সাহিত্যিকা

আমার মা’র কথা

আমার মা’র কথা
© অমিতাভ দত্ত, ১৯৭০ ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং
আমার মা গৌরী দত্ত ছিলেন, অনেকদিক থেকেই, এক ব‍্যতিক্রমী মানুষ। জন্মেছিলেন মধ‍্যবিত্ত ব্রাহ্মণ পরিবারে। নিজের ইচ্ছেয় এবং পরিবারের ঘোর বিরোধিতা উপেক্ষা করে বিয়ে করেছিলেন কায়স্থ পরিবারে যখন তিনি কলেজের ছাত্রী – ইন্টারমিডিয়েট (IA) দ্বিতীয় বর্ষ।
মা ছিলেন অসাধারণ মেধাবী ছাত্রী, ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় rank holder ছিলেন, এবং স্কলারশিপও পেয়েছিলেন। অপেক্ষাকৃত কম বয়সে জীবন সংগ্রাম শুরু করতে হয়েছিল তাই সংস্কৃত নিয়ে BA (Hons) পাস করার পরও উচ্চতর শিক্ষা লাভ করতে পারেন নি। এরপর চল্লিশ বছরের উপর শ্রীরামপুর রমেশ চন্দ্র বালিকা বিদ‍্যালয় নামের একটি উচ্চ মাধ্যমিক স্কুলে সুনাম ও খ‍্যাতির সঙ্গে শিক্ষকতা করেছেন। আর কর্মরত থাকার সময়ই Study Leave নিয়ে হোম সায়েন্সে ডিপ্লোমাও নিয়েছিলেন।
আমাদের বাড়িতে একটা ভেলভেট মোড়া কাস্কেটের মধ‍্যে মার পাওয়া অনেক মেডেল ছিল। সেটি আমাদের শ্রীরামপুরের বাড়ি থেকে চুরি হয়ে যায়। ১৯৪৭ সালে ইন্টারমিডিয়েট (IA) পরীক্ষায় লজিকে সেরা নম্বর পাওয়ার জন‍্য মা পুরস্কার পান টেনিসনের কবিতার একটি বই। ইংরেজ অধ‍্যক্ষর সই করা Citation ছিল বইটির প্রথম পাতায়। নীল চামড়ায় বাঁধানো মোটা সেই বইটা এখন রয়েছে আমার কাছে। এক সময় কয়েকটি কবিতা পড়েও ছিলাম। আমার বইয়ের সংগ্রহ, গোটা পঁচিশেক কার্ডবোর্ড বাক্সের মধ‍্যে বন্দী জীবন যাপন করছে। বিভিন্ন কারণে সেগুলোকে মুক্ত করতে পারছি না। ওই টেনিসনের বইটা কোন একটা বাক্সের মধ‍্যে রয়েছে। খুঁজে বার করা সময় সাপেক্ষ ব‍্যাপার।
আমার মার ছিল অসাধারণ বই পড়ার ক্ষমতা। বইয়ের প্রতি আমার আকর্ষণ আমি বোধহয় মা’র কাছ থেকেই পেয়েছি। বাড়িতে মা “মাসিক বসুমতী” রাখতেন। তাতে একাধিক ধারাবাহিক উপন‍্যাস বার হ’ত। যদিও আমাদের ভাইবোনেদের জন্য বরাদ্দ ছিল “শুকতারা”, আমি লুকিয়ে, মানে এককথায় চুরি করে “মাসিক বসুমতী”ও পড়তাম। মনে আছে, একটি ধারাবাহিক উপন‍্যাসের নাম ছিল “ইন্দ্রাণীর প্রেম”। আমি সেটাও পড়তাম। তখন আমি চতুর্থ শ্রেণীর ছাত্র, “প্রেম” মানে কি জানিই না। সরল মনে মাকে জিজ্ঞাসা করায় উনি জানতে চাইলেন ওই “প্রেম” কথাটি আমি কোথা থেকে পেয়েছি। আর যখন জানলেন যে আমি “ইন্দ্রাণীর প্রেম” পড়ি তখন একেবারে যাকে বলে “প্রহারেণ ধনঞ্জয়”। এছাড়াও, এখন মনে পড়ে, ছোটবেলায় আমি মায়ের হাতে অনেক মার খেয়েছি।
