, তাঁরাই রাঢ়ী শ্রেণীর ব্রাহ্মণ নামে পরিচিত। সেই ব্রাহ্মণেরা হলেন- শ্রী বেদগর্ভ, শ্রী দক্ষ, শ্রী ভট্টনারায়ণ, শ্রী হর্ষ ও শ্রী ছন্দ। তারমধ্যে ঋষি সাবর্ণির পুত্র ঋষি সৌভরি ছিলেন একজন বাকসিদ্ধ বেদজ্ঞ সাগ্নিক ব্রাহ্মণ। মহারাজা আদিশূরের প্রার্থনা শুনে মহারাজ চন্দ্রকেতু গৌরবঙ্গে পাঁচজন বেদজ্ঞ সাগ্নিক ব্রাহ্মণ পাঠিয়েছিলেন। এভাবেই তারা বঙ্গদেশে এসে পড়েছিলেন।

১৬১০ সালের এই পূজার সময়ে জনবসতিপূর্ণ বড়িশা অঞ্চলে ছিল গ্রামীণ জলাভূমি, গাছপালা এবং বিস্তীর্ণ জমি। সেখানেই কাঠের থামের উপর হোগলাপাতার ছাউনি দিয়ে তৈরি হয় প্রথম পূজামণ্ডপ, আর সময়ের সঙ্গে পরিবর্তনে সেই প্রাথমিক মণ্ডপ থেকে আজকের আটচালা বাড়ি – বদল হয়েছে কাঠামো, কিন্তু রয়ে গিয়েছে বহু পুরনো আচার। একচালা প্রতিমা, সপ্ততীর্থের জলে কলাবউ স্নান, মাস ভক্ত বলির প্রাচীন রীতি, পুরনো ভোগের পদ এবং একসময়ের পশুবলির ইতিহাস ইত্যাদি মিলিয়ে এই পূজার প্রতিটি পর্ব পরিবর্তনশীল ঐতিহাসিক তথ্য মিশ্রিত। সেই আটচালা কাঠামোর স্মৃতিই পূজাটির পরিচয়ের সঙ্গে আজও অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত।

উপরে বর্নিত এই ছবিটি ২০২১ সালে আটচালা বাড়িতে অনুষ্ঠিত দুর্গাপুজার ছবি। সাবর্ণ বাড়ির পূজা হয় এক চালচিত্রে, এর মাঝে থাকে তিন ভাগ। চালচিত্রে থাকে ছিন্নমস্তা, বগলা, মাতঙ্গী, কমলাকামিনীসহ দশমহাবিদ্যা। দশমহাবিদ্যার সঙ্গে থাকেন রাধাকৃষ্ণ। দেবীর দুপাশে থাকেন শিব ও রাম। আটচালা বাড়ির পূজার প্রতিমায় দুর্গার সঙ্গে একই চালার নীচে থাকেন লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক এবং গণেশ। দেবীর সাজেও পুরনো বনেদি প্রভাব থাকে – যেমন লাল রঙের বেনারসি, অলঙ্কার এবং প্রতিমার বর্ণ হয় সোনালি-হলুদ আভায়। গণেশের বর্ণ লাল এবং অসুরের বর্ণ সবুজ। প্রতিমার চালচিত্রে দশমহাবিদ্যার বিভিন্ন রূপের সাথে রাধাকৃষ্ণের উপস্থিতি শক্তি ও বৈষ্ণব ভাবধারার মিশ্রণ উল্লেখ করে। বাংলায় সেইসময় উচ্চবর্ণের হিন্দুরা কার্তিক পূজা করতেন না। কার্তিক মূলত পূজিত হতেন সমাজের নিম্নবর্ণের দ্বারা। সাবর্ণ পরিবারের সূত্রে কার্তিকের রূপ হল রাজকীয়। পরিবারের তরফে দেবর্ষি রায়চৌধুরী বলেন, ‘‘পারিবারিক বিশ্বাস, লক্ষ্মীকান্তকে কল্পনা করেই ১৬১০ সালে কার্তিকের রূপ বদলে যায়।’’

দুর্গাপুজো শেষেই শুরু হয় সাবর্ণ রায়চৌধুরীর বিখ্যাত চন্ডীপুজো। মহেশচন্দ্র রায়চৌধুরীর আমল থেকেই এই পুজো হয়ে আসছে। কথিত রয়েছে, মা স্বপ্নে দেখা দিয়েছিলেন। সেদিনই চন্ডীপুকুর থেকে একটি ঘট উঠেছিল। সেই ঘট আজও বড়িশার আদিচন্ডী বাড়িতে রাখা আছে, সেখানেই মা আদিচন্ডী পুজিত হন। এখানে পঞ্চমী-অষ্টমীতে মূল পুজো ও ভোগ হয়। কথিত আছে পঞ্চমীতে মা চন্ডীর জন্মদিন। অষ্টমী ও নবমীতে হয় মূল পুজো। পুজোর সাথেই মেলা বসে। মেলা ও পুজো চলে ১০ দিন ধরে।

