বেটন বাতোঁ মে
দীপ্ত প্রতিম মল্লিক, ১৯৮০ মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং
এই গল্পটি উৎসর্গ করলাম আমার সহপাঠী ১৯৮০ মেকানিক্যালের শ্রীরূপ মিত্রকে- যার হকি স্টিকের যাদু কলেজ জীবনে মুগ্ধ করেছিল। শ্রীরূপ আজ আমাদের মধ্যে নেই কিন্তু ওর হকির যাদু অমর হয়ে আছে।
১৯৭৭ সালের ফেব্রুয়ারির শেষ, টেষ্ট পরীক্ষা এখনও দেরী আছে- মনটা নতুন আগত বসন্তর হাওয়ায় উড়ু উড়ু। লাঞ্চের পর একটা পনেরো থেকে দু ঘন্টা পাত্র স্যারের দুরুহ অংকের জিএস টি ক্লাসটা করে বেরুচ্ছি – শেষ ক্লাসটা আর করবোই না। এরকম বসন্তদিনে শেষ ক্লাস করার কোনো মানে হয় না। এর থেকে ব্যাতাইতলার লেভেল ক্রশিংতে বসে হাওয়া খেতে খেতে রঙ্গীন প্রজাপতি দেখা অনেক বেশী চিত্ত-আকর্ষক।
তখন সেকেন্ড ইয়ারে পড়ি, পড়াশুনোর চাপ কিছুটা শিথিল। মনের আনন্দে কলেজ বিল্ডিং থেকে বেরিয়ে সবে একটা ভারজিনিয়া সিগারেট ধরিয়েছি, এমন সময় পিছন থেকে কে যেন কলারটা চেপে ধরলো, “এই যে মুদ্দা, পেয়েছি”- ঘাড় ঘুরিয়ে দেখি মোটা। তাকিয়ে দেখি মুদ্দা আসছে। সামনেই ক্যান্টিন থেকে বত্রিশ খানা দাঁত বের করে এক অমাইক হাসি নিয়ে। মুদ্দা মানে অভিজিত, আমার সহপাঠী, আমাদের এগারো নম্বর হোস্টেলেরই, হোস্টেলের ঘর খুব সাফসুতরো রাখে বলে ওর নাম সাফাইওলা বা মুদ্দাফরাস- সংক্ষেপে মুদ্দা। মোটাও আমাদের ইয়ারের আর একই হস্টেলের।
ভাবলাম কি হল রে বাবা, কি করলাম? হঠাৎ গ্রেফতার কেন? ততক্ষণে মুদ্দা চলে এসেছে। মুদ্দা আমার বুকে একটা চাপড় মেরে বলল, চল, আজ তোর করিশমা দেখানোর দিন- আজ তোকে গোলে খেলতে হবে, মোটার পায়ে চোট।
“গোলে খেলতে হবে? কোন খেলা?” – আমি তো আকাশ থেকে পড়লাম।
“নকশা হচ্ছে?” মুদ্দা আমার মুখের থেকে সিগারেটটা কেড়ে নিয়ে বলল, “সেদিন যে অতো উৎসাহ দেখালি হকি খেলা নিয়ে, সুযোগ পেলে দেখিয়ে দিবি, হস্টেল টিম এবারে চাম্পিয়ান হবেই, ব্লা, ব্লা… আজ সেই সুযোগ এসেছে, মোটার পা ড্যামেজ, তুই গোলে দাঁড়াবি, ব্যাস।”
শুনে তো আমার হয়ে গেছে। হকির গোলে খেলা আর নিজেকে পকিস্তান বর্ডারে গোলাগুলির মুখে ফেলা- একই ব্যাপার। যতোই তোমার পায়ে প্যাড, মাথায় হেলমেট আর হাতে স্টিক থাক না গোলকিপারের, ঐ ভারি সাদা কাঠের বলের আধখানাও যদি গায়ে এসে লাগে, তো সোজা হাসপাতাল।
