সাহিত্যিকা

আমাদের প্রিন্সিপাল প্রফেসর অতুল চন্দ্র রায়

আমাদের প্রিন্সিপাল প্রফেসর অতুল চন্দ্র রায়
© জীবন কুমার চৌধুরী, ১৯৬৮ ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং

আমি বি ই কলেজে ভর্তি হই ১৯৬৩ সালে ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে ও পাঁচ বছরের গ্র্যাজুয়েশন কোর্স সমাপ্ত করেছিলাম ১৯৬৮ সালে। আমাদের তৎকালীন অধ্যক্ষ ছিলেন প্রফেসর অতুল চন্দ্র রায়, অর্থ্যাৎ সহজে বোঝাতে হলে প্রিন্সিপাল, ছিলেন গ্লাসগো ইঞ্জিনিয়ারিং এর স্নাতক। ১৯৪৯ সালে বি ই কলেজে এসে অধ্যাপনায় যোগদান করেন। কলেজের এক’শ বছর পূর্ণ হবার বছরে অর্থ্যাৎ ১৯৫৬ সালে উনি কলেজের প্রিন্সিপালের দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং প্রায় দশ বছর অর্থাৎ ১৯৬৬ সালের জুন মাস পর্যন্ত এই দায়িত্ব অসামান্য দক্ষতার  সাথে পালন করেছিলেন। এরপর ইউনিভার্সিটি অফ নর্থ-বেঙ্গলে ভাইস-চ্যান্সেলর পদে যোগদান করেন।

১৯৬৩ সালে কলেজে ভর্তি হওয়ায় আমি স্যারকে পেয়েছি প্রায় তিন বছর। উনি ছিলেন অ্যাপ্লায়েড মেকানিক্স এর অধ্যাপক, বিষয়টি প্রধানত মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ছাত্রদেরই আদ্যোপান্ত পড়তে হয়। আমার ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ হওয়ায় অল্প কিছু পড়তে হয়েছিল, তবে অন্য অধ্যাপক পড়াতেন। মেকানিক্যাল বিভাগের বন্ধুদের থেকে ওনার পড়ানোর ধরন ও বিষয়ের উপর দখল সম্বন্ধে প্রভূত প্রশংসা শুনেছি।

স্যারের সাথে সামনাসামনি সাক্ষাতের সৌভাগ্য হয়েছিল একবার মাত্র, সেটাও খুব অনুকূল পরিস্থিতিতে ছিল না। সেই ঘটনাটি পরে বলব। কলেজে স্যারকে দেখেছি বহুবার। প্রচন্ড ব্যক্তিত্ব, মাঝারি গড়ন, আপাদমস্তক কেতাদুরস্ত বেশভূষা, গায়ের রঙ কৃষ্ণবর্ণ, আর মাথায় কাঁচাপাকা কেশ বিন্যাস। কঠিন শৃঙ্খলা পরায়ণ ছিলেন। প্রায়শই কলেজ ক্যাম্পাসে নিজের গাড়ি নিয়ে ঘুরতেন। ছাত্ররা যেমন সন্মনা করতো, তেমনি যথেষ্ট ভয়ও পেতো, আমিও সেই দলে ছিলেম। অপ্রয়োজনে প্রিন্সিপালের চেম্বারের কাছাকাছি কেউ যেতো বলে মনে পড়ে না। তবে সকল তর্কের উর্ধে গিয়ে বলতে পারি, স্যার ছিলেন অত্যন্ত ছাত্রদরদী, এব্যাপারে বেশ কিছু গল্প চালু আছে, আর আমরাও অনেকগুলি শুনেছি।

আমি যখন বিই কলেজের আশ্রমিক পরিবেশে, মানে ক্যাম্পাসের বিভিন্ন ছাত্রাবাসে আবাসিক হয়ে ছিলাম, বিনা দ্বিধায় সেই সময়টিকে বলা যায় স্বাধীনতা পরবর্তী বি ই কলেজের স্বর্ণযুগ। এর কারণ হয়তো এক’শ বছরে কলেজের একটা নিজস্ব ঘরানায় ঐতিহ্য তৈরি হয়েছে ও তার সাথে প্রফেসর রায়ের প্রশাসনিক দক্ষতা। সেই আমলে কলেজে রাজনীতির অনুপ্রবেশ ছিল না; কিছু ছাত্রের ব্যাক্তিগত ভাবনাচিন্তা থাকলেও সেগুলি আমাদের পড়াশুনা বা অন্যান্য কার্যকলাপে কোনো প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেনি। কলেজের অধ্যাপক, কর্মচারী ও ছাত্রদের মধ্যে মেলামেশা নিজস্ব লক্ষণ-রেখার মধ্যে যথেষ্ট সৌহার্দ্য-পূর্ণ ছিল। ছাত্র অশান্তি যে একেবারে হয়নি, বললে সত্যের অপলাপ হবে, তবে তাতে রাজনীতির প্রলেপ পড়ে নি।

