ক্রিকেট বল এবং মেশিন
নারায়ন প্রসাদ মুখোপাধ্যায়, ১৯৬৭ মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং
ক্রিকেট নিজে খেলা, খেলা দেখা বা কমেন্ট্রি শোনা বরাবরই আনন্দদায়ক ছিল।
কিন্তু চাকরি জীবনে এই ক্রিকেট আমাকে দু-দুবার challenge এবং অস্বস্তির এর মুখে ফেলেছিল। ক্রিকেট বলের দুটো প্রোজেক্ট আমাকে বেশ ভাবিয়ে তুলেছিল।
সময়টা ১৯৯৪ – ৯৫ সাল। আমাদের অফিসের নতুন ডিরেক্টর আমাকে ওনার চেম্বারে ডেকে বললেন – Dr. Mukherjee there is a need of a machine for making stitches on a cricket ball. Look at this letter from the Ministry of Sports. This is to help the artisans of our country. এই কথা বলে তিনি একটা চিঠি আমার দিকে এগিয়ে দিলেন। চিঠি টা এক নিশ্বাসে পড়ে ফেললাম । এইটুকু বুঝলাম বর্তমানে আর্টিসানরা হাতে সেলাই করে। সেটা মেশিনের সাহায্যে করতে হবে। তার ফলে বলের প্রোডাকশন এবং গুনমান বাড়বে। ঠিক হলো ডিরেক্টার সাহেবের সঙ্গে পরশুর ফ্লাইট এ দিল্লী যাবো । মিনিস্ট্রি থেকে একজন আমাদের সঙ্গে থাকবেন। তারপর আমরা সকলে দিল্লী থেকে বাই কার মীরাট যাবো । ওখানে দুটো তিনটে সংস্থা ভিজিট করবো । আর্টিসানদের সঙ্গে কথা বলবো এবং দেখব কি রকম মেশিন হলে ওরা উপকৃত হবে।
দিল্লী থেকে মীরাট যাওয়ার পথে অনেক কথা হচ্ছিল। মিনিস্ট্রির ভদ্রলোকের নাম মিস্টার সুরিন্দর সিং । দিল্লি থেকে মীরাট প্রায় আড়াই তিন ঘন্টার পথ। মিস্টার সিং আমাদের বোঝাচ্ছিলেন বর্তমানে স্কিল্ড আর্টিসানদের সংখ্যা কমে যাচ্ছে। সেই জন্য লো কস্ট অটোমেশন হলে ভালো হয়। একমাত্র অস্ট্রেলিয়াতে ক্রিকেট বল মেশিনে সেলাই করা হয়। এই মেশিনে সেলাই করা বলের নাম কুকাবুরা বল। এই বলের ওপর ছয় টা সেলাই থাকে। তার মধ্যে বলের দুটো অর্ধে দুটো প্রান্তিক সেলাই মেশিনে করা হয়। বোলার এই সেলাই কাজে লাগায় বলকে ঠিক মতো ধরা বা গ্রিপ করার জন্য। এই ভাবেই সে বলকে ইচ্ছা মতো সুইং অথবা টার্ন করতে সক্ষম হয়। বলের মাঝ খানের দুটো সেলাই অবশ্য হাতে তৈরি এবং অর্ধ গোলাকার দুটো চামড়ার আচ্ছাদন কে তাদের মধ্যেখানে অবস্থিত কোর সমেত জুড়ে দেওয়ার কাজ করে। হাতে সেলাই এর কাজে ধৈর্য এবং দক্ষতা দরকার। তাছাড়া প্রচুর সময় সাপেক্ষ।
ক্রিকেট বল তৈরি হয় মূলতঃ গরুর চামড়া থেকে। বলের মূল অংশ (কোর) কর্ক দিয়ে তৈরি। তারপরে সেই কর্কটিকে আরও শক্তিশালী করার জন্য দড়ি দিয়ে বেশ কয়েকবার আবদ্ধ করা হয় । কর্ক ও দড়ির গোলাকার সমষ্টি পরে দুই অর্ধ গোলাকৃতি চামড়ার কাপের মধ্যে আবদ্ধ করা হয়। আর চামড়ার কাপ সিন্গল পিস মোল্ড বা দুটো পিস কাটিং এবং সেলাই করে বানানো হয় ।
মীরাট থেকে ফিরে এসে আমরা ডিজাইনের কাজে মন দিলাম। ঠিক হলো কুকাবুরা বলের মতো আমাদের মেশিনেও সেলাই হবে। আন্তর্জাতিক স্টান্ডার্ড অনুযায়ী বলের দুই প্রান্তের সেলাই এর দুটো লাইনের মধ্যে তিন মিলি মিটারের দূরত্ব। দুটো নিডল কে বলের পরিধিতে ঐ অফসেট পোজিসনে রেখে একসাথে দুটো লাইন সেলাই করা যাবে। নিডলের আপ ডাউন মুভমেন্ট, লুপারের সাথে নিডলের সমন্বয়ে সুতোর ফাঁস তৈরি করে চেইন স্টিচ তৈরি করা এবং লেদার কাপের ইনক্রিমেন্টাল এনগুলার পোজিসনাল মুভমেন্ট – এই সবগুলো ব্যাপার সিনক্রোনাইস করে প্রয়োজনীয় সংখ্যক সেলাই করতে হবে। স্টেপার মোটর, মাইক্রোকন্ট্রোলার এবং এনকোডারের সাহায্যে মেশিনে উন্নত মানের চেইন স্টিচ বানানো সম্ভব। এই ভাবনার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই মেশিন ডিজাইন করা হলো।