আমাদের পিতৃদেব তাঁর মধ‍্যবয়সে বেসরকারী চাকরি ছেড়ে দিয়ে ব‍্যবসা শুরু করেন। শুরুতে ঠিকঠাক চললেও গুরুতর সমস‍্যা শুরু হয় পশ্চিমবঙ্গে শ্রমিক আন্দোলন, ঘেরাও ইত‍্যাদি শুরু হওয়ার পর। সেই সময় তিনি ভীষন অসুস্থ হয়ে পড়েন। সেই কঠিন সময়ে আমার মা সেই সংসারের হাল ধরেছিলেন।
মা ছিলেন আমাদের ছোট্ট পরিবারের “Rock of Gibraltar”, ছিলেন স্বতন্ত্র, অত‍্যন্ত ব্যাক্তিত্বময়ী, স্পষ্টবক্তা এবং দৃঢ়চেতা। উনার মূল‍্যবোধ ছিল উচ্চমাত্রার। নিজের আদর্শ, মতামত ও সিদ্ধান্তের ওপর আস্থা রাখতেন। এবং মার্জিত আচরণ এবং নিজস্ব মতামতের জন্য পরিচিত ছিলেন। আমার ছোট বোনকে নিজে যে স্কুলে পড়াতেন সেখানে পড়তে না দিয়ে পাঠিয়েছিলেন অন‍্য একটি স্কুলে – যেটি ছিল আমাদের বাড়ি থেকে কিছুটা দূরে। সেই সময় “Conflict of Interests” সাধারন লোকের ধারণা না থাকলেও মা সেটা বুঝতেন ও মেনে চলতেন।
আমার মার কথাবার্তার ধরনও ছিল অন‍্য রকম। তখন উনি ওঁর ব‍্যবসা সরিয়ে নিয়ে গেছেন উড়িষ্যায়। আমার বাবা খুব ভালো মোটর বাইক চালাতে পারতেন, আর সেখানে প্রায়ই মোটর বাইক চালিয়ে এদিক ওদিক যেতে হতো। একবার শ্রীরামপুরে বাড়িতে এসে তিনি বলেছিলেন… “ভাবছি এখানে একটা মোটর বাইক কিনবো”।
আর মার প্রতিক্রিয়া হয়েছিল…. “কিন্তু আমি পেছনে ব’সবো না”।
২০০০ সালের ১২ই জানুয়ারি আমার পিতৃদেব পরলোক গমন করেন, শ্রীরামপুরের এক নার্সিং হোমে। মাকে যখন আমি বাড়ি থেকে নিয়ে এসে বাবার শরীরের সামনে দাঁড় করলাম তখন কিন্তু তিনি কান্নাকাটি কিছুই করলেন না। খালি বল্লেন.. “চললে? এখন আর আমাকে কে বকাবকি করবে? আর আমার সেই মা আমার একত্রিশ বছর বয়স পর্যন্ত (মানে আমার বিবাহিত জীবনের আগে) আমি অসুস্থ হ’লেই নিজের কাছে নিয়ে শুতেন।
২০০০ সালের মে মাসে আমি ক’লকাতা থেকে বদলি হয়ে চলে যাই মহারাষ্ট্রের সোলাপুরে। মা কিছুতেই রাজি হ’লেন না শ্রীরামপুরের “স্বামীর ভিটে” ছেড়ে আর তাঁর বক্তব‍্য ছিল.. “এখান থেকে যাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না”।
২০০৪ সালের ডিসেম্বর মাস। আমি তখন পশ্চিম রেলওয়ের সদর দফতর মুম্বাইতে কর্মরত। একদিন মা টেলিফোনে বললেন…. “তোর কাছে যেতে ইচ্ছে করছে”। আমি সঙ্গে সঙ্গে সবকিছু বন্দোবস্ত করে ফেললাম। সেই সময় মা আমার বোনের বাড়িতে ছিলেন। যেদিন মুম্বাই থেকে বেরোবো অর্থাৎ ১৩ই ডিসেম্বর, ভোর তিনটেয় ক’লকাতা থেকে আমার ভগ্নিপতি ফোনে জানালো যে মা আর নেই, চলে গেছেন, ঘুমের মধ‍্যে। আকাশপথে দৌড়ে এসে দেখলাম মা আমার ঘুমিয়ে আছেন, সারা দেহ লেপ/কম্বলে ঢাকা। খালি মুখখানি বেরিয়ে আছে। আমার চোখে জল এলো না। খালি বুকের মাঝে হঠাৎই চাপ লাগতে লাগলো। আর মনে হ’ল মা যেন বলছেন..