সে সময় দেশে প্রচন্ড খাদ্য-সংকট চলছে। একবার ছাত্রাবাসের খাবার নিম্ন মানের হওয়ায়, বিশেষত দুর্গন্ধযুক্ত চালের কারণে ছাত্ররা খুবই হৈ চৈ করেছিল। কিভাবে মিটমাট হল মনে নেই, তবে কলেজ প্রশাসনের উদ্যোগে রাতে হস্টেলের ভাতের বদলে রুটি চালু হল। আরেকবার বাইরের স্থানীয়দের সাথে কলেজের কিছু ছাত্রের বচসা, হুমকি, প্রতিহুমকি, অল্প হাতাহাতি, ইট-পাটকেল ছোঁড়াছুড়ি ইত্যাদির একটি ঘটনা ঘটেছিল। ঘটনাটিকে কলেজের সমগ্র ছাত্রসমাজের অপমান হিসেবে ধরা হল এবং ছাত্র নেতারা প্রশাসনের কাছে সবার নিরাপত্তার বিষয়টি বিহিত করার আবেদন করল, সাথে ভূখা-হরতাল অর্থ্যাৎ হস্টেল কিচেন বন্ধ। প্রফেসর রায়ের প্রশাসন ঘটনাটি সামাল দেবার জন্য কিছু কড়া ফরমান জারি করলেন; তার মধ্যে একটি ছিল হস্টেল ছাড়তে হবে। আমরা, যারা মফস্বলের, তারা না খেয়ে হোস্টেলে পড়ে রইলাম শুধু লেবু- জল খেয়ে। যতদূর মনে পড়ছে কয়েকদিনের বেশি ব্যাপারটা গড়ায় নি। প্রফেসর রায় সেসময় কলেজের চৌহদ্দির মধ্যে কোনো পুলিশ অনুপ্রবেশ করতে দেননি। ওনার কড়া নির্দেশ ছিল, কলেজের চৌহদ্দির মধ্যে অনুশাসন কলেজ কর্তৃপক্ষের, বাইরের কাউকে হস্তক্ষেপ করতে দেওয়া হবে না। স্যরের এই সিদ্ধান্ত কলেজের কয়েকজন ছাত্রকে সেদিন পুলিশি হস্তক্ষেপ থেকে রক্ষা করে। তাঁর কারণ, উনার করিশ্মার প্রতি তদানীন্তন রাজ্য প্রশাসন কর্তৃপক্ষ যথেষ্ট শ্রদ্ধাশীল ছিলেন।

আমাকে একবারই স্যারের সামনে গিয়ে দাঁড়াতে হয়েছিল। ঘটনাটি এবার বলি। ১৯৬২ সালে ভারত চীন যুদ্ধ হয়। যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে জারি হয় যে কলেজে এনসিসি আবশ্যিক করতে হবে। সেই নির্দেশ অনুযায়ী এনসিসি আবশ্যিক হল। শুরু হল বিকেলে কিছুক্ষণ এনসিসি প্যারেড, লেফট-রাইট-লেফট ও মার্চিং। বছর খানেক পরে ঠিক হয় যে আগামী পৌষের শীতে পানাগড়ে এনসিসি ক্যাম্প হবে। বিভিন্ন বছরের হাজার খানেক ছাত্র মালপত্র নিয়ে ট্রেনে চড়ে শেষ রাতে গিয়ে নামলাম পানাগড় স্টেশনে। পৌষের সেই ঊষাকালে হাড়-কাঁপানো কনকনে শীতে বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর নির্দেশ দিল মালপত্র নিয়ে হেঁটে যেতে হবে প্রায় পাঁচ-ছয় কিলোমিটার দূরে এয়ারপোর্ট হ্যাঙ্গারে, সেখানেই হবে আমাদের ক্যাম্প। ভোরের আলো-আঁধারি কাটিয়ে কাঁধে পিঠে মালপত্র নিয়ে আর কিছু হাতে করে টানতে টানতে কোনক্রমে পৌঁছলাম সেখানে। সেখানে চূড়ান্ত অব্যবস্থা। খোলা মাঠ, কোনো ছাউনি নেই। প্রকৃতির ডাক পেলে আশেপাশের মাঠে যেতে হবে। সকালের প্রাতঃরাশ এল অনেক পরে তবে সেটা মুখে রোচে না। বেলা বাড়ার সাথে সাথে বেশিরভাগ ছেলেদের মধ্যে প্রচন্ড বিরক্তি দেখা দিল, ক্রমে ক্রমে ক্ষোভ প্রকাশ শুরু হলো। যে অফিসাররা আমাদের নিয়ে এসেছিলেন তাঁরা সেখানে কোনো কথাই বলছেন না, পাত্তাও দিচ্ছেন না। তিতি-বিরক্ত হয়ে অনেকেই ঠিক করল যে ক্যাম্পে থাকবে না, এখান থেকে চলে যাবে, আমিও সেই দলে যোগ দিলাম। অনেক কষ্ট করে প্রায় শূন্য হাতে রাতে বাড়ি ফিরলাম
** এখন মনে হয়, তখন আমাদের অনেকেই হয়তো মিলিটারি কঠিন ক্যাম্প-জীবনের ব্যাপারে ওয়াকিবহাল ছিল না, মানসিক প্রস্তুতিও ছিলনা। আমার বাবা প্রথম জীবনে মিলিটারিতে থাকায়, আমায় কাছে পুরো ঘটনা শুনে শাস্তির জন্য তৈরি থাকতে বললেন।

