সাহিত্যিকা

চাকরী জীবনের কিছু টক মিষ্টি স্মৃতি

চাকরী জীবনের কিছু টক মিষ্টি স্মৃতি
© শ্যামা প্রাসাদ সরকার, ১৯৬৯ সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং

আমার বাড়ি খড়গপুরে, ছোটবেলার স্কুলের পুরোটাই সেখানে। তারপর ১৯৬৪ সালে হায়ার সেকেন্ডারি পাশ করে ভর্তি হলাম শিবপুরে, সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং ডিপার্ট্মেন্টে। বিষয় তো অনেক ছিল: Structure, Soil Mechanics, Design, … তবে আমার পছন্দের বিষয় ছিল Public Health Engineering, পড়াতেন প্রফেসর অরুন দেব। কেন বা কিভাবে জানিনা, উনি আমাকে ভীষণ স্নেহ করতেন, হয়তো ওনার বিষয় আমি খুব মন দিয়ে বুঝবার, শিখবার চেষ্টা করতাম, সেই কারণেও হতে পারে। আমি ঠিক করেছিলাম ৬৯ এ ডিগ্রীর পর Public Health Engineering- এই মাস্টারস করবো, তবে ঘরের কাছে নয়, আই আই টি কানপুরে করবো। কানপুরে এপ্লাই করলাম, কিন্তু আমাকে বিস্মিত করে ডাক পেলাম খড়গপুর থেকে, কানপুর থেকে এলোই না। পরীক্ষা ইন্টারভিউ দিলাম, আমার পছন্দ সেই Public Health Engineering, তার বিভাগীয় প্রধান প্রফেসর রাও এবং আরও কয়েকজন আমার ইন্টারভিউ বোর্ডে ছিলেন। ভালোভাবেই উৎরে গেলাম। যদিও আমার বাড়ি খড়গপুরে, কিন্তু আমি হস্টেলে গিয়ে উঠলাম। আর দু বছর পরে ১৯৭১ সালে নিজের নামের সাথে মাস্টার্স ডিগ্রীটাও জুড়ে গেলো।

১৯৭১ সাল, লেখাপড়ার পাট আপাতত শেষ, এবার আরও কঠিন কাজ – একটা মনের মতন চাকরী খুঁজে নিতে হবে। খবরের কাগজে vacancy দেখে বা এর ওর থেকে জেনে নিয়ে বায়োডাটা সহ আবেদন পাঠাচ্ছি। তখন স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে Chatterjee Polk একটি বিখ্যাত স্থাপত্য ও নির্মাণ সংস্থা, এটি মার্কিন স্থপতি বেঞ্জামিন পোল্ক এবং ভারতীয় সিভিল ইঞ্জিনিয়ার বিনয় কুমার চ্যাটার্জির যৌথ উদ্যোগে গঠিত হয়েছিল। মূলত বৃহত্তর ‘স্টেইন, চ্যাটার্জি অ্যান্ড পোল্ক’ (Stein, Chatterjee and Polk) কোম্পানিটি সেইযুগে দক্ষিণ এশিয়ায় আধুনিক স্থাপত্যশৈলী প্রবর্তনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিল। এর Joseph Allen Stein আমাদের বিই কলেজ আর্কিটেকচার ডিপার্ট্মেন্টে অনেকদিন পড়িয়েছিলেন। সেই Stein, Chatterjee and Polk এর উল্লেখযোগ্য কিছু প্রজেক্ট ছিল: সেই সময়ে কলকাতার প্রথমদিকের High Rise বিল্ডিং চ্যাটার্জি ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার, নয়াদিল্লিতে ‘দ্য টাইমস অফ ইন্ডিয়া’ ভবন, জালিয়ানওয়ালাবাগ স্মৃতিসৌধ, এবং নেপালের কাঠমান্ডুতে ‘নারায়ণহিতি প্রাসাদ’ (Narayanhiti Palace) এর ডিজাইন; ও আরও অনেক।

