ইতালির এটা সেটা (দ্বিতীয় পর্ব)
© অঙ্কিতা মজুমদার, ২০০৯ ইলেকট্রনিকস ও টেলি কমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং
ইতালির এটা সেটা (দ্বিতীয় পর্ব)
বাস থেকে নামলাম যেখানে সেখানে পর পর খাবারের দোকান। ক্যাফে, পিজ্জা, ওয়াইন। এখন সান্ধ্যকালীন খাবার খাওয়া হবে নাকি রাতের খাবার ঠিক করতে করতেই আরো মিনিট পনেরো কেটে গেল। কারণ তখনই সন্ধ্যা প্রায় সাতটা বাজে আর পরদিন ভোরেই আমাদের ভেনিস যাওয়ার বাস। এদিকে আবার এই ক্যাফেগুলাতে খেলে তালহাদাদের ভেজ খেতে হবে কেননা এইসব জায়গায় হালাল খাবার দেয় না। আবার ভেজ খেয়ে মন ভরবে না এই খিদের মুখে কারণ এই খাবারগুলাও আমাদের চেনা নয়। কেমন লাগবে তার ঠিক নাই। তালহাদারা যদিও সবই খেয়ে নেবে বলছে, আমার মনে খুঁত খুঁত করছে। অন্যান্য দিনে ভেজ খেতেই হবে হয়তো। এখন খিদের সময় মন ভরে খেতে না পারলে ভালো লাগে!
গুগলের ভরসায় বেশ খানিক দূরে একটা টার্কিশ দোকান পাওয়া গেল। ঠিক হল এইখানে একটু ঘুরে ছবি টবি তুলে আমরা একেবারে রাতের খাবার খেয়ে নেব। কারণ ততক্ষণে আমরা হাঁটতে হাঁটতে ডুওমো (Duomo di Milano) চলে এসেছি। আর খেয়ে দেয়ে আবার এখানে আসতে গেলে অন্ধকার হয়ে যাবে, ছবি উঠবে না।

ডুওমোর সামনে এসে আমি এতটাই অবাক যে খালি একদৃষ্টে চেয়ে আছি। এত বিশাল একটা চার্চ! শুধু বিশাল নয়, আড়ম্বড়, শিল্পকর্ম এবং শ্রেষ্ঠত্বের এক অদ্ভুত মেলবন্ধন! এটি আসলে ব্যাসিলিকা অফ দি নেটিভিটি অফ সেইন্ট মেরি। মিলানের বিখ্যাত ক্যাথিড্রাল যা কিনা ইতালিয়ান রিপাবলিকের মধ্যে বৃহত্তম। ছয় শতাব্দী ধরে এই চার্চ তৈরী হয়েছে।
এর কিছুটা ইতিহাস বলি:
ব্যাসিলিকা অফ দি নেটিভিটি অফ সেইন্ট মেরি (Basilica of the Nativity of Saint Mary) বা মিলান ক্যাথেড্রাল (Duomo di Milano) হলো ইতালির মিলানে অবস্থিত বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম ও বিখ্যাত গথিক ক্যাথেড্রাল। এটি মূলত সেন্ট মেরির জন্ম বা কুমারী মেরির জন্মকে উৎসর্গ করা হয়েছে।

(Duomo di Milano) এর ছবিগুলো সাধারণত যা তুলে ধরে:
• বাহ্যিক দৃশ্য: হাজার হাজার সূক্ষ্ম সূঁচালো চূড়া (spires), মার্বেল পাথরের তৈরি ভাস্কর্য এবং সাদা-গোলাপী রঙের भव्य গঠন।
• ছাদ: দর্শনার্থীরা ক্যাথেড্রালের ছাদে হেঁটে যেতে পারেন, যেখান থেকে পুরো মিলান শহর দেখা যায়।
• অভ্যন্তরীণ অংশ: বিশাল গথিক থাম, রঙিন কাঁচের জানালা (stained glass), এবং সূক্ষ্ম কারুকার্য।
• ‘মাডোনিনা’ (Madonnina): ক্যাথেড্রালের সবচেয়ে উঁচু চূড়ায় থাকা কুমারী মেরির সোনালী মূর্তি, যা মিলান শহরের একটি প্রতীক।
ধর্ম বুঝি না বুঝি এই ডুওমো আমি হাঁ করে তাকিয়ে দেখেছি। ইতালিতে একটা জিনিস লক্ষ্য করলাম। ভার্জিন মেরিকে নিয়ে এদের খুবই হুলুস্থূল ব্যাপার। যেমন ১৫ই আগস্ট আমরা যখন ফ্লোরেন্সে, জানতে পারলাম সেইদিন তাদের জাতীয় ছুটি কারণ সেইদিন ভার্জিন মেরি স্বর্গে গেছেন। আবার এই মিলানের ক্যাথিড্রালও। আমি খ্রিস্টান ধর্ম সম্পর্কে খুব কিছু জানি না। অবশ্য কোনো ধর্ম সম্পর্কেই যে জানি এমনটা নয়। শুধু জানি ক্যাথলিক আর প্রোটেস্ট্যান্ট নামের দুটো ভাগ আছে। কৃষ্ণনগরে এই দুই চার্চ আছে যেখানে আমরা বড়দিনে বাড়ির সবাই মিলে যেতাম। তখন থেকেই অল্প স্বল্প জ্ঞান। ক্যাথলিক চার্চ আমার বাড়ির কাছে হওয়ায় আমি সেখানে প্রায়ই যেতাম। আমার চার্চ এ যেতে ভালোও লাগত। নিস্তব্ধ, শান্ত। জানি কেবল ক্যাথলিকদের যীশু এবং মাতা মেরির মূর্তি থাকে আর প্রোটেস্ট্যান্টদের কেবল ক্রুশ। তা যখন ইউকে এলাম দেখি সবই চার্চ অফ ইংল্যান্ড। আমি ভাবি হবেও বা এই দুই শাখার কোনো একটা। ইংল্যান্ডে বলে এমন নাম। ভুল ভাঙলো চাকরি শুরুর পর। শুরুতে বোধহয় ইংল্যান্ডে আগে শুধু ক্যাথলিক চার্চই ছিল। তা রাজা অষ্টম হেনরির বৌকে ডিভোর্স দিয়ে আরেকখান বিয়ে করার শখ হলো। এদিকে ক্যাথলিক চার্চ ডিভোর্স দেওয়ার অনুমতি দেয় না। তাই রাজা নিজেই শুরু করলেন চার্চ অফ ইংল্যান্ড। স্রেফ ডিভোর্স দেবেন বলে। রাজা হওয়া কিন্তু হেব্বি ব্যাপার। তিনি যদিও একবার ডিভোর্স দিয়েই ক্ষান্ত হননি, ছয়বার বিয়ে করেন এবং কয়েক বৌয়ের গর্দান দেন।