প্রোটোটাইপ টেস্ট করে দেখা গেলো হাতে সেলাই করতে যেখানে ৩০ – ৪০ মিনিট সময় লাগছিল সেখানে মেশিনে মাত্র তিন মিনিট সময়েই একটা বলের সেলাই সম্পন্ন হয়ে যায়। তবে একটা সমস্যা ছিলো। ২০ – ২৫ টা বল সেলাই করার পরেই সুতো ছিঁড়ে যাচ্ছিল। মীরাট এবং লুধিয়ানা থেকে কয়েক জন আর্টিসান কে ডেকে মেশিনের ডেমো দেওয়া হলো। এই মেশিনের ডিজাইন সত্ত্ব লুধিয়ানা র একটি পার্টিকে বিক্রি করা হয়েছিল। সে আজ পঁচিশ বছর আগের কথা। আমার অবশ্য জানা নেই এই মেশিনের চেয়ে আরও উন্নত মেশিনের ব্যবহার বর্তমানে আমাদের দেশে হচ্ছে কিনা।
এক বছর বাদেই ক্রিকেট বল নিয়ে আরও একটি প্রোজেক্ট আমার দায়িত্বে এসে পড়েছিল। সেটি হলো বোলিং মেশিন। NRDC র চেয়ারম্যান ক্রিকেট বল স্টিচিং মেশিন দেখতে এসে বোলিং মেশিন ডেভেলপ করার কথা বললেন। কম খরচায় তৈরি করা যাবে এবং স্কুল কলেজ এবং পাড়ার প্রতিটি ক্লাবে ব্যবহার করা যাবে। এই ব্যাপারে আমি এবং আমার এক কলিগ মোহনবাগানের প্লেয়ার অরুণ লালের সঙ্গে দেখা করলাম। শুনেছিলাম ওনাদের একাডেমী তে একটা মেশিন আছে। কিন্তু উনি বললেন মেশিনটি বর্তমানে খারাপ আছে । তবে তার অপারেশন আমাদের বুঝিয়ে দিলেন। বললেন এই মেশিনে ভ্যারাইটি বল করা যায় না। পরামর্শ দিলেন আমাদের মেশিনটি যেন ফাস্ট, সুইং, স্লো, স্পিন ইত্যাদি বিভিন্ন ধরনের বোলিং এর উপযুক্ত হয়। তাহলে এই মেশিনে প্রাক্টিস করে কেউ নিজেকে ভালো ব্যাটস্ম্যান তৈরি করতে পারবে।
অফিসে ফিরে এসে আমরা ডিজাইনের কাজ শুরু করে দিলাম। দু তিনটে কনসেপচুয়াল ডিজাইন নিয়ে আলোচনা হলো। শেষ পর্য্যন্ত একটা আইডিয়া নিয়ে আমরা সহমত হলাম। সেটা এই রকম – দুটো রোটেটিং হুইল পাশাপাশি থাকবে। তারা পরস্পর বিপরীত দিকে ঘুরবে। ভ্যারিয়েবল স্পীড মোটরের সাহায্যে তাদের ঘোরানো হবে। দুটো চাকার মাঝখানে গ্যাপ থাকবে তার মাপ ক্রিকেট বলের ডায়ামেটারের চেয়ে সামান্য কম হবে। রোটেটিং হুইলের সারকামফারেন্সে হার্ড রাবারের ব্যান্ড শক্ত ভাবে আটকানো থাকবে। ক্রিকেট বল একটি ইনক্লাইন্ড গাইডের মাধ্যমে দুটো রোটেটিং হুইলের মাঝখানের গ্যাপে এসে পড়লে ফ্রিকসনে ব্যাটস্ম্যানের ব্যাটের দিকে ছুটে যাবে। হুইলের স্পীড এবং ওরিয়েন্টেশন চেন্জ করে বিভিন্ন ধরনের বোলিং করা যেতে পারে। প্রোটোটাইপ তৈরি হলো। পারফরম্যান্স দেখে আমরা খুশি। কিন্তু রোটেটিং হুইলের রাবারের দ্রুত ক্ষয় চিন্তার ব্যাপার হয়ে দাঁড়াল। ঠিক হলো রাবারের হার্ডনেস অনেক টা বাড়ানো দরকার।
ইতিমধ্যে হাওড়ার একটি ফার্ম আমাদের কাছ থেকে ডিজাইন সত্ত্ব কিনে নিল। কয়েক মাস বাদে হায়দরাবাদ থেকে দুজন ইঞ্জিনিয়ার প্রোটোটাইপ দেখতে এলো এবং ছবি তুলে নিয়ে গেল। এক বছর বাদে পেপারে একটি এ্যাড দেখলাম হায়দরাবাদ এর একটি কোম্পানি ক্রিকেট বোলিং মেশিন বিক্রি করছে। এই মেশিনের ছবি ও স্পেসিফিকেশন অনেকটাই আমাদের মেশিনের মতো।
যাইহোক বুঝলাম আমাদের অনেক দেরী হয়ে গেছে।






Add comment