সাহিত্যিকা

এ্যান্টারটিকা অভিযানে দুই বিক্কলেজিয়ান (সপ্তম পর্ব)

এ্যান্টারটিকা অভিযানে দুই বিক্কলেজিয়ান (সপ্তম পর্ব)
© দীপ্ত প্রতিম মল্লিক, ১৯৮০ মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং

আগের পর্বের লিংক
https://sahityika.in/2026/06/27/%e0%a6%8f%e0%a7%8d%e0%a6%af%e0%a6%be%e0%a6%a8%e0%a7%8d%e0%a6%9f%e0%a6%be%e0%a6%b0%e0%a6%9f%e0%a6%bf%e0%a6%95%e0%a6%be-%e0%a6%85%e0%a6%ad%e0%a6%bf%e0%a6%af%e0%a6%be%e0%a6%a8%e0%a7%87-%e0%a6%a6-5/

৩রা জানুয়ারি ২০২৪ – মন্তেভিদিও, উরুগুয়ে
নতুন বছর শুরু হয়ে গেছে। এই দু দিন জাহাজ চলেছে অবিরাম- দুদিন পর আজ জাহাজ থামবে উরুগুয়েতে। সুতরাং এই দু’দিন আমাদের অগাধ বিশ্রাম, আর তাতেই যেন হাঁফিয়ে উঠেছি। দক্ষিণ আমেরিকার পূর্ব দিক ধরে চলেছি। দেখার সেরকম কিছু ছিল না এই দু’দিন। অনন্ত সমুদ্র, দূরে আর্জেন্টিনার ক্ষীণ তটরেখা, আর মাঝে মাঝে তিমির ফোয়ারা। ফলে আজ মনে এক অনাবিল আনন্দ এল, যখন দূরে উরুগুয়ের তটরেখা দেখতে পেলাম।

উরুগুয়ে নিয়ে সামান্য কিছু বলি। আয়তনে এটি দক্ষিণ আমেরিকার ক্ষুদ্রতম দেশ। একদিকে ব্রাজিল, অন্যদিকে আর্জেন্টিনা, ফলে উরুগুয়ে এদের মাঝে স্যান্ডুইচ। ছোট দেশ, কিন্তু শতকরা হিসেবে পৃথিবীর সবচেয়ে বেশী স্বাক্ষরিত লোকের বাস এখানে। এছাড়া সামাজিক বিচারেও এগিয়ে আছে এই দেশ- তামাম আমেরিকার মধ্যে উরুগুয়েই প্রথম মেয়েদের সমান অধিকার দেয় – মেয়েরা ভোট দেওয়ার অধিকার পায় ১৯২৭ সালে।

অনেক আগেই জাহাজ সমুদ্র থেকে দে লা প্লেটা নদীতে ঢুকেছে। স্প্যানিশ ভাষায় “রিও দে লা প্লাটা” (Río de la Plata) অর্থ “রূপালী নদী” (River of Silver), এটি মূলত পারানা এবং উরুগুয়ে নদীর মিলিত স্রোতে সৃষ্ট একটা বিশাল ফানেল-আকৃতির মোহনা। প্রায় ২২০ কিলোমিটার (১৪০ মাইল) প্রশস্ততার কারণে এটি বিশ্বের সবচেয়ে প্রশস্ত নদী, আর আমরা চলেছি পৃথিবীর সবচেয়ে চওড়া নদীর ওপর দিয়ে। সমুদ্রই বলা যায়। এই মোহনার দুই তীরের সমৃদ্ধ অঞ্চলে আছে দক্ষিণ আমেরিকার দুটি প্রধান রাজধানী: নদীর উত্তর তীরে মোহানার কাছে উরুগুয়ের রাজধানী মন্তেভিদিও, আর দক্ষিণ-পশ্চিম তীরে কিছুটা ভেতরে আর্জেন্টিনার রাজধানী বুয়েনস আইরেস। তবে সমুদ্রে বা মোহানায় যেমন ঢেউ থকে, সেরকম নেই-আর জলের ঘন নীল রঙ পালটে হয়েছে হালকা নীল, কখনও বা ঘোলাটে। জলের গভীরতা প্রচুর, ফলে জাহাজ চলাচলে অসুবিধা নেই। বেলা আটটায় জাহাজ বন্দরে এল।