পূজার আচার অনুষ্ঠান নিজস্ব পারিবারিক রীতিতে পালন হয়। যেমন মহাষষ্ঠীর আগেই কৃষ্ণানবমী থেকেই কল্পারম্ভ পূজা শুরু হয়। অর্থাৎ দুর্গাপূজার আনুষ্ঠানিক পর্ব শুরু হওয়ার আগেই দেবীর আরাধনার প্রস্তুতি শুরু হয়ে যায়। সপ্তমীর সকালে প্রথা মেনে কলাবউ স্নানের সময় সপ্ততীর্থের জল ব্যবহার হয়, তারপর নির্দিষ্ট আচার মেনে দেবীর পাশে প্রতিষ্ঠা করা হয়। ১৮০টি মাটির খুঁড়িতে মাসকলাই এবং দই দিয়ে আচার পালনের পুরাতন প্রথা পরিবারের ইতিহাসে পাওয়া যায়। লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, এর মাধ্যমে বিভিন্ন উপদেবতা ও অপদেবতাকে সন্তুষ্ট রাখার চেষ্টা করা হত। পারিবারিক ইতিহাসে আরও জানা যায় যে অতীতে পূজায় ১৩টি ছাগল এবং একটি মহিষ বলির প্রথা ছিল। এখন পশুবলির পরিবর্তে প্রতীকী চালকুমড়ো এবং আখ বলি দিয়ে এই আচার সম্পন্ন করা হয়। সময়ের সঙ্গে সামাজিক রীতি বদলালেও পূজার মূল কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত বেশ কিছু প্রাচীন আচার এখনও ধরে রাখার চেষ্টা করা হয়।

সাবর্ণ পরিবারের দুর্গাপূজায় ভোগ রান্নার ঐতিহ্যও গুরুত্বপূর্ণ। পূজার বিভিন্ন দিনে নির্দিষ্ট খাবার নিবেদনের রীতি ছিল। এখন নিমতার বাড়িতে হয় সম্পূর্ণ নিরামিষ ভোগ। অন্য বাড়িগুলিতে আমিষ ভোগের আয়োজন করা হয়। অষ্টমীর সন্ধিপুজোয় পরিবারের সদস্যারা ভিজে গায়ে দেবীর ভোগ রাঁধেন। সন্ধিপূজার সময় খিচুড়ি, ল্যাটামাছ এবং শোল মাছ পোড়া, যা মাখনে মাখিয়ে নিবেদন করা হয়। কাঁচকলা পোড়ার মতো পদ দেওয়ারও প্রচলন ছিল। নবমীর রাতে রান্না করে রাখা হত খেসারির ডাল, চালতার অম্বল, কচুশাক এবং কইমাছ। দশমীর সকালে সেই রানার একটি ভাগ দেবীকে নিবেদন করা হয় আর রাতে ভোগের তালিকায় লুচি, বেগুনভাজা, পটলভাজা এবং ছানার ডালনার মতো পদ থাকে। বনেদি বাড়ির দুর্গাপূজায় পরিবারের নিজস্ব রান্নার প্রথা পূজার অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল।

সময়ের সঙ্গে সাবর্ণ পরিবারের সদস্যসংখ্যা বেড়েছে এবং বংশের বিভিন্ন শাখায় আলাদা আলাদা দুর্গাপূজার প্রচলন হয়েছে। বর্তমানে সাবর্ণ পরিবারের মোট ৮টি দুর্গাপূজার কথা জানা যায়। বড়িশায় আটচালা বাড়ি, বড়বাড়ি, মেজোবাড়ি, মাঝেরবাড়ি, বেনাকিবাড়ি এবং কালীকিঙ্কর ভবনে পূজা হয়। এর বাইরে বিরাটি এবং নিমতা-পাঠানপুরেও পরিবারের পূজা হয়। এই সব পূজার মধ্যে বড়িশার আটচালা বাড়ির পূজাকেই পরিবারের প্রাচীনতম মূল দুর্গাপূজা হিসেবে ধরা হয়।

