ক্যালক্যাটা ক্রনিকলস
© শান্তনু দে, ১৯৮৯ মেটালার্জিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং
২১শে ডিসেম্বর, ২০২৫:
ক্যালক্যাটা ক্রনিকলস ১
আমার পাকাপাকি কলকাতা বাস প্রায় এক মাস হলো।আমার অবস্থা অনেকটা অপুর মতো।
“তুমি চলিয়া যাইতেছ…. তুমি কিছুই জানো না, পথের ধারে তোমার চোখে কি পড়িতে পারে, তোমার ডাগর নবীন চোখ বিশ্বগ্রাসী ক্ষুধায় চারিদিককে গিলিতে গিলিতে চলিয়াছে—নিজের আনন্দের এ হিসাবে তুমিও একজন দেশ-আবিষ্কারক।”
শুধু ডাগর নবীন চোখ হবে না ওটা হবে একটা কুতকুতে প্রবীণ চোখ।
দু চোখ ভরে চওড়া চওড়া রাস্তা, আলিশান ভিক্টরিয়ান স্থাপত্য, আর চারদিকের আলোর রোশনাই দেখি। কিন্তু এদের সঙ্গে তো আর গল্পগাছা করা যায় না। অচেনা শহরে গল্প করি উব্যের ড্রাইভার, আমার নিজের গাড়ির ড্রাইভার, শপিং মলের সিকিউরিটি গার্ড, ফাঁকা রেস্তোরাঁর নিঃসঙ্গ ওয়েটার, এদের সঙ্গে। তার মধ্যে বেশ কিছু ইন্টারেস্টিং কথোপকথন হয়। সেগুলোই কিছু জমে গেলে লিখবো মাঝে মাঝে।
১.
উব্যের ক্যাবের দরজা খুলে ভিতরে ঢুকতেই,সুচিত্রা মিত্র স্বাগত জানালেন “যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে, তবে একলা চলো রে” দিয়ে। শুনে এতটাই হতভম্ব হয়ে গেলাম যে দু চার মিনিট কোনো কথাই বলতে পারলাম না। ততক্ষণে সেই গান শেষ হয়ে আবার শুরু হয়েছে। লুপে দিয়ে রেখেছে। এরকম অবাক হয়েছিলাম প্রায় বছর তিরিশ আগে, শেয়ার ট্যাক্সির সরদার্জি ড্রাইভার গুনগুন করে “ডুব দে মা কালী” গাইছে। তখন অমৃক সিং অরোরার গাওয়া শ্যামা সঙ্গীত খুবই জনপ্রিয় হয়েছিল। যাই হোক, একে বললাম, ‘এই গান তো এয়ারপোর্টে প্যাসেঞ্জারদের গান। সেখানে উব্যের না পাওয়া গেলে আমারই তো এই গান গাইতে ইচ্ছে করে।”
-” না, স্যার, আসলে রবীন্দ্রসঙ্গীত আমায় শক্তি দেয়, সাহস যোগায়।”
ছোকরা বলে কী! দুই বাংলার এক বাংলা ও ভারতের বিস্তীর্ণ অঞ্চল যাকে প্রায় রিজেক্ট করে দিয়েছে, সে শক্তি দেয়? সাহস যোগায়!”