অবশ্যি দোষ পুরোটাই আমার। কদিন আগে ডিনারের পর হস্টেলে গুলতানির সময় খুব লেকচার দিয়েছিলাম। কথা হচ্ছিল ক্রিকেট, গাভাসকার এই সব নিয়ে, সেই নিয়ে কথা কাটাকাটির সময় আমি বললাম, ক্রিকেট, ফুটবল এসবের চেয়েও আমরা হকিতে অনেক এগিয়ে। কেননা ভারতের খেলাধূলায় যা সম্মান, যা মেডেল টেডেল সবই হকিতে। ক্রিকেট ফুটবলে লবডঙ্কা।
শুরু করলাম, জানিস, হকি প্রথম সাহেবরা আনে এই বাংলাতেই উনিশ শতকের শেষ দিকে। আর এতো অল্প দিনে হকি বাংলাতে এতো জনপ্রিয় হয় যে ১৯০৪ সালে বেঙ্গল হকি এ্যাসোসিয়েশন তৈরি হয় এই বাংলাতেই। সেটাই পরে নাম পালটে ইন্ডিয়ান হকি এ্যাসোসিয়েশন হয়ে যায়। হকির সবচেয়ে যেটা পুরানো আর নামি টুর্নামেন্ট সেই বেটন কাপ ১৮৯৫ সাল থেকে চলছে আর এই হকি এ্যাসোসিয়েশনই ১৯০৪ সাল থেকে বেটন কাপের দায়িত্ব নেয়। আর তখন আমাদের বিই কলেজের দারুন টিম। আর খেলার মান এতোই উচ্চশ্রেণীর ছিলো যে ১৯০৫ সালে আমাদের কলেজ প্রথম বেটন কাপ জেতে। ভেবে দ্যাখ তখন ক্যালকাটা রেঞ্জার্স ক্লাব, এস পি জি মিশনের মতো টিমকে হারিয়ে বেটন কাপ জেতা চাট্টিখানি কথা নয়। শুধু কি তাই! ১৯২১ সালে তখনকার বাঘা বাঘা টিমকে হারিয়ে বি ই কলেজ আবার বেটন কাপ জেতে। তারপর ক্রমে হকি এই বাংলা ছাড়িয়ে গোটা ভারতে ছড়িয়ে পড়ে । ১৯২৮ সালে তারই ফসল হকিতে প্রথম অলিম্পিক সোনা। তারপর আরো সাত সাত বার অলিম্পিকে সোনা এসেছে শুধু এই হকিতে। আর আমাদের বাংলা! অজস্র ভালো ভালো খেলোয়াড় এসেছে এই বাংলা থেকে। প্যাট জান্সেন, লেসলি ক্লডিয়াস, কেশব দত্ত, গুরবক্স সিং, যোগিন্দার সিং, এনামুর রহমান- কতো নাম করব। আর এখন যে ছেলেটা খেলছে বাংলার থেকে, সামার অলিম্পিকে দারুন গোলকিপিং করেছে, সেই বীর বাহাদুর ছেত্রী হল আমার গুরু। ওর মতো গোল কিপিং করা আমার স্বপ্ন। আর সেই গৌরবমণ্ডিত ইতিহাস ছেড়ে তোরা পড়ে আছিস ক্রিকেটে, ফুটবলে- ছোঃ।
এইসব শুনে মোটা বলল, “আমাদের কলেজে হকি খেলার এগারো জন ছেলেই পাওয়া যায় না, ইন্টার হস্টেল লীগে এগারো জন কুড়িয়ে বাড়িয়ে জোগাড় করতে হয়, একবার তো ভেবেছিলাম ব্যারাক সারভেন্টদের খেলাতে হবে টিমের এগারো জনকে মাঠে নামাতে। তো তুই এবার আয়, তোর হকি এরকম জান প্রাণ, তো খেলে দেখিয়ে দে!”
