দু’টি লেখা – নিসার, উইম্বলডন চ্যাম্পিয়ন ইলিনা রিবাকিনা
শান্তনু দে, মেটালার্জিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং
নিসার
পার্থে ইন্ডিয়া-অস্ট্রেলিয়ার সিরিজ ওপেনার। ভারতের ক্যাপ্টেন নির্ভীক গুপ্তা টিম লিস্টে বিশাল চমক দিয়েছেন। তিন তিন জন একসাথে ডেবিউ করছে…মহারাষ্ট্রের ওপেনার শুদ্ধশীল কারমার্কার ,কাশ্মীরের উইকেটকিপার আবু ফজল আর বাংলার কে একটা ছেলে।
সেই ছিয়ানব্বইয়ের সিরিজে সৌরভ,দ্রাবিড় আর ভেঙ্কটেশ প্রসাদের পর বোধ হয় প্রথম বার। শুদ্ধশীল আর আবু প্রায় বছর দু’য়েক ভারতীয় দলের দরজায় কড়া নাড়ছে। নির্বাচন প্রত্যাশিতই ছিল। কিন্তু এই ছেলেটা …অস্ট্রেলিয়া তো দূরের কথা, ভারতেই কেউ নাম পর্যন্ত শোনেনি। প্রেসবক্সে ,টিভিতে জোর বিতর্ক, মাত্র সাতটা ফার্স্ট ক্লাস ম্যাচ খেলে টিমে চান্স পাওয়া ,ফাস্ট বোলারকে নিয়ে।
লাঞ্চের বিরতি। সারা মাঠে পিন ড্রপ সাইলেন্স। শুধু এক কোনায় কিছু ভারতীয় সমর্থক পতাকা নেড়ে চেঁচাচ্ছে …নিসার, নিসার, নিসার। অস্ট্রেলিয়া, থার্টি সেভেন ফর সেভেন। ভারতের নতুন ফাস্ট বোলার মোহাম্মদ নিসার বারো রানে সাত উইকেট।
কর্নার রুমের দক্ষিণের দেওয়ালটা কাঁচের। ভারী পর্দাটা সরিয়ে দিলে দূরে দূরে কারখানার চিমনি ,ধোঁয়া, কিছু বন্ধ কারখানার পচাগলা শব। মাঝখানে বিনোদিনী উচ্চ-মাধ্যমিক বিদ্যালয় …একটা বেশ বড় স্কুল আর স্কুলের মাঠ। অধিকাংশ পড়ুয়া আশপাশের চালু বা বন্ধ কারখানার শ্রমিকের ছেলে। যদিও স্কুলের রেজাল্ট বা ঢোকার মুখে টানানো বড় কাঠের বোর্ডে জীবন যুদ্ধে সফল প্রাক্তনীদের তালিকা দেখে বোঝার উপায় নেই যে ,অধিকাংশ ছাত্রের স্কুলে আসার একমাত্র মোটিভেশন মিড-ডে মিল।
অতীন পর্দাটা সরিয়ে বাইরের দিকে তাকালো। বর্ষার শেষ,শরতের রোদে এখনো সে রকম রং ধরেনি।এদিক -ওদিক কিছু কিছু কাশ ফুল উঁকি মারছে…দিন পনের পরেই চার দিক ছেয়ে যাবে। স্কুলের মাঠে, কিছু ছেলে টেনিস বল দিয়ে ক্রিকেট খেলছে। শুদ্ধ, নির্মল আনন্দ। একটা বেশ মোটাসোটা, বয়সের তুলনায় অনেক বড়সড় চেহারার ছেলে বল করছে, মাত্র পাঁচ-ছটা স্টেপ নিয়ে।
প্রথম বলটা ইয়র্কার …হাওয়াই চপ্পল পরা ব্যাটসম্যান বাচ্চাটার একদম গোড়ালিতে। মাটিতে পড়ে বাচ্চাটা ছটফট করছে। কয়েক মিনিট পর, দু’জনের কাঁধে ভর দিয়ে ছেলেটা বেরিয়ে গেল। পরের বলটা গুড লেংথ স্পট থেকে লাফিয়ে উইকেটকিপারের মাথার উপর দিয়ে একদম বাউন্ডারি লাইনের বাইরে। হালকা আওয়াজ উঠলো, “এই গামবাট ,আস্তে।” পরের বল একটু স্লো ডেলিভারি, প্রায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই ছেলেটা বল করলো। অফস্ট্যাম্পটা তিন চারটে পাক খেয়ে উইকেইকিপারের দিকে যাচ্ছিল। অন্যদিকে ডাইভ দিয়ে কোন ক্রমে বাঁচলো। হঠাৎ অতীনের খেয়াল হলো, তিনটে বলের একটাও সে নিজেই দেখতে পায় নি। জানলা থেকে পিচের এঙ্গেলটা এরকম, ঠিক স্লিপ বরাবর, ভিজিবিলিটি সব থেকে ভালো হয় উচিত। ঘরের দরজা লক করে অতীন নেমে এলো।