স্থাপত্যের দৃষ্টিভঙ্গিতে এই বাড়ির ইতিহাস গুরুত্বপূর্ণ। প্রাথমিক মণ্ডপ তৈরি হয়েছিল কাঠ এবং হোগলাপাতা দিয়ে। পড়ে মণ্ডপের কাঠামো পরিবর্তিত হয়ে স্থায়ী মন্দির নির্মিত হয়েছে। আটচালার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ১৬টি থামবিশিষ্ট নাটমন্দির। পরবর্তী সময়ে পুরনো কাঠামোর সংস্কার করা হলেও পূজার ঐতিহ্য এবং পারিবারিক আচার ধরে রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। বড়িশার পরিবেশও আজ সম্পূর্ণ ভিন্ন। যে অঞ্চল ছিল একদা কলকাতার প্রান্তবর্তী গ্রামীণ জনপদ, সেটিই এখন মহানগরের ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা। সেই পরিবর্তনের মাঝেও আটচালা বাড়ির দুর্গাপূজা ৪০০ বছরেরও বেশি সময়ের পারিবারিক স্মৃতি, আচার এবং স্থাপত্যের সঙ্গে যুক্ত হয়ে রয়েছে। বিগত ৪০০ বছরে সাবর্ণ রায়চৌধুরীদের বাড়ি শরিকদের মধ্যে ভাগবাঁটোয়ারা হতে হতে প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল। অতীতের নিদর্শনরূপে আছে পুরনো দুর্গাপূজাটি, ঠাকুরদালান, সামনে আকাশ মাথায় নিয়ে দাঁড়িয়ে-থাকা আটচালার কয়েকটি থাম এবং কুলদেবতা রাধাকান্ত জিউয়ের বিগ্রহ। বনেদি বাড়ির শেষ চিহ্ন আছে, ৬৪ সাবর্ণপাড়া রোডের প্রায়ান্ধকার, সঙ্কীর্ণ একটি ঘুলঘুলি এবং কাদামাটি দিয়ে গাঁথা পাতলা ইটের ৪৫ ইঞ্চি দেওয়াল। আজ যখন বাড়ি তৈরি হয় ৮ ইঞ্চি বা ১০ ইঞ্চি দেওয়ালে, সেইসময়ের ৪৫ ইঞ্চি পুরু দেওয়াল উল্লেখ করার মতো বিষয়।

১৬১০ সালে শুরু। সেই দিনের বিশেষ কিছুই এখন আর অবশিষ্ট নেই। কিন্তু আজও দেবী সাবর্ণ পরিবারে আসেন। তাঁর গাত্রবর্ণ হয় শিউলি ফুলের বোঁটার মতো। লাল বেনারসী আর নানা অলঙ্কার অঙ্গে ধারণ করেন তিনি। গণেশের গায়ের রং হয় লাল। অসুরের সবুজ। দেবীর এক দিকে থাকেন রঘুপতি, অন্য দিকে শিব। এখানে দুর্গা দেবী নয়, সে আমাদের বাঙ্গালীদের ঘরের মেয়ে। যেন পুত্রকন্যাসহ পিতৃগৃহে চারটি দিনের জন্য এসেছে। বিজয়া দশমীর দিন আমাদের ঘরের মেয়ে শ্বশুরঘরে ফিরে যাবে, আর সেইভাবেই আবেগে অশ্রুনয়নে বরণ করে আমরা ঘরের মেয়েকে বিদায় দেবো। আরাধ্য দেবীর সাথে এই আত্মীয়তা বোধ আর কোথাও দেখা যায় না।

*******

১৭৫৭ সালে পলাশী যুদ্ধের পরেই মহারাজ রাধাকান্ত দেব কলকাতায় শোভাবাজারের নিজের রাজবাড়ীতে দূর্গাপূজার আয়োজন করেছিলেন, অর্থাৎ বড়িশায় সাবর্ণ পরিবারের দুর্গাপূজার ১৪৭ বছর পরে। কথিত আছে, কলকাতার প্রথম দশভূজা দুর্গার পূজা তিনিই করেছিলেন। এরপরের সময়ের ব্যবধান কলকাতার বনেদি দুর্গাপূজার বিবর্তন বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। এর ইতিহাসে আছে সপ্তদশ শতকের বাংলার জমিদারি সমাজ, বড়িশার পুরনো জনপদ, কলকাতার জন্মের আগের সময়, পারিবারিক উত্তরাধিকার এবং কয়েক শতাব্দী ধরে বদলে যাওয়া সামাজিক রীতির ইতিহাস।

এর কিছুকাল পর থেকেই কলকাতা ও বিভিন্ন বাঙালী অধুষ্যিত শহর ও গ্রামাঞ্চলের জমিদার ও বনেদী পরিবারে দুর্গাপূজার শুরু হয়। এই পূজাগুলিতে আচার ও আনন্দের থেকেও মূখ্য ছিলো নিজেদের প্রতিপত্তি ও বিত্তের প্রদর্শন। এই প্রবণতায় ক্ষুব্ধ হয়ে রানী রাসমণি তাঁর জানবাজারের বাড়িতে সাধারণ মানুষের প্রবেশযোগ্য দুর্গাপূজার আয়োজন করেন। এরপর বিভিন্ন স্বচ্ছল পরিবারে ধীরে ধীরে পারিবারিক দুর্গোৎসবের উৎসাহ দেখা যায়।

বিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগ থেকে দুর্গাপুজা মূলত সর্বজনীন হয়ে যায়। ধনী, দরিদ্র বা ধর্মীয় ভেদাভেদ দূরে সরিয়ে সবাই মিলেমিশে এই উৎসবের আয়োজন করেন। এই উৎসবে ধর্মীয় আবেগ খুবই কম। থাকে সম্প্রীতির মিলন। তাই জাত, ধর্ম নির্বিশেষে সবাই এগিয়ে আসেন, আর এখানেই বাঙালির দুর্গাপূজার সার্থকতা।