এর আগেই আমরা জলখাবারের পাট চুকিয়ে চারতলায় অপেক্ষা করছি। জাহাজ থেকে ট্যুর নিয়েছি কেননা মন্তেভিদিও বিরাট, শহর, হন্টনের আয়ত্তের বাইরে। নটায় ডাক পড়ল-কনডাকটেড টুরের। অনেক লোক, আর সামনে ট্যুর ম্যানেজার পতাকা নিয়ে চলেছেন। জাহাজ থেকে নেমে দেখি সারি দিয়ে বাস। অনেক লোক, তাই বাসও অনেক। আমরা চারজন একটা বড় বাসে উঠলাম, প্রায় চল্লিশ জন পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এসে একত্রিত হয়েছেন। এই বাসে ইংরাজি বলা গাইড আছেন।

বাস যাত্রা শুরু করল, গাইড রাস্তাঘাট বোঝাচ্ছেন- বলছেন যে মন্তেভিদিওর পুরনো শহর যেমন ছিল, তেমনই রাখা আছে, তাকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে নতুন শহর। নতুন শহর মানে ঝাঁ চকচকে রংবেরঙ্গের বিশাল বিশাল বাড়ি, বিরাট চওড়া সব রাস্তা। বাড়িগুলো সবই কুড়ি পঁচিশ তলা। দেখার মত হলো এদের রঙ- কেউ নীল, কেউ সবুজ, কেউ বা গোলাপি। খানিক যাওয়ার পর গাইড জানাল, এবার আমরা পুরানো আর নতুন শহরের সন্ধিস্থলে এসে গেছি। আর এখানেই আছে মন্তেভিডিওর বিখ্যাত প্লাজা দি ইন্ডিপেন্সিয়া, যেখানে আমরা নামব।

বাস পারকিং এ দাঁড়ালে আমরা নামলাম। পাশেই বহু প্রাচীন ঐতিহাসিক বাড়ি কলোনিয়া ডেল স্যাক্রিমেন্টো। বেশ কিছু ছবি তোলার পর আমরা ঢুকলাম ঐতিহাসিক ওল্ড কোয়ার্টারে। ১৬৮০ সালে নির্মিত এই পুরানো শহর ওয়ার্ল্ড হেরিটেজে স্থান পেয়েছে। পাথুরে রাস্তা- দু পাশে ছোট ছোট রঙ বেরঙের বাড়ি- অনেকটা স্প্যানিশ ধাঁচে বানানো। পথে পড়ল বিরাট এক ক্যাথিড্রাল। মিনিট চল্লিশ হাঁটা হল বিভিন্ন অলিগলি দিয়ে, পুরনো শহরের একটা ধারণা তৈরী হল।

আবার সবাই মিলে বাসে ওঠা। বেশ খানিকক্ষণ ধরে চললাম বিরাট চওড়া রাস্তা দিয়ে, দু পাশে আকাশ ছোঁয়া সব বাড়ি। রাস্তায় লোকজন সব ব্যস্ত হয়ে কাজে যাচ্ছে। ক্রমে বাস এল এক বিরাট স্টেডিয়ামের পাশ দিয়ে- ঘন নীল রঙে মোড়া গ্যালারি। গাইড জানালেন, ১৯৩০ সালে এখানেই (Estadio Centenario in Montevideo) প্রথম ফিফা ফু্টবল বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হয়। যেহেতু উরুগুয়ে ১৯২৮ সালে অলিম্পিক ফুটবলে সোনা জেতে তাই উরুগুয়েই প্রথম বিশ্বকাপ আয়োজনের দায়িত্ব পায়।

স্টেডিয়াম দেখার পর বাস আবার এগিয়ে চলল। পুরো শহরটা এক চক্কর ঘুরে নামলাম এক প্রাসাদসম বাড়ির সামনে। এদের পার্লামেন্ট (Palacio Legislativo)। বিশাল সাদা রঙ এর বাড়ি-স্থাপত্যে অনন্য। এর একটা পুরনো ফাইল ফটো দিলাম।

