ডাইরীর ছেঁড়া পাতা
ময়ূখ দত্ত, ১৯৯০ সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং
ছোটোবেলায় আমরা সবাই কিছু কিছু খেলা খেলতাম, যেগুলো পরবর্তীকালে বড় হয়ে আর কাউকে খেলতে শুনি না, বা দেখি নি। যেমন কুমীরডাঙা, চু কিত কিত, বাঘবন্দী, ষোল ঘুঁটি…আরো কত..ছোটোবেলায় প্রায় সব খেলাই আমরা পাড়ার ছেলে-মেয়ে, সবাই একসংগে খেলতাম, মারপিট, ঝগড়াঝাটি সবই হত….
এই খেলা গুলোর মধ্যে যে মজা আছে, যে উত্তেজনা আছে, সেটা আমাদের পরিচিত ফুটবল, ক্রিকেট, বাস্কেটবল ইত্যাদির থেকে খুব আলাদা হয়ত নয়, তবু বড় হওয়ার সাথে সাথে ওই খেলাগুলো কেমন যেন কোথায় হারিয়ে যায়… বন্ধুবৃত্ত থেকে ক্রমশঃ সরে যায় একটা সময়ে পাড়ায় একসাথে খেলতে থাকা সন্ধ্যা, লতা, বুলটি, মানসী, শ্যামলীরা… শৈশবের সাথেই হারিয়ে যায় ছেলে, মেয়ে নির্বিশেষে মজা করে একইসাথে খেলার আনন্দ!!
বড় হয়ে এমন কোনো খেলা দেখতে পাই না যা ছেলে-মেয়েরা একসংগে খেলে….সরল, সাদাসিধে খেলার সাথে কিছুটা জটিল নিয়মের প্রথাগত খেলার তো পার্থক্য থাকবেই, তবু আমার মনে হয় যে বড় হওয়ার সাথে সাথে বিভিন্নভাবে আমাদের মনের গভীরে যে লিংগবৈষম্যের বীজ ঢুকে যায় নিজেদের অজান্তেই, সেটা একটা বড় কারন…..
আজকের দিনে জীবনের প্রতিটা ক্ষেত্রে ছেলে-মেয়েরা যখন একইভাবে যে কোনো সমস্যার সমাধান করে, সংসারে স্বামী-স্ত্রী দুজনে যখন ঘরে-বাইরে সব কাজ মিলেমিশে সামলায়, অফিসে ছেলেরা-মেয়েরা যখন একই মিটিং রুমে বসে কালেক্টিভ ডিসিশান নেয় একই টিমের কর্মী হিসেবে, সেখানে আমরা অনেকেই হয়ত ভেবে দেখি না যে কেন ছোটোবেলায় সেই লুকোচুরী খেলার মত আমরাও ছেলে-মেয়েরা বড় হয়ে একই টিমে একইভাবে ফুটবল খেলতে পারবো না? কেন কল্পনাতেও আসে না যে রবিচন্দ্রন অশ্বিনের বলে ঝুলন গোস্বামী বা মিতালীরাজ ছয় মেরে টিম কে জেতাচ্ছে!! সমাজের প্রতিটা ক্ষেত্রে আজকাল আমরা gender equality, inclusive atmosphere এর কথা বলি, তাহলে ছেলেদের ফুটবল আর মেয়েদের ফুটবল আলাদা হবে কেন?
জানি, এক্ষুনি অনেকেই হয়ত শারীরিক ক্ষমতার তফাত ইত্যাদি অনেক প্রসংগ টেনে আনবেন…. আচ্ছা এই শারীরিক তফাতগুলোকে জয় করেই তো আমাদের সমাজ এগোচ্ছে (ধীরে ধীরে হলেও) প্রতিদিন বিভিন্ন স্তরে, তাহলে খেলায় এই তফাত কেন?