পরিশেষে, দুর্গাপূজার সূচনাবর্ষ হিসেবে ১৬১০ সালটি পরিবারের ঐতিহ্যে প্রতিষ্ঠিত হলেও সেই সময়ের সরাসরি সমসাময়িক নথি সীমিত। তাই ১৬১০ সালকে পরিবারের প্রচলিত ঐতিহাসিক সূচনাবর্ষ হিসেবেই দেখা হয়।

********

সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবারের ইতিহাস
সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবারের ইতিহাস ও কলকাতা শহরের জন্মের ইতিহাস প্রায় সমকালীন। সপ্তদশ শতকে সুতানুটি, গোবিন্দপুর ও কলকাতা – এই তিনটি গ্রামের জমিদারি অধিকার ছিল এই পরিবারের অধীনে।

১৬৯৮ সালের ১০ নভেম্বর ইস্ট ইন্ডিয়৷ কোম্পানি বড়িশার সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবারের কাছ থেকে তিনটি পাড়াগাঁ কিনে নিয়েছিলেন ১৩০০ টাকায়। সঙ্গে আরও দুটি গ্রাম সুতানুটি ও গোবিন্দপুর। ওই তিনটি গ্রাম নিয়ে ক্রমশ গড়ে ওঠে আজকের শহর কলকাতা। কিছু প্রচলিত শ্রুতি এই যে সুতানুটি, গোবিন্দপুর ও কলকাতা কেনার জন্য ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তৎকালীন বাংলার সুবেদারকে ১৬,০০০/- টাকা উৎকোচ দিয়েছিলেন। ঔরঙ্গজেবের পৌত্র সুলতান আজিম ওসমান তখন বাংলার শাসক। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি নাকি গ্রাম তিনটি কিনেছিলেন রাম রায়, মনোহর দাস ও রায়চৌধুরী পরিবারের অন্যান্য শরিকের থেকে। এর মূল দলিলটি আছে লন্ডনের ব্রিটিশ মিউজিয়মে। রায়চৌধুরীরা যে জব চার্নককে কলকাতা বিক্রি করেছিলেন এমন কোনও প্রমাণ নেই। জব চার্নক নাকি বড়িশায় সাবর্ণ রায়চৌধুরীদের ঠাকুরদালান সংলগ্ন আটচালায় বসে সুতানুটি, গোবিন্দপুর ও কলকাতা কেনার কথাবার্তা পাকা করেছিলেন। সেই আটচালায় চার্নককে সাদর অভ্যর্থনা জানিয়েছিলেন পরিবারের বিদ্যাধর রায়চৌধুরী।

সম্ভবত গ্রাম তিনটি কেনার জন্য জব চার্নক শুধুই প্রাথমিক কথাবার্তা বলেছিলেন। কোম্পানির হয়ে গ্রামগুলি কিনেছিলেন ওয়ালশ নামের একজন ইংরেজ। মূল দলিলটি হয়েছিল ফার্সি ভাষায়, আর যৌথ বিক্রেতা হিসেবে সাক্ষর করেন মনোহর দেউ, বিদ্যাধর রায়চৌধুরীর সন্তান রাম চাঁদ, রাম দেউ-এর সন্তান রামবাহাদুর, প্রাণ এবং গন্ধর্ব। তাঁরা বিক্রি করেছিলেন আমিরাবাদ পরগনার অধীন ডিহি কলকাতা, সুতানুটি এবং গোবিন্দপুর।

এরকম মতও প্রচলিত আছে যে, রায়চৌধুরীরা গ্রাম তিনটি প্রথমে বিক্রি করতে চাননি এবং আপত্তি জানিয়েছিলেন। তবে শাসকের কূটনীতির প্রভাবে অর্থাৎ ১৬,০০০/- টাকা উৎকোচের বিনিময়ে ইংরেজরা আজিম ওসমানের ছেলে ফারুকসিয়ারের থেকে আগেই অনুমতি নিয়েছিলেন। রায়চৌধুরী পরিবারের তখন আর কিছুই করার ছিল না। পরিবারের কর্তা বিদ্যাধর রায়চৌধুরী কোম্পানির নথিপত্র রাখার জায়গা নেই দেখে লালদিঘির দক্ষিণ প্রান্তে তাঁর কাছারিবাড়িটি তাঁদের ব্যবহার করতে দিয়েছিলেন। ব্রিটিশ রাজশক্তির শক্তিসামর্থ সম্পর্কে রায়চৌধুরীরা বিলক্ষণ খোঁজখবর রাখতেন । কিন্তু তাঁরা স্বপ্নেও ভাবেননি, যে তিনটি গ্রামের অধিকার তাঁরা ছেড়ে দিচ্ছেন সেই তিনটি গ্রামই একদিন ব্রিটিশ কমনওয়েলথের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর হবে। এবং সেই শহরটিকে কেন্দ্র করে ব্রিটিশরা ক্ৰমে-ক্রমে এই উপমহাদেশের বিশাল ভূখণ্ড গ্রাস করে নেবে।