এবার এলাম এখানকার এক জমজমাট রাস্তায়- নাম লা রামলা – দোকানের পর দোকান এখানে, তবে সবকটাই নামী ব্রান্ডের, কাজেই দেখা ছাড়া উপায় নেই। আবার বাসে উঠলাম, এবার বাস দাঁড়ালো নদীর ধারে প্লাজা দে লা এ্যামেন্টা নামের এক জায়গায়। সামনেই বিশাল নদী, যেন এক সমুদ্র। ওপরের লেভেলে পার্ক, নীচের লেভেলে দেখছি অজস্র বীচ, অনেকেই স্নান করছে। বস্তুত বলে না দিলে বোঝা যায় না এটা নদী না সমুদ্র। দেখতে দেখতে দুপুর একটা বাজে, এবার ফেরার পালা। এই সিটি হাইলাইটস ট্রিপে মোটামুটি শহরটার ওপর একটা ধারণা হলো। লোকজনও যা দেখলাম, ভালই লাগল। কোত্থাও ভিখারী বা ভবঘুরে চোখে পড়ল না। শহরটিও খুবই পরিষ্কার।

আমরা ফেরার পথে প্লাজা দ্য ইন্ডিপেনসিয়াতে নেমে গেলাম। বিরাট জমজমাট এলাকা। ফিস মার্কেটে অজস্র রেস্টুরেন্ট। তারই একটাতে কফি ও মাছভাজা খাওয়ার পর আবার হেঁটে হেঁটে বন্দরে এলাম। এক চক্কর বন্দরে ঘুরে আবার জাহাজে ওঠা। এবারে মন ভারাক্রান্ত, কারণ অদ্যই জাহজে শেষ রজনি। কাল সকালবেলায় জাহজ চলে আসবে অন্তিম গন্তব্যস্থল বুয়েনস আইরিস।

জাহাজে নিয়ম হল শেষদিনে তোমার সুটকেশ প্যাক করে কেবিনের দরজার বাইরে রখতে হবে। আর যদি তুমি সুটকেশ নিজে নামাতে চাও তাহলে অন্য কথা। কিন্তু ঐ ভারী সুটকেশ নিজেরা নামানো যেমন ঝকমারি তেমনি শক্তও। কজেই আমরা মালপত্র গুছিয়ে সুটকেশ বন্ধ করে বাইরে রেখে ডিনার খেতে গেলাম। ততক্ষণে জাহাজ ছেড়ে দিয়েছে- চলেছে বুয়েনস আইরিসের দিকে।

৪ঠা জানুয়ারি ২০২৫– বুয়েনস আইরিস

সকাল থেকে হৈ হৈ-জাহাজ ভিড়েছে বুয়েনস আইরিসের ডকে- আমরা এসে গিয়েছি আর্জেন্টিনায়। বাকি যা কিছু মালপত্র ছিল সেগুলো পিঠের ব্যাগে পুরে ঘন্টাদাদের ডাকলাম, ওরা তৈরিই ছিল, চারজনে গেলাম এখানে শেষবারের মত জলখাবার খেতে। খেতে খেতেই আমাদের ডাক। অতএব বিদায় জাহাজ। সতেরো দিনে জাহাজ যেন ঘরবাড়ি হয়ে গিয়েছিল। তাকে বিদায় দিতে কষ্টই লাগে। গ্যংওয়ে দিয়ে বেরুলাম। লাগেজ রাখাই ছিল। যে যার লাগেজ তুলে কাস্টমস করে বেরুলাম। আশ্চর্য লাগল ইমিগ্রেশন বলে কিছুই পেলাম না। একটা অন্য দেশে ঢুকছি- ইমিগ্রেশন নেই? জিজ্ঞাসা করতে বলল, না, না, কিছু লাগবে না। তখন ভেবেছি, এটাই বোধহয় নিয়ম, কিন্তু পরে এর জন্য খানিকটা ভুগতে হয়েছিল।

