সাহিত্যিকা

রবীন্দ্রনাথের গানে বাউল সঙ্গীতের প্রভাব

রবীন্দ্রনাথের গানে বাউল সঙ্গীতের প্রভাব
অসীম দেব, ১৯৭৭ ইলেকট্রনিকস ও টেলি কমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং

বাউল গানের প্রতি রবীন্দ্রনাথের অনুরাগ আমরা তাঁর বিভিন্ন লেখনীর মাধ্যমে উপলব্ধি করতে পারি। শুধুমাত্র বাউল গানের সুর, বাণী বা তত্ত্বকথা নয়, এমনকি তার বেশভূষায়ও। তাইতো আমরা কবিকে নিজেরই রচিত ‘ফাল্গুনী’ নাটকে অন্ধ বাউলের ভূমিকায় একাধিক বাউল গান গেয়ে নেচে নেচে অভিনয় করতে দেখেছি।

রবীন্দ্রনাথ বিভিন্ন স্থানে বলেছেন যে, লালন ফকিরের বাউলের সুর ও বাণী তাঁর মনের মধ্যে সহজভাবে মিশে গিয়েছিল। শিলাইদহে কিছুদিন অবস্থানকালীন লালন ফকির, গগন হরকরা প্রমুখ বাউল সাধকদের সান্নিধ্যে এসে রবীন্দ্রনাথ “মনের মানুষ” ও “অচিন পাখি”র দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত হন। উনার কুঠিতে বাউলরা এসে গাইতেন ‘মিলন হবে কত দিনে, আমার মনের মানুষেরও সনে’, আর রবীন্দ্রনাথ লিখলেন- ‘আমার প্রাণের মানুষ আছে প্রাণে, প্রাণ তাই হেরি তাই সকল খানে’। বাউলের মনের মানুষ আর রবীন্দ্রনাথের প্রাণের মানুষ এখানে একাত্ম, অর্থাৎ এক ও অভিন্ন। রবীন্দ্রনাথের নিজের কথায় এটি পূজা পর্যায়ের গান, এবং বাউল রাগাশ্রিত।

আমার প্রাণের মানুষ আছে প্রাণে
তাই হেরি তায় সকল খানে॥
আছে সে নয়নতারায় আলোকধারায়, তাই না হারায়-
ওগো তাই দেখি তায় যেথায় সেথায়
তাকাই আমি যে দিক-পানে॥
আমি তার মুখের কথা শুনব ব’লে গেলাম কোথা,
শোনা হল না, হল না-
আজ ফিরে এসে নিজের দেশে এই-যে শুনি
শুনি তাহার বাণী আপন গানে॥
কে তোরা খুঁজিস তারে কাঙাল-বেশে দ্বারে দ্বারে,
দেখা মেলে না মেলে না,
ও তোরা আয় রে ধেয়ে দেখ্ রে চেয়ে আমার বুকে
ওরে দেখ্ রে আমার দুই নয়ানে॥

রবীন্দ্রনাথ একবার এলেন কুষ্টিয়া, রাজশাহীর জমিদারী দর্শনে। সেখানে পেলেন পল্লীর মুক্ত বাতাস। তখন নদীর বুকে বজরায় ভেসে, আর গ্রামে গঞ্জে ঘুরে ঘুরে কাটিয়েছেন প্রায় দশটি বছর। এর আগে জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে তিনি পল্লী সংস্কৃতির নিদর্শনগুলি শহরের পরিবেশেই দেখেছেন। আর এখন সেই শিল্প-সংস্কৃতির উৎসমুখে এসে, তাঁর সৃজনীপ্রতিভা আলোড়িত হলো। উনি লিখেছেন, “আমার লেখা যারা পড়েছেন তাঁরা জানেন বাউল-পদাবলীর প্রতি আমার অনুরাগ আমি অনেক লেখায় প্রকাশ করেছি। শিলাইদহে যখন ছিলাম, বাউল দলের সঙ্গে আমার সর্বদাই দেখা-সাক্ষাৎ আলাপ আলোচনা হত। আমার অনেক গানেই আমি বাউলের সুর গ্রহণ করেছি। এবং অনেক গানে অন্য রাগ-রাগিনীর সঙ্গে আমার জ্ঞাত বা অজ্ঞাতসারে বাউল-সুরের মিল ঘটেছে। এর থেকে বোঝা যাবে, বাউলের সুর ও বাণী কোন এক সময় আমার মনের মধ্যে সহজ হয়ে মিশে গেছে।”