সাবর্ণ পরিবারের ২৭তম পুরুষ নন্দদুলাল রায় চৌধুরীর বড় ছেলে রাঘবেন্দ্র পাকাপাকি ভাবে বড়িশায় বসবাস করলেন। তিনিই প্রথম বড়িশাধিপতি খেতাব ব্যবহার শুরু করেন। প্রাচীন কালে এই বড়িশা গ্রাম খাসপুর পরগনার অন্তর্গত বহুলাপুরী বা বহুগ্রামের অংশ ছিল। রাঘবেন্দ্রের একমাত্র সন্তান তারিণীচরণ। এই পিতা-পুত্রের সময় বড়ো বাড়ির দুর্গোৎসব ও রথযাত্রা আরও খ্যাতি অর্জন করেছিল। তারিণীচরণ অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ দিকে বড়ো বাড়ির উত্তর-পশ্চিম প্রান্তে এক বাজার বসান। আগে ছিল সাপ্তাহিক হাট। প্রজাদের প্রয়োজনে ও এলাকার ব্যবসাকে সমৃদ্ধিশালী করার জন্য সেটিকে নিয়মিত বাজারে রূপান্তর করেন। জমিদারের খেয়ালে বাজার, তাই নাম হয় সখের বাজার। তারিণীচরণের মোট আট ছেলে ছিল। কিন্তু তাঁদের মধ্যে শুধু রামকুমার, কালীকান্ত ও চন্দ্রকান্তের বংশ রক্ষা পেয়েছিল।

সাবর্ণ কথাটি নাম নয়, এটি পদবি।
লক্ষ্মীকান্ত মজুমদার হিজরি ১০১৫ বা ইংরেজি ১৬২৬ সালে মহারাজা মানসিংহের সুপরিশে মুঘল দরবার থেকে মজুমদার ও রায়চৌধুরী উপাধি পেয়েছিলেন। সেবার মানসিংহের সুপরিশে ওই একই উপাধি পেয়েছিলেন নদীয়া রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা ভবানন্দ ও পাটুলির রাজা জয়ানন্দ। লক্ষ্মীকান্ত মজুমদারের জন্ম ইংরেজি ১৫৭০ সালে। মৃত্যু ১৬৪৯ সালে। তিনি নবাব সরকারের কর্মী ছিলেন, এবং সংস্কৃত, বাংলা ও ফার্সি ভাষায় ভাল দখল ছিল। মুঘল দরবার থেকে উপাধি পাওয়ার কিছু পরে ইনি হাবিলিশহর বা আজকের হালিশহরে বিরাট অট্টালিকা স্থাপন করে। সেই অঞ্চলটি এখন চৌধুরীপাড়া নামে পরিচিত। লক্ষ্মীকান্ত হাবিলিশহর, মাগুরা, খাসপুর, পইকান, আনোয়ারপুর, কলিকাতা পরগনা এবং হেতেগড় পরগনার কিছু অংশ জায়গির পেয়েছিলেন। এই পরগনাগুলি আগে সম্ভবত মহারাজা প্রতাপাদিত্যের পিতৃব্য রাজা বসন্ত রায়ের জমিদারির অন্তর্ভুক্ত ছিল।

বারো ভুঁইয়ার সময় যখন বাংলার রাজনীতি ক্রমাগতই পরিবর্তনশীল, লক্ষ্মীকান্ত মজুমদারের উত্থান সেই সময়। তখন কলকাতা ও সংলগ্ন অঞ্চল ছিল যশোহরের মধ্যে। এই যশোর এস্টেটের দায়িত্বে ছিলেন বারো ভুঁইয়ার বসন্তরায় এবং বিক্রমাদিত্য। বিক্রমাদিত্যর পুত্র প্রতাপাদিত্য এবং লক্ষীকান্ত, দু’জনেই ছিলেন বসন্তরায়ের অত্যন্ত প্রিয়। লক্ষ্মীকান্ত ছিলেন যশোর এস্টেটের মহামন্ত্রী। বিক্রমাদিত্যর মৃত্যুর সময় পূর্ববঙ্গ, অর্থাৎ যশোহরের দিক পেলেন প্রতাপ, পশ্চিম দিক পেলেন বসন্তরায়। পিতার মৃত্যুর পর প্রতাপের চরিত্রের আমূল পরিবর্তন ঘটে। অত্যন্ত স্বৈরাচারী হয়ে হত্যা করলেন পিতৃতুল্য বসন্তরায়কে। এরপর সম্রাট আকবর প্রতাপকে দমন করতে মানসিংহকে পাঠান। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘বউঠাকুরানীর হাট’ উপন্যাস এই প্রতাপাদিত্য আর বসন্তরায়েরই ভালবাসা ঘৃণা ঔদ্ধত্য আর স্নেহের আনন্দ-বেদনার কাহিনি।