বাইরে বেরিয়ে গাড়ির জন্য অপেক্ষা করছি, কিন্তু তার আর দেখা নেই। ঘন্টাদার স্যান্তিয়াগোর অভিজ্ঞতার পর অন্য গাড়ি নিতে ভয় লাগে, না হলে ট্যাক্সি বাইরে দেখছি ঘুরে বেড়াচ্ছে। কিন্তু কে যে কতোটা সৎ জানা নেই। আর্জেন্টিনা আর একটা দেশ যেখানে প্রচুর ঠকবাজ ঘুরে বেড়াচ্ছে। আধঘন্টা অপেক্ষার পর যখন গাড়ি এলো না, কাছেই একটা এয়ারপোর্ট ট্যাক্সির এজেন্সিকে বললাম গাড়ি পাওয়া যাবে কিনা। সে বলল, এখন কোনো গাড়ি নেই- বেলা এগারোটার আগে কিছু পাওয় যাবে না আর আমাদের লাগবে পঞ্চাশ ডলার। এইটুকু রাস্তা পঞ্চাশ ডলার? আমরা বুকিং ডট কম থেকে বুক করেছিলাম পনেরো ডলারে। অনিবৌদি জিজ্ঞাসা করল, ট্যাক্সি তো অনেক কম, তোমাদের এত রেট কেন?
– ট্যাক্সি? যাও, যাবে তো, আমি তো বারণ করছি না। তবে তোমরা বেড়াতে এসেছ, তাই বলি এদের বিশ্বাস নেই, সে তোমাদের কোথায় নিয়ে যাবে বা আদৌ মালপত্র নিয়ে পৌছাবে কিনা সে গ্যারান্টি কেউ দেবে না।
– কেন? বিশ্বাস করা যায় না ট্যাক্সিকে?
– বিশ্বাস? বুয়েনস আইরিসের ট্যাক্সিওলাদের? তোমরা ক্ষেপেছ? জানো, এখানে রোজ কত কমপ্লেন আসে কাস্টমারদের থেকে? আমরা বেশি রেট নিই বটে কিন্তু নিরাপদে পৌছে দিই।
– কিন্তু সে তো বলছ বেলা এগারোটার আগে নয়, এই আড়াইঘন্টা মাল নিয়ে করব কি?
– সে আমি বলতে পারব না, নিতে হলে নাও, না হলে যাও।
ঘন্টাদা বলল, তোমরা মাল নিয়ে দাঁড়াও, আমরা দুজন বাইরেটা দেখে আসি।

আমরা দুজন পোর্ট এরিয়ার গেট দিয়ে বেরিয়ে এলাম। ট্যাক্সি প্রচুর বটে কিন্তু তার লাইনে শ-খানেক লোক দাঁড়িয়ে। দুজন বিফল মনোরথে আবার ভিতরে ঢুকব, এমন সময় একটা বড়ো প্রাইভেট গাড়ি এসে দাঁড়ালো। গাড়ি থেকে ড্রাইভার নেমে বোর্ড বের করছে, দেখি আমার নাম লেখা। দেখে ধড়ে প্রাণ এল। কোথায় ছিলে বাবা এতক্ষণ? ড্রাইভার আমাদের কথা কিছুই বুঝল না, বা হয়তো বোঝার চেষ্টাই করল না। যাই বলি, সে উত্তর দেয় “নো ইংলিশ”। ইশারা করে বললাম, ভাই এক মিনিট দাঁড়াও। ঘন্টাদা ততক্ষণ চলে গেছে বৌদিদের ডাকতে। আমি গাড়ির দরজা খুলে দাঁড়িয়ে আছি, যাতে গাড়ি না ভেগে যায়। ওরা মাল নিয়ে এল, ড্রাইভার মাল গাড়িতে তোলার পর গাড়িতে বসে নিশ্চিন্ত।

আমাদের গন্তব্যস্থল ওয়ান্ডিহ্যাম হোটেল, আধঘন্টায় এসে গেলাম। বিশাল হোটেল, ভেবেছিলাম এখন সবে দশটা বাজে, ঘর দেবে না, কিন্তু ঘর পাওয়া গেল। লোকজন ভালো, হোটেলটি চমৎকার। ন’তলায় পাশাপাশি দুটি ঘর পেলাম। মালপত্র রেখে রিসেপশনে এসে জানতে চাইলাম এখানে হলুদ বাসের কাছাকাছি স্টপ আছে কিনা। বুয়েনস আইরিস বিশাল শহর, আর পকেটমার, ঠকবাজে ভর্তি। কাজেই শহরে ঘুরতে গেলে সাবধানতা দরকার, তাই পাবলিক ট্রান্সপোর্ট পুরোপুরি বর্জনীয়। তবে উপায় কি? উপায় হলদে বাস- যেটা হপ অন, হপ অফ বাস। পুরো শহর চক্কর মারছে এই বাস, ২২টা স্টপ আছে- যেখানে খুশি নামো, ওখানকার দর্শনীয় জিনিষপত্র দেখে আবার হলদে বাস ধরো, এগিয়ে যাও পরের জায়গাতে। রিসেপশন থেকে জানালো, এখান থেকে পাঁচ মিনিট হাঁটাপথে আছে আর্জেন্টিনার বিখ্যাত কফিশপ-কাফে তোরতোনি, ওর উল্টোদিকে পেয়ে যাবে হলদে বাস। রিসেপশন থেকে ম্যাপ নিয়ে হেঁটে এলাম কাফে তোরতোনি। রাস্তায় প্রচুর লোক। তখন বাজে প্রায় এগারোটা, কিন্তু কাফে তোরতোনিতে প্রায় শ খানেক লোক লাইন দিয়েছে ঢোকার জন্য। এতো ভিড়? এতো লাইন? ঘন্টাদা বলল, কি কফি, একবার চেখে দেখতে হচ্ছে তো। অনি বৌদি বলল, ভিড় দেখেছ? সারদিন লাইনেই চলে যাবে, তার চেয়ে সন্ধ্যায় দেখা যাবে।

