জানলা
© সুব্রত প্রামাণিক, ১৯৮০ ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং
আগে আমার কাছে সেই একটাই জানলা ছিল, আমার দোতলার পড়ার ঘরে। বাড়িতে আরও অনেক ছিল কিন্তু ওটাই ছিল আমার প্রিয় জানলা। জানলার পাশেই ছিল আমার পড়ার টেবিল, আর তার পাশেই একটা খাট। চোখ মেললেই জানলা দিয়ে অনেকটা দুর পর্যন্ত দেখা যেত। বাইরে চোখ গেলেই দেখতাম সবুজ গাছের সারি, বেশির ভাগই ছিল বিভিন্ন লোকের বাড়িতে লাগানো আম, জাম, কাঁঠাল, ডাব, কলা বা বেশ কিছু নাম না জানা গাছ। সামনের দিকে দূরে এক বিশাল বট গাছ আর একটু ডানদিকে ছিল বিরাট কদম গাছ। মাঝে মাঝে সন্ধ্যার সময় জায়গাটা কদমফুলের গন্ধে মাতোয়ারা হয়ে যেত। সন্ধ্যে হলেই ওই গাছগুলো সব পাখির কলরবে ভরে যেত, আর একটু রাত বাড়লে সব নিশ্চুপ। আবার সকাল হলেই বিভিন্ন পাখির ডাকেই আমার ঘুম ভাঙত।
জানলার বাইরে ওই পাখিগুলোর জন্য রোজ দানা আর জল রেখে দিতাম। চড়াই, শালিক, টুনটুনি, দোয়েল এসে খুব হইচই করে রোজ যখন খেত সেই দানা খাওয়া দেখে আমার খুবই মজা লাগত। বুঝতাম ওরা নিজেদের মধ্যে খুব কথা বলছে – ওদের ভাষা বুঝতাম না কিছুই, কিন্তু ওদের অভিব্যক্তি দেখেই মনটা ভরে যেত। আমায় ওরা একদমই ভয় পেত না। কখনও দানা হাতে রেখে, বা বাইরে হাত বাড়িয়ে দিলে আমার হাত থেকেও ওরা নিয়ে খেত, আবার কেউ কেউ সাহস করে হাতে এসে বসত। আবার কোনও দিন দানা রাখতে ভুলে গেলে, জানলার গ্রীলটাতে বসে আমার দিকে জিজ্ঞাসু চোখে তাকিয়ে কি সব বলত। সেদিন নিজেকে কেমন যেন অপরাধী মনে হত। আবার দানা এনে রাখলে সব শান্তি।
রাস্তার ওপরে, বাড়ির উল্টোদিকেই একটা কুমোরপাড়া ছিল। শুনেছি, আমাদের বাড়িটা যে জমিতে তৈরি হয়েছে, সেটা নাকি ওদেরই ছিল। আমার কাকারা ওই জমি কিনে বাড়ি করেছিলেন। দেখতাম বনবন করে চাকতি ঘুরছে আর কি সুন্দর সুন্দর মাটির খুরি, কলসি, বাটি একের পর এক তৈরি করত ওই আমারই বয়সী কুমোরের ছেলেটা, নাম ছিল প্রদীপ। নতুন তৈরি হওয়া জিনিস একটা তক্তার ওপর সারি সারি করে সাজিয়ে রাখত। সেই তক্তা ভরে গেলে সেটা রোদে রেখে এসে আরেকটা তক্তা নিয়ে বসত। কোনোদিকেই তাকাতো না, একমনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ওই করে যেত। বাড়িতে আমার তুতো ভাইবোনেরা এলে ওদের নিয়ে কুমোরপাড়া গিয়ে কতক্ষন যে বসে বসে ওদের কাজ দেখতাম। প্রদীপ মাঝে মাঝে আমাদেরও দিত খুড়ি বানাতে। একটা ঠিকমত করতে পারলে কি আনন্দটাই না হত।
আরেকটু দূরে চোখ গেলে দেখতাম বংশীর খাটাল। ওরা বিহারের লোক, বহুযুগ আগে বাংলায় এসে স্থিতু হয়েছে। ওঁদের অনেক গরু, মোষ ছিল। সকালবেলায় লাইন করে লোক দাঁড়িয়ে দুধ নেওয়ার জন্য, আর বংশীর ছেলে দিবা একমনে, একের পর গরু মোষের দুধ দুইছে আর বালতি ভরে গেলে বংশীর দিকে এগিয়ে দিচ্ছে। বংশী মেপে মেপে সবাইকে দুধ বেচছে। আমার ঠাকুরমা ওই দুধ আনার কাজ করতেন। কোনওদিন উনি না যেতে পারলে আমিই যেতাম। দিবার কাছ থেকে বোঝার চেষ্টা করতাম, কি ভাবে গরু মোষের লাথি না খেয়ে ও নির্বিবাদে দুধ দুয়ে চলেছে। আমায় বলত, তুইও কর না, ওরা শান্ত কিছু বলবে না। সাহসে কুলোয়নি, আর দিবা আমার ভয় দেখে হা হা করে হেসে উঠত।