প্রতাপকে পরাজিত করে রাজা মানসিংহ ১৬০৮-এ লক্ষ্মীকান্তকে হালিশহর থেকে আটটি পরগনার নিষ্কর জমিদারি স্বত্ত প্রদান করেন। রাজা মানসিংহ লক্ষ্মীকান্তকে রায়চৌধুরী উপাধি প্রদান করেন। ইতিপূর্বে হালিশহরে বছর দু’য়েকের জন্য দুর্গাপূজা করলেও এ বার লক্ষ্মীকান্ত রায়চৌধুরী বড় আকারে বড়িশাতে পূজা শুরু করার সিদ্ধান্ত নেন। অনেক গবেষকের মতে, তাহিরপুরের রাজা কংসনারায়ণ বা ভাদুরিয়ার রাজা জগৎনারায়ণের পূজার যে বর্ণনা পাওয়া যায় সেখানে দেবীমূর্তির সঙ্গে লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক, গণেশ ছিলেন না। দেবীকে মূলত চণ্ডীরূপে পূজা করা হত। এই প্রথম দেবীকে সপরিবার আবাহন করলেন লক্ষ্মীকান্ত। কার্তিকের মূর্তিতে কিছু পরিবর্তন আনা হয়। পণ্ডিতরা বিধান দিলেন, দেবীর গায়ের রং হতে হবে স্বর্ণাভ বা শিউলি ফুলের বোঁটার মতো।

বড়িশা নামের উৎপত্তির পিছনেও একটি সংক্ষিপ্ত ইতিহাস আছে। রাজস্ব আদায়ের সুবিধার্থে নবাব মুর্শিদকুলি খাঁ ১৭২২ সালে বাংলাকে ১৩টি চাকলা ও বহু পরগনায় ভাগ করেছিলেন। কেশবরাম রায়চৌধুরী বাংলার দক্ষিণ চাকলার রাজস্ব আদায় করতেন। সর্বোচ্চ রাজস্ব আদায় করার সুবাদে অন্যদের হিংসারও পাত্র হয়েছিলেন। বড় হিংসা থেকেই নাকি রায়চৌধুরীদের বাসস্থানের অঞ্চলের নাম হয় বড়িশা।

কেশবরামের জন্ম ইংরেজি ১৬৫০ সালে। মৃত্যু ১৭২৬ সালে। তাঁর আমলে বাহান্ন পীঠের অন্যতম দেবী কালীর পীঠস্থান কালীক্ষেত্র বা ‘কালীকোঠা” নামে অভিহিত হত। তীর্থযাত্রীর পুণ্যস্নানের সুবিধার জন্য তিনি কালীক্ষেত্রের মন্দির চত্বরের কাছে আদি গঙ্গার ঘাট তৈরি করে দেন। সেই থেকে কালীক্ষেত্র হয়ে ওঠে কালীঘাট। দেবী কালীর একটি ছোট মন্দিরও তিনি তৈরি করে দিয়েছিলেন। কালীঘাট ছিল রায়চৌধুরীদের জমিদারির অংশ। কিন্তু এই পরিবারে কালীপূজার চল ছিল না বলেই জানা যায়। অথচ একসময় এই পরিবার বাথেকে নৈবেদ্য না গেলে কালীঘাটে পূজাই হত না।

এক সময় জমিদারির আয়ে হেসেখেলে যাদের সংসার চলে যেত এখন তাঁর কেউ কেউ ব্যবসা করছেন, কেউ কেউ নিয়েছেন চাকরি। কেউ খুলেছেন চুন-সুরকির দোকান, কেউ মেকানিকাল এঞ্জিনিয়ার। একদিন মাত্র ১৩০০ টাকায় বিক্রি হয়েছিল তাঁদের কলকাতা – এই নিয়ে কিন্তু আজকের বংশধরদের মনে কোনও কষ্ট নেই। বরং যে যেমনভাবে পারেন নিজেদের পূর্বপুরুষদের স্মৃতিরক্ষা করে চলেছেন।

আজকের কলকাতার বিনয়-বাদল-দীনেশ বাগ এলাকার লালদিঘির পাশে কোনও স্থানে লক্ষ্মীকান্ত মজুমদারের ইটের তৈরি কাছারিবাড়ি ছিল। ছিল শ্যামরায়ের মন্দির, যেখানে মহাসমারোহে আবির ও কুমকুম সহযোগে দোল খেলা হতো। তারপর সবাই স্নান করত দীঘিতে। দীঘির জল আবির-কুমকুমে লাল হয়ে যেত। তাই দীঘির নাম হয় লালদীঘি। জব চার্নক নাকি মজুমদার পরিবারের কাছারিবাড়ির বন্দোবস্ত নিয়ে সেখানে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রথম অফিস স্থাপন করেছিলেন। ১৭০১ সালে ফোর্ট উইলিয়ম দুর্গ হওয়ার পর কাছারিবাড়িটি ভেঙে ফেলা হয়।