শহরতলীর স্কুল। নর্থ স্টার স্কুল ক্রিকেট কম্পিটিশনের ট্রায়াল হচ্ছে। ক্লাস নাইনের অতীন গুটিগুটি পায়ে ম্যাটের কাছে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। যদিও ক্রিকেট বলে কোনদিন সে খেলেনি, তবুও এই বয়সেই টেনিস বলের ক্রিকেটে সে পাড়ার এক নামজাদা প্লেয়ার। পিটি স্যারকে সে নিজেও ট্রায়াল দিতে চায় বলাতে একদম শেষের দিকে সুযোগ মিললো।
বল করছে,ক্লাস ইলেভেনের উদ্দালক। এই বয়সেই বড়িশা স্পোর্টিং এর হয়ে সেকেন্ড ডিভিশনে খেলে। প্রথম তিনটে বলই অফ স্ট্যাম্পের বাইরে, হালকা আউট সুইঙ্গার। তিনটেই গালি থেকে কাভারের মধ্যের বিভিন্ন কোন দিয়ে কাল্পনিক বাউন্ডারির দিকে। মাত্র এক ওভার ব্যাট করেই অতীন স্কুল টিমে। টীমকে একার দ্বায়িত্বে নর্থ স্টার ক্রিকেটের সেমি ফাইনালে তোলার পর থেকেই অতীনের উত্থান। পি সেন ট্রফিতে অতীনের বাইশ বলে বাহাত্তর এখনও ময়দানের এখানে ওখানে কান পাতলে শোনা যায় …কখনো কোনো ময়দানী ক্যান্টিনে প্রত্যক্ষদর্শী কোনো বৃদ্ধের স্টু খেতে খেতে স্মৃতিচারণায়, বা কোনো পাঁচতারা হোটেলের রেস্তোরাঁয়। বাহাত্তর রানের প্রত্যেকটাই নাকি এসেছিল বাউন্ডারিতে …সবকটাই গালি থেকে কাভারের মধ্যে। শোনা যায় স্বয়ং সৌরভ নাকি অতীনকেই অফ সাইডের আসল ভগবান মানে।
ছেলেটা আর বল করার সুযোগ পেলো না। ঘন্টা খানেক পরে খেলা শেষ হলে ,অতীন গিয়ে আলাপ জমায়।
– নাম কী তোমার ?
-মোহাম্মদ নিসার।
– নিসার!!
– হ্যাঁ, বাবা ক্রিকেট খেলতেন স্পোর্টিং ইউনিয়নে ,ফাস্ট বোলার।
– নাম কি?
– মহম্মদ হাফিজ।
-বাড়িতে আর কে আছে?
-মা। পাটকলে কাজ করে।
– আর বাবা?
– প্র্যাকটিস করে ফেরার সময় ট্রেনে কাটা পড়ে। আমি তখনও হই নি।
পাটকলের পাশে নিসারের ঝুপড়িতে দেওয়াল জুড়ে অসংখ্য ফাস্ট বোলারের ছবি। সবই পেপার কাটিং, হলুদ হয়ে গেছে … লিলি, টমসন, প্যাসকো, ট্রুম্যান, লিন্ডওয়াল, আরো অনেকগুলো চিনতে পারলো না।
নিসারের মায়ের কাছে ছেলের দ্বায়িত্ব পেতে বেশি অসুবিধে হল না।এখন দরকার একজন কোচ।
অতীনের উত্থানের মতই পতনও খুব দ্রুত। নব্বই দশকের গোড়ার দিকে বাংলা টিমের ব্যাটিং লাইন আপ অরুণ লাল, অশোক মালহোত্রা, শ্রীকান্ত কল্যাণী, স্নেহাশিষ, উঠতি সৌরভ। দু বছর টিমের সাথে ঘুরে ঘুরে মাত্র একটা ম্যাচ খেলেছিল। ত্রিপুরার সাথে সাত নম্বরে নেমেছিল …চৌতিরিশ নট আউট। এর মধ্যেই বি ই কলেজে চান্স পেয়ে পড়াশোনা আর ক্রিকেট এক সঙ্গে চালাতে না পেরে, নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের চাপে খেলায় ইতি। অবশ্য সেই নিয়ে অতীনের কোনো খেদ নেই …নিজের সফল কারখানা, গান, কুইজ, একাডেমিতে নাটক …এই সব নিয়েই বেশ সুখে আছে। ক্রিকেট নিয়ে সে রকম কোনো উৎসাহ নেই।
খালাসিটোলার চুল্লুর ঠেকে পেল না। অনেক ঘুরেঘুরে শেষমেশ এককালের নাম করা ফাস্ট বোলার অরুণ বর্মনকে পাওয়া গেল, উত্তর কলকাতার এক ছোট্ট বারে। দুপুরবেলায় কোয়ার্টার জিন আর লাইম কর্ডিয়াল নিয়ে বসে আছে। কে বলবে, এই অরুণ বর্মন চোট না পেলে, ৭৭-এ কপিলের জায়গায় ওরই খেলার কথা ছিল।
– গুরু, মোহাম্মদ হাফিজ কে চেনো?