শুনে তো আমার হয়ে গেছে, কেননা “মুখেন মারিতং জগতং” অন্য কথা, বাস্তবে আমার হকি খেলার অভিজ্ঞতা খুবই অল্প আর সেটা শুধু স্কুলে গোলকিপিং এর। তাই নিজেকে বাঁচাতে বললাম, “আমি গোলে খেলি আর হোস্টেলের গোলে মোটা দারুণ খেলে, তাই আর যাই নি এ লাইনে।“
মুদ্দা বলল, “পচা, তুই আজ হোস্টেলের হকি প্র্যাকটিশে আয়, তোর এই সব কথাগুলো শুনলে সবাই উৎসাহ পাবে। বেটন কাপ না হলেও ইন্টার হস্টেল চম্পিয়ানশিপের ফাইনালেও যদি উঠি তো অনেক। জানিস তো, কদিন আগেই যাদবপুরের কাছে আমরা ছ ছটা গোল খেয়েছি। তাই এইসব শুনে যদি এক আধটাও ভালো প্লেয়ার পাওয়া যায় তো দারুণ।“
“তা যাবো, কখন যেতে হবে বল?” আমি বললাম, লেকচার মারার এমন সুযোগ বাঙ্গালী ছাড়ে?
“তাহলে কাল বিকালেই চ, আমাদের হোস্টেলের হকি প্র্যাকটিস আছে ওভালে” মুদ্দা বলল।
তখন কলেজে ক্রিকেট সীজন শেষ হবার আর ফুটবল সীজন চালু হবার আগে এই যে দু তিনটে মাস, মানে ফেব্রুয়ারীর শেষ থেকে এপ্রিলের প্রথম, সেই সময়টায় হকি খেলা হতো। কলকাতায় হকি লীগও হতো ঐ সময়ে, আর কাস্টমস, মোহনবাগান, পোর্ট কমিশনারস এরা কলকাতার হকি লীগের টেবিলে প্রথম দিকে থাকতো। এও শুনেছি যে পঞ্চাশের দশকে কলেজ থেকে সেরা হকি খেলোয়াড়দের পোর্ট আর কাস্টমস মোটা মাইনে দিয়ে নিয়ে যেত। এখন সে সুদিন আর নেই। আমাদের কলেজে ইন্টার ইয়ার, ইন্টার হস্টেল হকি চাম্পিয়ানশিপের খেলা তো ছিলই, এ ছাড়া ইউনিভারসিটি হকি লীগেও কলেজ অংশ গ্রহন করত।
আমাদের সে সময়ে, মানে সাতের দশকে, হস্টেল ১৬ ছিলো হকির চ্যাম্পিয়ান। শ্রীরুপ, সুব্রত এরা সব ষোলোর ছেলে আর এরা যা খেলতো তার জবাব নেই। হস্টেল ১৪-ও পিছিয়ে ছিল না। আর রিচারডসন হস্টেল ছিল ডারক হর্স। সেখানে আমাদের হস্টেল এগারো লীগ টেবিলের নীচে টিমটিম করছে। সব বিড়ি খাওয়া চেহারা- ৩৫ মিনিট করে দুটো হাফ খেলার দম অনেকেরই থাকতো না, তাই শেষ দিকে সব দাঁড়িয়ে যেত।
পরদিন বিকালে ব্যারাক সারভেন্ট সুনীলদার হাতে বানানো গরম গরম লুচি আর ছোলার ডাল সপাটে খাচ্ছি, মুদ্দা বলল, “খাওয়ার পর একসাথে যাবো কিন্তু।“
আমি বললাম, নিশ্চয়ই, হস্টেলের ইজ্জত বলে কথা!
শুনে মিস তাগামা (পুং) বলল, “চ, তুই কিরকম লেকচার দিস, শুনে আসি। ফেরার পথে লিপিতে বাতোঁ বাতোঁ মে দেখে আসা যাবে।“ প্রসঙ্গত জানাই, এই সিনেমাটার পোস্টারে ইংরাজিতে লেখা থাকতো Baton Baton Mein। সেটা মাথায় রেখে মিস তাগামা (পুং) বলল, বেটন কাপ না পেতে পারি, ডাবল বাতোন তো পাওয়া যাবে। মিস তাগামা (পুং) আমার রুম মেট। মিস তাগামা শুনে কেউ মেয়ে না ভাবে, তাই ওকে ডাকা হতো মিস তাগামা (পুং) বলে। নাদুস নুদুস চেহারা বলে এই নাম ওকে উপহার দেওয়া হয়েছে।
মুদ্দা, মিস তাগামা (পুং) ও আমি এগারোর থেকে বেরিয়ে চললাম ওভালের দিকে। মুদ্দার হাতে ওর নিজস্ব হকি স্টিক। যতোই আমি লেকচার দিই না কেন, মুদ্দার কিন্তু সত্যিই হকি জান-প্রাণ, নাহলে কেউ পকেট মানি দিয়ে নীরস হকি স্টিক কেনে?
