সাহিত্যিকা

এ্যান্টারটিকা অভিযানে দুই বিক্কলেজিয়ান (পঞ্চম পর্ব)

এ্যান্টারটিকা অভিযানে দুই বিক্কলেজিয়ান (পঞ্চম পর্ব)
© দীপ্ত প্রতিম মল্লিক, ১৯৮০ মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং

আগের পর্বের লিঙ্ক

এ্যান্টারটিকা অভিযানে দুই বিক্কলেজিয়ান (চতুর্থ পর্ব)

২৯ ডিসেম্বর ২০২৩- ডিসেপশন পয়েন্ট
এই কদিন রোজই জাহাজের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে প্রবল ছোটছুটি করেছি। কেউ খবর দিল, এই বুঝি কোনো ভালো সিনারি চলে গেল বা “ছোট ছোট”, ওদিকে তিমি মাছ বেরিয়ে যাচ্ছে, আরে সামনে এক ঝাঁক পেঙ্গুইন, মার দৌড় ক্যামেরায় ধরতে গেলে। এরই সাথে প্রবল ঠান্ডা, বরফ, হাওয়া – সব মিলিয়ে আমরা সবাই অত্যন্ত ক্লান্ত ছিলাম। ডিসেপশন আইল্যন্ড আসবে অনেক বেলায়, তাই সকালে ওঠার কোনো তাড়াও ছিল না।

এই Deception Island এর ইতিহাস কিছুটা উল্লেখ করি।
গুগল যা বলছে ইংরেজিতে বোঝাতে সুবিধা হবে: the island was first sighted by British sealers in 1820, and the name was coined by American sealer Nathaniel Palmer who first visited the bay in November 1820. The Island (62°57’S, 60°38’W) is an active volcano in the South Shetland Islands, off the Antarctic Peninsula. The origin of the name ‘Deception was due to its unique shape. From some angles, Deception looks like a normal island. Only when you pass through the entrance, the horseshoe shape becomes apparent. Then again, unlike typical volcanoes, Deception Island is not a mountain with a crater on top. Once you reach the centre of the bay, the actual deception becomes clear. You are on the flooded caldera of a volcano! Nowhere else in the world can a vessel sail right into an active volcano. The history of this Island is a tale of fire and ice in reality. The rocky outcrops that form the outer periphery of the island rise from the blue sea – a dream-like view that would fit perfectly into a fantasy tale. These cliffs partly covered by white glaciers and partly by black volcanic ash effectively hide the secret of the island. From sea level, the island looks like a solid landmass surrounded by cliffs.

Looking WSW from the center of the caldera

A massive eruption, between 8,300 and 3,980 years BC, resulted in the collapse of the mountain’s top. This makes it appear as a normal island surrounded by cliffs. The volcano rises 1.4 kilometers from the sea bed and its basal diameter is 30 kilometers. Interestingly, the eruptions and lava flow did not turn the glaciers on the island into steam. For this reason, the volcanic events on the island are classified as subglacial eruptions.

এবার নিজেদের কথায় ফিরে আসি। আরামে ঘুম দিয়ে উঠলাম সকাল আটটায়। দেখি আকাশ আজ ঝকঝকে পরিষ্কার। শুধু তাই নয়, দারুণ রোদ উঠেছে। চান টান করে ওপরে ব্রেকফাষ্ট খেয়ে ডেক পনেরোতে চলে এলাম আমরা চারজন। জাহাজ তরতর করে এগিয়ে চলেছে ডিসেপশন আইল্যন্ডের দিকে। দুদিকেই ছোট ছোট বরফে মোড়া দ্বীপ। দূরে মূল ভুখন্ড কখনও বা আবছা দেখা যাচ্ছে, যদিও সময়ের সাথে সাথে তা মিলিয়ে গেল। আইসবার্গ যত্রতত্র, তেমনই প্রতি মুহূর্তে কোথাও না কোথাও তিমির ফোয়ারা উঠছে। আমরা সুইমিং পুলের পাশে রোদে বসে গল্পর বই পড়ছি। রোদের তাপে শরীরে বেশ আরাম লাগছে। আর ঠান্ডা লাগলে চোদ্দতলার ওয়ার্ল্ড ফুড থেকে কফি আনছি।

