সাহিত্যিকা

ক্রিকেট ও আমি

ক্রিকেট ও আমি
নারায়ন প্রসাদ মুখোপাধ্যায়, ১৯৬৭ মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং
আমার প্রিয় খেলা ক্রিকেট। আমার ছোটবেলায় বা কলেজের সময় ৫০-৬০ এর দশকে মাঠে যাওয়া অত সহজ ছিলো না। ইডেনে খেলা হলে বাংলায় কমল ভট্টাচার্য, পুষ্পেন সরকার, অজয় বসুর ধারাবিবরণী শুনতাম। আর অন্য কোথাও খেলা হলে রেডিওতে বেরি সর্বাধিকারীর ভাষ্যই ছিলো ভরসা। ইডেনে গিয়ে যে খেলা দেখিনি, তা নয়। তবে রেডিওই ছিলো মুখ্যত মাঠের সাথে আমার যোগাযোগ। আর ছিলো আনন্দবাজার পত্রিকা।
আমি ছিলাম ব্যাটসম্যান। বোলারদের খুব পেটাতাম। ফাস্ট বোলিংকেও কোন দিন ভয় পাইনি। অনায়াসে ব্যাট চালিয়ে চার ছক্কা হাঁকিয়েছি। আমার ব্যাটিং এর জন্যই আমি সাধারণত দুই তিনজনের পরেই নেমে যেতাম। আমার কাজ ছিলো চার ছয় মেরে বিপক্ষের মনোবল ভেঙ্গে দেওয়া। পাড়ায় ক্যাম্বিসের বলে খেলার সময় অনেকের জানলার কাঁচ ভেঙেছি একবার নয়, বহুবার। তখন কিছুদিন খেলা বন্ধ থাকতো, তারপর আবার শুরু হয়ে যেতো।
আমি স্কুল টিমে খেলেছি, পাড়ার টিমে খেলেছি। একটা ম্যাচ মনে আছে। Under 15 ক্রিকেট টুর্নামেন্ট । আয়োজনে আমাদের ক্লাব। কোয়ার্টার ফাইনালের ম্যাচ। আমাদের উইকেট কিপার অসুস্থ। ক্যাপ্টেন আমাকে বলল উইকেট কিপিং করতে। এর আগে আমি মাঝে মাঝে উইকেট কিপিংও করেছি। তাই একটুও ঘাবড়ে যাইনি‌। যাইহোক ওরা প্রথমে ব্যাট করতে নেমে রানের পাহাড় তুলল। ২০ ওভারে ১৭৫ রান‌‌। আমাদের ব্যাট করতে নেমে দশ রানে দুজন আউট হয়ে গেল। ক্যাপ্টেন আমাকে ডেকে বলল এখন তুই ভরসা! টু ডাউন নেমে আমি প্রথম ওভারেই দুটো চার আর দুটো ছক্কা হাঁকালাম। তারপর সেই ম্যাচে হাইয়েস্ট রান করে এবং দুটো ক্যাচ ধরে আমি ম্যাচের সেরা হয়েছিলাম।
ক্রিকেট কমেন্ট্রি শোনাও আমার কাছে নেশা ছিল। বিশেষ করে বাংলায় কমেন্ট্রি শুনতে খুব ভালবাসতাম। সেই সময় কমল ভট্টাচার্য, অজয় বসু, পুষ্পেন সরকারের কমেন্ট্রি ক্রিকেটকে পৌঁছে দিয়েছিল বাড়ির অন্দরমহলে।
সেটা ১৯৫৯ – ৬০ সাল। ইন্ডিয়া অস্ট্রেলিয়া টেস্ট ম্যাচ কানপুরের মাঠে। রেডিওর সঙ্গে আমরা কজন স্কুলের বন্ধুরা আঠার মতো সেঁটে আছি। জেসুভাই প্যাটেলের বিধ্বংসী অফব্রেক বোলিং সেদিন ক্রিকেট বিশ্বের সেরা দল অষ্ট্রেলিয়াকে নাস্তানাবুদ করেছিল। প্রথম ইনিংসে ওনার বোলিং স্ট্যাটিস্টিক্স ৩৫.৫ ওভার, ১৬ মেডেন, ৬৯ রানে ৯ উইকেট, ইকনমি রেট ১.৯২
