সাহিত্যিকা

“হ্যাঁ সবাই”

“হ্যাঁ সবাই”
© তাপস সামন্ত, ১৯৮১ ইলেকট্রনিকস ও টেলি কমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং

ঠিক মনে পড়ে না। আবছা আবছা ভাসে মনে। আমি তখন বছর সাতেক। আমার কোলে আরও এক ভাই। ইস্কুলে পড়ি। দ্বিতীয় শ্রেণী। আমার উপরের শ্রেণীতে পড়ে এক কাকা- বাবার খুড়তুতো ভাই। বাবার খুড়ো মানে আমার দাদু- ছোটদাদু। খুব মজার লোক। বুনিয়াদি বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন দূরের ইস্কুলে।

চারকোঠা কাঠের দোতলা বাড়ির দোতলায় পাশাপাশি থাকি আমরা- দাদুর ঠিক পাশের কোঠায়। বারান্দায় পড়তে বসি সকালে। পাশ দিয়ে যাবার সময় প্রায়শই আমার আর ভাইয়ের কানটা একটু করে স্পর্শ করেই মুখে ট্যাঁ—- করে আওয়াজ করতো আর আওয়াজ থামাতো না- ঠিক ওই আকাশবাণীর শুরুটা যেমন হয়। চোখ গোল গোল করে মুচকি হেসে বলত “কীরে সকাল সকাল রেডিও চালিয়ে দিলি যে! স্টেশন তো খোলেই নি এখনো। বন্ধ কর, বন্ধ কর।” পাছে বাবা বা আমার দাদুর কানে যায় আর বকুনি খাই যে পড়তে বসে রেডিও কেন চালিয়েছি- ভয়ে আমরা নিজেদের কানদুটো নিজেই মুলে রেডিও বন্ধ করি। আর সেই দাদু মুচকি হেসে একটু আদর করে চলে যেত।

দাদু খুব গাছ লাগাত আর সেই গাছে প্রথম ফল হলে সবাই কে বিলোত। দাদুর ছিল খুব দক্তাপানের নেশা। বাড়ি এলে- সন্ধ্যা হলেই সব মশলাপাতি ভেজে একটা কাঠের পিঁড়িতে মিশিয়ে উনুনে ফুঁ দেওয়া চোঁঙা দিয়ে মড় মড় করে গুঁড়ো করত। সেই ভাজা মৌরি, দক্তাপাতা, ভাজা ধনিয়া ও আরও কত কী। খুব লোভ হত। তবে দাদুর নিষেধ- ওগুলো শুধু দেখাই যাবে। তাই মুফতের গন্ধ নেওয়া ছাড়া কোন উপায় ছিল না।

সেই দাদুর খুব তালরসের নেশাও ছিল। শীতের শেষ হতে না হতেই শুরু হত। ফলে দাদুর কফ ছিল নিত্য সঙ্গী। সেবার খুব বাজে অবস্থা। কফ সারছেই না। কাশতে কাশতে গলা ছিঁড়ে যাচ্ছে। কাঠির মাথায় তুলো দিয়ে দাদু গলায় আয়োডিন লাগাচ্ছে। এমনি চলতে চলতে দাদু একদিন শয্যাশায়ী হয়ে গেল। ডাক্তার আসে যায়। দাদু আর ঘর ছেড়ে বেরোয় না। খুব মন খারাপ নিয়ে দরজার বাইরে থেকে দেখি। রাতে দাদুর কাশির শব্দ আর কষ্ট শুনতে পাই।

সেদিন খুব বাড়াবাড়ি। ডাক্তার জবাব দিয়ে দিয়েছে। পরদিন আমরা অভ্যাস মত ইস্কুলে গেছি। ছুটির শেষে বাড়ি ফিরছি। পথে শুনলাম দাদু আর নেই। দু চোখ বেয়ে জল নামল। তিন বছরের বড় কাকার চোখের জল বাঁধনহারা। দুইবন্ধু মনে উথালিপাথালি নিয়ে যখন ভিটেতে পা দিলাম কান্নার রোল তখন চারিদিকে। মা, কাকিমা, ঠাকুমা, জেঠিমা, খুড়িমা, বড়মা, দিদি, পিসি, ভাই, বোন সবাই হাউমাউ করে কাঁদছে। কাকার দুই দাদা তখনও কলকাতা থেকে এসে পৌছায়নি। কাকাকে ছোটঠাকুমা জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কাঁদতে লাগল। মা আমাকে আর ভাইকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগল। আমাদের দুইবন্ধুর হতচকিত অবস্থা।

