লাদাখ – অন্য রকম সুন্দর (পর্ব ২)
© বন্দনা মিত্র, ১৯৮৬ মেটালার্জিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং
6th September 2025
লাদাখের ইতিহাস নিয়ে তো অনেক বকবক হল, এবার একটু ভূগোল নিয়ে কথা বলি। লাদাখ কথাটির অর্থ অনেক পাস মানে গিরিপথের দেশ। লা মানে গিরিপথ। লাদাখের উত্তরে কারাকোরাম পর্বত, যা ভারতকে মধ্য এশিয়া থেকে আলাদা করেছে, দক্ষিণে গ্রেট হিমালয়ান রেঞ্জ এবং মধ্যে জান্সকার রেঞ্জ, যা লাদাখকে কাশ্মীর থেকে আলাদা করেছে। চারদিকে উঁচু উঁচু পাহাড়ের মধ্যিখানে বাটির মতো বসানো লাদাখ উপত্যকা। সিন্ধু ও জান্সকার নদের কথা আগেই বলেছি । আরো একটি নদীর দেখা পেলাম, সায়ক। সিন্ধুর উপনদী। নদ কি নদী কে জানে! এই রুক্ষ অসবুজ বিবর্ণ ভূমিতে নারীর কমনীয় লাবণ্য কল্পনা করা খুব শক্ত। লাদাখের উত্তর ও পূর্ব ঘিরে আছে চিন, আকসাই চিন ও তিব্বত। লাদাখ ছিল প্রাচীন ভারতের সঙ্গে মধ্য এশিয়ার যোগাযোগ সূত্র। প্রাচীন কালে রেশমপথ ও বাণিজ্য পথ হিসেবে লাদাখ, যাকে বলে strategic location এর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
আগেই বলেছি, লাদাখের ধর্ম ও সংস্কৃতিতে তিব্বতের প্রভাব খুব বেশি। তিব্বতে প্রচলিত বজ্রযান বৌদ্ধ ধর্মানুসারী বোধিসত্ত্ব এখানে পূজিত হন। তিনটি জনপ্রিয় রূপ – অবলোকিতেশ্বর, মৈত্রেয় ও মঞ্জুশ্রী। অবলোকিতেশ্বর করুণা, দয়া ও বিশ্বের ত্রাণকর্তা হিসেবে পূজিত। মঞ্জুশ্রী প্রজ্ঞার দেবতা এবং মৈত্রেয় ভবিষ্যতের বোধিসত্ত্ব, যিনি শাক্যমুনি মানে গৌতম বুদ্ধের পর আবির্ভূত হবেন। হিন্দু ধর্মের অবতারবাদের সঙ্গে মিল আছে বেশ। লাদাখে সব কটি বৌদ্ধ মঠেই এই তিন বোধিসত্ত্ব বিরাজমান। এখানে বোধিসত্ত্বের মুখাবয়ব মোঙ্গলিয়ান ছাঁদের, চোখ দুটি নরুণচেরা। স্বাভাবিক, আমরা দেবতাকে যখন প্রিয় করি তখন তাকে আয়নায় প্রতিবিম্বের মত পরিচিত আপন ভাবতে ভালবাসি। বোধিসত্ত্বের সঙ্গে তারা দেবী, দেবী দ্রোলমা, মহাকাল, বজ্রপাণি ইত্যাদি বজ্রযান বৌদ্ধ ধর্মের দেবদেবীরাও উপস্থিত ছিলেন।
আমরা এদিন দেখলাম লামারু ও আলচি গুম্ফা। এদুটি লাদাখের প্রাচীনতম গুম্ফা। মনে করা হয় দশম শতাব্দীতে রিনচেন জ্যাংপো নামে এক বৌদ্ধ স্থপতি বানিয়েছিলেন। লামারু শব্দের অর্থ স্বস্তিকা। দুঃখের বিষয় এই সব প্রাচীন স্থাপত্যের অন্দরে ছবি তোলা একেবারেই নিষিদ্ধ। মন্দিরের দেওয়ালে অপরূপ রঙিন মুরাল চিত্রপট আঁকা আছে – বৌদ্ধ ধর্মের নিগূঢ় পাঠ থেকে সেই সময়ের জীবনযাপন। কিন্তু অত সূক্ষ্ম, হালকা রঙের কাজ আধুনিক ক্যামেরার উজ্জ্বল ফ্ল্যাশ লাইটে ভয়ানক ক্ষতিগ্রস্ত হবে । তাই রক্ষণাবেক্ষণের স্বার্থে মোবাইল ও ক্যামেরা নৈব নৈব চ।




উপরেরটি মুরাল, আর নিচেরটি বালুর উপর মান্ডালা, এই সংস্কৃত শব্দটির আক্ষরিক অর্থ “বৃত্ত”। এটি একটি জ্যামিতিক নকশা যা সাধারণত বৃত্তাকার হয় এবং এর কেন্দ্র থেকে বিভিন্ন প্রতীক ও জ্যামিতিক আকার বাইরের দিকে ছড়িয়ে পড়ে। এর আধ্যাত্মিক ও ধর্মীয় অর্থ: হিন্দু, বৌদ্ধ, জৈন এবং শিন্তৌ ধর্মে মান্ডালাকে মহাবিশ্বের প্রতীক বা ধ্যান ও মনঃসংযোগের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা হয়।