“এতক্ষণে এলি রবুন! এবার আমায় নিয়ে চল্। তোর শেষ কাজটা কর্”
মা চলে গেছেন প্রায় বাইশ বছর আগে। তবে তিনি রয়ে গিয়েছেন আর থাকবেনও আমার মনের মণিকোঠায় যতদিন আমি আছি এই ধরাধামে।
২০০০ সালে যখন আমার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদোন্নতি হয় তখন মা আমাকে একটি হাতঘড়ি উপহার দিয়েছিলেন। সেটি আজও আমি ব‍্যবহার করি।
আর রয়েছে কিছু ফটো। তারথেকে একটি পোস্ট করলাম এখানে। মার সঙ্গে আমি। এটা দার্জিলিঙে তোলা – সালটা খুব সম্ভবত ১৯৫৬। মূল ছবিটি ছিল সাদা-কালো। পরবর্তীতে স্টুডিওতে কম্পিউটারের সহায়তায় ছবিটি রঙ্গিন হয়। এই সাদা-কালো ছবিটি কলকাতায় আমার ছোট বোনের কাছে ছিল। সেই রঙ্গিন ভার্সনটা বানিয়ে আমায় দিয়েছিল। ২০১৭ সালে আমার সেই বোন চলে গিয়েছে। তাই সেই সাদা-কালো ছবি এখন আর জোগাড় করা যাবে না।
আমাদের প্রজন্মের মানুষদের, তাদের জননীদের স্মরণ করার জন‍্য প্রয়োজন হয় না International Mother’s Dayর। আমার মার ডাকনাম ছিল “রাণী”। রাণীর মতোই বেঁচেছিলেন তিনি। She had lived her life in her own terms. আর রাণীর মতোই চলে গেছেন। Neither she suffered herself nor she made others to suffer for her.
পল ম‍্যাকার্টনি ও জন লেননের যৌথভাবে লেখা Beatles Group এর একটি বিখ‍্যাত গানআছে “Let it be”
When I find myself in times of trouble,
Mother Mary comes to me
Speaking words of wisdom, let it be
And in my hour of darkness
She is standing right in front of me
Speaking words of wisdom, let it be
Let it be, let it be, let it be, let it be
Whisper words of wisdom, let it be
সেই গানে তিনি গেয়েছেন তাঁর কঠিন সময়ে। হিন্দু রমণী হয়েও জাতিভেদের উর্দ্ধে উঠে মাদার মেরীর উপস্থিতি অনুভব ক’রতেন।
আমারও অনেক দুঃসময়ে, কঠিন সময়ে, প্রতিকূল পরিস্থিতিতে মাকে স্মরণ করেছি লড়াই করার শক্তি পাওয়ার জন‍্য।
১৫ই মে, ২০২৩
** মা গত হয়েছিলেন ১৩ ডিসেম্বর, ২০০৪ সালে। আজকের তারিখ থেকে হিসেব করলে ২২ বছরই হবে।
********

Sahityika Admin

Add comment