সাহিত্যিকা

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নাটিকা ‘তাসের দেশ’

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নাটিকা ‘তাসের দেশ’
© দেবাশীষ বন্দ্যোপাধ্যায়, ১৯৮১ ইলেকট্রনিকস ও টেলি কমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং

রবীন্দ্রনাথের নাটিকা ‘তাসের দেশ’ নিয়ে কিছু আলোচনা করার অধিকার বা ক্ষমতা আমার কোনোটাই নেই। তবে মনে হলে যে রবীন্দ্রনাথের খুব কাছের লোক যেমন প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়, প্রমথনাথ বিশী বা শান্তিদেব ঘোষ যা যা বলেছেন সেগুলো জোড়া-তাপ্পি মেরে একটা লেখা হতে পারে। সঙ্গে ঐ নাটিকাটিতে যে গানগুলো রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন তার একটা লিস্ট যোগ করলে মন্দ হয় না। হয়তো রবীন্দ্রগবেষকদের কোন কাজে লাগলেও লাগতে পারে।

‘তাসের দেশ’ নাটিকাটি ১৯৩৩ সালে (১৩৪০ ভাদ্র) প্রথম প্রকাশিত হয়। ‘সংশোধিত’ ও পরিবর্ধিত’ দ্বিতীয় সংস্করণ ১৯৩৯ সালে (১৩৪৫ মাঘ) প্রকাশিত হয়। প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় লিখেছেন: “বৃদ্ধবয়সে কবি ‘মুক্তির উপায়’ গল্পটির নাট্যরূপ দেন। আর ‘একটি আষাঢ়ে গল্প’ অবলম্বনে ‘তাসের দেশ’ লেখেন, সেও শেষ বয়সে।” সাধনা পত্রিকায় ১২৯৯ সালে ‘একটি আষাঢ়ে গল্প’ তিনি লিখেছিলেন। এই গল্পটি রবীন্দ্রনাথের ‘গল্পগুচ্ছ’-তে আছে।

প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় আরও বলেছিলেন: “পূজাবকাশের [১৯৩৩] পূর্বে শান্তিনিকেতনে কিছু-না-কিছু অভিনয়ের রেওয়াজ খুবই পুরোনো। এবারও সকলে কবির কাছে নূতন নাটক চাইলে, তিনি লিখে দিলেন ‘তাসের দেশ’ ও ‘চন্ডালিকা’।….. শান্তিনিকেতনের উৎসবানুষ্ঠানশেষে দলবল নিয়ে রবীন্দ্রনাথ চললেন কলকাতায়। ম্যাডান থিয়েটারে তিন রাত অভিনয় হল। ‘তাসের দেশ’-এর অভিনয়ে, সাজসজ্জায় ভাবভঙ্গিতে ও কথাবার্তায়, অর্থাৎ রবীন্দ্রনাথের নাট্যনির্দেশে আর শিল্পী নন্দলাল ও সুরেন্দ্রনাথের রূপকল্পনায়, এমন এক বৈশিষ্ট্য ফুটে উঠেছিল যা দেশের লোক পূর্বে কখনো দেখে নি, আর যে দেখেছে সে-ই মুগ্ধ হয়েছে। অভিনয়ের এ একটি নূতন ধারা।….

ইতিমধ্যে বোম্বাইয়ে রবীন্দ্রসপ্তাহ-উদযাপনের ব্যবস্থা হয়েছে। সেখানে কবির চিত্র প্রদর্শনী হবে; অভিনীত হবে ‘শাপমোচন’ আর ‘তাসের দেশ’। তাসের দেশের গুজরাটি তর্জমা করানো হয়েছে – সেটা দর্শকরা দেখে নেবেন, কিন্তু অভিনয় বাংলায় হবে।”