বাউলের মনের মানুষ খোঁজার পথ বাউলের গান ও আত্মোপলব্ধি। উদ্দ্যেশহীন ঘুরে বেড়ানোই যেন তাঁদের জীবন। কেউ হয়তো কখনও বা সঙ্গী হয়, কখনও আবার কেউই থাকে না। তখন নিঃসঙ্গ জীবন। রবীন্দ্রনাথ লিখলেন- ‘যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে, তবে একলা চল রে’। ১৯০৫ খ্রিষ্টাব্দে এই গানটি বাউল নামের গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত হয়। রবীন্দ্রনাথের ভ্রাতুষ্পুত্রী ইন্দিরা দেবী এই গানের সুর দিয়েছিলেন।

যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চলো রে
তবে একলা চলো, একলা চলো, একলা চলো রে।
যদি কেউ কথা না কয়,
ওরে ওরে ও অভাগা কেউ কথা না কয়
যদি সবাই থাকে মুখ ফিরায়ে সবাই করে ভয়,
তবে পরান খুলে 
ও তুই মুখ ফুটে তোর মনের কথা একলা বলো রে,
যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে, তবে একলা চলো রে।
যদি সবাই ফিরে যায়,
ওরে ওরে ও অভাগা সবাই ফিরে যায়
যদি গহন পথে যাবার কালে কেউ ফিরে না চায়
তবে পথের কাঁটা
ও তুই রক্তমাখা চরণতলে একলা দলো রে,
যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে, তবে একলা চলো রে।

১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনের শুরু। রবীন্দ্রজীবনীকার প্রভাত কুমার মুখোপাধ্যায় বলেছেন, “এই সময় আকস্মিক বন্যার ন্যায় কয়েকদিনের জন্য কূল ছাপাইয়া গীতধারা উৎসারিত হইল এবং স্বদেশি যুগের এই গানগুলি অধিকাংশই হইতেছে বাউল সুরে বাঁধা।“ বাউল নতুন নতুন গান বাঁধে। ফকির লালন সাঁইয়ের কথা উঠে আসতে থাকে কলকাতা থেকে প্রকাশিত নানা পত্রিকায়। প্রায় দু’শ বছরের পরাধীন ভারতবর্ষের শৃঙ্খলিত জাতিকে উদ্বুদ্ধ করতে তিনি লিখলেন ‘আজি বাংলাদেশের হৃদয় হতে কখন আপনি, তুমি এই অপরূপ রূপে বাহির হলে জননী’। বাউল ঢং এর এই গানটি দেশমাতৃকার প্রতি নিবেদিত।

আজি বাংলাদেশের হৃদয় হতে কখন আপনি
তুমি এই অপরূপ রূপে বাহির হলে জননী
ওগো মা, তোমায় দেখে দেখে আঁখি না ফিরে
তোমার দুয়ার আজি খুলে গেছে সোনার মন্দিরে
ওগো মা…।
ডান হাতে তোর খড়গ জ্বলে, বা’হাত করে শঙ্কা হরণ
দুই নয়নে স্নেহের হাসি, ললাটনেত্র আগুনবরণ
ওগো মা, তোমার কী মুরতি আজি দেখি রে
তোমার দুয়ার আজি খুলে গেছে সোনার মন্দিরে
ওগো মা…।
তোমার মুক্তকেশের পুঞ্জ মেঘে লুকায় অশনি
তোমার আঁচল ঝলে আকাশতলে রৌদ্রবসনী
ওগো মা, তোমায় দেখে দেখে আঁখি না ফিরে
তোমার দুয়ার আজি খুলে গেছে সোনার মন্দিরে
ওগো মা…।
যখন অনাদরে চাই নি মুখে ভেবেছিলেম দুঃখিনী মা
আছে ভাঙা ঘরে একলা পড়ে, দুখের বুঝি নাইকো সীমা
কোথা সে তোর দরিদ্র বেশ, কোথা সে তোর মলিন হাসি
আকাশে আজ ছড়িয়ে গেল ঐ চরণের দীপ্তিরাশি
আজি দুখের রাতে সুখের স্রোতে ভাসাও ধরণী
তোমার অভয় বাজে হৃদয়মাঝে হৃদয়হরণী
ওগো মা, তোমায় দেখে দেখে আঁখি না ফিরে
তোমার দুয়ার আজি খুলে গেছে সোনার মন্দিরে
ওগো মা…।

রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘দ্যা রিলিজিয়ন অফ ম্যান’ (A Religion of Man – ১৯৩০) বইয়ে এবং ফ্রান্সের বক্তৃতায় উল্লেখ করেছেন, After a long struggle with the feeling that I was using a mask to hide the living face of truth, I gave up my connection with our church. About this time one day I chanced to hear a song from a beggar belonging to the Baul sect of Bengal… it was alive with an emotional sincerity… Since then I have often tried to meet these people and sought to understand them through their songs’.

এরপর শিলাইদহে অবস্থানকালে রবীন্দ্রনাথ লালনের দর্শনে প্রভাবিত হয়ে সেগুলোর সুর ও বাণীর ওপর ভিত্তি করে নিজের অনেক গান ও কবিতা রচনা করেন। কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়ায় লালনের আখড়া থেকে উনি লালনের গানের খাতা আনিয়ে প্রায় ২৯৮টি গান সংগ্রহ করেন। ১৯১৫ সাল থেকে কলকাতার “প্রবাসী” পত্রিকায় তিনি লালনের ২০টি গান প্রকাশ করেছিলেন। বাউল যেমন তার নিজের তৈরি যন্ত্রানুষঙ্গ নিয়ে মনের আনন্দে গান গেয়ে বেড়ায়, সেই গানের প্রতিটি শব্দে তাঁদের চিন্তাশীলতা ও জীবন দর্শন প্রকাশ পায়।

এবার রবীন্দ্রনাথের রচনাতে আমরা পাই লালমাটির শান্তিনিকেতনের রাঙা ধুলায়। বাংলা ১৩১৬, ইংরেজি ১৯০৯ সালে উনি হয়েছিলেন রাঙামাটির পথের পথিক, রচনা করলেন বাউল রাগের আরেকটি গান:

গ্রাম ছাড়া ঐ রাঙা মাটির পথ
আমার মন ভুলায় রে।
ওরে কার পানে মন হাত বাড়িয়ে,
লুটিয়ে যায় ধুলায় রে আমার মন ভুলায় রে,
গ্রাম ছাড়া ঐ রাঙা মাটির পথ আমার মন ভুলায় রে।।
ও যে আমায় ঘরের বাহির করে
পায়ে পায়ে পায়ে ধরে মরি হায় হায় রে।
ও যে কেড়ে আমায় নিয়ে যায় রে
যায় রে কোন চুলায় রে আমার মন ভুলায় রে,
গ্রাম ছাড়া ঐ রাঙা মাটির পথ আমার মন ভুলায় রে।।
ও কোন বাকে কি ধন দেখাবে
কোনখানে কি দায় ঠেকাবে
কোথায় গিয়ে শেষ মেলে যে
ভেবেই না কূলায় রে আমার মন ভুলায় রে,
গ্রাম ছাড়া ঐ রাঙা মাটির পথ
আমার মন ভুলায় রে।।