এর নাম moonscape । লামাউরু মঠের সামনে।
The “Moonscape”: The naturally sculpted hills and craggy rock formations surrounding the monastery earned it the name Moonland. কথিত আছে যে অতীতে এখানে একটি বড় জলাশয় (lake) ছিল। বিদ্যার্থী নারোপা (Naropa) এই জলাশয় শুকিয়ে স্থাপন করেন।

এরপর গেলাম আরেক আশ্চর্য জায়গায়। খোলা আকাশের নীচে ছড়িয়ে আছে আদিকালের শিলা বা রক, তার গায়ে বিচিত্র ছবি আঁকা। (Petroglyphs). নেট থেকে পাওয়া তথ্য যদি সত্যি হয় তবে এর মধ্যে অনেক ছবি Paleolithic ও Neolithic যুগের চিত্রণ। আশ্চর্য যে এমন দুর্লভ সম্পদ প্রহরাহীন অগোছালো পড়ে আছে, ASI এর কোন দাগছোপ পেলাম না। অপূর্ব প্রস্তরচিত্রগুলির ঠিক মত রক্ষণাবেক্ষণ করে এ বিষয়ে যাঁরা বিশেষজ্ঞ তাঁদের সাহায্যে এদের প্রাচীনতার কাল নির্ধারণ খুব জরুরী। বিশেষ করে যখন বার বার বলা হচ্ছে যে দশম শতাব্দীর আগে লাদাখের কোন প্রামাণ্য ইতিহাসই নেই।
আমাদের এদিনের মত শেষ গন্তব্য ছিল পাথর সায়েব গুরুদুয়ারা। শিখ গুরু নানকের লাদাখ সফরকে স্মরণ করে এই গুরুদুয়ারাটি নির্মিত।

লাদাখের আড়াআড়ি টানা পি ও কের লাইন, মানে পাক অধিকৃত কাশ্মীর। গিলগিট, বালটিস্তান- এই সব অঞ্চল পিওকে র মধ্যে পড়ে। লাদাখের কিছু গ্রাম আছে যা একেবারে সীমান্ত ছুঁয়ে, যেখানে পাহাড়ের গায়ে ভারতের সীমারেখা লোহার খুঁটি দিয়ে চিহ্নিত। তারপর চওড়া একফালি নো ম্যানস ল্যান্ড। দূরে দেখা যায় আরেক সারি লোহার খুঁটি – পাকিস্তানের সীমানা। এমনই এক গ্রামে আমরা নামলাম, সীমান্ত দেখতে। বাস স্ট্যান্ডের একধারে পাহাড় ঘেঁষে ছোটখাটো পসরা নিয়ে ছোট ছোট একসারি দোকান। ওদিকে বেশ কয়েকটা দুপুরে খাওয়ার দোকান, ওয়াশরুম ইত্যাদি। ছোট দোকানগুলোতে ড্রাই ফ্রুটস, পাথরের গয়না ইত্যাদি জিনিসপত্রের সঙ্গে শক্তিশালী বাইনোকুলারও রাখা। আমরা নামতেই হঠাৎ ওখানকার একটা তিন চার বছরের বাচ্চা, তার নিজের চেয়ে বড় সাইজের একটা বাইনোকুলার দোকান থেকে ছোঁ মেরে তুলে নিয়ে আমাদের পেছনে তুরতুর করে ছুটতে লাগলো। তার মা দামী জিনিসটা পড়ে ভাঙবে বলে হায় হায় করতে করতে ছেলের পেছনে ছুটছে, দোকান আলগা রেখে। পরে বুঝলাম , ওখানে ট্যুরিস্টরা এই সব দোকান থেকে দূরবীন ভাড়া নিয়ে পাকিস্তানের সীমানা, ওদেশের সীমান্তরক্ষী ও তাদের পতাকা দেখে। দোকানীরা গাইডের কাজ করে। সেই বাচ্চা ছেলেটি মা’র দেখাদেখি আজ আমাদের গাইড হতে চেয়েছিল।

১৯৭১ এ ভারত পাক যুদ্ধের সময় ভারতীয় সেনা তুর্তুক দখল করে। এখানে একটি War Memorial আছে। এর আগে একরাত কাটিয়েছি তুর্তুক গ্রামে, সেও সীমান্তবর্তী ছবির মত এক গ্রাম। ঊষর পাথুরে, সবুজের সংস্পর্শ রহিত লাদাখ উপত্যকায় একটুকরো শ্যামল সবুজ রুমালের মত বিছিয়ে আছে তুর্তুক গ্রাম। এপ্রিকট বাগিচা হিসাবে বিখ্যাত। রুক্ষতা দেখে দেখে ক্লান্ত দু চোখে আদরে সবুজ বুলিয়ে আরাম দেয়। তুর্তুকে বালটি উপজাতির বাস। একসময় বাল্টিস্তানের অংশ ছিল।