ওভালে গিয়ে দেখি গ্যালারীর তলার ছোট ঘরটা থেকে পার্থ হকি স্টিক, প্যাড, বল এই সব বের করছে। পার্থ ছিল আমাদের হস্টেলের এক অসাধারণ খেলোয়াড়- সে ক্রিকেটই হোক, ফুটবল হোক বা হকিই হোক। খেলাই ছিল ওর মন প্রাণ। ওখানে দেখি চ্যাট, মোটা এরাও সব দাঁড়িয়ে। এরাও সব আমাদের ইয়ারের আর ১১ নম্বরের ছেলে। এছাড়া বিশ্বজিতদা, মোটাদা, অসীমদা, স্বপনদা, সত্যদা এরাও আছে। তখন হকি ক্যাপ্টেন হচ্ছে বিশ্বজিতদা। মুদ্দা বোধহয় আগেই বিশ্বজিতদাকে বলে রেখেছিল, আমাদের দেখেই বিশ্বজিতদা বলল, তোরা এসে গিয়ে খুব ভালো করেছিস, ওরে, সবাই এখানে আয়, পচা কিছু হকির ওপর ভোকাল টনিক দেবে- আমদের প্রথম ম্যাচ রিচারড’দের সাথে, দেখ ভোকাল গ্যাসে কিছুটা উন্নতি হয়।
দেখলাম জনা বারোর এক জমায়েত। গ্যালারীতে বল্লভী- অমিত প্রেম করছিলো। মুদ্দা গিয়ে তাঁদেরকেও ডেকে আনল। পাশের রাস্তা দিয়ে খান কয়েক ফার্স্ট ইয়ারের ছেলে যাচ্ছিল লেডিস হস্টেলের দিকে তাকাতে তাকাতে, মিস তাগামা(পুং) গিয়ে তাদেরও ডেকে আনল, বলল, “ফিউচারে এরা এগারোতে এলে কাজে লাগবে তাই ডেকে আনলাম।“ বল্লভীকে দেখে ওর একনিষ্ঠ ভক্ত দুদু যাচ্ছিল, সেও এসে জুটল বল্লভীকে দেখবে বলে। আমি দেখলাম মন্দ না, প্রায় খান কুড়ির এক জনতা, সাথে বল্লভীও আছে, কাজেই ডাবল উৎসাহ। সামনে তাকিয়ে দেখি লেডিস হোস্টেলের ওপরের বারান্দা থেকে উন্মনা আর কবিতাও উঁকি ঝুঁকি মারছে। এইসব দেখে তিনগুন উৎসাহ নিয়ে হকির ওপর সকল বিদ্যা আর জ্ঞান উজার করে দিলাম। প্রায় মিনিট পনেরো পর বল্লভী “আমার ল্যাব লেখা আছে রে” বলে চলে যাওয়ার পর দুপক্ষেরই উৎসাহে ভাঁটা পড়লো। বিশ্বজিতদা বলল, খুব ভাল বলেছিস, তুই রোজ মাঠে আসিস না কেন, বলে হাতে একটা হকি স্টিক ধরালো। আমি বললাম, “আজ আর হবে না, সিনেমার টিকিট কাটা আছে গো, পরে আসব। আমি গোলে খেলি, পরে প্র্যাকটিশ করব।” এই বলে কাটলাম, চললাম ব্যাতাইতলার লেভেল ক্রসিংতে বসতে, তারপর শংকরদার এক ভাঁড় মালাই মেশানো চা খেয়ে চললাম মিস তাগামা(পুং)র ভাষায় অন্য বেটন কভার করতে।
তো সেই হকির লেকচার এরকম বুমেরাং হয়ে এতো তাড়াতাড়ি ফিরে আসবে ভাবিনি। এখন আর কিছু করার নেই- একদিকে মোটা, একদিকে মুদ্দা, একই হস্টেলে থাকি- বলা যায় পালাবার কোনো পথই নেই। বললাম, “আগে হোস্টেলে ফিরে খেতে ফেতে দে, তা ছাড়া আমার অনেক দিন প্র্যাকটিশ নেই, অন্য কাউকে নামা।“ “না না এখন অন্য কাউকে নিলে আরো বড়ো রিস্ক, বিশ্বজিতদা বার বার বলেছে তোকে খেলাতে, তোকে দাদা ভরসা করে, অন্য কাউকে এখন নেওয়া যাবে না” – মুদ্দা অবিচল। ওরা দুজন হাত ছাড়লেও দুপাশে রইল পুলিশ গার্ডের মতো, যাতে পালিয়ে না যাই।