সেই Chatterjee Polk এর ইন্টারভিউ দিতে ধানবাদ গেলাম, কিন্তু শিকে ছিঁড়ল না, কারণ তাঁরা ভালো ফান্ডাবাজ ব্রিজ এর লোক খুঁজছেন, আর আমি Public Health Engineering এর লোক। এরপর আমাদের পরিচিত একজন আমাকে রেফারেন্স দিলেন, কলকাতায় শেক্সপীয়র সরণীতে Atkins অফিসে গিয়ে একজনের সাথে দেখা করলে যদি কিছু হয়। Atkins অফিসে যার সাথে দেখা করবো, তিনি ড্রাফটসম্যান, চাকরী দিতে পারবেন না, কিন্তু ইন্টারভিউ এর জন্য সঠিক জায়গায়, মানে “স্যারের কেবিনে” পৌঁছে দেবেন। বি. ই. কলেজে পড়ার সময় Atkins -এর অফিস বেশ কয়েকবার লক্ষ্য করেছি, এবার সেখানেই গিয়ে চেষ্টা করতে হবেI

শুভস্য শীঘ্রম। পরের দিনই নম দুর্গা করে সব মার্কশিট, সার্টিফিকেট ইত্যাদি নিয়ে খড়্গপুর থেকে হাওড়াগামী ট্রেনে চেপে বসলামI আর মোটামুটি ফাঁকা থাকায় জানলার ধারে একটা সিটে জায়গাও পেয়ে গেলামI একটু পরেই এলো পাঁশকুড়া স্টেশন। একদল পুরুষ ও মহিলা বিরাট বিরাট ফুলের গাঁটরী মাথায় নিয়ে গাদাগাদি করে উঠলোI এই গাঁটরীগুলো স্থান পেল সব সিটের নীচে, আর কিছু মাথার ওপরের বাংক-এ। আমার মাথার ওপরে বাংক এও কিছু রাখলোI প্রসঙ্গত বলে রাখি, পাঁশকুড়া ফুলের চাষের জন্য বিখ্যাত। এখান থেকেই কলকাতার জগন্নাথ ঘাটের ফুলের পাইকারী বাজারে ফুল চালান যায়I কিছুক্ষণ পরেই কোলাঘাটে রূপনারায়ণ নদীর ব্রিজের ওপর দিয়ে ট্রেন চলছেI দুলুনিতে চোখটা খানিক জুড়ে এসেছিলI এমন সময় ঝাঁকুনির চোটে একটা কিছু মনে হয় ওপরের গাঁটরী থেকে টুপ্ করে আমার মাথায় পড়লI হাতে নিয়ে দেখি একটা সদ্যফোটা নীল অপরাজিতা ফুলI তখনও ভোরের শিশির গায়ে লেগে আছেI উল্টোদিকে বেঞ্চে বসা এক ভদ্রলোক কৌতুহলী হয়ে প্রশ্ন করলেন, আপনি কি কোনও শুভ কাজে যাচ্ছেন? বললাম, না, যাচ্ছি একটা কাজের খোঁজেI ভদ্রলোক বললেন, নিশ্চিন্তে যান, এ কাজ আপনার পাকাI মাথায় ফুল পড়া অতি সুলক্ষণI তাও আবার অপরাজিতা – যার স্থান ব্রহ্মার পদতলেI সেই অপরাজিতা ফুল মাথায় ঠেকিয়ে পকেটে রাখলাম।

হাওড়া স্টেশনে নেমে বাস ধরে শেকসপীয়ার সরণিতে W. S. Atkins অফিসের সোজা ওপরে উঠে গেলাম। সেই ড্রাফটসম্যান ভদ্রলোক আমাকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের হেডের চেম্বারের সামনে নিয়ে গেলেনI বাইরে থেকেই জিজ্ঞাসা করলাম আসব কি? উত্তর এল, এসI ঘরে ঢুকে দেখি পাশাপাশি দুটো টেবিলে দুই ভদ্রলোক বসে আছেনI পরে জেনেছিলাম, ডানদিকের ভদ্রলোক – শ্যামল রায়, সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের হেড আর বাঁদিকের ভদ্রলোক তাপস কর – মেকানিকাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের হেডI

আমি সংক্ষেপে আমার উদ্দেশ্য এবং সাধ্যমত সবিস্তারে নিজের শিক্ষাগত যোগ্যতা জানালামI আমি ব্যাগ থেকে যখন সার্টিফিকেট ইত্যাদি দেখাবার জন্য বার করছি, ওঁরা দুজনেই বাধা দিলেনI ভাবলাম, যা: হয়ে গেল, এখানেও কিছু হলো না? তার বদলে ওনারা বললেন, ওসবের প্রয়োজন নেই। বললেন, ডিসেম্বর মাস শেষ হতে চললোI তুমি ১লা জানুয়ারী জয়েন করতে পারবে ? সদর্থক উত্তর দেওয়ায় বললেন, তোমাকে মিউনিসিপ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং ডিপার্টমেন্টে কাজ করতে হবে। ওখানে কিন্তু কাজের লোড খুব বেশীI আমি আরও একবার বললাম, স্যার, সার্টিফিকেট কি একেবারেই দেখবেন না? দুজনেই মৃদু হাসলেন।

