সাহিত্যিকা

আমার দেশের বাড়ির দুর্গাপুজা, ছয় দশক আগে

আমার দেশের বাড়ির দুর্গাপুজা, ছয় দশক আগে
© বিজিত কুমার রায়, ১৯৭৪ মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং

আবালবৃদ্ধবনিতা, সকলের কাছেই দুর্গাপূজা একটি অনন্য আকর্ষণ। সেই ছোট্টবেলার থেকে বাড়ির পূজা দেখে যার শুরু, আর এখন প্রবীণ বয়সে সেটি চলছে একটি বৃহৎ অর্থে বাড়ি মানে হাউজিং সোসাইটির পূজা। সেও বাড়ির মতোই।

আমার শৈশবকাল কেটেছে গ্রামে আমাদের দেশের বাড়িতে। আমার প্রপিতামহ ছিলেন মুর্শিদাবাদের শেষ নবাবের দেওয়ান আর পিতামহ ছিলেন একজন অতি প্রসিদ্ধ আইনজীবী। তাঁদের দ্বারা তৈরি আমাদের দেশ মুর্শিদাবাদের নসিপুর গ্রামে আমাদের বসতবাড়ি সেইসময় একটি বৃহৎ দেওয়ান বাটি নামে প্রসিদ্ধ ছিল। সেটি ছিলো একটি অতি বৃহৎ জমিতে যার শুরু নশিপুর রাজবাড়ীর উল্টোদিকে আর শেষ প্রায় মাইল খানেক দূরে গঙ্গা বা ভাগীরথীর ধারে। আমাদের বসতবাড়িতে আমাদের বাবাজ্যঠাদের পরিবার ছাড়া দুর সম্পর্কের আত্মীয়রাও থাকতেন। তাই বাড়িটি ছিলো অনেক লম্বা। বিশাল বড় গেট দিয়ে ঢুকে দুই ধারে বড় বাগান আর মাঝের রাস্তা দিয়ে যেতে হতো মূল বসতবাড়িতে। তারপর ছিলো বাইরের লোকেদের সাথে দেখাশুনা করার মহল, আর নানান গুদাম ঘর।

এগুলি পেরিয়ে ছিল বিশাল জায়গা জুড়ে মার্বেল বাঁধানো চণ্ডীমণ্ডপ। সেটিও একটি আলাদা বাড়ির মতো। কারণ তিন তলার মতো উঁচু চণ্ডী মণ্ডপ ছাড়াও ছিলো পূজার সামগ্রী রাখার বিভিন্ন ঘর, বাজনা বাজিয়ে মানে ঢাক ঢোল সানাই বাজিয়েদের থাকার ঘর। আর ছিলো একটি বাঁধানো চাতাল যার মধ্যবর্তী অংশ ছিল মাটির কারণ সেখানে বিভিন্ন পূজা ও বলিদান হতো। ছিল নানান কাজে ব্যবহারের জন্য একটি উঁচু চাতাল একপাশে যেখানে পূজার কদিন বাইরের গণ্যমান্য লোকেরা বসতেন আর দুর্গাপূজার সন্ধ্যাবেলা আরতির পর হতো নানান বিচিত্রানুষ্ঠন। সবই বাড়ির লোকেদের কে নিয়ে হতো।

এই চন্ডীমণ্ডপ পেরিয়ে ছিল জ্ঞাতিদের মহল। সেটি পেরিয়ে ছোট বাগান পেরিয়ে নিত্য পূজিত সিংহবাহিনীর মন্দির। অষ্ট ধাতুর একটি মূর্তি ছিলো মায়ের যেটি এখনো আমার জ্যাঠার বাড়িতে নিত্য পূজিত হয়। এরপর ছিল বড় শিব মন্দির। সেটি পেরিয়ে বাড়ির চৌহদ্দির পাঁচিল আর তার পাশে অল্প দূরে মা ভাগীরথীর খাত।

এতকিছু বলার কারণ ধান ভানতে শিবের গীত খানিকটা বোঝাতে যে আগের দিনের নিয়ম মেনে আমার পূর্বপুরুষরা মনে করতেন যে সকল জ্ঞাতিগুষ্ঠি একসাথে থাকবে, আনন্দ করবে, আর পূজাপার্বণে সমস্ত গ্রাম আমন্ত্রিত হবে, পূজার অনুষ্ঠানে আনন্দের ভাগ নেবে। আমার ছোটবেলা এইভাবেই কেটেছে। পূজার খুঁটিনাটি সেইরকম কিছু মনে নেই। যেগুলি মনে আছে সেইগুলি লেখার চেষ্টা করছি।