কথায় কথায় এক বিয়োগান্ত নাটকের পর্দা উঠলো।
“স্যার আমাদের বাড়ি সুন্দরবনের কাছে। পারিবারিক মাছের ব্যবসা আছে। বছর দুয়েক আগে ভাইকে বললাম, “ভাই তুই ব্যবসাটা একটু ভালো করে দ্যাখ, আমি উব্যের চালিয়ে আরও দু’এক পয়সা এক্সট্রা রোজগার করি। তাহলে আমাদের ব্যবসা আরও বাড়ানো যাবে।” … এবার বাড়ি গিয়ে দেখি, মাছের ব্যবসার প্রচুর পয়সা সে মেরে দিয়েছে। এরপর ভাইকে ত্যাজ্য ভাই করে দিয়েছি। তাই “যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চলো রে।”
আমি বললাম, “সামান্য কারণে ভাইকে আলাদা করে দিলেন!! আপনি শিক্ষিত যুবক, জানেন তো টাকা মাটি, মাটি টাকা, তা ছাড়া, “ভায়ের মায়ের এত স্নেহ, কোথায় গেলে পাবে কেহ।” আরো অনেক কিছু বললাম যার সারমর্ম ‘যা সিমরান, জি লে তেরি জিন্দেগি’ টাইপের নিশ্চয়ই হয়েছিল। উবের ড্রাইভার দেখি গাড়ি ইউ টার্ন নিয়ে নিল। আমি বললাম, ‘ভাই আমাকে আমার গন্তব্যে ছেড়ে দিয়ে ভাইয়ের কাছে গেলে ভালো হয় না?” বার দুয়েক বলায় হুঁশ ফিরলো ভদ্রলোকের। যথাসময়েই ঠিক জায়গায় পৌঁছতে পেরেছিলাম, সুন্দরবন আর যেতে হয় নি।
২.
আমাদের আবাসনের কাছাকাছি একটা মধ্যবিত্ত টাইপের শপিং মল আছে। সেখানেই গত সপ্তাহে চুল কাটতে গিয়েছিলাম। চুল কাটবে যে ছেলেটা, তার চোখ মুখ ফোলা ফোলা, খুব কাঁদলে যেরকম হয়। একটু সহানুভূতির সুরে কথা বলতেই গড়গড় করে বেরিয়ে গেল। ছেলেটা মেসির বিশাল ফ্যান। বান্ধবীকে আই ফোন কিনে দেবে বলে পয়সা জমাচ্ছিল। সেখান থেকে আট হাজার টাকা তুলে টিকিট কেটে মেসিকে দেখতে গিয়েছিল। কিছুই দেখতে পায় নি। শোকে দুঃখে প্রায় পাথর হয়ে গেছে।
-“স্যার। এরা যারা মেসিকে ঘিরে রেখেছিল এরা জানে মেসির স্ট্রাগল? ছোট্ট মেসি মাত্র বছর দশেক বয়েস, নিউয়েল ক্লাবের হয়ে গোলের পর গোল করছে, এই সময় ধরা পড়লো ওর গ্রোথ হরমোন ডেফিসিয়েনসি আছে। লম্বা হবে না একদম। ট্রিটমেন্ট খুব খরচ সাপেক্ষ। বাবা স্টিল প্ল্যান্টের ম্যানেজার, মা কারখানার শ্রমিক। কোথায় পাবে এত টাকা? তিন বছর এরকম অনিশ্চয়তার পরে মেসি বার্সেলোনার বাচ্চাদের টিম লা মাসিয়ায় জয়েন করে, চিকিৎসার খরচ দেবে বার্সেলোনা, সেইজন্য। ভেবে দেখুন স্যার, একটা বাচ্চা ছেলে সব ছেড়ে ছুড়ে বিদেশে অনিশ্চিত পরিবেশে এসে মানিয়ে গুছিয়ে, শারীরিক সমস্যা অতিক্রম করে পৃথিবীর সর্বকালের সেরা ফুটবলার হলো এটা কী কম কথা? শুধু প্রতিভা নয়, অনেক ডেডিকেশন লাগে।”
আমি দু’একটা স্বান্তনা বাক্য বলে জিজ্ঞেস করলাম, “সে তো ঠিক আছে, কিন্তু গার্ল ফ্রেন্ডকে আই ফোন কেন কিনে দিতে হবে ! এন্ড্রয়েড খারাপ কী!”
– ” স্যার আমার ও, নেটপ্রভাবী। ”
– আমি বুঝতে পারলাম না। -” কী ভাবী?”