যে অপরাজিতা ফুলটি মাথায় পড়েছিল, যার ফলে এরকম আচমকা ইন্টারভিউ ছাড়াই এবং কোনও কাগজপত্র না দেখিয়েই আমি প্রথম চাকরীটা পেলাম, সেটা আজও যত্নসহকারে বাড়িতে বিশেষ জায়গায় তুলে রেখে দিয়েছিI পঞ্চাশ বছর হয়ে গেল, এখনও প্রতি দুর্গাপুজোর সময় আমি ওই ফুলটিকে ভক্তিভরে প্রণাম করে তুলে রাখিI এই ঘটনা আমি আমার অন্য একটি লেখাতেও সবিস্তারে তুলে ধরেছিI

অফার লেটার পেয়ে আমার চাকরীজীবন শুরু হলে। কিছুদিনের মধ্যেই আমার সেক্শনের সকল কর্মীদের সাথে সুন্দরভাবে মিশে গিয়েছিলাম। কাজের চাপ ছিল খুব বেশি। প্রচুর ফিল্ড সার্ভেও করতে হতI অনেক ড্রাফটসম্যান পেয়েছিলাম, আর অনেকগুলো Piped Water Supply Scheme Design করতে হয়েছিলI তবে Atkins -এ আমি মাত্র আট মাসের মতন ছিলামI ২২শে অগাস্ট Atkins-এর মিউনিসিপাল ইঞ্জিনিয়ারিং ডিপার্টমেন্ট থেকে আমাকে যে বিদায় সম্বর্ধনা বা ফেয়ারওয়েল দেওয়া হয়, সেটা এক কথায় ছিল মর্মস্পর্শীI সেখানে অন্যদের সাথে উপস্থিত ছিলেন প্রতিষ্ঠানের কান্ডারী Mr. Atkins এবং Mr. Das, সে ছবি আমার অ্যালবামে সযত্নে রাখা আছেI
পরদিন, ২৩শে অগাস্ট ১৯৭২ আমি যোগদান করি পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পাবলিক হেলথ ইঞ্জিনিয়ারিং ডিপার্টমেন্টে অ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ারের চাকরী পেয়ে সেখানে I
উল্লেখ করি, , W. S. Atkins ইতিমধ্যে যৌথ মালিকানাধীন হয়েছে এবং নাম হয়েছে Das Atkins Engineers Pvt Ltd.

Public Health Engineering Directorate-এ নানা জায়গায় ঘুরলেও আমি বেশীরভাগ সময় কাজ করেছি প্ল্যানিং এ। এবার সব কথা সরিয়ে রেখে চলে আসি আমার সুপারিটেন্ডিং ইঞ্জিনিয়ারের কর্মজীবনে।।

সুপারিটেন্ডিং ইঞ্জিনিয়ারের পদে আমার উন্নতি হয় ২০০১ সালেI তখন ট্রান্সফার এবং পোস্টিং লিস্ট প্রাথমিকভাবে তৈরী করতেন ইঞ্জিনিয়ার-ইন-চিফI আমাদের সুপারিটেন্ডিং ইঞ্জিনিয়ারদের নতুন লিস্ট তৈরী হচ্ছে শুনে বিকাশ ভবন, সল্টলেক থেকে নিউ সেক্রেটারিয়েটে আমাদের অফিসে গেলামI আর লিস্ট দেখে মন দমে গেলI আমার সুপারিটেন্ডিং ইঞ্জিনিয়ারের পদে উন্নতি হয়েছে ঠিকই, এবং পোস্টিং হয়েছে দার্জিলিঙে দার্জিলিং গোর্খা হিল কাউন্সিল-এ (D.G.H.C. )।