এখানে ইন্টারেস্টিং ব্যাপার হলো, এক্সট্রা রান বাদ দিলে, জেসুভাই প্যাটেল রান দিয়েছিলেন মাত্র ৬৯, আর আমাদের বাকীরা সব মিলিয়ে দিয়েছিলেন ১৩৫, মানে প্রায় দ্বিগুণ।
আর জেসুভাই প্যাটেলের দ্বিতীয় ইনিংসে ছিলো ২৫.৪ ওভার, ৭ মেডেন, ৫৫ রানে ৫ উইকেট। ইকনমি রেট ২.১৪, শক্তিশালী অষ্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে সেদিনের ভারতের জয় আমরা স্কুলের বন্ধুরা সবাই মিলে তুমুল চেঁচামেচি এবং নাচানাচি করে সেলিব্রেট করেছিলাম।
আমি কোনদিন ক্রিকেটের পিছু ছাড়েনি। কলেজ লাইফেও ক্রিকেট খেলতাম কখনো হোস্টেল চত্বরে আবার কখনো ওভাল কিংবা লর্ডসের মাঠে‌।
স্কুল কলেজের সময়ে আমার প্রিয় ক্রিকেটার ছিলো পঙ্কজ রায়, নরি কন্ট্রাকটর, পলি উমরিগর, চাঁদু বোরদে, আর বিদেশের গ্যারি সোবার্স, রোহন কানাহাই, রিচি বেনো, নীল হার্ভে, হানিফ মহম্মদ। মুখ্যত রেডিও আর খবরের কাগজের দৌলতেই এই নামগুলি জেনেছিলাম। তারপর সত্তরের দশক থেকে সুনীল গাভাসকর, আর কপিলদেব ছিলো আমার হীরো।
স্কুলকলেজের সময়ে আমার বিশেষ আকর্ষন ছিলো হানিফ মহম্মদ। ১৯৫৭-৫৮ সালে দুর্ধষ ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে ব্রিজটাউনে হানিফ ৩৩৭ রান করেছেন। সেদিন তৃতীয় দিনের দ্বিতীয় ইনিংস খেলতে নেমে প্রথম ইনিংসে ৪৭৩ রানে পিছিয়ে থাকা পাকিস্তানের হানিফ মহম্মদ টানা ১৬ ঘন্টা ব্যাটিং করে ম্যাচ ড্র করেন। টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসে এটাই ছিলো দীর্ঘতম সময়ের ইনিংস, আর দ্বিতীয় ইনিংসে ট্রিপল সেঞ্চুরির বিশ্বরেকর্ড। (২০১৪ সালে নিউজিল্যান্ডের ব্রেন্ডন ম্যাককালাম ভারতের বিরুদ্ধে দ্বিতীয় ইনিংসে ট্রিপল সেঞ্চুরি করে এই রেকর্ড ভাঙেন)। এছাড়াও ১৯৫৮-৫৯ সালে পাকিস্তানের ঘরোয়া প্রথম শ্রেণীর ম্যাচে করাচির হয়ে বাহাওয়ালপুরের বিরুদ্ধে ৪৯৯ রান করেছিলেন। ৫০০ রান তিনি করতে পারতেন, কিন্তু তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে রান আউট হয়ে যান। সেই হানিফ মহম্মদ ছিলো আমার আইডল। ছোটখাটো চেহারার এই ক্রিকেটারকে সবাই নাম দিয়েছিলো লিটল মাস্টার, পরে গাভাসকরকে যে নামে ডাকা হতো।