– ওই, যাকে আপনারা বলেন নেট ইনফ্লুয়েনসার। বাংলা কাগজ তাদের নাম দিয়েছে নেট প্রভাবী।
– তা, কী ভাবে নেট প্রভাবিত করে তোর গার্ল ফ্রেন্ড?
– ও হচ্ছে ফুচকা বিশারদ। সারা কলকাতায় কোথায় কোন ফুচকা বিক্রেতা আছে তাদের ভিডিও করে, ফুচকা রিভিউ করে ..অনেক ভিউ স্যার। ফুচকপিডিয়া দিয়ে ইন্সটা সার্চ করুন। আই ফোন না হলে নেট-প্রভাবীদের খুব অসুবিধা হয় স্যার।
কন্টেন্ট ইজ কিং, গুগুল পিক্সেল এর ক্যামেরা খুব ভালো, আর্ট ই বড় কথা, যন্ত্র নয় এই সব বলে চুল কেটে বেরিয়ে এলাম। তবে ঠিক জানি বান্ধবীর ভাগ্যে আই ফোনই আছে।
৩ জানুয়ারি, ২০২৬
ক্যালকাটা ক্রনিকলস ২
এটা কয়েক বছর আগে লিখেছিলাম। এর মধ্যে অনেকগুলোর মান পড়ে গেছে। তাও এটাই থাক…
একটা পারফেক্ট শীতের সকাল। খুব ভোরেই বেড়িয়ে পড়ুন … গন্তব্য ভবানীপুর। শ্রী হরি মিষ্টান্ন ভান্ডার। সেই প্রবাদপ্রতিম কচুরি আর হালকা মিষ্টি ছোলার ডাল। বেশী না …মাত্র খান চারেক খেয়েই থামুন। তখন মন বলবে, আত্মাও বলবে খান দশেক খেতে… কিন্তু একটু আত্ম সংযম দেখান। বরং দু’একটা ল্যাংচাই খেয়ে নিন। এবার যাবো পার্ক স্ট্রীট… চলুন হেঁটেই যাই, শীতকালে মন্দ লাগবে না। ফ্লুরিজ-এ পৌঁছে খোদ ইংলিশ ব্রেকফাস্ট অর্ডার করুন, এখানকার নাম বোধ হয় অল ডে ব্রেকফাস্ট… বেকন -হ্যামওয়ালা… সঙ্গে আইরিশ কফি। আস্তে আস্তে খান, এখনো একটা আশ্চর্য সুন্দর গোটা দিন পরে আছে … তাড়া কিসের? বেরিয়ে দেখবেন অক্সফোর্ড বুকস খুলে গেছে… ঢুকে পড়ুন … বই আর কফির গন্ধ মিলে আপনাকে একদম পাগল করে দেবে। ঘুরে ঘুরে বই-এর গন্ধ শুঁকুন, কথায় বলে ঘ্রাণেন অর্ধ ভোজনং। তাই বলে আবার যেন বইপত্র খেতে শুরু করে দেবেন না, বরং কিনে ফেলুন দু’চারটে। ওখান থেকে বেরিয়ে কুসুম রোল সেন্টার … অক্সফোর্ডের দোকানে অর্ধভোজন করা আত্মাকে শান্ত করতে খেয়ে নিন একটি এগ চিকেন রোল। পুরাণে আছে, মা দুর্গা শারোদৎসব শেষে এখান থেকেই শিবের জন্য এগ চিকেন রোল নিয়ে কৈলাসে ফেরেন। একটা খেয়ে, আর একটা প্যাক করে নিয়ে আপনার ব্যাকপ্যাকে ঢোকান, পরে খিদে পেলেই টুক করে খেয়ে নেবেন। যে রেটে হাঁটাহাঁটি করছেন, খিদে তো পাবেই। এবার হেঁটেই চলে যান ভিক্টরিয়া মেমোরিয়াল। ওই লেকটার পাশের বেঞ্চে বসে নতুন কেনা