মেদিনীপুরে চন্দ্রকোনায় সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবারের পূজা
কলকাতা বেহালার শখের বাজারের সাবর্ণ রায়চৌধুরীদের বংশধর ছিলেন রামকালী চৌধুরী। ১৭১১ সালে জমিদারি রক্ষার্থে তিনি গিয়েছিলেন পশ্চিম মেদিনীপুরে চন্দ্রকোণার জগন্নাথপুর গ্রামে। কয়েক বছরের মধ্যেই তিনি পূজা শুরু করেন জগন্নাথপুর গ্রামে। সেই পূজায় আছে স্বপ্নাদেশের গল্প।

তিনশো বছরের বেশি সময় ধরে চন্দ্রকোণার জগন্নাথপুরের চৌধুরী পরিবারে পুজোর ঐতিহ্য অক্ষত। চন্দ্রকোণা এক নম্বর ব্লকের জগন্নাথপুরে একই জায়গায় প্রাচীন চারটি মন্দির। এক মন্দিরে শীতলা। আরেক মন্দিরে মহাদেব। রঘুনাথ বিষ্ণু মন্দিরের পাশেই দেবী দুর্গার মন্দির। এখন মন্দিরের জায়গায় তৈরি হয়েছে পাকা দালান। দুর্গার সঙ্গে পূজিত হন মহাদেবও। সন্ধিপুজোয় কালো পাঁঠা বলি দেওয়ার রীতি রয়েছে। প্রাচীন যুগ থেকে একই কাঠামোয় দুর্গা, লক্ষ্মী, সরস্বতী, গণেশ, কার্তিকের পুজো হয়।

দক্ষিণ কলকাতায় সাবর্ণ পরিবারের একটি সংগ্রহশালা আছে। সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবার পরিষদ এটির পরিচালনা করে, যেখানে পরিবারের ইতিহাস ও ঐতিহ্য সংরক্ষীত হয়েছে। এই মিউজিয়ামে বহু দুষ্প্রাপ্য দলিল দস্তাবেজ, মানচিত্র, মুঘল আমলের কাবুলতিপত্র, পুরোনো দিনের আসবাব সহ কলকাতা-সুতানুটি-গোবিন্দপুরের ফার্সি ভাষায় লেখা ১৬৯৮ সালের প্রজাসত্ব হস্তান্তরের দলিলের নকল রয়েছে। এছাড়াও কলকাতার প্রতিষ্ঠা সংক্রান্ত জনস্বার্থ মামলায় ২০০৩ সালে হাইকোর্টের রায়ের দলিল ও দস্তাবেজ এই সংগ্রহশালায় রয়েছে। ২০১৬ সালে এই সংগ্রহশালায় একটি অফলাইন ডিজিটাল পাঠাগার চালু হয়েছে। প্রতি বছর ফেব্রুয়ারি মাসে এই সংগ্রহশালায় একটি আন্তর্জাতিক ইতিহাস উৎসব আয়োজিত হয়। এই উৎসব উপলক্ষে সপ্তর্ষি নামক হাতে লেখা পত্রিকা প্রকাশিত হয়।

********

এবার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ইন্দোনেশিয়ার পূজার কথা বলি।
ইন্দোনেশিয়ার জাভা দ্বীপে বহু প্রাচীন একটি আট হাতের দুর্গা প্রতিমা সংরক্ষিত আছে। এই প্রাচীন দুর্গা প্রতিমাটি মূলত নবম শতাব্দীর হিন্দু শিল্পকলার এক অনন্য নিদর্শন, যেটি ইন্দোনেশিয়ার সবথেকে বিখ্যাত এবং বৃহত্তম হিন্দু মন্দির প্রম্বানান মন্দির (Prambanan Temple) প্রাঙ্গনে শিবমন্দিরের উত্তরকক্ষে অবস্থিত।

প্রম্বানান মন্দিরের দুর্গা প্রতিমার সময়কাল ৮ম থেকে ৯ম শতাব্দী। প্রাচীন এই মূর্তিতে দেবী দুর্গাকে মহিষাসুরমর্দিনী (মহিষ রূপী অসুরকে বধ করা দেবী) রূপে অত্যন্ত চমৎকার ও মার্জিত ভঙ্গিমায় উপস্থাপন করা হয়েছে। মূর্তির মূল বৈশিষ্ট্যসমূহ আটটি হাত ও আয়ুধ: ভারতে প্রচলিত দশভুজা (দশটি হাত) রূপের তুলনায় প্রাচীন জাভানিজ শিল্পে দেবীকে সাধারণত অষ্টভুজা (আট হাত) রূপে নির্মান করা হতো। এই আটটি হাতে শঙ্খ, চক্র, গদা, খড়্গ, তলোয়ার ও ধনুকসহ বিভিন্ন স্বর্গীয় প্রতীক ও অস্ত্র শোভা পায়। দেবী দুর্গা একটি মহিষের (অসুরের রূপ) পিঠে দণ্ডায়মান হয়ে এক হাত দিয়ে তিনি মহিষের লেজ এবং অন্য হাত দিয়ে অসুরের চুল ধরে থাকেন। চতুর্থ থেকে দ্বাদশ শতাব্দীর মধ্যবর্তী সময়ে ইন্দোনেশিয়ায়, বিশেষ করে জাভা দ্বীপে, হিন্দু ধর্মের অন্যতম পূজনীয় ও জনপ্রিয় দেবী ছিলেন মা দুর্গা। আগ্নেয়গিরির শিলা (Andesite) থেকে খোদাই করে তৈরি এই ঐতিহাসিক মূর্তিটি প্রমাণ করে যে, প্রাচীনকালে ভারতের সংস্কৃতির সঙ্গে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার গভীর আধ্যাত্মিক এবং শৈল্পিক সংযোগ ছিল।