১৯৩৯ সালের জানুয়ারি মাসে ‘পরিশোধ’, ‘চন্ডালিকা’ ও ‘তাসের দেশ’ এই তিনটি নাটক তিনি নতুন করে লিখলেন। স্থির হয়েছে কলকাতায় অভিনয় হবে। ‘তাসের দেশের’ নতুন সংস্করণ উৎসর্গ করলেন সুভাষচন্দ্র বসুকে। তিনি লিখলেন – “স্বদেশের চিত্তে নূতন প্রাণ সঞ্চার করবার পুণ্যব্রত তুমি গ্রহণ করেছ, সেই কথা স্মরণ করে তোমার নামে ‘তাসের দেশ’ নাটিকা উৎসর্গ করলাম।”
শান্তিদেব ঘোষ বলেছেন: “১৯৩৩ খ্রিস্টাব্দে গুরুদেব ‘তাসের দেশ’ ও ‘চন্ডালিকা’ সাধারণ নাটকের আদর্শে লিখলেন, বিশেষ করে অভিনয়ের জন্য। এ দুটিকে শারদোৎসব বা ফাল্গুনীর মতো গীতিনাটকও বলা চলে। প্রচুর গান এই নাটকে এবং গানগুলি নাটকের কথার মতনই প্রয়োজনীয় অংশ নিয়ে আছে। ….এই নাটকের গান শুনে বেশ বোঝা যায় যে, নাটকে কেবল সুরমাধুর্য বিস্তারের জন্য গানগুলি বসানো হয় নি, নাটকের সাধারণ ভাষায় যে ভাব প্রকাশ করা গেল না, গান দিয়েই তাকে যেন পূরণ করা হচ্ছে।”
প্রমথনাথ বিশী তাসের দেশ নিয়ে বলেছেন: “তাসের দেশ কিম্ভূতরসাশ্রিত তত্ত্বনাট্য। এই নাটকের মানুষ পাত্র-পাত্রীগণ ছাড়া আর সকলেই তাস-জাতীয় জীব। মানবসংসার হইতে বহু দূরে অবস্থিত একটি দ্বীপে তাহাদের বাস, সে-দ্বীপ তাসের দেশ। তাস-জাতীয় জীবগণের চেহারা, আচার-ব্যবহার ও মনোবৃত্তি মানুষের সঙ্গে মেলে না, তাহাদের দেখিয়া কিম্ভূত মনে হয়, তাহাদের জীবন যাত্রা দেখিয়া নাটকের মানব পাত্রদের মনে কিম্ভূতরসের উদয় হইয়াছে, তাই নাটকটিকে কিম্ভূতরসাশ্রিত বলা হইল।”

প্রমথনাথ বিশী ‘তাসের দেশ’-এর মূল বক্তব্যটি সুন্দর ভাবে তুলে ধরেছেন: “যে-যৌবনের চঞ্চলতায় রাজপুত্র ঘর ছাড়িয়া বাহির হইয়া পড়িয়াছে, সেই চঞ্চলতাই জীবন্মৃতের মনে জীবনের সাড়া আনিয়া দিয়েছে, যাহারা ছিল জীবন্মৃত তাহারা জীবিত হইয়া উঠিল, যাহারা ছিল তাস, তাহারা হইয়া উঠিল মানুষ। তাসের চেয়ে তাসীগণই আগে জীবনের ডাকে সাড়া দিয়েছে, পুরুষ পিছাইয়া ছিল, মেয়েদের দৃষ্টান্ত তাহাদের সঙ্কোচের গ্রন্থি শিথিল করিয়া দিয়েছে।”
প্রমথনাথ বিশী আরও বলেছেন: “এই নাটকের তত্ত্ব রবীন্দ্র-সাহিত্যে নূতন নয়, নানা রচনায়, নানা ভাবে ইহা প্রকাশিত হইয়াছে, যৌবনের স্পর্শে জীবন্মৃতের চঞ্চলতা, জীবনের স্পর্শে জড়ের সংস্কারমুক্তির বার্তা ফাল্গুনী নাটকে বিশদভাবে বর্ণিত হইয়াছে, বর্তমান ক্ষেত্রে তাহার বিস্তারিত আলোচনা বাহুল্য। নাটকটিতে দুইটি বিষয় লক্ষণীয়, কিম্ভূতরসের অবতারণা এবং রূপকথার কাঠামো। এই দুইটি লক্ষণই ইহার বৈশিষ্ট্য।”
তাসের দেশ নাটিকাটির ২৭টি গানের একটি তালিকা দেওয়া হল। সব গানই কিন্তু কবি শান্তিনিকেতনে থাকার সময়ে লেখেন নি। যেমন প্রশান্তকুমার পাল বলেছেন “১ কার্তিক [মঙ্গল ১৮ Oct, ১৯২৭] রবীন্দ্রনাথের অবারিত অবকাশের মধ্যে কেটেছিল, কেবল বিকেলে হাক্ লিম্ (চীনা যুবক) ও মেন্দিস (সিংহলি ভদ্রলোক) তাঁকে মোটর করে শহর [স্থান: ব্যাঙ্কক থেকে রেলপথে পিনাঙ পৌঁছে তাঁরা ইস্টার্ন এন্ড ওরিয়েন্টাল হোটেলে ওঠেন, বিশদ বিবরণের জন্য “রবীন্দ্র-সংগমে দ্বীপময় ভারত ও শ্যাম-দেশ – সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় দ্রষ্টব্য] ঘুরিয়ে আনেন। এই দিন রবীন্দ্রনাথ ‘খর বায়ু বয় বেগে গানটি রচনা করেন।”