প্রশ্নগুলো আগেই মাথায় ঘুরত, মনে আছে মাস্কাটে থাকাকালীন আমাদের বঙ্গীয় পরিষদের পিকনিকে mixed gender cricket নামে একটা খেলার খুব চল ছিল, প্রতি টিমে চারজন মেয়ে থাকতেই হবে, কোনো মহিলা ব্যাটসম্যান কে একজন মহিলা বোলারই বল করতে পারবে, মেয়েরা ব্যাটে বল লাগেতে পারলেই স্কোরবোর্ডে এক রাণ যোগ হবে, দৌড়ে রাণ নিলে সেটা দ্বিগুন হয়ে যাবে, ইত্যাদি অনেক নতুন নিয়ম কানুন…ছেলে-মেয়ে সবাই মিলে হৈ হল্লা, বেশ মজা হত কিন্তু!! অনেকটা সেরকমই একটা খেলার সন্ধান পেলাম আজ, আর তাই এত কথা লেখা…
খেলাটার নাম “কর্ফবল (korfball)”।
হল্যান্ডের খুব পরিচিত খেলা…”Cousin of Basketball” নামে পরিচিত, যার সাথে নেটবল আর বাস্কেটবলের বেশ কিছু মিল রয়েছে। ৩.৫ মিটার (১১.৫ ফুট) উঁচুতে নেটবিহীন একটা ঝুড়িতে বলটা ফেলতে হয়। এই খেলায় আটজনের টিমে চারজন করে ছেলে আর মেয়ে থাকে, মেয়েদের সামনে ‘গার্ড’ শুধু মেয়েরাই দিতে পারে, বল নিয়ে ড্রিবলিং করা বা দৌড়ানো বারন!! এই নিয়মগুলো ছেলে-মেয়েদের শারীরিক বৈষম্যজড়িত প্রতিবিন্ধকতাকেও জয় করে এগিয়ে যাওয়াতে সাহায্য করছে।
এখন পৃথিবীর প্রায় ৭০ টা দেশে এই খেলা হলেও হল্যান্ডের বাইরে খুব একটা পরিচিতি পায় নি, অলিম্পিকেও স্থান পায় নি…আরো একটা নতুন নিয়ম আসতে চলেছে এই খেলাটায় – ট্র্যান্সজেন্ডার দের জন্য…
আমরা ধীরে ধীরে ভিন্ন ভিন্ন চিন্তাধারায় উত্তীর্ণ হচ্ছি, আজকাল যে কোনো স্বীকৃত খেলাধুলায় এই ট্র্যান্সজেন্ডাররা খেলতে পারে, কিন্তু একটাই শর্তে, “ট্রান্সজেন্ডার মেয়ে” দের টেস্টোরেস্ট্রন এর মাত্রা কমিয়ে একটা নির্দিষ্ট মাত্রার নীচে নামিয়ে আনতে হয়, যা অনেক সময়েই অনেক সমস্যার সৃষ্টি করে। জানি না কতজনের মনে আছে, দ্যুতি চাঁদ বা পিংকি প্রামানিকের গল্প!! টেস্টোস্টেরানের মাত্রা বেশী হলে তাকে ‘মেয়ে’ হিসেবে গ্রাহ্য করা হয় না, মেয়েদের প্রতিযোগিতায় তাকে খেলতে দেওয়া হয় না… এইসব থেকে ওপরে উঠে খেলার আনন্দ কে প্রাধান্য দিতে, এ ই “কর্ফবল” খেলায় এখন নতুন নিয়ম আসতে চলেছে যাতে আটজনের টিমে, চারজন মেয়ে থাকবে আর চারটে “open gender slot” থাকবে, যেখানে ট্রান্সজেন্ডাররাও খেলতে পারবে।
যে কোনো খেলা, তা সে গ্রাম্য খেলা কাবাডি বা খোখো ই হোক বা ফুটবল, ক্রিকেট, বাস্কেটবলই হোক, আমাদের অনেককিছু শেখায় ছোটোবেলা থেকে – সহনশীলতা, নিয়মানুবর্তিতা, সকলে মিলে কাজ করা, হারতে শেখা, হেরে জিততে শেখা, নির্দেশ মেনে চলা ইত্যাদি জীবনের প্রচুর শিক্ষা আমরা পাই খেলার মাঠের মধ্যে থেকে। যে কোনো সমাজের গঠন অনেকগুলো পিলারের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে, খেলাধুলা সেরকমই একটা বড় পিলার। সেই পিলারের গা থকে আমরা যদি লিংগবৈষম্যের গন্ধটাকে কিছুটা হলেও সরাতে পারি, আশার আলোটা স্বাভাবিকভাবেই আরো উজ্জ্বল হয়।
আমি তাকিয়ে রইলাম খেলা হিসেবে কর্ফবলের জনপ্রিয়তার দিকে, আমাদের ক্রমঃ উত্তরনের দিকে!!