১৯৬০ সালের ডিসেম্বরে পাকিস্তান ভারতে খেলতে এসেছিলো। দিনটাও মনে আছে, ৩০ ডিসেম্বর। তৃতীয় টেস্ট হয়েছিলো কলকাতার ইডেনে। খেলা ড্র হয়েছিলো। সেই পাকিস্তান দলে ছিলো ফজল মামুদ, হানিফ মহম্মদ, ইন্তিখাব আলম, মুস্তাক মহম্মদের মতন সব ক্রিকেটার। দু’বছর আগেই হানিফ ৩৩৭ আর ৪৯৯ রানের দুটো ইনিংস খেলেছেন। সুতরাং হানিফ মহম্মদ ছিলো বিশেষ আকর্ষন। আর আমাদের ছিলো নরি কন্ট্রাক্টর, ভিজয় মঞ্জরেকর, পলি উমরিগর, জয়সীমা, আব্বাস আলি বেগ, চাঁদু বোড়দে, সুভাষ গুপ্তে। পাকিস্তান টসে জিতে বয়াটিং শুরু করে। সেই টেস্টে হানিফ আর মুস্তাক, দুই ভাই হাফ সেঞ্চুরি করেছিলো। আর আমাদের মোটামুটি রান করেছিলো ভিজয় মঞ্জরেকার, আর চাঁদু বোড়দে।
১৯৫৯-৬০ সালে রিচি বেনোর দুর্ধষ অস্ট্রেলিয়া দল ভারতে এসেছিলো। সেই দলে আর ছিলো নীল হার্ভে, নর্ম ও’নীল, রে লিন্ডওয়াল, এলান ডেভিডসন। আমাদের ছিলো নরি কন্ট্রাক্টর, চাঁদু বোড়দে, বাপু নাদকার্নী, বুধি কুন্দরন, জয়সীমা, রামাকান্ত দেশাই, জেসু প্যাটেল। আমাদের কলকাতার দর্শকদের জন্য বিশেষ আকর্ষন ছিলো পঙ্কজ রায়। উনি দুই ইনিংসেই মোটামুটি রান করেছিলেন। ভারত প্রথম ইনিংসে ভালো রান করতে না পারলেও দ্বিতীয় ইনিংসে ভালো রান করে, ম্যাচ ড্র করেছিলো। জয়সীমা (৭৪), চাঁদু বোড়দে (৫০), পঙ্কজ রায় (৩৯), রামনাথ কেনি (৬২) দ্বিতীয় ইনিংসে ভালো রান করেছিলো।
১৯৬৭ সালের একটা ঘটনা, আমরা তখন কলেজের ফাইন্যাল ইয়ারে।
সেই দিনের কথা ভুলতে পারবো না। দিনটা ছিলো নতুন বছর, ১লা জানুয়ারি। ইডেনে ভারত ওয়েস্ট ইন্ডিজ টেস্ট, ওয়েস্ট ইন্ডিজ সিরিজে ১-০ এগিয়ে আছে। আগের দিন, অর্থাৎ বছরের শেষ দিনে ৩১ ডিসেম্বর, ১৯৬৬ র খেলার শেষে গ্যারি সোবার্সের ওয়েস্ট ইন্ডিজ ২১২/৪ রানে দাঁড়িয়ে আছে। রোহন কানাহাই ৭৮ রানে নট আউট (যদিও ৪০ রানের মাথায় দু’বার ক্যাচের সুযোগ দিয়েও বেঁচে যান)।
সেদিন খেলার শুরুতেই পরিস্থিতি আয়ত্তের বাইরে চলে যায়। তখন ইডেন গার্ডেন্সের গ্যালারীর আসন সংখ্যা ছিলো উনষাট হাজার। কিন্তু সিএবি (ক্রিকেট এ্যাসোসিয়েশন অফ বেঙ্গল) প্রচুর কমপ্লিমেন্টরি টিকেট বাজারে ছাড়ে। আর প্রচুর ভুয়ো টিকিটও কালোবাজারে বিক্রি হয়। অনুমান, সেদিন কম হলেও আশি হাজার দর্শক মাঠে উপস্থিত ছিলো। তখনকার দিনে ইডেনে মেটাল ফেন্স ছিলো না, তাই প্রচুর দর্শক মাঠে ঢুকে যায়। পুলিশ লাঠি চার্জ করে। দর্শক উত্তেজিত হয়ে পড়ে। এরপর পুলিশ সীতেশ রায় নামের একজন বৃদ্ধের উপর প্রচন্ডভাবে লাঠিচার্জ করে। প্রতিবাদে দর্শকেরা বাঁশের স্ট্যান্ডগুলো উপড়ে ফেলে, আর ত্রিপলের ছাদে আগুন লাগিয়ে দেয়। এবার পুলিশ এসে টিয়ার গ্যাস চার্জ করে।