সাধারণত কোনও ইঞ্জিনিয়ারই দার্জিলিং যেতে চাইত না এবং যেতে হলেও ওখানে চরম অনিচ্ছাসত্বে কাজ করতI এই আবহেই আমি গেলাম। যে ঘরে আমার থাকার ব্যবস্থা ছিল, সেটা দেখেই তো গা গুলিয়ে উঠলোI বুঝলাম, আগে যারা এই পদে ছিলেন, তাঁরা কেন প্রতি মাসে মাত্র কয়েকদিনের জন্যই এখানে থাকতেনI প্রথম রাত সেই ঘরেই কাটিয়ে পরের দিনই দার্জিলিঙের এক্সিকিউটিভ ইঞ্জিনিয়ার বিশ্বজিৎ পাত্রকে নিয়ে গেলাম PHE-র সেক্রেটারী Zimba সাহেবের কাছেI

D.G.H.C.তে একজন IAS সেক্রেটারী থাকলেও প্রত্যেক ডিপার্টমেন্টে একজন করে WBCS সেক্রেটারী আছেনI Zimba সাহেব ছিলেন সেইরকমI সদা হাস্যময় মানুষI উনি একথা সে কথার পর পরিষ্কার বাংলায় জিজ্ঞেস করলেন – সরকার সাহেব, কেমন লাগছে? আমি বললাম – স্যার, আমার ডিপার্টমেন্ট তো আমাকে এখানে কাজের জন্য পাঠিয়েছেI তা, আপনি কি কাজ চান ? উনি বললেন, সার্টেনলি – কেন, কোনও প্রব্লেম ? বললাম একটা মানুষ কাজ করতে পারে মন দিয়ে, যদি সব facilities পায়I আপনারা আমাকে যেখানে থাকতে দিয়েছেন, সেখানে যদি আমাকে থাকতে হয় তাহলে আমার কাছ থেকে কোনও কাজ প্লিজ expect করবেন নাI উনি সব জেনে বিশ্বজিৎকে বললেন, পাত্র সাহেব, আমি আপনাকে ১০দিন সময় দিচ্ছিI তার মধ্যে সরকার সাহেবের requirement অনুযায়ী উনার ঘর ঠিক করে দিতে হবেI Report to me after 10 days. আমার থাকার জায়গাটা ছিল মোটামুটি লম্বাটে একটা রুমI পরের দিন থেকেই renovation শুরু হয়ে গেলI আমি সকাল থেকে সন্ধ্যে পর্যন্ত অফিসে থাকতামI সেই সময়ই ঘরের সব কাজ হতI

১০ দিনের মধ্যে ঘরের চেহারা আমূল পাল্টে গেলI নতুন floor mat, carpet (যেটা শতছিন্ন, ধূলি-ধূসরিত ছিল), বাহারি পর্দা, ডাইনিং টেবিল, rack, electric-এর সব নতুন gadgets and lamps, বেশ উঁচু মতন foreign made room heater – যা শুধু শীতের জায়গাতেই দেখা যায়I সবচেয়ে বেশী পাল্টালো বাথরুম – নতুন বড় geyser, water shower, commode, urinal pan, basin, mirror with rack – অর্থাৎ যাবতীয় দরকারী জিনিস দিয়ে বাথরুমকে নতুন রূপ দিলI বুঝলাম, আমাদের সঙ্গে D.G.H.C.র এইজাতীয় কাজে কত ফারাক – অন্তত সেযুগেI

আগেই বলা ছিল, পরের দিন Zimba সাহেব আমাকে নিয়ে গেলেন D.G.H.C.র হেড অফিসে যেখানে সুভাষ ঘিসিং বসতেনI উদ্দেশ্য, D.G.H.C.র সেক্রেটারীর সঙ্গে আমার আলাপ করানোI ভদ্রলোক প্রথমেই ইংরেজীতে বললেন – আপনার বাড়ী তো কলকাতায়I এখানে বাড়ীর সকলকে ছেড়ে আছেনI আপনি যখন খুশী কলকাতায় যাবেনI যতদিন খুশী থাকবেনI আমরা কিছু মনে করব নাI তবে একটা কাজ করতে হবে – we want workI আমাদের সব schemes বা projects তো আপনার PHE ডিপার্টমেন্ট sanction করে এবং সেইমত আমরা ফান্ড পাইI আপনি নিজে Initiative নিয়ে scheme গুলো এখানে তৈরী করে PHE ডিপার্টমেন্ট থেকে sanction করিয়ে আনবেনI