সেই কোন এককালে নবনীদাস খ্যাপা বাউলে লিখেছিলেন, “দেখেছি রূপ সাগরে মনের মানুষ কাঁচা সোনা। তারে ধরি ধরি মনে করি ধরতে গেলেম, আর পেলাম না…।” এখানে রূপসাগর হলো আমাদের বিশ্বসংসার বা হৃদয়ের গভীরতা এবং ‘কাঁচা সোনা’ হলো সুজন বা পরমাত্মার প্রতীক। এই গানের অনুকরণে বাংলা ১৩২৪/ইংরেজি ১৯১৮ সালে দাদরা তালের বাউল রাগে রবীন্দ্রনাথ সৃষ্টি করলেন আরেকটি চিরন্তন গান,

ভেঙ্গে মোর ঘরের চাবি নিয়ে যাবি কে আমারে
ও বন্ধু আমার!
না পেয়ে তোমার দেখা, একা একা দিন যে আমার কাটে না রে ।।
বুঝি গো রাত পোহালো, বুঝি ঐ রবির আলো
আভাসে দেখা দিলো গগন-পারে-
সমুখে ঐ হেরি পথ তোমার কি রথ
পৌঁছবে না মোর দূয়ারে ।।
আকাশের যত তারা চেয়ে হয় নিমেষহারা,
বসে রয় রাত-প্রভাতের পথের ধারে ।
তোমারি দেখা পেলে সকল ফেলে
ডুববে আলোক-পারাবারে ।।
প্রভাতের পথিক সবে এল কি কলরবে-
গেল কি গান গেয়ে ওই সারে সারে!
বুঝি-বা ফুল ফুটেছে,
সুর উঠেছে অরুণবীণার তারে তারে ।।

সাতাশ বছর বয়স পর্যন্ত রবীন্দ্রনাথের কোনও বাউল সুরের গান নেই, তিরিশ থেকে চল্লিশ বছর পর্যন্ত মাত্র খান দুয়েক গান রচনা, তারপর বঙ্গভঙ্গের সময় বয়স যখন চুয়াল্লিশ বছর হঠাৎ অকস্মাৎ এতগুলি গানের সৃষ্টি।

তখন রবীন্দ্রনাথের হাতে বাউল গানের ঢং নানাভাবে রচিত হয়েছে। বাউল সুর-প্রধান গানের সঞ্চারীতে তিনি প্রাচীন রাগ-রাগিণী বা কীর্তনের সাহায্যও নিয়েছেন। উদাহরস্বরূপ বাংলা ১৩৩২, ইংরেজি ১৯২৫ সালে দাদরা তালের ঝিঁঝিট বাউল রাগের গান,

বজ্রমানিক দিয়ে গাঁথা আষাঢ় তোমার মালা
তোমার শ্যামল শোভার বুকে বিদ্যুতেরই জ্বালা।।
তোমার মন্ত্রবলে পাষাণ গলে. ফসল ফলে
মরু বহে আনে তোমার পায়ে ফুলের ডালা।।
মরোমরো পাতায় পাতায় ঝরোঝরো বারির রবে
গুরুগুরু মেঘের মাদল বাজে তোমার কী উৎসবে
সবুজ সুধার ধারায় প্রাণ এনে দাও তপ্ত ধরায়
বামে রাখ ভয়ঙ্করী বন্যা মরণ-ঢালা
বজ্রমানিক দিয়ে গাঁথা আষাঢ় তোমার মালা।।

প্রথাগত শিক্ষায় শিক্ষিত না হলেও বাউলরা জীবন দর্শন সম্পর্কে অনেক গভীর তত্ত্বের কথা বলেছেন।
“খাঁচার ভিতর অচিন পাখি, কেমনে আসে যায়।
তারে ধরতে পারলে মনবেড়ি, দিতাম পাখির পায়ে…।”
এই কালজয়ী বাউল গানটির রচয়িতা বাউল ফকির লালন সাঁই (লালন শাহ)। ‘অচিন পাখি’ এখানে জীবদেহে পরমাত্মা। আর ‘অচিন পাখি’ এমন একটি ধারণা যেখানে সীমা ও অসীমের কোন দ্বন্দ্ব নেই। এই অসাধারণ ব‍্যাখায় অনুপ্রাণিত হয়ে রবীন্দ্রনাথ উৎসর্গ কাব্যগ্রন্থে লিখলেন,
অসীম সে চাহে সীমার নিবিড় সঙ্গ,
সীমা চায় হতে অসীমের মাঝে হারা…।”
প্রলয় সৃজনে না জানি এ কার যুক্তি,
ভাব হতে রূপে অবিরাম যাওয়া-আসা—
বন্ধ ফিরিছে খুঁজিয়া আপন মুক্তি,
মুক্তি মাগিছে বাঁধনের মাঝে বাসা।।