প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ছাড়া এই গ্রামে দেখার জন্য আছে বাল্টিকের রাজবংশ ইয়াগবো রাজাদের প্রাসাদ, যার একটি অংশ মিউজিয়াম হিসেবে জনসাধারণের জন্য খোলা। রয়েছে ছোট কিন্তু তথ্যবহুল এবং বাল্টিক উপজাতির প্রাচীন রীতি, পোশাক, দৈনন্দিন উপকরণ সামগ্রীর এক দুর্লভ ও বিচিত্র সংগ্রহ। মিউজিয়ামটি দেখতে গিয়ে বাল্ইটিক আর্কিটেকচার সম্বন্ধেও একটা ধারণা হয়। ইয়াগবো বংশ প্রায় হাজার বছর বাল্টিস্তান শাসন করেছে। ইয়াগবো শব্দটি প্রাচীন মধ্য এশিয়ার একটি উপাধি, যার অর্থ শাসক বা রাজা। ইয়াগবোরা প্রাচীন পারসিক রাজবংশের সঙ্গে রক্তের সম্পর্কে সম্পর্কিত।
আমরা স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলছিলাম। জানা গেল, বাল্টিক ভাষার কোন লিপি নেই, প্রাচীন সংস্কৃতের মত এটিও শ্রুতিভিত্তিক। যেহেতু এখন এই ভাষার ব্যবহারিক কোন মূল্য নেই এবং বাল্টিক জনসংখ্যা বিপদজনক ভাবে কম, বয়োজ্যেষ্ঠরা ভয় পাচ্ছেন যে অদূর ভবিষ্যতে এই ভাষা হয়ত বিলুপ্ত হয়ে যাবে।

তুর্তুক আসার পথে পড়েছে খারদুংলা পাস, প্রায় ১৮০০০ ফিট উচ্চতায় দাঁড়িয়ে। যানচলাচল যোগ্য পৃথিবীর সর্বোচ্চ পাস গুলির অন্যতম। দুপুরের খাবারের আয়োজন ছিল নুব্রা ভ্যালির এক জায়গায়। সেখানে এটিবি (All Terrain Bike) চালানোর সুযোগ আছে। আমাদের গাইড একজন জম্মুর ছেলে, খুব দক্ষতার সঙ্গে আমাকে অল্প সময়ের মধ্যেই শিখিয়ে দিল এই বাইকের খুঁটিনাটি। আনাড়িসুলভ অকুতোভয়ে আমি বাইক ছোটালাম বালির সমুদ্রে।
তুর্তুক থেকে আমাদের যাত্রা হুন্ডারে। দুই কুঁজ বিশিষ্ট উটের রাজত্ব। চাইলে পিঠে চড়াই যেত। কিন্তু উট চড়ার কথা মনে হলেই সোনার কেল্লার জটায়ুর সেই উটের পিঠে ওঠার দৃশ্য চোখের সামনে ভেসে ওঠে। তাছাড়া দলে কটা বাচ্চা উটও ছিল, মায়ের কাছ ঘেঁষে, বড় বড় চোখ মেলে । কেন জানি না মনে হল আমায় দেখে তারা খুবই টেনশনে আছে, এই সাতাশমণী ওজন যদি ঘাড়ে চাপে তবে কোমর ভেঙে দুখান হবে। মা উটগুলোও যেন বাচ্চাদের সামলে নিয়ে বিড়বিড় করে বলছিল – বালাই বালাই, ষাট ষাট। তাই সে চেষ্টা আর করলাম না।

তবে শুধু দু চোখ মেলে দেখার জন্যই সেই সৌন্দর্য বিন্দুতে যাওয়া দরকার। অপার্থিব ভাবে সুন্দর। দূরে কারাকোরামের মাথায় বরফের মুকুট, রোদ পড়ে সোনার মত, হীরের মত জ্বলছে। আকাশ শুধু নীল বললে কিছু বোঝানো যাবে না। এই উজ্জ্বল তীব্র জীবন্ত নীল রঙের যথাযথ নামকরণ ভ্যান গঁ কি পল গঁগ্যা করতে পারতেন বোধহয়। আমরা নেহাতই অপটু মানুষ। সেই রঙ ক্যামেরা বন্দী করতে গিয়ে বোকা বনে গেলাম।

*******






খুব ভালো লাগলো।
যেমন সুন্দর বর্ণনা, তার সঙ্গে ছবিগুলো দিয়ে লাদাখের এই অঞ্চলের পরিষ্কার এক ছবি ফুটে উঠেছে। লেখার সাথে কিছু কিছু ইতিহাসের উল্লেখও পড়লাম।
সব মিলিয়ে দারুণ একটি নিবেদন।
ধন্যবাদ।
অনেক ধন্যবাদ আপনাকে। শুভেচ্ছা রইল।