এগারোটা নাগাদ ট্যুর ম্যানেজারের ঘোষণা শুরু হল। জানলাম যে ডিসেপশন আইল্যান্ড হচ্ছে একটি ভলক্যানো, যার ক্রেটারের অংশ জলের তলায় আর জাহাজ ঐ ক্রেটারে যেতে পারে যেহেতু ওখানে জলের প্রয়োজনীয় গভীরতা আছে। এই আগ্নেয়গিরি মাঝে মাঝেই জেগে ওঠে। ১৯৬৭ সালের অগ্নুৎপাত ছিল সবচেয়ে ভয়ংকর। এখানে আগে ব্রিটিশ স্টেশনও ছিল, কিন্তু এই ভূমিকম্পর ফলে ১৯৬৯ সালে সে পাট চুকিয়ে দেয় ব্রিটিশরা।

এককালে তিমি শিকারিদের অত্যাচারে যখন নীল তিমির বংশ প্রায় লুপ্ত হয়ে যায়, তখন ১৯১২ সালে নরওয়ের থেকে এখানে কমার্শিয়াল হোয়েল স্টেশন বানানো হয় ওদের বংশ পুনরুদ্ধার করার জন্য। এখন অবশ্য সেই স্টেশনের কিছুই আর অবশিষ্ট নেই।

ডিসেপশন আইল্যন্ড হচ্ছে চিনস্ট্রিপ পেঙ্গুইনের কলোনী। এখানে কম বেশি ১০০,০০০ পেঙ্গুইন আছে, কাজেই আমরা এখন অনেক অনেক পেঙ্গুইন তো দেখতে পাবই, সাথে তিমিও।

বেলা সাড়ে এগারোটায় এসে গেল ডিসেপশন আইল্যান্ড। এ্যান্টারটিকার অন্য দ্বীপের সাথে এর তফাত হচ্ছে-এখানে নীচের দিকের অনেক অংশে বরফ নেই, ন্যাড়া। সেটা হয়েছে আগ্নেয়গিরির জন্য এখনো কিছুটা গরম উঠে আসছে আর তার ফলে নীচের দিকে বরফ প্রায় নেই। আমরা ডিসেপশন আইল্যান্ডের কোল ঘেঁসে চলেছি, হঠাৎ চোখে পড়ল এক ঝাঁক অরকা বা কিলার হোয়েল। এরা সাইজে ছোট কিন্তু ঝাঁক বেঁধে থাকে। এরা আসে হাম্পব্যাকদের বাচ্চা খাবে বলে।

চলেছি ন্যাড়া পাহাড়ের গা ঘেঁসে। মাঝে মাঝে এক একটা গ্লেসিয়ার আসছে-যদিও নীচে থেকে শ খানেক ফুট কোনো বরফ নেই। পাহাড়ের কোল ঘেঁসে সাদা টুপি পরা ওরা কারা? পেঙ্গুইন না? ক্যামেরার জুমে ধরা পড়ল হাজার হাজার পেঙ্গুইন ওখানে, কেউ জলে, কেউ বা নীচে রোদ পোয়াচ্ছে আর কেউ বা দুলে দুলে চলেছে। কিছু জায়গায় পাহাড়ের রঙ মেটে লাল- প্রচুর লোহার আকর আছে এখানে তার জন্য সব মেটে লাল। মাঝে মাঝেই ক্রেটারের অংশ চোখে পড়ছে, লম্বা লম্বা পাথর- যেগুলো ভলকানিক অগ্নুৎপাতের অংশ।

Chinstrap penguins at Bailey Head

পেঙ্গুইনদের কলকাকলী শুনতে শুনতে কখন যে ডিসেপশন আইল্যান্ড পেরিয়ে এলাম জানিনা। ঘন্টাদা বলল, চ খেয়ে আসা যাক। আজ ইন্টার ন্যাশনাল ডাইনীং রুমে যাই, ওখানে তিন কোর্সের খাওয়া, জমিয়ে খাওয়া যাক। তা জমিয়ে খাওয়া হল বটে, সূপ, স্প্রিং রোল, ব্রেড, প্যাশন ফ্রুট ইয়োগহার্ট, এম পানাডা খেয়ে মন এখন আনন্দে ভরপুর। চারজনে বসলাম গিয়ে সাততলার ডেকে। জাহাজ এখন ফেরার পথ ধরেছে। যে পথে এসেছি, সেই পথেই ফেরা। অনেকটা রাস্তা এই এ্যান্টারটিক পেনিনসুলা- প্রায় ২০০ নটিক্যল মাইল। এখান থেকে বেরুতে সন্ধ্যা হয়ে যাবে।