– ময়ূখ/২০২৩
***************
সংযোজন
উপরের লেখায় আমার বক্তব্য ছিলো এমনকিছু খেলা যা পরিনতবয়স্ক সবাই একসাথে খেলে খানিক আনন্দে সময় কাটাতে পারে। সেই প্রসঙ্গেই কর্ফবল খেলাটির উল্লেখ করি, যা অনেকেই হয়তো জানেন না। সুতরাং এই খেলা নিয়ে কিছু তথ্য (ইতিহাস ও বিবর্তন) বা ছবি দিলে সেটা নিশ্চয়ই অপ্রাসঙ্গিক হবে না।
১৯০২ সালে আমস্টারডামের ডাচ স্কুল শিক্ষক নিকো ব্রোখুয়েসেন’কে শিশুদের জিমন্যাস্টিক শেখানোর জন্য সুইডেনের শহর নাস-এ ট্রেনিং কোর্সে পাঠানো হয়েছিল। এখানেই সুইডিশ গেম “রিংবল” এর সাথে তার পরিচয় হয়। রিংবলে ছেলেমেয়েরা একসঙ্গেই খেলে। মাঠটি তিনটি জোনে বিভক্ত ছিল। খেলোয়াড়রা তাঁদের নির্দিষ্ট অঞ্চল ছেড়ে যেতে পারে না। তখন সেই ১৯০২ সালেই নিকো ব্রোখুয়েসেন এই নতুন খেলাটার ভাবনাচিন্তা করেন। উনি নিয়মগুলিও সরল করেছিলেন যাতে শিশুরাও খেলাটি বুঝতে এবং খেলতে পারে। এভাবেই কর্ফবলের জন্ম হয়।
১৯২০ আর ১৯২৮ সালের গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিকে কর্ফবল একটি প্রদর্শনী খেলা হিসাবে প্রদর্শিত হয়েছিল। আর ১৯৩৩ সালে বেলজিয়ামের অ্যান্টওয়ার্পে আন্তর্জাতিক কর্ফবল ফেডারেশন প্রতিষ্ঠিত হয়। আজ নেদারল্যান্ডস, বেলজিয়াম, নাইজেরিয়া, মরক্কো, ঘানা, রাশিয়া, জার্মানি, তাইওয়ান, তুরস্ক, হংকং, পর্তুগাল, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ইংল্যান্ড, স্কটল্যান্ড, আয়ারল্যান্ড, ওয়েলস, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, চেক প্রজাতন্ত্র, স্লোভাকিয়া, পোল্যান্ড, ইউক্রেন, গ্রীস, সার্বিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, জিম্বাবুয়ে, ভারত, পাকিস্তান, স্পেন, সুইডেন, হাঙ্গেরি, ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়া, ইতালি, ফ্রান্স এবং রোমানিয়া সহ ৬৯ টি দেশে কর্ফবল খেলা হয়।
এখন খেলার নিয়মে ম্যাচের শুরুতেই একটি দল কোর্টের একটি নির্দিষ্ট অর্ধেক বেছে নেয়। সেই অর্ধেক হবে সেই দলের ডিফেন্ডিং জোন, এতে “তাদের” নেট (ঝুড়ি) থাকবে। দুটি গোলের পরে, দলগুলি অঞ্চল পরিবর্তন করে: মানে ডিফেন্ডাররা আক্রমণকারী হয়ে ওঠে এবং আক্রমণকারীরা ডিফেন্সে চলে যায়। এই অঞ্চল-পরিবর্তনের মধ্যে, আক্রমণকারীরা তাদের নিজেদের ডিফেন্ডিং জোনে আসতে পারবে না বা এর বিপরীতেও নয়। একজন খেলোয়াড় ডিফেন্ড করার সময় গোল করার চেষ্টা করতে পারবে না। ব্লক করা, ট্যাকল করা এবং ধরে রাখা অনুমোদিত নয়, বা বলকে লাথি মারার অনুমতি নেই। এই নিয়মগুলো শারীরিক শক্তিকে খেলায় আধিপত্য করতে বাধা দেয়।