ডুওমোর কাছেই মিলনের সবচেয়ে বড় শপিং মল গ্যালেরিয়া ভিটোরিও ইমানুয়েল। যা নিজেই একখান আস্ত শিল্প। আর মানুষজন যে কী মারাত্মক ফ্যাশনেবল! সাথে সুন্দর চোখ, নাক, মুখ সবকিছুই যেন খোদাই করা। সব্বার দেখি লম্বা নাক। আমার অবশ্য নাকের প্রতি আলাদাই ব্যথা। নিজের সিঙ্গারার মত নাক কিনা! ছোটবেলায় মা নাক টেনে দিত লম্বা হবে বলে আর আমি থ্যাবরা করে দিতাম আমার দরকার নাই বলে। এখন মনে হয় কিজানি হয়তো একটু লম্বা হতেও পারত। না হয় একটু টিকালো সিঙ্গাড়া হত! ইংল্যান্ড আর ইতালির মানুষজনের পোশাক আশাকের ধরণও বেশ আলাদা। ইংল্যান্ডে সবাই কেমন একরকমের জামাকাপড় পরে। মিলানে অন্যরকম। আর যদি শারীরিক সৌন্দর্য আর ফিচার্সের কথা যদি বলি তবে ইটালি ইংল্যান্ডকে বলে বলে দশ গোল দেবে!
একরাশ ভালোলাগা, বিস্ময় কখন যে শরীরের ক্লান্তি ভুলিয়ে দিয়েছে টেরই পাইনি। আস্তে আস্তে ধাতস্থ হতে টের পেলাম আর দাঁড়ানো যাচ্ছে না। হাত পা কাঁপছে। সবার এক অবস্থা। কোনোমতে নিজেদের নিয়ে টার্কিশ রেস্টুরেন্টে পৌঁছে তবে শান্তি। যদিও সেই দোকানে একটাই ছেলে দৌড়ে দৌড়ে সব্বাইকে খাবার দিচ্ছে। আর দোকানে গিজগজে ভীড়!
তার পরেও পেট ভরে গেলেই পৃথিবীটা আবার দারুন জায়গা হয়ে যায়! খেয়ে দেয়ে হেঁটে হেঁটে আবার ডুওমোর সামনে দিয়ে ফিরছি। তখন অন্ধকার হয়ে গেছে। তার ভেতরে চারপাশে হলদে আলো আর সামনের ফাঁকা জায়গায় অচেনা ভাষায় গান গাইছে একটি ছেলে। মায়া মায়া হলদে আলোয় অন্য ভাষার গানে কী যে জাদু তা ওই সময় ঐখানে না থাকলে জানাই হত না! সেই মায়া গায়ে নিয়ে হেঁটে হেঁটে মিলানের বন্ধ হওয়া দোকানপাটের ভেতর দিয়ে হেঁটে হেঁটে যখন বিএনবি পৌঁছালাম তখন শরীর ছুটি চাইছে, কিন্তু মন বড় আদুরে মায়ায় ভরে আছে।

মিলান আমায় মুগ্ধ করেছে, ঘাড় ধরে হাঁ করে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে এক বিশাল উঁচু বাড়ির সামনে। কানে কানে বলেছে ধর্ম তো আসলে শিল্পেই। গানে, অক্ষরে, ছবিতে, স্থাপত্যে। অনেককাল আগে সেই অঞ্জন দত্ত ম্যাডলি বাঙালিতে বলেছিলেন, ঠিক সেইরকম। আর মানুষে। মানুষ যে কখনো কখনো জাদুকর হয়ে যুগের পর যুগ ধরে ম্যাজিক তৈরী করে রাখতে পারে, এ আমি খুব বেশিবার বিশ্বাস করিনি। আদ্ধেক দিনে একটা শহর দেখা যায় না। আমরাও দেখিনি। আমি মিলান গেছিলামই মিলান ফ্যাশনের আতুরঘর বলে। সেখানে নানান ছোট বড় ডিজাইনারের শপ আছে বলে। তার কিছুই হয়নি। তবে আফসোস নাই। আধবেলায় একটা শহর আমায় ক্লান্তি ভুলিয়ে দিয়েছে কিছুক্ষনের জন্য! একটা ঘর তৈরী করে দিয়েছে আশেপাশে। মনে মনে টুপি খুলে রাখতে বাধ্য করেছে। এই বা কম কী!

*******






Add comment