আমি থাকাকালীন তিনজনIAS সেক্রেটারীকে পাইI প্রত্যেকের সঙ্গে ছিল সত্যিকারের হৃদ্যতাI একজন সেক্রেটারী (শেষের জন – নাম মনে নেই) তো কোনও বড় মিটিং হলে আমাকে পাশে বসিয়েই কথাবার্তা চালাতেনI সত্যিই অতুলনীয় এখানকার মানুষের ব্যবহারI পরের কথা থেকে সেটা আরও স্পষ্ট হবেI

আমার অফিস ছিল দার্জিলিং স্টেশনের উল্টোদিকে একটা ছোট পাহাড়ের ওপরI লোকজন বা স্টাফ খুব অল্প, আর মহিলা কর্মীর সংখ্যাই বেশীI আমি ১০টার মধ্যে অফিসে এসে যেতামI অন্যরা আমার একটু পরে এসে কি ছেলে, কি মেয়ে – প্রত্যেকে অফিসে এসে প্রথমেই আমার রুমে ঢুকে “namaste” বলে তারপর নিজের জায়গায় যেতI ওখানে সন্ধ্যা নামে তাড়াতাড়িI তাই ওরা একটু আগেই বেরিয়ে যেতI আবার যাবার সময় প্রত্যেকে আমার ঘরে এসে “namaste” বলে তবে বাড়ী যেতI জানি না, সৌজন্যের এই সংস্কৃতিটি এখনও আর আছে কিনাI কিন্তু আমি যা দেখেছি, সেটাই লিখলামI

একটা কথা, আমি তো আগে অফিস থেকে বেরোতে পারি না – সব কাজ সেরে বেরোতে দেরী হতI রোজ ফেরার সময় দেখতাম একজন নাম পাসাং, সে ছিল বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী, তখনও বসে আছেI রোজ আমার সঙ্গে গাড়ীতে ফিরত – মাঝপথে নেমে যেতI একদিন থাকতে না পেরে জিজ্ঞেস করলাম – পাসাং, সবাই তো চলে যায়, তুমি বসে থাকো কেন? ইংরেজীতে বলল, Sir, boss Is my Lord. My duty Is to protect him. ওর প্রতি এক কৌতুহলে একদিন অফিসের কাছেই ওর বাবা-মায়ের সাথে আলাপ করতে ওর বাড়ীতে গিয়েছিলামI কি মিষ্টি ব্যবহার সকলের! ওখান থেকে একটা বই চেয়ে এনেছিলাম – বুদ্ধদেবের জীবনীI পড়ে ফেরত দিয়েছিলামI

আমি যত জায়গায় গিয়েছি – তার মধ্যে দার্জিলিং শ্রেষ্ঠI কি মনোরম দৃশ্যাবলী, কি লোকজনের অমায়িক ব্যবহার ! এখন বোধ হয় সেসব পাওয়া ভার, বিশেষত গোর্খা আন্দোলনের পরI

সবশেষে কাজের সামান্য কথা বলে আমার লেখা শেষ করছিI
দার্জিলিঙে D.G.H.C.র আন্ডারে কাজের সম্পূর্ণ স্বাধীনতা ছিলI কালিম্পঙে Deolo Reservoir-এর সুদীর্ঘ Rising main-এর re-design থেকে শুরু করে কার্শিয়াংএ মিরিক লেকের পাশে বিরাট জায়গায় জলাধার নির্মাণের Design করার ভার আমার ওপর ন্যস্ত ছিলI এই Proposed জলাধারের জলের Source ছিল অজস্র পাহাড়ী ফোয়ারা – যেগুলো পাথরের খাঁজ থেকে বেরিয়েছেI এই Project-এর Sanction ও Fund-এর জন্য কয়েকবার দিল্লীতেও ছোটাছুটি করতে হয়েছেI

দার্জিলিং অত্যধিক বৃষ্টির জন্য বিখ্যাতI প্রায় সারা বছরই বৃষ্টিপাত হয়I ২০০০ সালের আগে এখানের অ্যানুয়াল Rainfall ছিল 2500mmI পরে আমি যখন যাই, Rainfall statistics থেকে জানতে পারি – সেটা কমে প্রায় 2000mm এ এসে দাঁড়িয়েছেI লক্ষ্য করলাম, সব বাড়ীর ছাদই ঢালু (slant) যাতে জল না দাঁড়ায়I এত বৃষ্টিপাত সত্ত্বেও সারা বছর ধরে দার্জিলিং এ জলের অভাব। চিন্তা করে দেখলাম, এই প্রচন্ড বৃষ্টিকে যদি ধরে রাখা যায় এবং পানীয়ের উপযোগী করে তোলা যায় – অর্থাৎ বৈজ্ঞানিক ভাষায় Rain Water Harvesting কে কাজে লাগানো যায়! গোটা কয়েক Sketch করলামI Public Health Engineering Department, WB -এর তৎকালীন প্রিন্সিপাল সেক্রেটারীকে দেখালামI উনি দারুণ উৎসাহ নিলেনI উনারই উৎসাহে কালিম্পঙে ২-টি এবং দার্জিলিঙে ১-টি Rain Water Harvesting Plant বসানোর ব্যবস্থা করলামI

