সাহিত্যিকা

সত‍্যজিতের সঙ্গীত

সত‍্যজিতের সঙ্গীত
© সুকান্ত রায়, ১৯৭৭ ইলেকট্রনিকস ও টেলি কমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং (জ্ঞানের গন্ধর্ব)

সত‍্যজিতের সঙ্গীত (প্রথম ভাগ)
ফরাসি ভাষায় একটা কথা আছে ‘auteur’ – সাদা বাংলায় এর মানে হল লেখক (author)। কিন্তু কথাটা ব‍্যাবহার করা হয় চিত্রপরিচালকের সম্বন্ধে যিনি বহুমুখী প্রতিভা নিয়ে তাঁর চলচ্চিত্রকে এমন একটি পর্যায়ে নিয়ে যান যে মনে হয় তিনি সিনেমা তৈরির সাথে সাথে গল্পটিও লিখছেন, একজন লেখকের মতো। সত‍্যজিত রায়ের তুলনা এই শব্দটির সাথে। একাধারে চিত্রনাট‍্য, সঙ্গীত, ক‍্যামেরা, সেট ডিজাইন, সিনেমাটোগ্র‍্যাফি থেকে শুরু করে কস্টিউম, লোকেশন এমনকি সিনেমার পোস্টার আঁকা পর্যন্ত সবই উনার নিজের হাতে।

সত‍্যজিতের সঙ্গে আমার পরিচয় কিশোর বয়সে, স্কুল ছাড়ার সময়। ঘটনাচক্রে সত‍্যজিতের প্রথম ছবি আর আমার দেখা সৎজিতের প্রথম ছবি, দুটোই এক। প্রথম দেখে ছবিটা পুরো বুঝিনি। যেটুকু বুঝেছিলাম, তাতে মনে হয়েছিল যে ছবিটা অন‍্য বাংলা ছবিগুলোর থেকে আলাদা, বিশেষ করে এর সঙ্গীত। পরে জেনেছি ছবির সঙ্গীত সত‍্যজিত দেননি, দিয়েছিলেন সঙ্গীত জগতের আরেকজন যুগপুরুষ। সে যাই হোক, সত‍্যজিতের ছবিতে সঙ্গীতের ওপর টান সেই তখন থেকে। পরে যত বড় হয়েছি, বিভিন্ন পত্রিকায়, বইতে, সাক্ষাৎকারে সত‍্যজিতের সম্বন্ধে অনেক লেখাই পড়েছি। পড়তে পড়তে মনে হয়েছে সত‍্যজিতের চিত্রপরিচালনা এবং ছবি সম্পর্কে যতো লেখা হয়েছে এবং আমার চোখে এসেছে, তার সিকিভাগও সত‍্যজিতের সঙ্গীত সম্বন্ধে লেখা হয়নি। তাই সত‍্যজিতের এই সুবিশাল প্রতিভা নিয়ে চোখ বাঁধা কলুর বলদের মতো অধমের এই ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা। চিত্রপরিচালক সত‍্যজিত না সঙ্গীতজ্ঞ সত‍্যজিত, কে বড় এই নিয়ে তর্ক হতেই পারে, ক্ষতি নেই, চলতে থাকুক। আমার এই প্রতিবেদনের উদ্দেশ্য সেই বিতর্কের আগুনে ঘি ঢালা নয়, বরং একে অন্ধের হস্তীদর্শন হিসেবে নিলে ঠিক হবে।

সঙ্গীতের প্রভাব সত‍্যজিতের জীবনে সেই ছেলেবেলা থেকেই। দাদু উপেন্দ্রকিশোর ও বাবা সুকুমার ছিলেন ছিলেন সত‍্যজিতের মতোই বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী। উপেন্দ্রকিশোর শুধু লেখালিখিই করতেন না, উনি একজন চিত্রকর, দার্শনিক, প্রকাশক, শখের জ‍্যোতির্বিদ এবং সর্বোপরি এক সুরকার ও নামী বেহালাবাদক। মায়ের দিকের পরিবার ছিল গানের, প্রত‍্যেকেরই অল্পবিস্তর নাম ডাক ছিল। মাতামহ কালীনারায়ন ছিলেন এক খ‍্যাতিমান সুরকার। স্বাভাবিকভাবেই রবীন্দ্রসঙ্গীত ও ব্রাহ্মসঙ্গীতের সেই পরিবেশেই বেড়ে ওঠেন শিশু সত‍্যজিত।

