সাহিত্যিকা

প্ৰিয় মা,

প্ৰিয় মা,
© অঙ্কিতা মজুমদার, ২০০৯ ইলেকট্রনিকস ও টেলি কমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং

আজকাল কিসের জন্য অপেক্ষা করি কে জানে!
একটু আলো, নাকি খানিকটা দমকা হাওয়া,
ঠাহর করতে পারিনা।

কাল ফোন ঘাঁটতে ঘাঁটতে আমার অষ্টমঙ্গলার ছবি পেলাম।
আমার আর তোমার।
মেয়ের আর মায়ের।
মায়ের আর মেয়ের।
আমাদের আলো আলো মুখ।

আগেরবার বাড়ি গেলাম যখন,
তোমার একটা ডায়েরি পেয়েছি।
হিসাবের।
সেই কতকাল আগের।
কয় টাকা বেতন পেলে।
কাকে কত টাকা দিলে।
“অমুককে ১০০০ টাকা ধার দিলাম।”
আমার খুব জানতে ইচ্ছা করে সেসব ধার কখনো শোধ হয়েছে কিনা।
তুমি আমায় শিখিয়েছিলে কাউকে কিছু দিলে একেবারে দিয়ে দিচ্ছি ভেবেই নাকি দিতে হয়।
আমি খুব চেষ্টা করি।
তারপরেও তোমার মত পারি না।
ধার দিলে ফেরৎ পাওয়ার আশা রেখে ফেলি।
শর্ত ছাড়া কোনোকিছু দিয়ে দেওয়াটা এ জীবনে রপ্ত হবে না বোধহয়।

তোমার সবকিছু হয়তো লজিক্যাল নয়।
কতকিছুতে রাগ করেছি।
অথচ গোটা তুমিটা আমার কাছে স্বপ্নের মত।
একটা গোটা তুমির চাইতে বড় সত্যি যেন কিছু হয়না।
ভালোবাসি বলতে পারিনি তেমন করে, ছুঁয়ে থাকতে পারিনি, আজকাল একটু আফসোস হয় বইকি!
তবে তোমায় বকা দেওয়ার জন্য মোটেই আফসোস নেই।
সেই তুমি পুজোর সময় খেয়ে দেয়ে সিনেমা দেখতে গিয়ে পপকর্ন খেতে চাইলে,
আমি দিলাম না।
তাতে আমার মোটেই কোনো আফসোস নেই।
আফসোস তেমন কিছুরই নেই।
কেবল আরেকটু যদি সময় পেতাম…
কী করতাম জানিনা।

তারপরেও…
খানিকটা আলো আর খানিকটা হাওয়া
খানিকটা আদর, খানিক মায়া।
একটু সময় পেলে
আর কয়েকটা আলো আলো মুহুর্ত হত
মায়ের আর মেয়ের
মেয়ের আর মায়ের।

২৪ জানুয়ারি, ২০২৪
প্ৰিয় মা,
তোমার কথা বলতে গেলে হুড়মুড় করে সমস্ত কিছু চোখের উপর এসে পড়ে
গলার কাছে কী একটা আটকে থাকে।
আর বলা হয় না।
মানুষ বুঝে ফেলবে আমার চোখ ঝাপসা হয়ে আসছে।
আমি ঝাপসা চোখ নিয়ে কারো দিকে তাকাতে চাইনা।

বড্ড শীত পড়েছে।
সেই যে তুমি একটা গাবদা জ্যাকেট পরতে শীত পড়লেই কী যেন বলতে,
হ্যামিল্টন সাহেবের কোট।
এই শীতে বাবা তোমার হাতে বোনা সোয়েটার পরার কিছুদিন পর খেয়াল করল গলার কাছটা খুলে আসছে।
বেচারা যত্ন করে তুলে রেখেছে।
যাতে একেবারে না ছিঁড়ে যায়।
তোমার হাতের জিনিস!
আমি তো আর খুলে আসা উল বুনে দিতে জানিনা।
দেখ সুযোগ ছিল, শিখলাম না।
আসলে বুনে দেওয়ার কাজ তো তোমার।
সেদিন আলমারিতে তোমার বোনা জ্যাকেটটা দেখলাম।
আনতে গিয়েও আনলাম না।
বেশি পরলে খারাপ হয়ে যায় যদি।
তুলে রাখি।
যেন তোমার বোনা সোয়েটার আগলে রাখলেই তোমায় আগলে রাখা যাবে।