দরকার ছিল বৃষ্টির জল ধরে রাখার জন্য বড় বড় PVC TankI বৃষ্টির জল যথোপযুক্তভাবে ধরে সামান্য ফিল্ট্রেশন এবং ক্লোরিনেশনের পর সেটা জমা করা হত ওই সব ট্যাংকেI সেটা এমন উচ্চতায় বসানো ছিল যে সেখান থেকে Valve অপারেট করে মাধ্যাকর্ষণের মাধ্যমে সেই জল প্রয়োজনমত চলে যেত বিল্ডিংএর নির্দিষ্ট কক্ষেI

আমি দার্জিলিঙে থাকাকালীন কালিংপঙ-এ একটা Rain Water Harvesting Plant (Kalingpong PHE অফিস-এ) চালু করে আসতে পেরেছিলামI কালিম্পঙে আর একটা Plant কমপ্লিট হয়েছিলI কিন্তু বিশেষ কারণে তখনও Commission হয়নিI আর দার্জিলিঙের D.G.H.C.র PHE অফিস-এর Plant-টা ছিল বিরাট বড় – কারণ Staff সংখ্যা বেশীI ওটার কাজ Under Progress ছিলI কলকাতার Planning Circle-এ আমার ট্রান্সফার হয়ে গেলI তাই ওগুলো সব কমপ্লিট করে আসতে পারলাম নাI

কিন্তু কলকাতায় এলেও Rain Water Harvesting-এর ভূত আমার মাথা থেকে গেল নাI তাই, Planning Circle-এ থাকাকালীন চেষ্টা করলাম এদিকে কোথাও Rain Water Harvesting করার Scope আছে কিনা, যদিও এখানে দার্জিলিং-এর তুলনায় Rainfall অনেক কম (Maximum Annual 1500mm)I তা সত্ত্বেও দক্ষিণ ২৪ পরগনার বাসন্তীতে একটা স্কুলের প্রাঙ্গণে বিরাট বড় পুকুরে বাইরে থেকে কয়েকটা Drain-এর মাধ্যমে বৃষ্টির জল এনে সেই জল পাম্প করে একটা মোটামুটি বড় চৌবাচ্চা বা Surface Reservoir-এ ফিল্ট্রেশন এবং ক্লোরিনেশন করে হ্যান্ড পাম্পের সাহায্যে সাপ্লাই করার ব্যবস্থা হলI স্কুলের ছাত্ররা ছাড়াও গ্রামের অনেক মহিলা ওই জল সংগ্রহ করে নিয়ে যেতেনI

বাঁকুড়াতে অনেকদিন ধরে একটা বিশাল Open-cast অথবা Open pit কোলিয়ারী Abandoned ছিল, যদিও বড়জোড়াতে এই রকম কোলিয়ারীর সংখ্যা বেশীI যাইহোক, যেটার কথা বলেছি, তার Abandoned pit-টা ছিল বিরাট বড়, একটা দীঘির মতন – আদর্শ Rain Water PitI ওখানে জলের আর কোনও source ছিল নাI এই Pit-এর জলকে Rain Water Harvesting-এর জন্য Ideal বুঝে ছোট্ট একটা Portable Treatment Plant বসাই শুধুমাত্র ফিল্ট্রেশন আর ক্লোরিনেশন-এর জন। এই Plant বসানোর ফলে একটা বিরাট Arid Area উপকৃত হয়I অবশ্য, এর আগে, রামকৃষ্ণ মিশন বাঁকুড়াতে কয়েকটা ছোট ছোট Rain Water Harvesting Plant বসিয়েছেI উনাদের আমন্ত্রণে আমরা গিয়ে দেখে এসেছি – উনাদের কাজ সত্যিই প্রশংসনীয় !

আজ আমার আপাতত এইটুকুই।

*********

Sahityika Admin

Add comment