সাহিত্যিকা

গোপাল সেন ট্রফি ও আমাদের স্মৃতি

গোপাল সেন ট্রফি ও আমাদের স্মৃতি
সৌমিত্র সিংহ, ১৯৮১ মেটালার্জি

ছবিতে বামদিক থেকে পেছনের সারিঃ রামজীবন’দা, সৌমিত্র সিংহ, রবি নন্দী, সুপ্রকাশ সেনগুপ্ত, হলধর’দা
বামদিক থেকে মাঝের সারিঃ স্বপন সরকার, পার্থসারথি গুহ ঠাকুরতা, দেবাশীষ ঘোষ, দিলীপ’দা, প্রফেসর যাদবলাল চক্রবর্তী, ডঃ শোভেন রায়, দেবেশ’দা, রথীন্দ্র নাথ ভট্টাচার্য, বিশ্বজিৎ পালিত
বামদিক থেকে সামনের সারিঃ তন্ময় দাস, আদিত্য ব্যানার্জি, অনুপ কুমার দাস, অর্ধেন্দু দত্ত (বালি), স্বপন কুয়ার ঘোষ, দেবব্রত সেনগুপ্ত
আজ রামজীবন’দা, হলধর’দা, প্রফেসর যাদবলাল চক্রবর্তী, ডঃ শোভেন রায় আমাদের মধ্যে আর বেঁচে নেই। ওনাদের দেওয়া উৎসাহ কোনোদিন ভোলার নয়। আমাদের খেলাধুলোর শিক্ষকরা বেঁচে আছেন কিনা জানি না, তবে তাঁরা মাঠে ছিলেন, এবং আমাদের পরে বলেছিলেন এরকম উপভোগ্য খেলা অনেকদিনই দেখেননি। আমাদের কিছু চোটআঘাত হয়েছিল, সেটা ফুটবল খেলায় খুবই স্বাভাবিক, তা নিয়ে আমরা আর তেমন মাথা ঘামাইনি।
ওপরের ছবিতে আমাদের কয়েকজন অনুপস্থিত আছে যেমন সৌমিত্র সরকার, সঞ্জিত মুখার্জি, মানস সামন্ত এবং আরও অনেকেই যাদের নাম আমার এখন আর মনে নেই।

ভূমিকা
বাদল মোদক, ১৯৭৭ সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং
আমি আমি ফার্স্ট ইয়ার থেকেই কলেজ টিমে। আর সৌমিত্রর লেখাটার উপর কিছুট আগাম ভূমিকা দিয়ে রাখি। ভালো লিখেছে। তবে ‘৭৯ পর্যন্ত ও আমাদের কলেজ টিমে ছিলো না, তারপরে হয়তো খেলেছে।

আমাদের সময়ে (‘৭২-‘৭৭) যাদবপুরের সাথে প্রথম খেলা হয় তিন বছর আগে ’৭৩ উইন্টার মিটে। সেবার যাদবপুর কলকাতার এ ডিভিশনের কয়েকজন প্লেয়ার এনেও আমাদের হারাতে পারেনি। মোহনবাগানের ফরোয়ার্ড লাইনের প্রদীপ দত্তকে আটকানোর দায়িত্ব ছিলো আমার উপর। সেদিনের খেলায় আমাদের জেতাই উচিৎ ছিলো। আর ১৯৭৬-৭৭ যে সময়ের কথা সৌমিত্র বলছে, তখন আমি কলেজ ফুটবলের ক্যাপ্টেন। সেইসময়ের যাদবপুরে খেলা মানে গোপাল সেন ট্রফি। আমি এথলেটিক ক্লাবের বাজেট থেকে তখনের ময়দানের নামী কোচ অচ্যুত ব্যানার্জিকে নিয়ে এসেছিলাম। উনি দশ দিন আমাদের কোচিং করিয়েছিলেন। প্রথম তিনদিন শুধুই দৌড় করালেন, আর দম বাড়াতে বললেন। বললেন এই দুটো ফুটবলের প্রথম স্টেপ। তারপর পাসিং আর ডিস্ট্রিবিউশন। জানি দশ দিনে বিরাট উন্নতি হয় না, তবে সামান্য উন্নতি সকলেরই হয়েছিলো।