এই অবস্থায় ওয়েস্ট ইন্ডিজের ক্রিকেটাররা ভয়ে ইডেন গার্ডেন থেকে বেরিয়ে অচেনা কলকাতা শহরের রেড রোড, আউটরাম ঘাট রোড ধরে দৌড়ে পালাতে শুরু করে। উন্মত্ত জনতা পুলিশের গাড়িতে, বাসে, ট্রামে আগুন ধরিয়ে দেয়। এমনকি স্পোর্টিং ইউনিউন তাঁবুতেও আগুন ধরিয়ে দেয়। সেই রায়ট দূর সুবোধ মল্লিক স্কোয়ার পর্যন্ত ছড়িয়ে যায়।
তবে সবকিছুকে ছাড়িয়ে যায় একজনের একটি ব্যাক্তিগত ঘটনা, নিজের প্রাণ বাজি রেখে। ইডেনে যখন উন্মত্ত জনতার আগুনে আর অল্পক্ষনের মধ্যেই ওয়েস্ট ইন্ডিজের ফ্ল্যাগ জ্বলে যাবে, তখন কোথা থেকে দৌড়ে আসেন ক্রিকেটার কনরাড হান্টস। পুলিশের ব্যারিকেড সরিয়ে দিয়ে নিজের জীবন বিপন্ন করে সে ছাদে উঠে ফ্ল্যাগ নামিয়ে আনে। কনরাড হান্ট নিজের আত্মজীবনী Playing to Win তে লিখেছেন: “I looked up and saw our national flags fluttering in the breeze, threatened by the fire that was now coming towards the pavilion. I started to climb up to get the flags and avoid surrendering them, the symbol of sovereignty of our two nations, to ‘mob rule’. The plain-clothes policeman said, ‘Don’t you go. I’ll get them.’ He went and brought the two flags down and gave them to me.” 
কনরাড হান্ট, Conrad Hunte. 
দুঃখের ব্যাপার, পরদিন অল ইন্ডিয়া রেডিও মিথ্যা বলে যে খেলা বিঘ্নিত হয় কুয়াশার জন্য। ডেডলক চলতেই থাকে। ফ্রাঙ্ক ওরেল সেইসময় ব্যাক্তিগত কারনে কলকাতায় ছিলেন। তিনিও ওয়েস্ট ইন্ডিজ টিমের টিম মিটিং এ উপস্থিত ছিলেন। সেইসময় আকস্মিকভাবে মনসুর আলি পতৌদি ওয়েস্ট ইন্ডিজ টিমের মিটিং রুমে ঢুকে পড়েন। এরপর ফ্রাঙ্ক ওরেল আর মনসুর আলি পতৌদির যৌথ উদ্যোগে ৩রা জানুয়ারি খেলা শুরু হয়। ভারত ম্যাচের শেষদিনে (টেকনিক্যালি চতুর্থ দিনে) ইনিংস ও ৪৫ রানে হেরে যায়।
Brief scores:
West Indies 390 (Conrad Hunte 43, Rohan Kanhai 90, Seymour Nurse 56, Garry Sobers 70; BS Chandrasekhar 3-107)
beat India 167 (Budhi Kunderan 39, ML Jaisimha 37; Lance Gibbs 5-51) and 178 (ML Jaisimha 31, Rusi Surti 31, Hanumant Singh 37; Garry Sobers 4-56) by an innings and 45 runs
.

Sahityika Admin

Add comment