বইগুলো উল্টে পাল্টে দেখুন, লেকে ভিক্টরিয়ার পরীর প্রতিবিম্ব দেখুন। ফেরার পথে গেটের কাছের ফুচকাওয়ালার কাছ থেকে দু চারটে ফুচকা খেয়েই আমরা আবার হাঁটতে শুরু করবো … এবার গন্তব্য খিদিরপুরে ফ্যান্সি মার্কেটের কাছে ইন্ডিয়া হোটেল। লোকে বলে কলকাতার সব থেকে ভালো বিরিয়ানি এখানেই পাওয়া যায়। মাটন বিরিয়ানি খেয়ে বেরিয়ে, এবার একটা ট্যাক্সি নিয়ে নিন। এবার যাবো উত্তরের দিকে ….কলেজ স্ট্রিটের দিলখুশা কেবিনে কবিরাজি কাটলেট খেয়ে, কলেজ স্ট্রিটেই একটু ঘোরাফেরা করুন। দ্বারিকের দই আর বাগবাজারে নবীন দাসের দোকানের রসগোল্লা দিয়ে সন্ধ্যের দিকে একটু মিষ্টি মুখ করে নিন। সারা দিন ধরে এত ঘোরাঘুরি করে ক্লান্ত?…খিদেও পেয়েছে খুব।
চলুন রয়ালে রুমালি রুটি আর চিকেন চাপ খেয়ে বাড়ি যাই।
৪ঠা জানুয়ারি, ২০২৬
ক্যালক্যাটা ক্রনিকলস ৩
আগের রবিবার কিছুই লিখি নি। এদিকে বেশ কয়েকটা গল্প জমে গেছে। আজকে লিখেই ফেলি সবকটা এক সাথে।
ক্যাব ড্রাইভার্স, কলকাতায় গড ফাদার
দিন দশেক আগে, একটা ক্যাবে উঠে দেখি, জোরে ভোজপুরী গান চলছে। রেটিং এর ভয় দেখাতে, অবশ্য বন্ধই করে দিল। তারপর শুরু হলো ফোন। একের পর এক নাম্বারে ফোন করে লোকটা খুব মিহি গলায় বলতে শুরু করলো (ভোজপুরী ভাষায়),”আজ কত তারিখ মনে আছে? টাকা এলো না কেন? কোনো ভয় ডর নেই নাকি? ”
আমি বলি – “এইভাবে বললে কেউ টাকা দেবে? আর, খামোখা টাকা দেবেই বা কেন আপনাকে?”
ড্রাইভার সাহেব: “আপনি গড ফাদার দেখেছেন? আমি এই অঞ্চলের বিহারি ট্যাক্সি ড্রাইভারদের মধ্যে “Make them an offer they can’t refuse” বলা লোকটা। আমি ওদের প্রটেকশন দি। পুলিশের হুজ্জুতি থেকে বাঁচাই, আর বিনিময়ে সামান্য একটু ফিজ নি।”
আর বেশি কথা বাড়ালাম না। “ভোজপুরী গান চালাও ভাই। রেটিং ও ফাইভ স্টার দেবো বলে নেমে এলাম।”
সঞ্চয়ী ক্যাব ড্রাইভার
কয়েকদিন আগে আর এক ক্যাবে ড্রাইভারের সঙ্গে গল্প করছিলাম। ভদ্রলোকের বয়স আন্দাজ প্রায় পঞ্চাশ। আঠেরো বছর বয়স থেকে হলুদ / হলুদ-কালো ট্যাক্সি চালানো দিয়ে শুরু, আর এখন টাটা কোম্পানির ইভি গাড়ি চালান। মাসিক আয় এক লাখ কুড়ি। তার মধ্যে লাভ এক লাখ। স্ত্রী স্কুল টিচার। ছেলে ও মেয়ে দুজনেই IT কোম্পানিতে কাজ করে। ইচ্ছে ,৫৫ বছর বয়সে কাজ কর্ম ছেড়ে দিয়ে গ্রামের বাড়িতে ফিরে গিয়ে চাষ বাস করবেন। বিয়ের সময় প্যাক্ট করেছিল, যখন যার ইনকাম কম হবে তার টাকায় সংসার চলবে। আয় যার বেশি তার টাকা সঞ্চয় হবে। সঞ্চয়ের যা হিসেব দিল ,সেটা আজকের দিনেও খুব একটা কম নয়।