– চিনবো না! ময়দানে অত জোরে কাউকে আর বল করতে দেখি নি। বেচারা, বেঘোরে মারা গেলো। বেঁচে থাকলে,ওই হত ভারতের প্রথম ফাস্ট বোলার। উতুপুতু মিডিয়াম পেস নয়,সত্যিকারের ফাস্ট বোলার।
– ওর ছেলেকে খুঁজে পেয়েছি। পনেরো বছর বয়েস।কিন্তু এই বয়সেই একশো চল্লিশে বল করে। নাম মোহাম্মদ নিসার।
…… অখন্ড নীরবতা।
– চল, দেখে আসি তোর নিসারকে।
********
উইম্বলডন চ্যাম্পিয়ন ইলিনা রিবাকিনা

পড়াশোনার ইচ্ছে আছে,কিন্তু রেজাল্ট ঠিক ভালো হচ্ছে না। বাবা বললেন “পড়াশোনা অনেক হয়েছে আর নয়, এবার চাকরি বাকরি দেখো।
ছেলে : “নাহ ,আমি আরো পড়বো।”
বাবা বাড়ি থেকে বের করে দিলেন।
অনেকটা দেয়া নেয়া সিনেমায় কমল মিত্র উত্তম কুমারের সাথে যা করেছিলেন, অনেকটা সেরকমই ব্যবহার ছিলো এবারের উইম্বলডন চ্যাম্পিয়ন ইলিনা রিবাকিনার সাথে রাশিয়ান টেনিস ফেডারেশনের। বছর পাঁচেক আগে ইলিনাকে বলে দিয়েছিলেন, খেলতে হলে খেলো কিন্তু তার ব্যয়ভার আমরা আর নিতে পারবো না।
ঠিক এই সময়েই কাজাখ বিলিওনেয়ার বুলাট উটেমুরেটভ কাজখস্তানে টেনিস জনপ্রিয় করার জন্য অন্য দেশের প্রমিসিং কিন্তু পাত্তা না পাওয়া (বেশির ভাগ রাশিয়ান) প্লেয়ারদের কাজাখস্তানের নাগরিক করে নিয়ে আসছিলেন। অনেকটাই কাতার মডেল অনুসরণ করে। ইলিনা রিবাকিনা তাদেরই মধ্যে একজন। পাড়ার বখাটে ছেলে, যার মাধ্যমিকে পাশ করার আশা ছিল না, সে স্টার পেলে যে রকম ব্যাপারটা কী হলো বুঝতেই অনেকটা সময় কেটে যায়।
জেতার পরে ইলিনার হাবভাবে অনেকটা সেরকমই ব্যাপার দেখলাম। না কোর্টে চুমু খাওয়া, না শুয়ে পড়া, না লাফ-ঝাঁপ। জিতে নির্লিপ্ত মুখে ঘাম টাম মুছে ব্যাগ গোছাতে শুরু করলেন। মিনিট পাঁচেক পরে মুখে একটু হাসি ফুটলো। একমাত্র সেলিব্রেশন দেখলাম, বেশ কিছুক্ষণ পরে ধীরে সুস্থে গ্যালারিতে উঠে গিয়ে, অনেকটা প্যাট ক্যাশের মতো কোচ, বোন এদের সাথে দেখা করে এলেন।
ভেনাস রোজওয়াটার ট্রফি হাতেও সেই একই রকম নির্লিপ্ততা কী মেয়েরে বাবা! দেখা যাক আজকের ম্যাচে কী হয়। জোকার জেতে না, আন্ডারডগ নিক কিরিওস? নিক জিতলেই খুশি হবো। রাফা জোকোভিচ, ফেডেরার এদের দেখতে দেখতে চোখ পচে গেছে।
নতুন কেউ আসুক।
Overpower. Overtake. Overcome – Serena Williams






Add comment