আমার প্রথম সরস্বতী পুজোর শাড়িটা মনে আছে?
তুমি কিনে এনেছিলে, ঘিয়ে গরদ লাল পাড়, জমিনে ছোট ছোট বরফি।
একদম অন্যরকম।
ক্লাস নাইনে কজন নতুন শাড়ি পরে বলত সরস্বতী পুজোয়!
তারপর সরস্বতী পুজো মানেই নতুন শাড়ি।
একটা কালো জামদানি এনেছিলে একবার।
জমিনে নানা রঙের কাজ করা।
সাথে রঙ মেলানো গয়না।
সেই শাড়িটা বহুদিন দেখিনা!
কাউকে দিয়ে দিয়েছ নিশ্চই।
আর কয়দিন পর আরেকটা সরস্বতী পুজো এসে যাবে।
এখন তো অনেক বড় হয়ে গেছি তাই আর বেড়ানোও নেই,
বন্ধুরাও।
বড় হতে হতে ছাদে মাথা ঠেকে যাচ্ছে।
ছুটি পাচ্ছিনা।
ঘর আগলাই,
কাজকম্ম, জীবন
থমকে দাঁড়ালেই তোমাকে দেখতে ইচ্ছা করে।
ইচ্ছা করে তোমার পুরোনো শাড়িতে নাক ডুবিয়ে বসে থাকি।
একটা জীবন কেটে যাক ঝড়ের মত।

২৪ অক্টোবর ২০২৩
প্ৰিয় মা…
এখানে পুজো আসার আগেই শীত এসে পড়ে।
গাছের পাতা ঝরা শুরু হয়ে যায়
আমার মত মন খারাপ করে ধুসর একটা দিন জানলার বাইরে থেকে তাকিয়ে থাকে।

আমি ভেবেছিলাম যেমনটা তুমি থাকলে হত, ঠিক তেমনটা বাঁচব।
পুজো আসার আগে রঙ মিলিয়ে শাড়ির ব্লাউজ কিনব।
পছন্দের লিপস্টিকের রঙ বাছতে দোকান উজাড় করে ফেলব।
নতুন জামার গন্ধে বিভোর হয়ে থাকব।
বিশ্বাস কর, ঠিক তাই তাই করছি।
কেবল পুজো আসছে না।

ছোটবেলায় কোন এক পুজোয় একটা রাণীরঙের জামা হয়েছিল।
হাতকাটা জামা, তাতে সাদা গোল গোল প্রিন্ট।
সেই জামা পরে ষষ্ঠীর বিকেলে খুব হুল্লোড় করেছিলাম।
আর কোথাও কিছু নেই
চোখ বুজলে কেবল ওই হাতকাটা ফ্রক পরা মেয়েটা সামনে এসে দাঁড়ায়।

আমি এখন আর গাঢ় রঙ পছন্দ করি না।
আমার আলমারি সাদা, কালো আর ধুসরে ভরে থাকে।
ঘুমের ভেতরে ঢাকের আওয়াজ ভেসে এলে আমি তোমার মত একটা সাদা শাড়ি গায়ে জড়িয়ে ছুটে যাই।
ঘুমের ঐপারে তুমি দাঁড়িয়ে থাকো।
ভারী অভিমান হয় আমার।
কত বছরের পুজোর জামা বাকি পড়ে আছে।
এভাবে চলে যেতে হয় বুঝি!

*******

Sahityika Admin

Add comment