একবার একজন খেলোয়াড়ের কাছে বল হয়ে গেলে, সেই খেলোয়াড় বল নিয়ে ড্রিবল করতে বা হাঁটতে পারে না। যাইহোক, প্লেয়ার ততক্ষণ পর্যন্ত এক পা নড়তে পারে যতক্ষণ না খেলোয়াড় বল ধরার সময় যে পা দিয়ে অবতরণ করেছিল সেটি একই জায়গায় থাকে। অতএব, কৌশলগত এবং দক্ষ টিমওয়ার্ক প্রয়োজন, কারণ বলকে সচল রাখার জন্য খেলোয়াড়দের একে অপরের প্রয়োজন।
হাফটাইমে দলগুলো কোর্টের অদলবদল করে।
এখন ১৯৭৮ সাল থেকে প্রতি চার বছর অন্তর IKF বিশ্ব কর্ফবল চ্যাম্পিয়নশিপ অনুষ্ঠিত হয়। ২০০৬ সালে হংকং প্রথম আন্তর্জাতিক IKF এশিয়া ওশেনিয়া কর্ফবল চ্যাম্পিয়নশিপের আয়োজন করে। নিউজিল্যান্ড ২০০৭ সালে IKF এশিয়া ওশেনিয়া যুব কর্ফবল চ্যাম্পিয়নশিপ আয়োজন করে।
একটি আন্তর্জাতিক কর্ফবল ম্যাচে সাধারণত দুটি অর্ধ বা চারটি সময় থাকে, যার দৈর্ঘ্য প্রতিযোগিতার উপর নির্ভর করে পরিবর্তিত হয়। যখন ম্যাচের অর্ধেক থাকে, সময়কাল সাধারণত ২৫ মিনিট, পিরিয়ড সাধারণত ৭ থেকে ১০ মিনিটের মধ্যে থাকে, প্রথম এবং দ্বিতীয় পিরিয়ডের মধ্যে এবং তৃতীয় এবং চতুর্থ পিরিয়ডের মধ্যে এক মিনিটের বিরতি থাকে। অর্ধেক সময়ে বিরতি পাঁচ বা দশ মিনিট। প্রতিটি দলের চারজন খেলোয়াড় এক জোনে এবং বাকি চারজন অন্য জোনে। প্রতিটি জোনের মধ্যে, একজন খেলোয়াড় শুধুমাত্র একই লিঙ্গের বিপরীত দলের একজন সদস্যকে রক্ষা করতে পারে।
১৯৮১ সাল থেকে ইন্টারন্যাশনাল ওয়ার্ল্ড গেমস অ্যাসোসিয়েশন কর্তৃক আয়োজিত কর্ফবল জাতীয় দলের প্রতিযোগিতা প্রতি চার বছর পর পর অনুষ্ঠিত হয়।
Year Winner / Runners Up / Host
1985 Netherlands / USA / United Kingdom
1989 Netherlands / West Germany / Germany
1993 Netherlands / West Germany / Netherlands
1997 Netherlands / Chinese Taipei / Finland
2001 Netherlands / Chinese Taipei / Japan
2005 Netherlands / Czech Republic / Germany
2009 Netherlands / Chinese Taipei / Taiwan
2013 Netherlands / Chinese Taipei / Colombia
2017 Netherlands / Belgium / Poland
2022 Netherlands / Chinese Taipei / United States
তথ্যসূত্র
উইকিপিডিয়া






Add comment