আমাদের টিম বেশ ভালো ছিলো, নামগুলো এখনও পরিস্কার মনে আছে। প্রথম ১১ জনে ছিলো অধিকাংশই  আমাদের ব্যাচের, গোলে অমল পাল, চার ব্যাক আমি, তাপস ভৌমিক (সিআরপি), শংকর দাস, দেবব্রত গুহ। হাফে বিশ্বজিত পালিত (‘৭৯), সুব্রত চ্যাটার্জি (চাটু)। ফরয়ার্ডে সোমনাথ চ্যাটার্জি, তপন ঘোষ ছিলো। টিমের অন্য নামগুলো পার্থ গুহঠাকুরতা (‘৮০), নিখিল (‘৭৯), তন্ময় দাস (‘৭৯), বিমান দাস, শরদিন্দু দে, শেখর বসু, আর উৎপল সরকার। সেদিন যাদবপুরের কাছে আমরা ভালো খেলেও হেরে গিয়েছিলাম।

মূল রচনা,
সৌমিত্র সিংহ, ১৯৮১ মেটালার্জি

আমি কলেজে ঢুকেছি ১৯৭৬ সালে, এবং প্রথম মাসেই আমি কলেজ টীমের ফুটবলে নিজের জায়গা করে নিয়েছিলাম, কোন খুঁটির জোরে নয়। তার কারণ আমি যখন কলেজে ঢুকেছি তখন ইন্টার হোস্টেল টুর্নামেন্ট সুরু হয়ে গেছে।

সেদিনের আমাদের হস্টেলের টিম মানে হোস্টেল ১২ আর ১৩ কম্বাইন্ড টিম, সেই কোন পুরাতন যুগ থেকে চলে আসছে। একদিন দুপুরে ১২ এর দাদারা আমাদের হোস্টেলে এসে চড়াও, “তোরা কে কে ফুটবল খেলিস?” রাগিং পর্ব শেষ হয়ে গেছে, আমি তাও মিনমিন করে বললাম, আমি খেলি। পালটা প্রশ্ন, তোর বুট আছে? বললাম, বুট আছে, কিন্তু এখানে নেই, বাড়ি থেকে আনিনি। আমাকে ডেকে নিয়ে চললো, ১২ তে চল দেখছি কি করা যায়।

ভয়ে ভয়ে ১২ তে গেলাম। আমার পা নিয়ে পরীক্ষা শুরু হলো, কার একস্ট্রা বুট আমার পায়ে ফিট হয়? কোনরকমে একজনের বুট পায়ে লাগলো, তাতে জল-ফল দিয়ে নরম করে খেলতে নামলাম। খেলার শেষে এথলেটিক ক্লাবের দিলীপদা আর দেবেশদা দুজনেই বললেন যে, আথলেটিক ক্লাবে আয়। একটা ফর্ম ফিল আপ করতে হবে, আর একটা ছবি দিয়ে যাবি। ব্যস, সেদিনের এক খেলাতেই কলেজ টীমে ঢুকে গেলাম।

কলেজের প্রথমদিকে, মানে আমার ফার্স্ট ইয়ারে একবার যাদবপুরের সঙ্গে গোপাল সেন ইন্টার ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ ট্রফির খেলা হয়েছিল, কিন্তু তার ফলাফল সবাইকে বলার মতো নয়। সুতরাং এবার যখন শুনলাম যে আবার যাদবপুরে গিয়ে একটা টুর্নামেন্ট খেলতে হবে তখন মনে মনে একটা পুরোনো অপমানের বোঝার প্রতিশোধ নেওয়ার কথা অনেকের মনেই জেগে উঠলো। যদিও মনে যে অন্য শঙ্কা ছিল না তা বলতে পারি না, কারণ জানতাম যে যাদবপুর টীমে প্লেয়ারস কোটায় কলকাতা ময়দানের এ ডিভিসনের কয়েকজন প্লেয়ার থাকবে।

টুর্নামেন্টে ৭ টা কলেজকে দুটো ভাগে ভাগ করা হয়েছে। দুই গ্রুপের কলেজগুলো নিজেদের মধ্যে লিগ ফর্ম্যাটে খেলবে, তারপর এক গ্রুপের চ্যাম্পিয়ন ও রানার্স অন্য গ্রুপের চ্যাম্পিয়ন ও রানার্সের সঙ্গে ক্রিশ ক্রশ ভাবে সেমি ফাইনাল খেলবে, সাধারণতঃ যা হয় আর কি। তারপর বিজয়ীরা নিজেদের মধ্যে ফাইনাল খেলবে। যতদূর মনে পড়ছে – আমাদের গ্রুপে ছিল বিই কলেজ, মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ, তারাতলা, মাইনিং ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ ধানবাদ, আর রিজিওনাল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ,দুর্গাপুর। অন্য গ্রুপে যাদবপুর ইউনিভার্সিটি, আই আই টি, খড়গপুর, আর জলপাইগুড়ি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ

আজ থেকে ৪৪ বছর আগের ঘটনা। স্মৃতি নির্ভর করে লিখছি। কিছু ভুল ভ্রান্তি হতেই পারে, যাঁরা ওই সময়ের কথা পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে মনে রেখেছেন তারা হয়তো আমার লেখার কিছু ভুলচুক ধরতে পারবেন, তা দেখে দয়া করে মার্জনা করে দেবেন।

সেটা ১৯৭৯ সাল। আমাদের যাওয়া মানেই সেই মুড়ির টিনের বাস; তখন চারপাশে সুন্দর দেখতে মিনিবাস চালু হয়ে গেছে, সেখানে সেই ভয়ঙ্কর চেহারার বাসে চড়ে যাওয়া। ওই বাসে সবাইকে ধরলো না, কেউ কেউ পাবলিক বাস করে গেলো। টিমকে তো সাপোর্ট করতে হবে। যাদবপুরের ক্যাম্পাসে বাস থেকে নামতেই চারপাশে একটা হই হই পড়ে গেলো। চিড়িয়াখানা থেকে যেন একদল বনমুরগি এসেছে জবাই হতে ।

বাস থেকে নামলাম, মনে হলো আমাদের পেয়ে লোকজন যেন বিয়ের উলু দিচ্ছে। কি চিৎকার রে বাবা। মাঠের পাশেই বাস থামলো, নেমেই সোজা মাঠের দিকে, নাহলে হলে যতক্ষণ দাঁড়াবো ততক্ষণ আওয়াজ খাবো। চারপাশে ক্রমশঃ ভিড় বাড়ছে। সেসময় প্রতিদিন আমাদের মুড়ির টিনে করে আসতে হচ্ছিল । তবে যাদবপুরের গা সওয়া হয়ে গিয়েছিলো বলে আওয়াজটা কম খাচ্ছিলাম।

আমাদের গ্রুপ লীগের প্রথম খেলা মেরিন কলেজের সাথে, আমরা,৪-১ গোলে জিতলাম। প্রথমেই আমরা একটা গোল খেয়ে গেছিলাম। কারণটা খুবই অদ্ভুত। ফুটবল খেলায় এরকম ঘটনা খুব একটা ঘটে না। বলটা আমাদের গোলের পেছনে চলে গেছে, অর্থাৎ গোল কিক। আমি পেনালটি বক্সের বাইরে, আর গোলকীপার দেব্ব্রত সেনগুপ্ত (৮১, ইলেকট্রিক্যাল) আমায় ফরোয়ার্ড পাস দিয়েছে। আমি সেই বল বক্সের মধ্যে রেটার্ন করে দিয়েছি, যাতে দেবু বা পার্থ গুহ ঠাকুরতা (‘৮১ ইলেকট্রিক্যাল) বলটা অন্যদিকে ডাইভার্ট পাস করে দিতে পারে। কিন্তু পার্থ ভেবেছে অন্যরকম। তার মনে হয়েছে যে গোল কিকে কিছু ভুল হয়েছে, আর তাই আমি বলটা ফেরত পাঠিয়ে দিয়েছি। তাই সে গম্ভীরভাবে হাত দিয়ে বলটা তুলে নিয়ে গিয়ে বক্সের মধ্যে নিয়ে গিয়ে নির্দিষ্ট জায়গায় বসালো। আমরা অবাক। রেফারী আর কি করে? পেনালটি দিলো, আমরা গোল খেয়ে গেলাম। যাই হোক, ৪-১ গোলে তো জিতলাম।

পরের খেলা দুর্গাপুরের বিরুদ্ধে, আমরা ৩-০ গোলে জিতলাম, কিন্তু সেই খেলায় বলে লাথির চেয়ে পায়ে লাথিটাই অনেক বেশী হয়েছিল। তারপরের খেলা ছিলো ধানবাদের সঙ্গে, সেটাতেও আমরা ২-০ গোলে জিতলাম বলে মনে আছে। অন্য গ্রুপ থেকে যাদবপুর দুটো দলকে হারিয়ে ফাইনালে উঠলো।