ট্রেনের হুইসেল শুনলেই চোখটা চলে যেত আরও দূরে, উঁচু রেললাইনের দিকে – দেখতাম একটা ট্রেন বেশ গতিতে কলকাতার দিকে চলে যাচ্ছে। ট্রেন দেখলেই মনে কেমন যেন একটা আনন্দ হত, আজও হয়। প্রথম দিকে স্টীম ইঞ্জিন ধোঁয়া উড়িয়ে যেত, তার চলার একটা তাল ছিল। খড়গপুর স্টেশন ওই জায়গাটা থেকে প্রায় ১কিমি দুরত্বে ছিল। ছাড়ার পর স্টীম ইঞ্জিনটা বেশ একটা তালে তালে আওয়াজ করে এগিয়ে আসত, দারুন লাগতো ওই আওয়াজটা। তারপর ট্রেনটা যখন সামনে দিয়ে যেত পরিষ্কার দেখতাম যাত্রীদের – কেউ দরজায় দাড়িয়ে, কেউ জানলা দিয়ে চলে যাওয়া অপসৃয়মান দৃশ্য উপভোগ করছে। পরের দিকে যখন ইলেকট্রিক আর ডিজেল ইঞ্জিন এল সেই আওয়াজটা আর পেতাম না, ট্রেনটা হুশ করে সামনে দিয়ে চলে যেত। ট্রেনের সময়গুলো সব মুখস্থ হয়ে গিয়েছিল, বিশেষ করে সকাল আর সন্ধ্যের গুলো। সকাল ৪:৩০ তে মাদ্রাস মেল, তারপর ৫টা নাগাদ বোম্বে মেল, ৬:৩০টায় জগন্নাথ এক্সপ্রেস, ৭:৪৫ স্টিল এক্সপ্রেস…..। মাদ্রাস মেল এত ঠিক সময়ে যেত রোজ যে ওটার আওয়াজ শুনে ঘড়ি মেলাতে পারতাম।
আমাদের ওখানে গ্রীষ্মকালে ঘুড়ি ওড়ানো হত, একটু বেলার দিকে আর বিকেলে জানলা দিয়ে আকাশের দিকে চোখ গেলেই লাল, নীল ঘুড়ি চোখে পড়ত। মনটাও ঘুড়ির সাথে উড়ে যেত বইয়ের পাতা থেকে। বই বন্ধ করে ঘুড়ি লাটাই নিয়ে ছুটতাম ছাদে।
আর বর্ষাকালে, যেদিন মাঠে খেলা থাকতো না, ওই জানলা দিয়েই দেখতাম সেই বৃষ্টির রূপ। গাছপালা সব ভিজে টপ টপ করে জল পড়ছে, পাখিগুলো কাকভেজা হয়ে মাথা নিচু করে চুপ করে বসে ভিজে যাচ্ছে। ট্রেনগুলো চলে যেত জানলা বন্ধ করে। দিবা গরু মোষ গুলো খাটালে ঢোকানোর জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়ত। আর প্রদীপ সদ্য গড়ানো কাঁচা মাটির খুড়ি কলসির তক্তাগুলো তুলে নিয়ে গিয়ে ঢাকা জায়গায় রাখত।
ওই জানলাটাই ছিল আমার জন্য বিরাট এক জগৎ, পড়তে পড়তে সেই জগৎটা দেখেই আনন্দ পেতাম, আনমনা হয়ে যেতাম। তারপর মশার কামড়ে সম্বিত ফিরে পেয়ে আবার খানিক পড়তাম।
সেই জানলা কবে যেন ধীরে ধীরে হারিয়ে ফেললাম। হারিয়ে যাওয়ার শুরুটা মনে হয় ক্লাস ১০ থেকে। সকাল, সন্ধ্যে স্কুল, টিউশন, হোমওয়ার্ক; বোর্ড পরীক্ষা, জয়েন্টের পরীক্ষার তোড়জোড়ের মধ্যে ওই জানলা দিয়ে পৃথিবীটাকে আর দেখাই হত না। তারপর কলেজ, চাকরির মধ্যে ওই জানলা যেন মুছেই গেল মন থেকে। মাঝে মাঝে ছুটিতে বাড়ি গেলে সেই টেবিলে বসতাম কিন্তু সেই একই দৃশ্য আমাকে আর সেভাবে আলোড়িত করত না। পাখিগুলো আর আসত না। আমার জগৎ তখন ওই জানলার বাইরে এতটাই বেড়ে গিয়েছিল হয়ত; আমি ওই জানলা থেকে দূরে চলে গিয়েছিলাম বলে ওই জানলার আনন্দ আমাকে ত্যাগ করেছিল।
আজ আমার কাছে অনেক জানলা। মাইক্রোসফটের জানলা, মোবাইলের জানলা – সারা পৃথিবী আমি দেখি ওই জানলা দিয়ে। কিন্তু কোথায় সেই মনমাতানো গন্ধ, কোথায় সেই মিষ্টি শব্দ, কোথায় সেই জিজ্ঞাসু চোখ, কোথায় সেই পাখিদের আনন্দ ধ্বনি?
আগের পৃথিবীটা অনেক ছোট্ট ছিল, কিন্তু হাত বাড়ালেই ধরতে পারতাম, ছুঁতে পড়তাম, প্রকৃতিকে শুনতে পারতাম – আজ শুধুই দেখা, ধরা ছোঁয়ার বাইরে। সেই পুরোনো জানলাটা যদি আবার একটিবারের জন্য ফিরে পেতাম!!!

********






Add comment