পাশ্চাত্য সঙ্গীতের সঙ্গে সত‍্যজিতের পরিচয় নিয়ে একটা মজার গল্প বলি। সত‍্যজিতের বাড়িতে অনেক বড়বড় বইয়ের আলমারি ছিল। সেই আলমারির বই গুলো দেখতে দেখতে একদিন সত‍্যজিতের চোখ পড়ে একটা ইংরেজি বইয়ের ওপর, নাম ‘book of knowledge’; তাক থেকে বইটি পেড়ে, এলোমেলো ভাবে পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে প্রথম যে ছবিটাতে চোখ আটকায় সেটা ছিল বেথোভেনের। এবার যাই, তার নিজের স্মৃতিচারণায় – “একদৃষ্টে তার দিকে তাকিয়ে থাকি সম্মোহিতের মতো। লেখাগুলো পড়ে ফেলি চটপট। সেদিনের মতো বইটা রেখে বন্ধুকে বলি সেকথা। বাড়ি ফিরে দেখি বিথোভেনের বেহালার কনসার্টের একটা রেকর্ড বাড়িতে। রেকর্ডটা ১৯২০ সালের, কে যে মালিক তা জানিনা। কিন্তু এটা আমি শুনে আসছি সাত বছর বয়স থেকে।” Book of knowledge এ পাশ্চাত্য সঙ্গীতের বিভিন্ন সুরকার, বিশেষ করে বেথোভেনের সম্বন্ধে পড়তে পড়তে তাঁকেই গুরু মানেন সত‍্যজিত। পরবর্তীকালে তিনি বলেছিলেন “কেউ যদি আমাকে বেথোভেনের ওপর একটা তথ‍্যচিত্র করতে বলে, আমি সব কাজ ছেড়ে তক্ষুনি ঝাঁপিয়ে পড়বো।

আবার জানিয়ে রাখি, ছবি নিয়ে লিখছি না, লিখিছি উনার সঙ্গীত নিয়ে। সঙ্গীতই মুখ‍্য যদিও তাঁর ছবির কথা বাদ দেওয়া যাবেনা কারন সত‍্যজিতের ছবি ও তাঁর সঙ্গীত একে অন্যের সাথে ওতোপ্রতোভাবে জড়িত। তবে সত‍্যজিত নিজে সিনেমায় সঙ্গীত সম্বন্ধে যা বলেছেন সেটা মনে রাখতে হবে। তাই আমার লেখায় এই সিনেমার কথা খুব subtly আসবে। ছবির বদলে শটের কথা। এর বেশি কিছু বলবোনা।

পাশ্চাত্য সঙ্গীতের প্রতি সত‍্যজিতের আসক্তি তার সিনেমা জীবনের অনেক আগে থেকেই। সত‍্যজিত তখন কাজ করেন বিজ্ঞাপন সংস্থা ডি জি কেমারে। মাসমাইনের অনেকটাই খরচ হত সিম্ফনি (পূর্ণাঙ্গ অর্কেস্ট্রা), সোনাটা (দুটি বাদ‍্যযন্ত্র দিয়ে রচনা, যেমন পিয়ানো ও বেহালা, অনেকটা যুগলবন্দীর মতো) ও কনসার্তোর (মূলতঃ একটি বাদ‍্যযন্ত্রে বাজানো, যেমন পিয়ানো বা বেহালা) রেকর্ডের ওপর। পাশ্চাত্য স্বরলিপির ওপর জ্ঞান ও দখল ধীরে ধীরে যেমন বাড়তে লাগলো, স্বরলিপির সূক্ষ্ম কাজগুলোও আয়ত্ত্ব করতে বেশি সময় লাগলো না। পাশ্চাত্য সঙ্গীতের অনুরাগের সঙ্গে সঙ্গে আরও একজনের ওপরেও সত‍্যজিত অনুরাগী হলেন। বলা যেতে পারে পাশ্চাত্য সঙ্গীতই দুটি মনের কাছাকাছি আসার মূল অবলম্বন হয়ে দাঁড়ালো – সত‍্যজিত ও তার পিসতুতো দিদি বিজয়ার। পাশ্চাত্য সঙ্গীতের প্রতি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা দুজনকে আরও কাছাকাছি এনে একেবারে বিয়ের পিঁড়িতে বসিয়ে দিলো।

কেমার কোম্পানিতে থাকাকালীন কর্মসূত্রে বিজয়াকে নিয়ে লন্ডনে যাওয়া সত‍্যজিতের সঙ্গীত জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়। কাজ ছাড়াও পাশ্চাত্য‍্ সিনেমা এবং সঙ্গীতের টানে দুজনেই সারা ইউরোপ ছুটে বেড়িয়েছিলেন। এমনই একদিন সত‍্যজিত ও বিজয়া ঠিক করলেন যে ভিয়েনায় স্বয়ং মোজার্তের বাঁশি (কনসার্তো) শুনতে যাবেন। হাতে টিকিট ছিলনা, হল ভর্তি, টিকিট পাওয়ার কোনো আশাও নেই। এমন সময় এক ভদ্রলোক দেবদূতের মতো এসে রায়দম্পতিকে দুটি টিকিট বিক্রি করলেন। মহানন্দে সেই টিকিট কিনে হলে ঢুকতে যাবেন, গেটের ভদ্রলোকটি দম্পতিকে আটকে দিয়ে বললেন যে টিকিট দুটি জাল। মাথায় বাজ পড়ার মতো অবস্থা, সহৃদয় দ্বাররক্ষক তাদের দুর্দশার কথা এবং সুদূর ভারত থেকে তারা এই কনসার্তো শুনতে এসেছেন শুনে, এদিক ওদিক ছোটাছুটি করে দুটো টিকিট জোগাড় করে দেন। এবারের টিকিট আসল ছিল।