কালচার কাকু ক্যাব ড্রাইভার
আর একদিন, ক্যামাক স্ট্রিট থেকে উঠেছি। ড্রাইভার ভদ্রলোক মধ্য চল্লিশ। ব্লু টুথে গিটারে পুরনো দিনের হিন্দি গান বাজছে। জিজ্ঞেস করতে বললো, সুনীল গাঙ্গুলির গিটার। এক সময় বাঙালির ঘরে ঘরে বাচ্চারা গান শিখতো, গিটার বাজাতো, কিছু না কিছু বাজাতো, পড়াশোনা করতো, পাড়ায় নাটক হতো, নৃত্যনাট্য হতো। এখন সব গেছে ।”
মৃদু প্রতিবাদ করলাম। আজকালকার জনপ্রিয় কয়েকজন গায়ক, গায়িকা, আর গ্রূপের নাম বললাম।
শুনে খুব একটা ইম্প্রেসড হলেন না। বললেন “কোথায় শ্যামল, মান্না, হেমন্ত, প্রতিমা, সন্ধ্যা, তরুণ? আর কোথায় আজকের এরা? ”
কালচারকাকুর সঙ্গে একটা ডিবেট করবো ভাবলাম। কিন্তু গন্তব্যে পৌঁছে যাওয়ায় আর কথা এগোলো না।
কলকাতায় চন্দ্রবিন্দুর কনসার্ট:
ক্যালক্যাটা ক্রনিকলস ৪
কলেজের এক বন্ধু খবর দিল। বিড়লা সভা ঘরে চন্দ্রবিন্দুর প্রোগ্রাম। গত তিরিশ বছর ধরে সুমন, মহিনের ঘোড়াগুলি, পরশ পাথর, ক্যাকটাস, নচিকেতা, অঞ্জন, রূপম ইসলাম ইত্যাদি মহীরুহ সমান গায়ক ও গানের দল থাকলেও, চন্দ্রবিন্দু যেন প্রাণের আরাম, আত্মার শান্তি। উপল, অনিন্দ্য, চন্দ্রিল, সঙ্গে সুরজিতের গিটার … একদম যাচ্ছেতাই রকমের ভালো কম্বো। গান শুনে মন ভরে গেল। তবে উপরি পাওনা বলতে Anny’s Anthem ও The missing link বলে দুটো রক ব্যান্ডের গান। Anny Ahmed মূলতঃ কাভার ভার্সন গাইলেন, মহিনের, চন্দ্রবিন্দু, প্রতুলের …খুবই ভালো গাইলেন। The missing link অনেক দিন গান বাজনা নিয়ে আছে। এরাও খুবই ভালো গাইলেন। ভবিষ্যতে সুযোগ পেলে দুটো দলেরই একক অনুষ্ঠান শুনবো।
কফি শপে ঝগড়া
২৫শে জানুয়ারি, ২০২৬