১৯০০ সালে শান্তিদেব ঘোষের প্রথম স্বরলিপি হলো যাবই আমি যাবই।
এরপর ১৯৩৩ সালে শান্তিদেব ঘোষ যে গানগুলির স্বরলিপিকার ছিলেন: আমরা চিত্র অতি বিচিত্র; আমরা নূতন যৌবনের দূত; আমার মন বলে চাই; আমি ফুল তুলিতে এলেম বনে; ইচ্ছে, ইচ্ছে; উতল হাওয়া লাগল; এলেম নতুন দেশে; ওগো শান্ত পাষাণমুরতি; চলো নিয়ম মতে, চিঁড়েতন হরতন ইস্কাবন; জয় জয় তাসবংশ; তোমার পায়ের তলায়; হা-আ-আ-ই; হাঁচ্ছোঃ ভয় কী দেখাচ্ছ; হেরো সাগর ওঠে তরঙ্গিয়া;
১৯৩৪ সালে হে নবীনা।
আর ১৯৩৯ সালে রচনা করেছিলেন
অজানা সুর কে দিয়ে যায়; গগনে গগনে ধায় হাঁকি; গোপন কথাটি রবে না গোপনে; তোলন নামন পিছন সামন; বলো সখী, বলো; বিজয়মালা এনো; ভাঙো, বাঁধ ভেঙে দাও;
১৯১১ সালের ঘরেতে ভ্রমর এল গুনগুনিয়ে গানের স্বরলিপিকার নিয়ে সংশয় আছে, সম্ভবত শান্তিদেব ঘোষই হবেন।

শান্তিদেব ঘোষ ছাড়াও ১৮৯২ সালে ইন্দিরা দেবী স্বরলিপি করেছিলেন কেন নয়ন আপনি ভেসে যায়, এই গানটিতে। আর ১৯২৭ সালে দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর করছিলেন খর বায়ু বয় বেগে।

** তথ্য সংগ্রহ ও কৃতজ্ঞতা স্বীকার:
১. তাসের দেশ – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, প্রকাশক: বিশ্বভারতী গ্রন্থনবিভাগ
২. রবীন্দ্রনাট্যপ্রবাহ – প্রমথনাথ বিশী, প্রকাশক: ওরিয়েন্ট বুক কোম্পানি, কলিকাতা
৩. রবীন্দ্রসংগীত – শান্তিদেব ঘোষ, প্রকাশক: বিশ্বভারতী গ্রন্থনবিভাগ
৪. রবীন্দ্র জীবনকথা – প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়, প্রকাশক: আনন্দ পাবলিশার্স।
৫. রবিজীবনী (দশম খন্ড) – প্রশান্তকুমার পাল, প্রকাশক: আনন্দ পাবলিশার্স।
৬. Tagoreweb (https://www.tagoreweb.in)

******

 

Sahityika Admin

Add comment