ভেবেছিলাম হস্টেলে ঢুকে কেটে পড়বো, কিন্তু কড়া গার্ড। আমাদের ইয়ারের ছেলেরা তো আছেই- নীচে থেকে বিশ্বজিতদা চেঁচিয়ে বলল, “ঠিক সাড়ে চারটেয় বেরুবো ওভালের জন্য, আর পচাকে সাথে নিয়ে যাস। পচা, তুই আজ আমাদের ভরসা।”
বুঝলাম, এ যাত্রা যেতেই হবে, বিশ্বজিতদা যে রকম ভরসা রেখেছে, তার একটা মর্যাদা রাখতেই হবে।
সুনীলদা আজ পরোটা আর আলুর দম বানিয়েছিল, সবে এক প্লেট নিয়ে মৌজ হয়ে পরোটায় একটা কামড় বসিয়েছি, দেখি মুদ্দা, হাতে হকি স্টিক ফিক নিয়ে শর্ট প্যান্ট পরে রেডি- হকি যে ওর ধ্যান জ্ঞান সেটা বোঝা যাচ্ছে। নাঃ, মুদ্দা, বিশ্বজিতদা এদের কথা ভেবেই মন শক্ত করলাম।
মুদ্দা বলল, পাঁচ মিনিটে রেডি হয়ে নে, টাইম আর বেশি নেই, নীচে বিশ্বজিতদারা অপেক্ষা করবে। চ্যাট যাচ্ছিল রেডি হয়ে, আমায় দেখে বলল, “ভাল করে খেয়ে নে, এরপর তো অনেক কাঠের গোলা খেতে হবে। বরফ টরফ অর্ডার দিয়েছিস? সোনাদা, হুলোদার শট খেলে লাগবে তো!” বোঝ কারবার, কোথায় উৎসাহ দেবে তা নয়, পিছনে লেগেছে- সব ব্যাটা শত্রু । অমৃতসমান পরোটা আলুর দম কোথায় আরাম করে খাব, তা নয়। এখন ছোটো এখন মাঠে গোলাগুলি খেতে।
পাঁচ মিনিট না হোক দশ মিনিটে আমরা বেরুলাম, মুদ্দা, চ্যাট, পাতি, পার্থ পরিবেষ্টিত হয়ে।
নীচে নেমে দেখি সব ইয়ার মিলে হস্টেলের প্রায় জনা চল্লিশ ছেলে। এতো হকির সাপোর্টার? মিস তাগামা (পুং) বলল, না, রে, এদের অনেকে এসেছে হকির বল লাগলে তোর কতটা লাগে সেটা দেখে চোখের আরাম করতে। ঐ যে স্পেনে না কোথায় ষাঁড়ের সাথে রক্তারক্তি দেখতে ছোটে না লোকে, খানিকটা সেরকম। বটে, শুনে ভাবলাম, ঠিক আছে, করেঙ্গে ইয়ে মরেঙ্গে।
ওভাল পৌছে দেখি মোটা ওখানে আগেই চলে এসেছে। আর সাথে এক গাদা গ্লাভস, একটা হেলমেট, কিছু স্টিক আর গোলকিপারের চওড়া প্যাড নিয়ে অপেক্ষা করছে। আমায় দেখে বলে, আয় এখানেই গয়নাগাঁটি পরে নে, তারপর যুদ্ধ। এখন আর পালাবার যো নেই- তাই পরে ফেললাম ধড়াচূড়া। এতে একটা ভাল হলো যে দেখি এই দেহে এইসব চড়িয়ে আর নড়তে চড়তেই পারছি না। ভাবলাম, ভালো, পরিশ্রমটা কমে গেল। এবারে মাঠে নামার পালা। সবার চোখ এড়িয়ে খান কয়েক বিড়ি আর দেশলাই পকেটে পুরলাম। নার্ভাস লাগলে ডোপিং এর কাজ করবে।