একটু দাঁড়াতেই বাস এসে গেল, আমরা ৪৮ ঘন্টার, মানে দু’দিনের টিকিট নিলাম। ভাড়া প্রতিজনের ৩০ আমেরিকান ডলার। এখানে ৩০ ডলার মানে অনেক, কিন্তু উপায় তো নেই! দোতলা বাস। নীচে খান কুড়ি সীট আর ওপরটি খোলা- সেখানে খান ত্রিশ। আমরা শহরটাকে ভালো করে দেখব, চিনব বলে ওপরে গেলাম। তখন বুঝিনি কিন্তু বাস ছাড়তেই বোঝা গেল এখানে রোদের তাপ প্রবল। বাস চললে মৃদু একটা হাওয়া পাওয়া যাচ্ছে বটে কিন্তু একের পর এক সিগন্যল, ফলে বাস ঘন ঘন দাঁড়াচ্ছে আর গরমে চাঁদি ফেটে যাওয়ার জোগাড়। নীচের সব সীট ভর্তি ফলে উপায়ও নেই।

আধঘন্টায় এসে গেল আমাদের প্রথম নামার স্টপ লা বোকা, যেটি ফুটবলের মক্কা। এখানেই আছে বোকা জুনিয়ার ক্লাবের বিরাট স্টেডিয়াম (La Bombonera – Boca Juniors Stadium)। আর আছে বোকা জুনিয়র্স প্যাশন মিউজিয়াম (Museo de la Pasión Boquense)। ৩ এপ্রিল, ২০০১ সালে এটির উদ্বোধন হয়। এটি একটি ফুটবল-ভিত্তিক জাদুঘর যা ক্লাব অ্যাটলেটিকো বোকা জুনিয়র্সের ইতিহাস ও এর সাথে যুক্ত ব্যক্তিদের প্রতি উৎসর্গীকৃত। ২০০১ সালে উদ্বোধনের পর এটি আর্জেন্টিনার প্রথম ক্রীড়া জাদুঘর এবং আমেরিকার প্রথম ফুটবল-ভিত্তিক জাদুঘর। এটিকে বিশ্বের অন্যতম সেরা ফুটবল জাদুঘর হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এখানে প্রতি বছর প্রায় ৫ লক্ষ পর্যটক আসেন এবং প্রধানত বিদেশীরাই। এখানে সব দোকানেই প্রমাণ সাইজের মারাদোনা, মেসি, বেনিনি, মারিও কোম্পোজ, গ্যাব্রিয়েল, সারজিয়ো ইত্যাদি বিখ্যাত ফুটবলারদের প্রমান সাইজের স্ট্যাচুতে ছয়লাপ। লোকেরা ভিড় করে ছবি তুলছে ঐ স্ট্যাচুর সাথে। প্রত্যেকটি বাড়ি রঙ্গীন- নীল সবুজ,হলদে রঙের ছড়াছড়ি। লা বোকার রাস্তায় খানিকক্ষণ হাঁটা। হাজার হাজার টুরিষ্ট এখানে। পকেট সামলে চলা- সে আরেক ঝকমারি।

বোকা জুনিয়ার ক্লাবের সুভেনির শপে খানিক ঘুরলাম। স্টেডিয়ামটাও বাইরে থেকে দেখলাম। তারপর আবার চাপলাম আর একটা হলদে বাসে। এবার নামব পরের স্টপ ক্যালিমিনিতো (Caminito, অনেক সময়ই “Caliminito” উচ্চারণ হয়), আমাদের তিন নম্বর স্টপ।