আধঘন্টা কেটে যাবার পর- সব কেমন থম মেরে গেল। শুধু চাপা কান্না চারিদিকে। মা গুম মেরে বসে আছে শীলগোড়ার পাশে রান্নাঘর আর ভাঁড়ারঘরের গলির পাশটাতে। ভাইটা মায়ের বুকে দুধ খাচ্ছে। সদরে লোকজন। পাশেই খিরিশগাছটা কাটা হচ্ছে। ছোটদাদুর নিজের হাতে লাগান গাছ। কুড়ুল নিয়ে পাড়ার লোকেরা কাটছে। সেই গাছের কাঠ দিয়েই দাদুকে দাহ করা হবে। আমার মনে তখন যেন আকাশ ভেঙে পড়েছে। জীবনে সেই প্রথম মৃত্যুর সাথে চাক্ষুষ পরিচয়। কোথাও কোন সান্ত্বনা পাচ্ছি না। বোঝানোর মত কারও অবস্থা নয়। শেষে একদৌড়ে মায়ের কোলে। আমার চোখে জল- মায়েরও চোখে জল। মায়ের মুখে কথা নাই। শুধু বুকটা থর থর করে করে কাঁপছে। আরও ভয় পেয়ে মা কে শুধোলাম- “মা , সবাই কী একদিন মরে যায়?” কাঁদতে কাঁদতেই মা মাথা নাড়ল। আরও ভয়ে ভয়ে শুধোলাম “তুমি, বাবা- তোমরাও?” এবার মা মুখ খুলল “হ্যাঁ- সবাই ।”

আমার পৃথিবীটা কেমন যেন হঠাৎ করে শূন্য হয়ে গেল। চিৎকার করে কেঁদে উঠলাম। মা বুকে টেনে নিয়ে আদর করতে করতে বলল-“কাঁদিস না খোকা। তাড়াতাড়ি বড় হয়ে পড়।”
সে দিন সত্যিই যেন নিজের অজান্তেই অনেকটাই বড় হয়ে যাই। মায়ের সাথে নতুন এক সম্পর্কের অনুভূতি নিয়ে। মা কে অনেক জ্বালিয়েছি তার পরেও তবুও কোথাও একটা অন্য অনুভূতি জড়িয়ে আছে। মায়ের কোলের শান্তি, সান্ত্বনা আর নিশ্চিত নিরাপত্তা কোথাও তো পাইনি আর।

আজ মা আমাদের ছেড়ে গেছে এগার বছর হল। এমনি এক দোলের ভোরে অসীমের পথে পাড়ি দিয়ে দিয়েছে মা। আমরা পেছনে রয়ে গেছি। অনেকদিন পর ছোটবেলায় সেই মুহূর্তটা বারবার ভেসে উঠছে মনে। এইদিনেই বিশেষ করে ওই দিনটার কথা বেশি মনে পড়ে। মায়ের কথাগুলো মাথা ঢং ঢং করে বাজতে থাকে।

আমি মানুষের জীবনেই বিশ্বাস করি। যাবতীয় কিছু করণীয় ওই জীবৎকালেই। তাই মা বিদায় নেবার পরের বছরগুলো শুধুই মাকে মনে করেই কাটিয়েছি। আজ সেই বিদায়ী দিন। চোখ বন্ধ করলেই আজও শুনতে পাই- “হ্যাঁ- সবাই”।

১০ই মার্চ, ২০২০

এটা ১৯৭৪এ মামাবাড়ির বাগানে তোলা। আমি চার বছর বয়সে

আমরা চারভাই, দিদি আর বাবা মা।
১৯৭৮ এর বন্যার পরবর্তী বছরে দেশের বাড়িতে তোলা, ১৯৭৯ সালে।
আমি তখন পঞ্চম শ্রেণীর ছাত্র।

******

Sahityika Admin

Add comment