আচমকা ভঙ্কুর হুইসিল। ভঙ্কু আজ রেফারী। তখন ফুটবলে নঙ্কু আর হকিতে ভঙ্কু রেফারিং করত। এরা আমাদের কলেজের স্পোর্টস স্টাফ। আর লাইন্সম্যান হত ছেলেরাই। ভঙ্কু খুব কড়া রেফারি, এসেই এত জোর হুইসিল ঠুকল যে আমরা আর দেরি করলাম না, মাঠে নামলাম, যে যার পজিশন নিলাম। দেখলাম দুজন লাইন্সম্যানের একজন শ্রীরুপ আর অপর জন পল্লেদা।
খেলা শুরুর পাঁচ মিনিটেই বুঝলাম, যতোটা ভয় পেয়েছিলাম, ততোটা ভয়ের কিছু নেই। রিচারডসন ফিফথ ইয়ারের হোস্টেল, তাদের অবস্থা আমাদের থেকেও খারাপ। সেন্টার পজিশন থেকে গোল পর্যন্ত আসার আগেই আমাদের ডিফেন্স রুখে দিচ্ছে। বিশ্বজিতদা আগেই বলেছিল আমরা ৪-৩-৩ ছকে খেলব, কাজেই খান তিনেক জব্বর ডিফেন্স আর হাফে মুদ্দা, পাতি, পার্থ – এরা একটা মাছিও গলতে দিচ্ছে না। ফলে বল আমার দিকে আসছেই না। যখন বুঝলাম আমি নিরাপদ, পিছনে মোদক ছিল, বলল, চুপচাপ না দাঁড়িয়ে একটা বিড়ি খা, শরীরে জোর পাবি-এই বলে একটা বিড়ি ধরিয়ে হাতে দিল। এক হাতের গ্লাভস খুলে স্টিকটা বারে ঠেস দিয়ে রেখে সবে খান তিনেক সুখটান দিয়েছি, যখন আবার মনে হচ্ছে পৃথিবীটা খুব সুন্দর, তখন দেখি ডিফেন্স ভেদ করে বিদ্যুৎগতিতে এগিয়ে আসছে রিচারডসনের সোনাদা। মুদ্দাকে কাটিয়ে সোনাদা তখন ডি এর ভিতর প্রায় ঢুকে গেছে। ভয়ে আমার মুখ থেকে বিড়ি পড়ে গেছে, হাতে স্টিক নেই, একটা গ্লাভস খোলা, কে আমায় বাঁচাবে! হায় রে মোদক, নির্ঘাত শত্রুপক্ষের চর, তা না হলে মুখে বিড়ি ধরিয়ে মারার প্ল্যান করে! এতো কিছু ভাবার আগেই সোনাদা ডি তে ঢুকে একটা শট নিল- কি তীব্র তার জোর- শটটা সোজা আমার দিকে আসছে না! নিজেকে বাঁচাতে মরীয়ার মতো বাঁ দিকে ঝাঁপ দিলাম- ডান পা-র গোড়ালির কাছে গোলার মত বলটা লাগল, আর দেখলাম মুদ্দা কোথা থেকে ছুটে এসে বলটা গোল লাইন থেকে বাঁচাল। মাঠ জুড়ে করতালি, সেটা কতটা গোল বাঁচাবার জন্য আর কতটা মার খাওয়ার জন্য জানি না।
তখন আমি খোঁড়াচ্ছি, প্যাড আর জুতোর ঠিক মাঝের খাঁজে বলটা লেগেছে, ফলে প্রবল যন্ত্রণা। ভাবছি কপাল ভাল, যদি হাতে লাগত তো হাতটাই ভাঙ্গত, না, আর বিড়ি টিড়ি খাওয়া চলবে না। ভঙ্কুদা, বিশ্বজিতদা ও আরো দু একজন ছুটে এলো, বলল বরফ টরফ লাগবে? খেলতে পারবি? বললাম, এখন খানিক ঠিক হয়েছে, খেলা যাবে। তখন মানে আমারও রোখ চেপে গেছে- দেখি না কি হয়!