আগে থেকেই সাবধান বাণী ছিল ক্যালিমিনিতোর ওপর। এখানে নাকি পকেটমারের ছড়াছড়ি। আর আছে ছিনতাইবাজ। যে সব গলিতে লোক চলাচল নেই বা কম, সেখানে টুরিষ্টদের যাওয়া মানা। এখানে অজস্র গলিও আছে, তবে গলির দু ধারে এত চমৎকার সব রঙ্গীন বাড়ি, তাদের অপুর্ব ডিজাইন আর প্রায় সব বাড়ির ব্যলকনিতে হয় মেসি দাঁড়িয়ে, নয় সারজিও দাঁড়িয়ে, মানে তাঁদের প্রমান সাইজ স্ট্যাচু। আমরা বিভিন্ন গলির মুখ থেকে যতোটা পারি দেখলাম। এখানে একটা দোকানে সুস্বাদু এম পানাডা খেলাম লাঞ্চে, তারপর আবার হলদে বাসে চাপা।

আমাদের পরের লক্ষ্য স্টপ সাতাশ, এই অঞ্চলে তিনটি দেখার মত বাগান আছে- গোলাপ বাগান, জাপানি বাগান আর বোট্যানিকাল গার্ডেন। কিন্তু সেই যে বাসে চাপলাম, বাস যাচ্ছে তো যাচ্ছেই। অতো বড়ো বুয়েনিস আইরিস শহর পুরো চক্কর দিচ্ছে। নীচে বসার জায়গা পাই নি, ওপরে বসতে হয়েছে – কিন্তু কি প্রচন্ড রোদ! চাঁদি ফেটে যাওয়ার জোগাড়। এক ফোঁটা ছায়া কোথাও নেই। ক্রমে এ যেন অসহ্য হয়ে উঠল। লোকেরা নামছেও না যে নীচে জায়গা হবে। একটি ঘন্টা রোদে পুড়ে অবশেষে অভীষ্ট স্টপ এল। আমরা যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। খুঁজছি – রোজ গার্ডেন কোথায়? বিশাল জায়গা, ফলে আবার হন্টন – মিনিট দশ হেঁটে রোজ গার্ডেন পাওয়া গেল কিন্তু গেট বন্ধ। মুখ বাড়িয়ে খুঁজছি- ঠিক জায়গাতে এলাম তো? না- গোলাপ গাছ দেখা যাচ্ছে বটে কিন্তু তাতে ফুলের চিহ্ন মাত্র নেই। গাছে পাতাও সেরকম নেই। বেঞ্চে একটি মেয়ে বসে ছিল, লোক্যাল মেয়ে- সেই আমাদের ডাকল। তার থেকে জানা গেল এখন তীব্র গরমে রোজ গার্ডেন বন্ধ থাকে, কেননা এটা ফুলের সময় নয়। খুলবে এপ্রিলে, যখন ঠান্ডা হাওয়া দেবে আর গাছে আবার পাতা গজাবে, ক্রমে ফুল আসবে ধীরে ধীরে। ভাবলাম‌ তাহলে জাপানি গার্ডেন বা বোটানিক্যাল গার্ডেনটা দেখি, কিন্তু বোঝা গেল, সব গুলোরই কলেবর এত বড়ো যে কুড়ি পঁচিশ মিনিট না হাঁটলে কারুর প্রবেশপথ পাওয়া যাবে না। কিন্তু এই কাঠফাটা রোদে হাঁটা অসম্ভব- তাই ঠিক হল, না, অনেক হয়েছে আজ- ফেরা যাক এবার।

বাসের জন্য দাঁড়িয়ে আছি তো আছিই, বাস আর আসে না। অনিবৌদি বলল, বাস বন্ধ হয়ে যায় নি তো? কিভাবে ফিরব তাহলে? বলতে না বলতেই বাস এসে হাজির। নীচের সব সীট ভর্তি, তাই আবার ওপরেই বাধ্য হয়ে রোদে বসা। বাস বেশ যাচ্ছিল, কিন্তু ঘন্টাখানেক পর একটা পার্কের পাশে দাঁড়িয়ে গেল। স্প্যানিশে কি সব বলল, বুঝলাম না। দেখি সবাই নেমে যাচ্ছে। বাস খালি, আমরাও নীচে নেমে বাসের গাইডকে বললাম, ব্যাপার কি দিদি, বাস যাবে না? গাইডদিদি বললেন- পাঁচটা বেজে গেছে, নিয়ম হল পাঁচটা বাজলে বাস বন্ধ, আবার কাল যাবে। সেকি? ঘন্টাদা বলল, তাহলে ফিরব কি করে? অনিবৌদি বলল, দিদিভাই কিছু একটা করে দাও যাতে নিরাপদে হোটেলে ফিরতে পারি। দিদিভাই ভালো, বললেন, আমার সাথে এস।