সুকুমার সেন বলেছেন, “বাউল গানের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের পরিচয় কিশোর বয়স হইতে…।” রবীন্দ্রনাথ মনে করতেন লোকসংগীতের মধ্যে বাউল গান অনেক ছন্দবহুল।
“তরুণ যৌবনের বাউল
সুর বেঁধে নিল আপন একতারাতে,
ডেকে বেড়াল নিরুদ্দেশ মনের মানুষকে
অনির্দেশ্য বেদনার খ্যাপা সুরে…।”

বাংলা ১৩২১, ইংরেজি ১৮১৪ সালে রবীন্দ্রনাথ দাদরা তালে বাউল রাগের আরেকটি গান সৃষ্টি করলেন,

ও আমার মন যখন জাগলি না রে
তোর মনের মানুষ এল দ্বারে।
তার চলে যাবার শব্দ শুনে ভাঙল রে ঘুম–
ও তোর ভাঙল রে ঘুম অন্ধকারে।
মাটির ‘পরে আঁচল পাতি’
একলা কাটে নিশীথ রাতি,
তার বাঁশি বাজে আঁধার-মাঝে
দেখি না যে চক্ষে তারে।
ওরে তুই যাহারে দিলি ফাঁকি
খুঁজে তারে পায় কি আঁখি?
এখন পথে ফিরে পাবি কি রে
ঘরের বাহির করলি যারে।

দাদরা তালে আমরা রবীন্দ্রনাথের বহু গান শুনেছি, কিন্তু জানি না যে এর অনেকগুলিই বাউল আঙ্গিকের আশ্রিত। যেমন নৌকা চালানোর সময় মাঝিদের মুখেই একটি গান ‘এবার তোর মরা গাঙে’ গানটি। বা “যে তোমায় ছাড়ে ছাড়ুক আমি তোমায় ছারবো না মা”, বাউল কবি দ্বিজদাসের একতারায় বেজে উঠেছে সেই একই কথা
“তোমায় হৃদ মাঝারে রাখিবো ছেড়ে দেবো না…”।

বাংলা ২৫ চৈত্র, ১৩২২, ইংরেজি ৭ এপ্রিল, ১৯১৬ সালে দাদরা তালে আরেকটি বাউল অঙ্গের গান, এই গানে বাউল মনের বেদনা জানায় যা সে তাঁর জীবনের সবকিছু এখানেই পিছনে ফেলে রেখে চলে যাবে।

যখন পড়বে না মোর পায়ের চিহ্ন এই বাটে,
আমি বাইব না মোর খেয়াতরী এই ঘাটে,
চুকিয়ে দেব বেচা কেনা, মিটিয়ে দেব গো, মিটিয়ে দেব লেনা দেনা,
বন্ধ হবে আনাগোনা এই হাটে–
তখন আমায় নাইবা মনে রাখলে,
তারার পানে চেয়ে চেয়ে নাইবা আমায় ডাকলে।
যখন জমবে ধুলা তানপুরাটার তারগুলায়,
কাঁটালতা উঠবে ঘরের দ্বারগুলায়, আহা,
ফুলের বাগান ঘন ঘাসের পরবে সজ্জা বনবাসের,
শ্যাওলা এসে ঘিরবে দিঘির ধারগুলায়–
তখন আমায় নাইবা মনে রাখলে,
তারার পানে চেয়ে চেয়ে নাইবা আমায় ডাকলে।
তখন এমনি করেই বাজবে বাঁশি এই নাটে,
কাটবে দিন কাটবে,
কাটবে গো দিন আজও যেমন দিন কাটে, আহা,
ঘাটে ঘাটে খেয়ার তরী এমনি সে দিন উঠবে ভরি–
চরবে গোরু খেলবে রাখাল ওই মাঠে।
তখন আমায় নাইবা মনে রাখলে,
তারার পানে চেয়ে চেয়ে নাইবা আমায় ডাকলে।”