হাফ টাইমে বিশ্বজিতদা বলল, দারুন গোল বাঁচিয়েছিস রে। মোটা বলল, এবার থেকে তুই-ই গোলে খেলিস। এরকম বডি’থ্রো আগে দেখিনি, এ যেন ছেত্রী। আমি প্রমাদ গুনলাম, আমি যে গোল নয়, নিজেকে বাঁচাতেই ঝাঁপ দিয়েছিলাম, সে কথা আর বললাম না।
হাফ টাইমে রিচারডসনের দুজন প্লেয়ার বদলি হল- এলো হুলোদা আর ট্যারা পঞ্চাদা। বুঝলাম এবার বিপদ, এক সোনাদাতেই রক্ষা নেই এবার সাথে হুলো–পঞ্চা। ওরা নামতে সেকেন্ড হাফে রিচারডসনের খেলার গতি বেড়ে গেল, ডিফেন্স হিমশিম খেয়ে যাচ্ছে প্রতি মুহূর্তে। আচমকা পার্থ একটা বল বাঁচাতে গিয়ে ফাউল করে বসলো – ব্যাস পেনালটি কর্ণার। আমি প্রমাদ গুনলাম।
পেনালটি কর্ণার নিল হুলোদা, সেখান থেকে পঞ্চাদা বলটা থামালো ডি এর লাইনে আর সোনাদা গদাম করে নিলো এক স্ট্রোক। ওভালে এক রাশ ধূলো উড়ল আর আমি দেখলাম ঠিক আমার মাথা লক্ষ্য করে কি যেন একটা আসছে। মাথাটা নীচু করারও সময় নেই, কি ভাগ্যি, হকি স্টিকটা এযাত্রা হাতে ঠিক মতো ছিল, নিজেকে বাঁচাতে ওটাকে মাথার সামনে মেলে ধরলাম আর বলটা সেই স্টিকে বুলেটের গতিতে এসে লেগে মাঠের বাইরে। আবার জোর হাততালি, এটা মার খাবার জন্য নয়, অবধারিত গোল বাঁচাবার জন্য।
এই পেনালটি কর্ণারের পর বিশ্বজিতদা বলল, পুরো শক্তিতে সব ঝাঁপা, এদের সাথে ডিফেন্স করা আর যাবে না। ফলে আমাদের টিম এবার তেড়েফুঁড়ে লাগল। এবার মিনিটে মিনিটে বল আসছে। এর মধ্যে আমরা খান চারেক পেনালটি কর্ণার পেলাম, তার থেকে মুদ্দা, আর পাতি দুখানা গোল পুরে দিল ওদের। এগারোর যে কজন সাপোর্টার ছিল তারা তারস্বরে চেঁচাচ্ছে। মিস তাগামা(পুং) তো রীতিমতো নাচ শুরু করে দিয়েছে। কে আবার একটা লকারের ভাঙ্গা দরজা ছিলো সেটাকে কাঁসরের মত বাজাচ্ছে। এরই মধ্যে তালে গোলে আমি একটা গোল খেয়ে গেলাম। ফল ২-১।
আর মাত্র দু মিনিট। বিশ্বজিতদা বলল, এবার সব ডিফেন্সে নাম, গোল খাওয়া চলবে না। আমিও তেড়ে ফুঁড়ে গোল পাহারা দিচ্ছি- কে বলবে আমি অভিজ্ঞ গোলকিপার নই! এমন সময় দেখি আবার তীরবেগে এগিয়ে আসছে সোনাদা, পাশে হুলোদা। মুদ্দা আটকাতে পারল না, পার্থ আর চ্যাট ডি-র মুখে চেষ্টা করল, কিন্তু না, দেখছি সোনাদা পাশ কাটিয়ে ঢুকতে চলেছে, স্টিকটা তুলেছে, অবধারিত গোল, এমন সময়……রেফারির হুইসিল, দেখি শ্রীরুপ পতাকা তুলেছে – অফসাইড। ভঙ্কুদা এক্কেবারে মোক্ষম সময়ে হুইসিলটা ফুঁকেছে ।
সোনাদা কোমরে হাত দিয়ে ভঙ্কুদাকে চ্যালেঞ্জ জানাল, অফসাইড কেন? ভঙ্কুদা হুইসিলটা নামিয়ে বলল, তুমি বলে জবাব দিচ্ছি, অন্য কেউ হলে কার্ড ধরাতাম- দুজন মাত্র ডিফেন্ডার ছিল, বল আগে গেছে, হকি ফেডারেশনের রুল, লাইন্সম্যান অফসাইড দেবে না তো কি!