ছুটি শেষ হলে কলেজে ফিরলাম। সেখানে যা শুনলাম, শ‘খানেক ছাত্র চলে যায়নি, পুরো সময় পর্যন্ত ক্যাম্পে ছিল। যারা ক্যাম্প থেকে পালিয়েছিল, তাঁদের শাস্তি হবে। দিনকয়েক পরে দিল্লি থেকে মিলিটারি অফিসাররা এলেন, আমাদের প্রত্যেকের ইনটারভিউ নেবেন। নির্দিষ্ট তারিখে যথাসময়ে আমরা সারিবদ্ধ ভাবে প্রিন্সিপালের চেম্বারের বাইরে দাঁড়িয়ে আছি। প্রতিবারে পাঁচ জনের গ্রুপকে ডাকা হচ্ছে। আমাদেরও পাঁচজনের গ্রুপকে ডাকা হল। আমাদের মধ্যে সবচেয়ে যে লম্বা, সে সামনে, তারপর আমি আর আমার পেছনে বাকি তিনজন। ভেতরে ঢুকলাম; জীবনে সেই প্রথমবার প্রিন্সিপালের অফিসে উনার সামনে। বিশাল টেবিলের ওপাশে একটি চেয়ারে স্যার বসে আছেন, আর ওনার দুপাশে মিলিটারি অফিসাররা। আমরা মাথা নিচু করে টেবিলের সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। আমাদের সামনের লম্বা বন্ধুকে দেখে স্যার সাদা বাংলায় বললেন, লম্বা আহাম্মোক (বাংলায় বকুনি পিতৃসুলভ লেগেছিল!)। কিছু ধমক খেয়ে আমরা সবাই অপরাধ স্বীকার করলাম। একটা ছাপানো মুচলেকাতে সই করতে হল। শাস্তি কে দেবেন এর জায়গায় অফশন ছিল, প্রিন্সিপাল না মিলিটারি অথরিটি। বলাবাহুল্য আমরা প্রথমটিই বেছে নিলাম। তারপর চলল সারা মাস ধরে প্রত্যেক দিন সকাল বিকেল প্যারেড, মায় ছুটি দিনগুলোতেও। বাড়িতে বাবাকে জানালে, বাবার প্রতিক্রিয়া – অল্পে রেহাই হরেছে।

কলেজের সর্বাঙ্গীণ উন্নতির ব্যাপারে স্যারের অবদান আমার প্রতিবেদনের বিষয় নয়।কাজেই সেই আলোচনায় যাচ্ছি না।

স্যারের প্রতি আমাদের এক ভয় মিশ্রিত শ্রদ্ধা সম্ভ্রম ছিল। অন্যদিকে আমাদের গর্বের বিষয় যে উনি আমাদের প্রিন্সিপাল ছিলেন। কলেজের আশ্রমিক পরিবেশ আমরা যথেষ্ট উপভোগ করেছি, আনন্দে থেকেছি সবাই। চৌহদ্দির বাইরের লোকজনের সাথে আমাদের আর কোনো ঝামেলা হয়নি।
প্রাকৃতিক নিয়মে কোনো বিশাল ব্যক্তিত্ব চলে গেলে একটি ক্ষণিক শূন্যতা দেখা দেয়। সময় সেটা ক্রমে ক্রমে পূরণ করে নেয়। কিন্তু স্যারকে আর না পাওয়ার শুন্যতা পূরণ হলো না। আমার স্যারকে স্মরণ করে আমার সশ্রদ্ধ প্রনাম জানিয়ে এই প্রতিবেদন শেষ করছি।

*** বয়সের ভারে স্মৃতি শক্তি ক্রমশ ফিকে হয়ে যাচ্ছে। ছয় দশক আগের উল্লেখিত ঘটনাগুলির সময়ের কিছু হেরফের হতে পারে, মার্জনা প্রার্থনীয়।

কলকাতা,
২৪/০৮/২০২৬

********

Sahityika Admin

Add comment