প্রতিমা হতো বেশ বড়, এক চালার। বিসর্জনের পর মাটি খড় ইত্যাদি পরিষ্কার করে কাঠামোটি চণ্ডীমণ্ডপের এক ধারে রেখে দেওয়া হতো। যতদূর মনে পড়ে, রথের দিন একটা পূজা হয়ে তারপর আবার নতুন মূর্তির কাজ শুরু হতো। ওই পুরো সময়টা কারিগরেরা থাকত আমাদের চন্ডীমণ্ডপের ঘরে, আর খাবার যেতো আমাদের সকলের সাধারণ হেঁশেল থেকে। বিস্তারিত অত মনে নেই; তবে চক্ষুদানের সময় সবাই মণ্ডপেই থাকতেন।

মহালয়ার দিনে মণ্ডপে চণ্ডীপাঠ হতো এটা মনে আছে। সম্ভবত বড় জ্যাঠামশাই এই কাজটি করতেন। আর মহালয়ার আগেই বা ঠিক তার পরেই আমার বাবা কলকাতা থেকে চলে আসতেন। কারণ উনি সরকারি চাকরীতে বাইরেই পোস্টেড থাকতেন। অন্য সব জ্যাঠারা গ্রামেই থাকতেন। তখন আসত আমাদের পূজার জামা কাপড়।

লিখতে ভুলে গিয়েছি যে, মায়েরা মানে বাড়ির বিবাহিত মহিলারা এই অনুষ্ঠানে বা পূজার মণ্ডপে সরাসরি অংশগ্রহণ করতে পারতেন না। আমাদের মূল বাড়ি থেকে চণ্ডীমন্ডপ পার করে জ্ঞাতিদের মহলে যাওয়ার জন্য বাড়ির দ্বিতীয় তলে একটি রাস্তা ছিল। চণ্ডীমন্ডপের সামনের অংশে একটি সুন্দর বসার জায়গা ছিল দুটি তলাতেই তবে সামনে বিশাল জানালা ছিল চিক দিয়ে ঘেরা। মায়েরা ওইখান থেকেই অনুষ্ঠান দেখতেন।

আরও একটি কথা, বাড়িতে পুজো অনুষ্ঠানে কখনও বাড়ির বিবাহিত মেয়েদের আসতে দেখিনি। যেমন আমার চার পিসি বা বিবাহিত দিদিরা। শুনেছি দাদু নিয়ম বেঁধে দিয়েছিলেন যে বড় বংশে ধনীগৃহে অনেক অনুষ্ঠান করে বিয়ে দেওয়ার পর তাদের বাপের বাড়িতে আর কোনো আমন্ত্রণ থাকবে না। খুবই অবাক করা নিয়ম ছিল।

আমন্ত্রণ অধিবাস করে পূজা শুরু হতো। আসতেন প্রধান পুরোহিত তলাপাত্র মশাই। বড় ভয় পেতাম ওনাকে। ছয়ফুটের ওপর লম্বা, মিশমিশে কালো স্বাস্থ্যবান চেহারা আর লাল লাল চোখ।

প্রতি পূজার আগের দিন দুই তলার একটি বিশাল বারান্দা যেটি কে আমরা লাল বারান্দা বলতাম (কারণ লাল সিমেন্টের মেঝের ওপর পংখের কাজ করা।) সেইখানে বাড়ির ও প্রতিবেশী ও আমন্ত্রিত মহিলারা তরকারি কাটতেন আর গল্পো গুজব চলতো। বলা ভালো সেই বারান্দাতে চিকের পর্দা দেওয়া থাকত যেটিকে দরকার মতো ওঠানো যেতো। আমার মা’কে অবশ্য আমি ওখানে কখনও দেখিনি কারণ উনি মিষ্টি মানে নাড়ু চন্দ্রপুলি যেখানে তৈরি হতো সেখানেই থাকতেন আর পূজার দিন খুব সকাল থেকে ওইখানে বড় বড়ো পরাতে নৈবেদ্য সাজানো হতো বা ফল মূল ইত্যাদি সাজানো হতো। ছোট বেলায় সবই বড় লাগে, তবে ওই পরাত মানে বড় পিতলের থালা পাশে কানা উঁচু করা আমি বড় হয়েও দেখেছি। এক একটি পরাত সাড়ে তিন ফুটের গোলাকার ছিলো। এই কাজটি হতো আমার বড় জ্যাঠা মশাইয়ের বাড়ির রান্নাঘরের বারান্দাতে যেখানে আমার ঠাকুমা যতদিন ছিলেন বসে দেখাশুনা করতেন। ওই পরাত বাড়ির কাজের লোকেরা অতি কষ্ট করে নিয়ে যেতো মাথায় করে মণ্ডপে।