সবাই মিলে রাস্তার মোড়ে এলাম। দিদি আমাদের হোটেলের নাম জেনে, একের পর এক ট্যাক্সিকে দাঁড় করিয়ে যাবে কিনা জিজ্ঞাসা করলেন- অবশেষে একটি পাওয়া গেল। দিদি তাকে গন্তব্যস্থল বুঝিয়ে দিলেন। আমাদের বললেন দশ আমেরিকান ডলার লাগবে, ঠিক আছে? আর ঠিক, কিছু যে পেয়েছি, এটাই অনেক। প্রথম দিকে একটু ভয় ভয় করছিল কেননা এখানে যে রকর ট্যাক্সির বদনাম, কিন্তু না, ড্রাইভারটা সত্যই ভালো ছিল।

পরদিন হোটেলে জলখাবার খেয়ে ও চেক আউট করে বেরুবার জন্য তৈরি হলাম। সুটকেশগুলো হোটেলের জিম্মায় রেখে এলাম কাফে তোরতোনির সামনে হলদে বাস ধরতে। আমাদের দু দিনের পাশ ফলে আজও বাস ফ্রি। দেখলাম কাফে তোরতোনিতে আজও বিশাল লাইন। অনিবৌদি বলল, আজ যে করেই হোক, এখানে একবার ঢুকতেই হবে।

বাস আজ সাথে সাথেই পেলাম। প্রথমেই নামলাম স্টপ জিরোতে, কাল এখানেই বাস তার অন্তিম স্টপেজ জানিয়েছিল আর গতকালই দেখেছি এখানে ট্যাঙ্গো মিউজিয়াম (Caminito) আছে। কাল দেখা হয় নি, আজ তাই প্রথমেই এখানে ঢুকলাম। প্রবেশ মূল্য নেই। এই Caminito আর্জেন্টিনার বুয়েনস আইরেসের বর্ণিল ‘লা বোকা’ (La Boca) এলাকার একটি বিখ্যাত উন্মুক্ত রাস্তার জাদুঘর ও ঐতিহ্যবাহী গলি। একটি উজ্জ্বল রঙের ঢেউখেলানো টিনের তৈরি বাড়ি, যেখানে ঊনবিংশ শতাব্দীর ইতালীয় অভিবাসীদের ইতিহাসের প্রতিফলন দেখা যায়, আর প্রাণবন্ত স্ট্রিট আর্ট, ট্যাঙ্গো নৃত্যশিল্পী এবং স্থানীয় কারুশিল্পের বাজারের জন্য পরিচিত। এখানের বাড়িঘরের রঙিন সম্মুখভাগ সেই দরিদ্র অভিবাসী ডক-শ্রমিকদের প্রতি এক ঐতিহাসিক শ্রদ্ধাঞ্জলি, যারা জাহাজ তৈরির কারখানার উদ্বৃত্ত রং এবং পরিত্যক্ত বা কুড়িয়ে পাওয়া সামগ্রী দিয়ে নিজেদের ঘরবাড়ি তৈরি করেছিলেন।

এইখানে ট্যাঙ্গো নাচের ওপর অনেক কিছু আছে, যা মুগ্ধ করল। এক জায়গাতে দেখি নাচ শেখাবার আসর। এক ঝাঁক তরুণ তরুণী নাচের ট্রেনিং নিচ্ছে। দেখতে কোনো বাধা নেই, কেননা বিশাল হলঘরের একটা দিক কাঁচের। ট্যাঙ্গো নাচের বিভিন্ন মুহূর্ত ও ভঙ্গিমা দেখে খুব ভাল লাগল। ট্যাঙ্গো প্রসঙ্গে একটি কথা – আর্জেন্টিনায় ট্যাঙ্গো এতই জনপ্রিয় যে ১৯৭৮ সালে ফিফা বিশ্বকাপ ফুটবলের আয়োজক দেশ আর্জেন্টিনায় যতগুলি ম্যাচ হয়েছে, সেই বলের নাম ছিল Adidas Tango Durlast

