সব কাল্পনিক
© শঙ্খ কর ভৌমিক, ১৯৯৭ মাইনিং ইঞ্জিনিয়ারিং
ছোটবেলায় যখন ডাকঘরের অমলের মত বন্ধ ঘরের জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকতাম, কুলগাছের ডালে বসা গিরগিটিটার রংবদল দেখা ছিল একটা প্রিয় বিনোদন। কেমন বদলে বদলে যায়- লাল থেকে সবুজ, আবার বাদামী, আবার ছাইরঙ!
আরেকটু বড় হয়ে গুটিপোকা পুষলাম, একদিন ডানাওয়ালা ঝলমলে প্রজাপতি হয়ে বেরিয়ে এল- কি অদ্ভুত পরিবর্তন!
কোনকিছু একরকম থাকে না।
এই যেমন জীবন। এই তো কদিন আগে ছিল একটা ছিমছাম ছোটবেলা। ক বছর পর হয়ে গেল একটা অভিমানী কৈশোর। আবার কয়েকবছর পর একটা দুঃসাহসী যৌবন, এখন যেটা হয়ে গেছে একটা উদ্বিগ্ন মাঝবয়স।
মানুষও ঠিক সেরকম। কিছু বছর আগে যে ছিল কঞ্চি (যেটা কখনো তলোয়ার হয়, কখনো বঁড়শি) হাতে ঘাসে হেঁটে বেড়ানো, দীঘির পাড়ে শাপলাফুলের দিকে অবাক তাকিয়ে থাকা বালক, সে হয়ে যায় হতে চাওয়া কবি, আবার হয়ে যায় ই এম আইক্লিষ্ট ছাপোষা।
কত সুখ মনখারাপে বদলে যায়। কত প্রিয়জন মুখদর্শন করতে না চাওয়া অমুক কিংবা তমুক। আজকে যে জীবনযুদ্ধের নায়ক, কাল সে ধার চেয়ে বেড়ানো পরাজিত সৈনিক। কত ভালবাসা শুধু তিক্ততা, তারপর নিছক ঔদাসীন্য হয়ে যায়। কত জলজ্যান্ত মানুষ হয়ে যায় শুধু স্মৃতি।
ছিল ডিম, হয়ে গেল দিব্যি একটা প্যাঁকপ্যাঁকে হাঁস,
এ তো হামেশাই হচ্ছে।
পথ থাকে পথের মত।
পথিক শুধু হেঁটে যায়।
পথের দুধারের দৃশ্যগুলো বদলে বদলে যায়।

******
ফেবুকবি ছাপাকবি সংবাদ
(গুরুদেব সুকুমার রায়ের শ্রীচরণে শতকোটি প্রণামপূর্বক)

হ্যাঁরে হ্যাঁরে, তুই নাকি কাল, খালাসিটোলায় খেয়েছিস মাল?
আর সেদিন নাকি কোন এক ফাঁকে, কোট করেছিস সুনীলদাকে?
আর ফেসবুকে তোর ভক্তগুলো- একেকখানা রাঙ্গামুলো?
আর এই যে শুনি তোদের পাড়ায়, লাইক বা শেয়ার মিলছে ভাড়ায়?
সেদিন নাকি লাইভ আসরে- নেমেছিলিস লুঙ্গি পরে?
ক্যান রে ব্যাটা, নেই কি ভয়? লিখলেই কি আঁতেল হয়?
ছিঁড়বি আমার গুপ্তকেশ। আমার লেখা ছাপায় ‘দেশ’।
আই ডোন্ট কেয়ার কানাকড়ি। জানিস, আমি দেরিদা পড়ি?
থাকত আজকে শক্তিদাদা, চারটে খিস্তি ছিলই বাঁধা।
আরে আরে, মারবি নাকি? চন্দ্রিল…না, শ্রীজাতকে ডাকি।
ভাট বকেছি, রাগ কোরোনা। জিভ খসে যাক। হোক করোনা।
হাঁহাঁ, তাতো সত্যি বটেই। পদ্য লিখলে এসব ঘটেই।
মিথ্যে কেন লড়তে যাবি? ভেরি ভেরি সরি। ভদকা খাবি?
শেকহ্যান্ড আর দাদা বল। সব শোধবোধ, সেলফি তোল।
আদরবাসা- অলরাইট? ঋদ্ধ হলাম। গুড নাইট।
******

ছোটবেলায় এক বুড়ো বন্ধু ছিলেন। মাসে একদিন ভিক্ষা চাইতে আসতেন। এসে হাঁক পাড়তেন, “ব্রইহ্মচারী হারাধন পাল। অমুক জায়গায় তমুক আশ্রম। সকাল দুপুর ও রাইতে জৈজ্ঞ হয়।”
হাঁক শুনে একটা টিনের কৌটোয় একমুঠো চাল নিয়ে বেরিয়ে এসে ঝোলায় ঢেলে দিতাম। তারপর একটু গল্প করতাম।
দীনহীন চেহারা। বেশিরভাগ ধার্মিকদের যেমন একটা স্নিগ্ধ ভাব থাকে, মুখে স্মিত হাস্য, তেমন নয় ঠিক।
সারা জীবনে এই একটি লোক শুধিয়েছিলেন, “তোমার কী করতে ইচ্ছা করে?”
বড় হয়ে একবার গিয়েছিলাম ব্রহ্মচারী হারাধন পালের বলে যাওয়া জায়গায়। সেখানে কোন আশ্রম নেই।
হয়তো হারাধন পাল ততদিনে প্রয়াত হয়েছিলেন বা তাঁর আশ্রম উঠে গিয়েছিল। এমনও হতে পারে, তিনি যাগযজ্ঞ কিছুই করতেন না, বাড়ি বাড়ি ভিক্ষা করে পাওয়া চাল দিয়ে পেট ভরাতেন। তাতে কী। ভেক কে না ধরে কখনো না কখনো। আর যজ্ঞ করা লোকেরা সবাই কি আর পরম সত্যবাদী হয়?
কিন্তু ইচ্ছার কথা জানতে চেয়েছিলেন।
আমি এত বয়সে কোনো শিশুকে জিজ্ঞাসা করে উঠতে পারলাম না তার কী করতে ইচ্ছা করে।
সাহসই পাই না।
*********






Add comment