জনতা চেঁচাচ্ছে, রিচারডসনের সাপোরটাররা ক্ষেপে গেছে, অনেক কমেন্ট শুনতে পাচ্ছি, যেমন
– ভঙ্কু মাল খেয়েছে।
– আরে এগারোর জিএফে ভঙ্কুকে খেতে দেখেছি।
-নঙ্কু –ভঙ্কু নিপাত যাক।
-রেফারীর কালো হাত ভেঙ্গে দাও, গুঁড়িয়ে দাও।
-শ্রেণীশত্রু রেফারী দূর হটো।
চেঁচামেচি খানিক হল বটে কিন্তু শ্রীরুপের হকি জ্ঞানকে সবাই শ্রদ্ধা করত, তাই সব মেনেও নিল। এই ফাঁকে ভঙ্কুদা অফসাইডের শট নেওয়ার জন্য বাঁশি বাজাল। মুদ্দা শট নেওয়ার সাথে সাথে লম্বা হুইসিল, খেলা শেষ।
সবার বিরাট আনন্দ- এগারো জিতেছে, পচা দু খানা গোল বাঁচিয়েছে, মিস তাগামা (পুং) এর নেতৃত্বে জনতা তখন নাচছে। সেদিন হস্টেলে বড়ঠাকুর পূর্ণদা হাফ ডিমের বদলে জোড়া ডিম খাইয়েছিল।
না, এর পর আর খেলিনি। মোটার পা পরের ম্যাচের আগেই ঠিক হয়ে গিয়েছিল। আর আমার গোড়ালিতে এমন লেগেছিল, পুরো সিজন খুঁড়িয়ে চলেছিলাম, তাতেই সিজন শেষ। পরে মোটা-মুদ্দা- বিশ্বজিতদারা অনেক বার এসেছিল বটে কিন্তু পা র চোট দেখিয়ে ওদের ঠান্ডা করেছিলাম।
পুনশ্চ- হকিতে অফসাইডের এর রুল ১৯৮৭ সালে পরিবর্তিত হয়, কে জানে এতে ভঙ্কুদার কোনো হাত আছে কিনা।
কৃতজ্ঞতা স্বীকার
কলেজে থাকাকালীন ক্রিকেট ফুটবল নিয়ে কত ঝগড়া, আলোচনা, মারামারি কিন্তু হকি চিরকালই সবার কাছে অবহেলিত রয়ে গেছে। অনেকে আমরা জানিই না যে আমাদের বেঙ্গল ইঞ্জিনিয়ারীং কলেজ দু দু বার বেটন কাপ জয় করেছে। এই সব হকি নিয়ে বিভিন্ন চাঞ্চল্যকর তথ্য পেয়েছি আমার সহপাঠী অভিজিত সেন, ইলেকট্রিক্যালের থেকে, যার হকি প্রেম আজও ভুলিনি ও ভুলব না।
You dream. You plan. You reach. There will be obstacles. There will be doubters. There will be mistakes. But with hard work, with belief, with confidence and trust in yourself and those around you, there are no limits. – Michael Phelps
If you fail to prepare, you’re prepared to fail. —Mark Spitz






Add comment