এখান থেকে বেরিয়ে বাইরে এলাম। বহু পুরানো এক রাবার গাছ ছিল, তা দেখতেও বেশ ভিড়। এই অঞ্চল দেখে বাকি দিন বাসে করে বিভিন্ন জায়গা দেখলাম। কোলন থিয়েটার, ব্যাসিলিকা, কনভেন্ট, অজস্র স্ট্যাচু, ওবেলিক্স – মানে বাসের কল্যাণে মোটামুটি বুয়েনস আইরিস শহরটা গুলে খাওয়া হল। হাতে সময় বেশি নেই। বিকাল পাঁচটায় শেষ বাসে ধরে আমাদের হোটেলের সামনে নামলাম।

নেমে দেখি অবাক কান্ড – কাফে তোরতোনির লাইন প্রায় নেই। ফলে লাইনে দাঁড়িয়ে মিনিট পনেরোর মধ্যে ঢুকে গেলাম। কাফে তোরতোনি দুশো বছরের পুরানো, ১৮৫৮ সালে এক ফরাসি ব্যাক্তি ‘তুয়ান’ (Touan) এটি প্রতিষ্ঠা করেন; ‘বুলভার দে ইতালিঁ’ (Boulevard des Italiens)-এ অবস্থিত একই নামের প্যারিসীয় ক্যাফের নামানুসারে এর নামকরণ করা হয় ‘তোরতোনি’ (Tortoni)। সেখানে ঊনবিংশ শতাব্দীতে প্যারিসের সংস্কৃতিমনা অভিজাতরা সমবেত হতেন। এখানে বহু খ্যতনামা লোকেরে এসেছেন- তার মধ্যে আলবার্ট আইনস্টাইন, হিলারী ক্লিনটন, জর্জ লুই বর্গে ইত্যদি বহু নাম বলা যায়। ওনাদের ছবির গ্যালারীও আছে কাফের ভিতর। চুড়োস আর কফি খাওয়া হল। দাম আহামরি বেশি নয় কিন্তু স্বাদে অতুলনীয় বলা যায়। ছটা বেজে গিয়েছিল, সাড়ে ছটায় গাড়ী আসবে এয়ারপোর্ট যাওয়র তাই তড়িঘড়ি ওখান থেকে বেরিয়ে হোটেল এলাম। মালপত্র বের করে তৈরি হতে না হতেই গাড়ি চলে এল।

এয়ারপোর্টে ঢুকে বোর্ডিং পাশ নেওয়ার পর দেখি ইমিগ্রেশনে বিরাট লাইন। ঘন্টাখানেক সেখানে দাঁড়াবার পর যখন কাউন্টারে এলাম- দেখি, কাউন্টারের ভদ্রলোক আর্জেন্টিনা ঢোকার স্ট্যাম্প খুঁজছেন। স্ট্যাম্প থাকবে কোথা থেকে- জাহাজ থেকে নামার পর কেউ তো ছিলোই না। তাকে কোনোরকমে বোঝানো গেল যে আমরা জাহাজে এসেছি। ভদ্রলোক পাসপোর্টগুলো নিয়ে ভিতরে চলে গেলেন। অনেকক্ষণ পরে ফিরে এসে কোন জাহাজে এসেছি, কবে এসেছি এই সব কমপিউটারে ঢুকিয়ে তবে পাসপোর্টে স্ট্যাম্প মেরে আমাদের ছাড়লেন। ঘন্টাদা বলল, যাক, এরা যে অন্তত বুঝেছে আমরা জাহাজে এসেছি- এটাই অনেক।

বুয়েনস আইরিস থেকে লন্ডন প্লেনে ২২ ঘন্টা। হবেই, কেননা পৃথিবীর একদম দক্ষিণ প্রান্ত থেকে প্রায় উত্তর প্রান্তে যাওয়া। যাত্রা পথে দু বার প্লেন পাল্টাতে হল-এখান থেকে প্রথমে এলাম মিয়ামি, সেখান থেকে প্লেনে নেওয়ার্ক আর সেখান থেকে অন্তিম প্লেমে লন্ডন। প্লেনে উঠেছিলাম রাত দশটায় আর লন্ডন এলাম দু দিন পর ভোরে। এত দীর্ঘ যাত্রা জীবনে প্রথম। লন্ডন হিথরোতে ঘন্টাদাদের বিদায় জানিয়ে ফিরে চললাম যে যার ডেরায়।

“দীপ্ত প্রতিম মল্লিক”
মেকানিক্যাল, ১৯৮০
BY: DIPTA PRATIM MALLICK
Email: dpmallic@yahoo.com

*******

Sahityika Admin

Add comment