কাল সন্ধ্যে বেলা একটু সময় ছিল। একটা খুব ছোট কফি শপে কফি খেতে ঢুকলাম। দেখলাম ,খুব ঝগড়া হচ্ছে। এক বস (মেল), এক সাব -অর্ডিনেটকে (ফিমেল) খুব বোঝাচ্ছে (না লেনিন নয়)। যা বুঝলাম, বস মেয়েটার কাজ নিজের নামে চালিয়ে দিয়েছে। আর মেয়েটা রেগে একদম বেগুনি হয়ে গেছে। ব্যাপারটা বেশ দৃষ্টিকটু হয়ে যাচ্ছিল। তাই একটু হস্তক্ষেপ করলাম। বললাম, “সেই রামায়ন, মহাভারতের যুগ থেকে বসকে ইম্প্রেস করার জন্য লোকে সাব-অর্ডিনেটের কাজ ঝেড়ে নিজের বলে চালিয়েছে। আমি নিজেই কতবার করেছি। আমার বস তো পুরো লাইফটাই আমার পিঠে চড়ে চালালো। এই যে হনুমান লঙ্কা দহন করলো, পুরোটাই একা করেছিল? ওর জুনিয়ররা সাহায্য করে নি! আপনার ও সময় আসবে। আপনিও তখন সাব-অর্ডিনেটকে দিয়ে কাজ করিয়ে নিজের বলে চালাবেন।”
এই প্রপোজাল দেখলাম মেয়েটির মনে ধরলো। একটু হাসিও ফুটলো। বস ছেলেটি তো খুব খুশি। আমি বেরোবো বলে দরজাও খুলে দাঁড়ালো।
কি ভালো পুলিশ!!
২৫শে জানুয়ারি, ২০২৬
যদিও এই শহরে আমার কাটানো দিনের সংখ্যা কম নয়, তবু রাস্তাঘাট আজও আমার কাছে প্রায় অচেনা। কোন জায়গা কোথায়—মোটামুটি ধারণা আছে ঠিকই, কিন্তু সেখানে কীভাবে পৌঁছতে হয়, সে বিষয়ে আমি চূড়ান্ত অজ্ঞ। এক কথায়, আমাকে নির্দ্বিধায় ‘রাস্তা-কানা’ বলা যায়। এই কারণেই ক্যাব, ট্যাক্সি বা নিজের গাড়ির পরিবর্তনশীল (ড্রাইভার সার্ভিস এজেন্সি থেকে নেওয়া) চালকদের প্রথমেই আমি একটি বিধিসম্মত সতর্কীকরণ দিয়ে দিই। সতর্কীকরণটি খুব সরল—
“ভাই, কীভাবে যাবো বলে ঘ্যানঘ্যান করবেন না। গুগল ম্যাপে যেমন দেখাচ্ছে, ঠিক তেমনই চালাবেন। গুগল ম্যাপের ম্যাম যা বলবেন, সেটাই ফাইনাল।”
কিন্তু তাতেও বিপত্তি কমে না। একজন একদিন বলেছিল,
“স্যার, ম্যাপের ম্যাম ইংরেজিতে কী বলছে বুঝতে পারছি না।”
আর কালই এক ড্রাইভার জানাল, ম্যাপ নাকি ‘বলগুটা রোড’ বলছে—সে রকম কোনো রাস্তা এই শহরে নেই। পরে বুঝলাম, ম্যাম আসলে ‘বেলেঘাটা রোড’ বলছিলেন।
যাই হোক, আমি রাস্তা-কানা হলেও গুগল ম্যাপের ম্যামরা আজ পর্যন্ত আমাকে ঠিক জায়গাতেই পৌঁছে দিয়েছেন। অন্যথা ঘটেনি।
কয়েকদিন আগে এল এক Gen-Z ড্রাইভার। আমি নিজে অ্যান্টি-জেনারেশন-গ্যাপ গোত্রের মানুষ। কলেজের কয়েক বছরের ছোট থেকে শুরু করে আমার নিজের ছেলে—যে বছরখানেকের জন্য জেন-জি হতে পারেনি—কারও সঙ্গেই আলাদা করে জেনারেশন গ্যাপ রাখিনি। তবে সাম্প্রতিক কালে জেন-জি প্রতিবেশী দেশগুলোতে যা কাণ্ড ঘটাল, তাতে খানিকটা বোমকে গিয়ে ওদের দিকে সন্দেহের চোখেই তাকাই।