রবীন্দ্রনাথের বাউল গানের অবদান লিখে শেষ করা যায় না। প্রতিটি গান আপন মাধুর্য ও স্বকীয়তায় অনন্যসাধারণ। কয়েকটি বহুশ্রুত ও জনপ্রিয় গানের কথা এখানে উল্লেখ করে আমাদের এইখানে ইতি টানতে হয়
** পাগলা হাওয়ার বদল দিনে
** পৌষ তোদের ডাক দিয়েছে আয় রে চলে আয়
** আজ ধানের ক্ষেতে রৌদ্র-ছায়ায় লুকোচুরির খেলা।’
** মেঘের কোলে রোদ হেসেছে, বাদল গেছে টুটি
** বাদল-বাউল বাজায় বাজায় বাজায় রে

বাদল বাউল বাজায় বাজায় বাজায় রে
বাজায় রে একতারা
বাদল বাউল বাজায় বাজায় বাজায় রে
সারা বেলা ধরে
ঝরো ঝরো ঝরো ধারা,
বাদল বাউল বাজায় বাজায় বাজায় রে
বাজায় রে এক তারা

জামেরও বনে ধানের ক্ষেতে
আপন তানে আপনি মেতে
নেচে নেচে হলো সারা
বাদল বাউল বাজায় বাজায় বাজায় রে
বাজায় রে এক তারা

ঘন জটার ঘটা ঘনায়
আঁধার আকাশ মাঝে
পাতায় পাতায় টুপুর টুপুর
নুপুর মধুর বাজে
ঘন জটার ঘটা ঘনায়
আঁধার আকাশ মাঝে
পাতায় পাতায় টুপুর টুপুর
নুপুর মধুর বাজে

ঘর ছাড়ানো আকুল সুরে
উদাস হয়ে বেড়ায় ঘুরে
ঘর ছাড়ানো আকুল সুরে
উদাস হয়ে বেড়ায় ঘুরে
পূবে হাওয়া গৃহহারা
বাদল বাউল বাজায় বাজায় বাজায় রে একতারা

তাল কাহারবা, রাগ গৌড়সারং বাউল।
রচনা শ্রাবণ ১৩২৯, ইংরেজি ১৯২২

তথ‍্যসূত্র
** গীতবিতান, বিশ্বভারতী
** বাংলা সাহিত‍্যের ইতিহাস (৩য় খন্ড) — ড. সুকুমার সেন
** বাংলা সাহিত‍্যের ইতিবৃত্ত — অসিত বন্দ‍্যোপাধ‍্যায়
** রবীন্দ্রসংগীত পরিক্রমা — অমল মুখোপাধ‍্যায়
** রবীন্দ্রনাথ ও বাউল — লীনা চাকী
** রবীন্দ্রসংগীত — শান্তিদেব ঘোষ, বিশ্বভারতী
** রবীন্দ্রনাথের গান ও অন‍্যান‍্য — সুভাষ চৌধুরী

কৃতজ্ঞতা স্বীকার:
ভগবানদাস গাঙ্গুলী, অনিলরঞ্জন গুহ
https://pagefournews.com/baul-effect-rabindra-composition/
https://abasar.net/abasarold/abasar/UNIbibidh_Tagore%20and%20Baul%20Songs.htm
https://www.bongodorshon.com/home/story_detail/the-influence-of-baul-gaan-on-rabindrasangeet
https://inscript.me/baul-songs-impacted-rabindranath-hugely

Acknowledgement for few pictures:
Hatpakha Magazine, Milan Danda, & Esakal

******

Sahityika Admin

Add comment