বেল আড়াইটেয় লিভিংস্টোন আইল্যান্ড এল। এখানে আবার বেশ কিছু তিমি দেখা গেল।

সকালে ভালো রোদ থাকলেও, যত পেনিনসুলার উত্তরে যাচ্ছি আকাশের অবস্থা খারাপ হচ্ছে। তিনটে নাগাদ গেল গ্রীনউইচ আইল্যান্ড। বিকাল পাঁচটায় ঘোষণা হল আমরা এ্যান্টারটিক পেনিনসুলা থেকে বেরিয়ে যাচ্ছি, ঢুকছি ড্রেক প্যাসেজে। চল্লিশ ঘন্টা ধরে জাহাজ ড্রেক প্যাসেজ দিয়ে যাওয়ার পর আসবে আমাদের পরের গন্তব্যস্থল – ফকল্যান্ড আইল্যান্ড।

ড্রেক প্যাসেজের নাম শুনে অনিবৌদি বলল, আমি এবার চলি, ঘরে বিশ্রাম নিই। ঘন্টাদা বলল, কোনো চিন্তা নেই তোমার- এবারও দেখো, সমুদ্র থাকবে শান্ত । তা-ও যাই বাবা- বিছানায় শুয়ে থাকাই ভালো।

আমরা সাততলায় থাকলাম। দেখছি ঢেউ এর জোর ক্রমেই বাড়ছে। এই কদিন পেনিনসুলাতে ঢেউ ছিল খুবই কম, যেহেতু চারদিক দ্বীপে ঘেরা। আজ বহুদিন পর খোলা জায়গায় এসে ঢেউ এর শক্তি যেন বেড়ে গেছে।
দেখি গুগল কি বলছে? The Drake Passage is so infamously rough from the fact that currents at this latitude meet no resistance from any landmass, anywhere on the planet. Coupled with the area’s propensity for high wind, a crossing of the Drake Passage can be quite the adventurous exploit.

Drake Passage is the spot where the Atlantic, Pacific, and Southern Seas converge, creating a roaring current mix that has the potential to make you regret that extra serve of pasta at supper. You have to cross it on almost all Antarctica voyages (although there are a few alternatives, such as flying from South America or cruising to East Antarctica from New Zealand).

ক্রমে আটটা বাজল। আমরা খেয়ে এলাম। শোওয়ার আগে, ঘরের কাঁচের দরজা দিয়ে দেখি ঢেউ এখন অনেক উত্তাল। জাহাজ অল্পসল্প দুলছে। দীপা বলল, ঢেউ আরো বাড়বে –ক্যাপ্টেন বলেছে হাওয়ার তেজ রাতে বাড়বে। ফলে ঢেউও বাড়ছে। কজেই শুয়ে পড়া যাক। মাঝরাতে অনেকবার ঘুম ভাঙ্গল। অনুভব করলাম জাহাজ ভালোই দুলছে। তবে এটা রোলিং নয়, হালকা দুলুনি-যেটা ঘুম পাড়াতে সাহায্যই করল বলা যায়।

৩০ ডিসেম্বর ২০২৩- ড্রেক প্যাসেজে আবার
The Mar de Hoces, as the Drake Passage is known in Spanish, was first allegedly sailed in the early 1500s, when famous Spanish marine explorer Francisco de Hoces sailed south enough to see the end of the landmass that is South America. A few decades later a famous British explorer, admiral, and sea captain, by the name of Francis Drake, lost a ship to formidable southward winds whilst sailing the west coast. The Spaniards, however, consider Francis Drake a pirate (in their defence, Drake did have a penchant for capturing their treasure-filled ships) so most Spanish-language literature nowadays still refers to the Drake Passage by its original name.

আজও সারাদিন জাহাজ চলল ড্রেক প্যাসেজ দিয়ে। চলেছি ফকল্যান্ড আইল্যন্ডের দিকে- যেটা দক্ষিণ আমেরিকার পূর্বপ্রান্তের এক দ্বীপপুঞ্জ। ঢেউ এর প্রতাপ আর বাড়েনি। পনেরো কুড়ি ফুটের ঢেউতে এখন অভ্যাস হয়ে গেছে। একটা হালকা দোলানি অব্যহত, কিন্তু তাতে অসুবিধা কিছু হয় নি। এমনকি অনিবৌদির মত সি-সিকনেসতে ভোগা লোকও দিব্যি ঘুরে বেড়াচ্ছে। সব মিলে ড্রেক প্যসেজের ভয় আর কারুর নেই। সব কিছু আগের মত। আমাদের আজকের দিনটা ছিল শুধুই বিশ্রাম। মাঝে দু খানা প্রেজেন্টেশন ছিল প্রিন্সেস থিয়েটারে- একটা ফকল্যান্ড আইল্যন্ডের ওপর আর অপরটি পেঙ্গুইনদের ওপর। আবার কিছু জ্ঞান আহরণ করা গেলো। বাকি দিন শুধু খাওয়া, বিশ্রাম আর সমুদ্রর রূপ দেখা।

**********

Sahityika Admin

Add comment