তারপর এলো কাঙ্খিত ফাইনাল খেলা । ঠিক সেই সময়ই আমাদের নতুন বাসটা কেনা হয়েছিল। সেটায় চড়ে গেলাম। যাদবপুর প্রথমে বোঝেনি যে আমাদের বাস। নতুন ঝকঝকে চকচকে বাস। বাসে আমাদের নাম দেখে বুঝলো, ততক্ষণে আমরা মাঠে ঢুকে গেছি। আমাদের সঙ্গে একজন উৎসাহী মেয়ে সমর্থিক সুমিত্রা’দি (‘৭৯ ইলেকট্রনিক্স) সেদিন মাঠে আমাদের একমাত্র মেয়ে সমর্থক। আর কলেজ থেকে বাস ভর্তি করে অনেক সমর্থক তো গিয়েছিলোই। আবার শিবপুর যাদবপুরের যে সকল প্রেমিক প্রেমিকারা ছিলেন, তাঁরা আমাদের মাঠে গা ঘামানোর সময় তাদের অভিসার পর্বটাও সেরে নিয়েছিল। অবশ্য খেলার সময় মাঠের ধারে এসে যে যার নিজের কলেজের জন্যই গলা ফাটিয়েছিলো।

শুরুতেই আমরা একটা গোল করে খেলাটাকে খানিকটা ধরে নিলাম। আমাদের এক বছরের জুনিয়র মেকানিকালের অর্ধেন্দু দত্ত’র (বালি) দূর পাল্লার শট গোলকীপারের মাথার ওপর দিয়ে জালে জড়িয়ে গেলো। একটা অদ্ভুত সুন্দর গোল। তার খানিক পরেই বিশ্বজিৎ পালিত’দার (১৯৭৯ ইলেকট্রিক্যাল) একটা গোল, নিখুঁত বল কন্ট্রলে ডজ করে আলতো শটে গোল ২-০, আমাদের খেলা খুলে গেছে।

এবার বিক্ষিপ্ত লগ্নে ওরা আক্রমণ চালাচ্ছে আর আমরা সর্বশক্তি দিয়ে প্রতিরোধ করছি। একসময় বাঁধ ভেঙ্গে গেলো। ওরা একটা গোল করে দিলো, ফলাফল ২-১। এবার আমাদের লেফট উইং এর অত্যন্ত দ্রুতগতির ফরওয়ার্ড সৌমিত্র সরকার (‘৮১ মেটালারজি) একের পর এক আক্রমণ শানাচ্ছে। এরই মাঝে অর্ধেন্দু সৌমিত্রর কাছ থেকে বল পেয়ে নিখুঁতভাবে গোলকিপারের মাথার ওপর দিয়ে বলটা নেটে জড়িয়ে দিলো। যারা প্রথম গোলটা দেখেনি তাদের জন্যে যেন আবার নতুন করে সাজিয়ে দিলো।

হাফ টাইমে খেলার ফলাফল ৩-১। আমরা জিতছি। বুঝতে পারছি আমাদের সমর্থকরা খুবই উত্তেজিত, আনন্দিত। হাফ টাইমের পর খেলা শুরু হলো বটে কিন্তু বুঝতে পারছিলাম যে বিড়ি সিগারেট খাওয়া দমে খুব বেশীক্ষণ চলবে না। আমি চিরকাল হাফ ব্যাক হিসেবে খেলে এসেছি। সেদিনও তাই ছিলাম। আস্তে আস্তে গলার ফাঁশ যেন চেপে বসতে শুরু করলো। ধীরে ধীরে খেলা একসময় ৩-৩ হয়ে গেলো। বিপদ বুঝতে পারছি কিন্তু সামলাতে পারছি না। এরই মাঝে আমাদের গোলকীপার দেবু আহত হয়ে মাঠের বাইরে চলে গেলো। ১৯৮০ ব্যাচের সঞ্জিত’দাকে (মাইনিং) গোলে নামানো হলো, কিন্তু আক্রমণের প্রাবল্যে ও দমের ঘাটতিতে আমরা আরও দুটো গোল হজম করলাম। খেলা শুরু করেছিলাম বিরাট আশা জাগিয়ে, শেষ করলাম বিধ্বস্ত সৈনিক হিসেবে। ফলাফল দাঁড়ালো ৫-৩। আমরা হেরে গেলাম।