প্রম্বানান মন্দির ছাড়াও প্রাচীন ইন্দোনেশিয়ার এই ধরণের কিছু দুর্গা প্রতিমা বর্তমানে জাকার্তার জাতীয় জাদুঘরে (National Museum of Indonesia) সংরক্ষিত রয়েছে।

স্থানীয় লোকগাথায় এই প্রতিমাকে ‘রোরো জংগ্রাং’ (Rara Jonggrang)-ও বলা হয়। সিংহাসারী দুর্গা প্রতিমা (পূর্ব জাভা) সময়কাল আনুমানিক ১২৭৫-১৩০০ খ্রিস্টাব্দ। ১,৫০০ কেজি ওজনের এবং ১৭৫ সেন্টিমিটার উচ্চতার এই আন্ডেসাইট পাথরের ভাস্কর্যটি পূর্ব জাভার সিংহাসারী মন্দির থেকে উদ্ধার করা হয়েছিল। বর্তমানে এটি নেদারল্যান্ডসের Museum Volkenkunde (Leiden)-এ সংরক্ষিত আছে। এই মূর্তিতে দেবীর মুখাবয়বে এক শান্ত ও সৌম্য ভাব ফুটিয়ে তোলা হয়েছে, যা দক্ষিণ এশিয়ার রণংদেহী রূপের থেকে পৃথক।

‘রোরো জংগ্রাং’ নিয়ে ইন্দোনেশিয়ার জাভা অঞ্চলের একটি বিখ্যাত লোকগাথা আছে, যেটি প্রাম্বানান মন্দির চত্বর, সেউ মন্দির এবং দুর্গা মূর্তির পৌরাণিক উৎপত্তির কথার উল্লেখ করে। গল্পের প্রেক্ষাপটে রাজকুমার বান্দুং বন্ডোভোসো একটি রাজ্য জয় করেন এবং রাজা প্রাবু বোকোকে হত্যা করেন। এরপর তিনি রাজার কন্যা রাজকুমারী রোরো জংগ্রানকে বিবাহ করতে চাইলে অনিচ্ছুক রাজকুমারী বাবার হত্যাকারীকে একটি শর্ত প্রদান করেন: রাজকুমারকে এক রাতের মধ্যে ১,০০০টি মন্দির নির্মাণ করতে হবে। অতিপ্রাকৃত শক্তির সহায়তায় রাজকুমার ভোর হওয়ার আগেই ৯৯৯টি মন্দির নির্মাণ করে ফেলেন। তাঁকে থামানোর জন্য রোরো জংগ্রাং তাঁর পরিচারিকাদের দিয়ে আগুন জ্বালান এবং ধান ভানার শব্দ করান, যাতে অতিপ্রাকৃত শক্তিগুলির ধারণা হয় যে সূর্যোদয় হয়ে গেছে। শেষ মন্দিরটি নির্মানের আগের মুহূর্তে বান্দুং বন্ডোভোসো প্রতারণার বিষয়টি বুঝতে পারেন ও ক্ষিপ্ত হয়ে রোরো জংগ্রানকে অভিশাপ দেন ও তাঁকে পাথরে পরিণত করেন। এভাবেই তিনি ১,০০০তম বা সর্বশেষ মূর্তিতে রূপান্তরিত হন।

যোগ্যকর্তার সোনাবুদোয়ো মিউজিয়ামের প্রতিমার সময়কাল ৮ম শতাব্দী। এই মূর্তিটিও মধ্য জাভা অঞ্চল থেকে সংগৃহীত। জাভার ঐতিহ্যবাহী বাতিক সারং (Batik sarong) এবং অলংকারে সজ্জিত দেবীর এই আট হাতের ভাস্কর্যটি ইন্দোনেশীয় ও ভারতীয় সংস্কৃতির এক অনন্য মিশ্রণ।

সুত্র সংগ্রহ:
** কোলকাতা সমগ্র ১-শ্রী পুর্নেন্দু পত্রী।
** বাঙালীর ইতিহাস, আদিপর্ব -শ্রী নীহার রঞ্জন রায়
** বনেদি কলকাতার ঘরবাড়ি
** ফেসবুক
** https://www.anandabazar.com
** https://bongodorshon.blogspot.com
** Wikipedia

********

 

Sahityika Admin

Add comment