যাই হোক, ড্রাইভারকে আমার সেই বিধিসম্মত সতর্কীকরণ শোনাতেই সে বলল, “একদম চিন্তা করবেন না, দাদু।”
আমার লবণ-চুল (লবণ এত বেশি, মরিচ এত কম—তাই লবণই বললাম) দেখে রাস্তাঘাটে, ট্রেনে-বাসে একটু প্রিভিলেজ পাই বটে, কিন্তু ‘দাদু’ সম্বোধন এই প্রথম। জেন-জি ছোকরাটাই সেই ইতিহাস গড়ল।
সে আরও যোগ করল, “এই কলকাতার রাস্তাঘাট আমি হাতের তালুর মতো চিনি। আমার ম্যাপ-ট্যাপ লাগবে না।”
আমার গন্তব্য ছিল শেক্সপিয়ার সরণি। কনফিডেন্ট ড্রাইভারের হাতে নিজেকে সঁপে দিয়ে নিশ্চিন্তে হোয়াটসঅ্যাপে বন্ধুদের গ্রুপে হা-হি-হা করছি, হঠাৎ জানলার বাইরে তাকিয়ে দেখি—ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল!
নিউ টাউন থেকে শেক্সপিয়ার সরণি যেতে গিয়ে ভিক্টোরিয়া কীভাবে এলো, সে প্রশ্ন না করেই সকালবেলার মিঠে রোদে দৃশ্যটা উপভোগ করলাম।
সমস্যা শুরু হলো, ছোকরাটি যখন নির্বিকারভাবে একটা ‘নো এন্ট্রি’ রোডে গাড়ি ঢুকিয়ে দিল। সঙ্গে সঙ্গে হাজির এক ট্র্যাফিক সার্জেন্ট—ইনিও জেন-জি। তারপর দু’জনেই নিজ নিজ ফর্মে এসে গেল।
সার্জেন্ট: “লাইসেন্স দেখাও।”
ড্রাইভার: “লাইসেন্স কিস চিজ কা? দেশ মে লাইসেন্সরাজ ওয়াপস আয়া ক্যা?”
এই উত্তর সার্জেন্ট মোটেই আশা করেননি। তিনি সঙ্গে সঙ্গে আরেকজনকে ফোন করে কী সব কথা বলতে লাগলেন। আর ড্রাইভার ছেলেটিও কাউকে ফোন করে জিজ্ঞেস করছে, “ইয়ে লাইসেন্স কিস চিজ কা? ও হ্যায় কেয়া?”
আমি বুঝলাম, কেসটা সহজে মিটবে না। সকালের মিঠে রোদে এই জেন-জি বনাম জেন-জি কাজিয়া দেখতে মন্দ লাগছিল না বটে, কিন্তু আমার দেরি হয়ে যাচ্ছিল। তাই ট্র্যাফিক সার্জেন্টকে বললাম, “ফেসবুকে দেখেছি—পরীক্ষা থাকলে দেরি হয়ে গেলেও আপনারা নাকি বাইকে করে পৌঁছে দেন। আমারও সেই সার্ভিসটা দরকার। হয় ওকে ছেড়ে দিন, নয়তো আমাকে বাইকে চাপিয়ে গন্তব্যে পৌঁছে দিন।”
অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি—দু’মিনিটের মধ্যে এক ঝকঝকে এনফিল্ড হাজির। আমাকে পিলিয়নে বসিয়ে ঠিক সময়ে শেক্সপিয়ার সরণিতে পৌঁছে দেওয়া হলো।
কি ভালো পুলিশ, তাই না?

ফটোগুলো নেট থেকে ঝেড়ে,
আর স্কেচের ব্যাপারটা: সঙ্গের স্কেচগুলো AI নির্মিত। লেখার থেকে স্কেচ অনেক ভালো বানিয়েছে…
*********






Add comment