এবার আসি আমাদের কথায়। আমরা মনে আছে সব মিলিয়ে জনা বারো ভাই ছিলাম আর জনা পনেরো বোন। বোনেদের মধ্যে অনেকের তখন বিয়ে হয়ে গিয়েছিল। আর দাদারাও কেউ কেউ অনেক বড় ছিলেন। বড়’দা মানে বড় জ্যাঠার বড় ছেলে আমার বাবার (সব থেকে ছোট) থেকে বছর তিনেকের ছোট ছিলেন। আমরা সমবয়সী ছিলাম পাঁচজন। আর আমন্ত্রিতদের মধ্যে যারা বহরমপুর বা অন্যান্য জায়গা থেকে আসতেন তাদের বাড়ির সমবয়সীরা আমাদের সঙ্গ দিত। আমাদের কাজ ছিলো শুধু হুরডঙ্গল করে বেড়ানো আর বড়দের বকা খাওয়া।

তবে হ্যাঁ, বাড়ির ছেলে মানে রায় বংশের ছেলেদের কিছু কাজ বাঁধা ছিল। বিশেষ করে যারা ৫-১২ বয়সের। একটা কাজ ছিলো সকালে পূজার পর শালপাতার ডোনাতে ফল মিষ্টি বিতরণ করা যারা আসবেন পূজা দেখতে তাঁদেরকে দেওয়া। খুব সম্ভবত অষ্টমীর দিন বৈকালে লুচি, মোহনভোগ ওই ডোনাতে করে সকলকে দিতে হতো। আর একটি কাজ ছিলো আমাদের মধ্যে একটু বড়দের সেটি হলো আরতির সময় দুই ধারে দাঁড়িয়ে বেশ বড় চামর (রুপার হাতলগুলি দুই ফুটের ছিল) দোলানো আর ঘড়ি অর্থাৎ চ্যাপ্টা ঘণ্টা বাজানো। ওই ঘড়ি বাজানোর বিশেষ পদ্ধতি ছিলো। ওই ঘড়ি আর মায়ের হাতের পিতলের দর্পণ এখনও আছে। ওই কাজ পেলে নিজেদের বেশ হোমরা চোমরা মনে হতো। গোঁফ না উঠলেও গোঁফে তা দেওয়ার মতো ব্যাপার। আর যদি সন্ধি পূজাতে ঘুমিয়ে না পড়তাম তা হলে মন্দিরে সিঁড়ি জুড়ে ১০৮টি প্রদীপ জ্বালানো। দারুণ লাগত এইসব। সারা গ্রামের লোকেরা যারা অধিকাংশই আমাদের দুর সম্পর্কের জ্ঞাতি বা পাশের গ্রাম বা লালবাগ জিয়াগঞ্জ মায় বহরমপুর থেকে অনেকেই আসতেন এই পূজাতে। দুপুরে ভোগ প্রসাদ নিবেদনের পরে আমরা বাড়ির পুরুষেরা (আমরাও তখন পুরুষের দলে) এক সাথে লাল বারান্দাতে খেতে বসতাম ভোগ প্রসাদ। কী খেতাম কিচ্ছু মনে নেই। তবে খিচুড়ি বা পোলাও আর ভাজা ও তরকারি আর পায়েস মিষ্টি থাকত।

সন্ধি পূজা আর অষ্টমীর বলির দিনে আমাদের একটু বড় দাদারা বলির আখ আর চালকুমড়া ধরত। আখ আর চালকুমড়া বলি হতো। পাঁঠা বলি আমরা দেখিনি। শুনেছি একবার আটকে গিয়েছিল। আমার ছোট জ্যাঠা ওই বলির কাজটি করতেন। আমাদের বংশের ছেলেরা ছাড়া এই সব কাজে হাত দেওয়ার কারো অধিকার ছিলো না। মায়ের গায়ে গহনা পড়ানো বা হাতে অস্ত্র দেওয়াটাও বংশের বয়স্ক পুরুষদেরই করতে হতো। প্রাণ প্রতিষ্ঠার পরে আর দর্পণ বিসর্জন পর্যন্ত পুরো কাঠামোতেই আমরা ছাড়া বাইরের কারো ছোঁয়ার অধিকার ছিলো না।