আমরা হেরে গেলেও সেদিনের সেই খেলায় নিজেদের সমর্থকদের সমর্থনে আমরা যাদবপুরের দর্শকদের কাছ থেকেও সমীহ আদায় করে ছেড়েছিলাম। এখানে একজনের কথা না বললে নয় সে আমাদের ব্যাচের সৌমিত্র সরকার। খেলার প্রথম পর্বেই লেফট উইং থেকে ক্রমাগত আক্রমণে যাদবপুর সত্যি দিশাহারা হয়ে গিয়েছিলো। আজ সৌমিত্র আর আমাদের মধ্যে নেই। আমাদের স্টার খেলোয়াড় অর্ধেন্দুও পারিবারিক কারণে পরে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়া ছেড়ে দিয়ে চলে যায়।

অর্ধেন্দু অর্থাৎ বালির পায়ের কাজ, আমরা বলতাম একেবারে সুরজিত সেনগুপ্তর মতো, পায়ের তলা দিয়ে আলতো করে টেনে গোল কীপারের মাথা টপকে বল ফেলে দেওয়া, সে তা ভোলা যায় না। সেটা এখনও আমার চোখের সামনে ভাসে। সেন্টার হাফ লাইনের পালিত’দার খেলাও ছিল অনবদ্য, লম্বা লম্বা স্টেপে পায়ের কাজও ছিলো দারুণ। দু’তিনটে প্লেয়ারকে অনায়াসে ডজ করে চলে যেতো। আমাদের স্ট্রাইকার, সেন্টারে ছিলো দেবাশীষ ঘোষ। সেদিনের পালিত’দার গোলের ক্ষেত্রে তার বেশ খানিকটা অবদান ছিল। যাদবপুরের রাজা চক্রবর্তী আর অমল দত্ত কলকাতা ফুটবলের প্রথম ডিভিশনের প্লেয়ার ছিলো। দেবাশীষ ঘোষের উপর দায়িত্ব ছিলো সেই দুজনকে policeman marking এর জন্যে।

আমাদের গোলকীপার দেবু যতক্ষণ মাঠে ছিলো, আমরা ভরসায় ভরপুর ছিলাম। ও চোট পেয়ে মাঠ ছেড়ে চলে যাওয়ায় আমরা খানিকটা উদ্যম হারিয়ে ফেলেছিলাম। মাঠ ছাড়ার আগে ওদের স্টার প্লেয়ার রাজা চক্রবর্তীর একটা দুর্দান্ত শট বামদিকে আঙ্গুল ছুঁইয়ে বাঁচিয়েছিল।

খারাপ লাগছিলো যারা ক্লাস কেটে মাঠে এসে আমাদের সমর্থন করতে এসেছিলো, তাঁদের জন্য, তাঁদের হতাশ মুখগুলো দেখে। তবে খেলার মধ্যে তো জেতাহারা আছেই, কি আর করা যাবে?
আমাদের খেলাগুলো হয়েছিল যাদবপুর ক্যাম্পাস গ্রাউন্ডের মাঠে, Blue Earth lab ও Integrated Building এর সামনে। আমাদের সুন্দর ওভাল মাঠে খেলার পরে এই মাঠে এসে খানিক অসুবিধেই হয়েছিলো। কিছু কিছু জায়গায় খানিক উঁচুনিচু থাকার দরুন বল কন্ট্রোলে বা ডিস্ট্রিবিউশনে বেশ অসুবিধা হচ্ছিল। এখন কি হয় জানি না, তবে আমাদের সময় মাঠের খুব একটা যত্ন নেওয়া হতো না। যথেষ্ট প্রতিকুল পরিবেশে আমাদের খেলতে হয়েছিল এটুকু বেশ মনে আছে।

যত লিখব গল্প বেড়েই চলবে!
খেলার শেষে যাদবপুরের ভাইস চ্যান্সেলর এম এন চক্রবর্তী মহাশয় পুরস্কার বিতরণ করলেন। রানার্স শিল্ড এখনো আমাদের আথলেটিক ক্লাবে সুন্দর করে সাজানো আছে।

কলেজে মোট ৭ বছর খেলেছি। ভাববেন না বছরের পর বছর ফেল করে করে খেলে যাচ্ছিলাম। আমাদের সময় ৫ বছরের কোর্স চালু ছিল । তারপর মাস্টারস করেছি আরও ২ বছর, পুরোটাই ফুটবল খেলেছি। কিন্তু জিজ্ঞেস করবেন না মাস্টারস তো ইউনিভার্সিটি, খেললে কি করে? সেসব ভেতরের গূঢ় তথ্য, মারাদোনার ভাষায় ভগবানের হাত।

 

Sahityika Admin

Add comment