পূজার মধ্যে একদিন বা দুই দিন সন্ধ্যাবেলা আরতির পর, ওই উঁচু চাতালে মঞ্চ বানিয়ে বাবা জ্যাঠারা বা বড় দাদারা নাটক বা অন্যান্য অনুষ্ঠান করতেন। আমার বাবাকে দেখেছি থিয়েটারের পার্ট করতে। আমার নিজের দাদা আমার পাঁচ বছরের বড় ওই বয়সেই দারুণ আবৃত্তি করতেন। তবে সব কিছুই হতো স্ত্রী ভূমিকা বর্জিত। একটা মজা ছিল পূজার কয়দিন দুপুরবেলা খাওয়াদাওয়ার পর আমরা কয়জন ওই চাতালের ওপর নিজেদের যা ইচ্ছা ডায়ালগ বলে থিয়েটার মা জ্যেঠিমারা অবিবাহিত দিদিরা ওপরের বারান্দা থেকে আমাদের সেই থিয়েটার দেখে খুব মজা পেতো। হায় রে, রেডিও টিভি কিছুইতো ছিলো না তখন।

দর্পণ বিসর্জনের ঠিক পরেই, বাইরের লোকেরা সবাই মণ্ডপ ছেড়ে চলে যেতেন। বাড়ির বড়রাও প্রায় সবাই বাইরের উঠানে চলে যেতেন। তখন বাড়ির বিবাহিত মহিলারা নামতেন মায়ের সাথে সোহাগ করার জন্য, সিঁদুর দেওয়ার জন্য। আমরা ছোটরা খুব মজা করতাম। ওই সিঁদুর খেলার দৃশ্য দেখে ভাবতাম যে দোল খেলার মতোই হচ্ছে।

দশমীর দর্পণ বিসর্জনের পর বিকেল থাকতে থাকতেই মায়ের মূর্তিকে নিচে নামানো হতো। আমরা প্রণাম করতাম। পুরোহিত মশাই বলতেন বেলপাতাতে দুর্গা লিখে পায়ে দেওয়ার জন্য।

তারপর একটি বড় ঠেলা গাড়িতে (যেটিকে সবাই ডানলপ বলতেন কারণ গাড়ির চাকাগুলি ছিলো ডানলপ রবারের টায়ারের) ঠাকুর প্রতিমা ওঠানো হতো। খুবই ঝামেলার ব্যাপার ছিলো। তারপর প্রধান ফটক দিয়ে বেরিয়ে পুরো গ্রাম প্রদক্ষিণ করে ভাগীরথীর তীরে পৌঁছাতাম। দুইটি নৌকাতে করে মাঝ নদীতে নিয়ে গিয়ে বিশেষ প্রক্রিয়াতে নৌকা সরিয়ে বিসর্জন হতো। সবকিছু সম্পন্ন করতে সন্ধ্যা হয়ে যেতো। এবার সন্ধ্যা হলে আমাদের গ্রামের মালাকার (না ফুলের মালা তৈরি করতেন না, ওনারা ছিলেন শব্দ বাজির বা আলোর বাজির বিশেষজ্ঞ) আসতেন অর্ডার দেওয়া বাজির সম্ভার নিয়ে। প্রথমে ছয়টি বাতাবি লেবুর সাইজের বোম ফাটানো হতো। ভয়ে কাঁপতাম আমরা। পরে আতসবাজি মানে বড় বড় মশাল আর তুবড়ি জ্বালানো হতো। ফিরে এসে শান্তির জল হতো আর মিষ্টি খাওয়া হতো। আমরা ছোটরা দলবেধে সবাইকে প্রণাম করতাম। পাশের জ্ঞাতিদের বাড়িতেও প্রণাম করতে যেতাম। এভাবেই দেশের বাড়ির মা দুর্গার পূজার অনুষ্ঠানের সমাপ্তি হতো।

 

যে বিশাল একান্নবর্তী পরিবারে আমরা বড় হয়েছিলাম, তারপর জীবিকার সন্ধানে সবাই যে কে কোথায় চলে গেলাম, আর আমাদের সেই শৈশব ও যৌবনকালের বিরাট বাড়িটি যেন সঙ্গীহীন বন্ধুবান্ধবহীন হয়ে গেলো। সংস্কার ও রক্ষনাবেক্ষনের অভাবে আমাদের আদি বাড়ির সেই জৌলুস আজ আর ধরে রাখা গেল না।

এখনের জেন জী বা জেন আলফা ছেলেমেয়েরা এগুলি দেখেনি বা হয়তো শুধুই শুনেছে, বা টিভিতে পুরনো আর্কাইভ দেখেছে। জ্ঞাতি গুষ্ঠি বা গ্রামের সবাইকে নিয়ে পূজার আনন্দ যে কি রকম সেটা যে না দেখেছে হয়তো বুঝতে পারবে না। তবুও চেষ্টা করলাম কিছু লেখার এক বিশেষ বন্ধুর অনুরোধে। তাকে অশেষ ধন্যবাদ আমার স্মৃতির অতল থেকে এই সব বের করাতে উৎসাহ দেওয়ার।

ছবি: নশীপুর রাজবাড়ি

*********

 

Sahityika Admin

Add comment