সত‍্যজিতের ওপর বেথোভেনের প্রভাবের কথা আগেই লিখেছি। এবার আসি তার আরও দুই প্রিয় পাশ্চাত্য সঙ্গীতকারের কথায় – মোৎজার্ট এবং বাখ। মোৎজার্টের প্রতি আগ্রহ জন্মানোর পর সত‍্যজিত একে একে মোৎজার্টের অপেরাগুলো শুনতে থাকেন – ডন গিয়োভানি, দ‍্য ম‍্যাজিক ফ্লুট, আর দ‍্য ম‍্যারেজ ফিগারো। ডন গিয়োভানি, কমেডি আর ট্র‍্যাজেডির সংমিশ্রণে এক দুই অঙ্কের অপেরার গল্প শুরু হয় ডনের এক সামরিক কর্তাকে হত‍্যার মাধ‍্যমে। পুরো অপেরায় ডনের নারীর প্রতি আসক্তি এবং নীতিহীন জীবনের বিভিন্ন ঘটনা এবং শেষে গিয়োভানি তার কৃতকর্মের ফল পায়। সত‍্যজিতের কথায় “যখন আমি মোৎজার্টকে একজন সঙ্গীত জগতের একজন প্রভাবশালী ব‍্যক্তি হিসেবে বলি, তখন আমি তার অপেরা এবং বিস্তৃত নাটকের মাধ্যমে চরিত্রগুলির স্বতন্ত্রতা বজায় রাখার অলৌকিক ক্ষমতার কথা বেশি ভাবি। এমনই ছিল তাঁর সুরের মূর্চ্ছনা যে লোপোরেলোর (ডনের চাকর) তোতলানো ভয়, ধ্বংসের মুখে ডনের সাহস এবং ডন গিওভানির স্ট‍্যচু দৃশ‍্যে তার চ‍্যালেঞ্জের প্রতি কম‍্যান্ড‍্যান্টের (সামরিক কর্তার) নিরলস স্বর, একই অপেরার এই আলাদা আলাদা পটভূমিতে, তার সুরের প্রয়োগ অসাধারণ।” সত‍্যজিত লিখেছেন যে বেথোভেন, মোৎজার্ট বা বাখের সুর কখনই তার কাছে বিলিতি সুর বলে মনে হয়নি। তার কারন হিসেবে বলা যেতে পারে যে, ছোটবেলা থেকেই তিনি শুনে আসছেন ব্রাহ্মসঙ্গীত, রবীন্দ্রসঙ্গীতও। জ‍্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের কল‍্যাণে ব্রহ্মসঙ্গীত ও রবীন্দ্রসঙ্গীত দুই ধারাতেই পাশ্চাত‍্যসঙ্গীতের প্রভাব এতখানি পড়েছিল যে, সত‍্যজিতের কানে সেই প্রভাব পরবর্তীকালে বেথোভেন শোনার সময় তা অনুরণিত হত।

মা সুপ্রভার আগ্রহে এককালে সত‍্যজিত শান্তিনিকেতনের কলাভবনে ভর্তি হয়েছিলেন ছবি আঁকা শিখতে। সেখানে সত‍্যজিতের সঙ্গে আলাপ হয় দিনকর কৌশিকের। দিনকর মহারাষ্ট্রের লোক, ছোটবেলা থেকেই শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের সঙ্গে পরিচিত ছিলেন। অনেক বড়বড় ওস্তাদের গান ও বাজনা দিনকর সামনে বসে শুনেছেন। মার্গসঙ্গীতের এহেন ঘনিষ্ঠ লোকের সঙ্গে যখন সত‍্যজিতের পরিচয় হল, তাঁদের বন্ধুত্ব পরস্পরকে অত্যন্ত সমৃদ্ধ করেছিল। সত‍্যজিত তার পাশ্চাত্য সঙ্গীতের গভীর অনুরাগ দিনকরের সঙ্গে ভাগ করে নেন এবং দিনকরের থেকে ভারতীয় সঙ্গীত সম্পর্কে সত‍্যজিত অনেক কিছু জানতে পারেন। দিনকর খুব ভালো বাঁশি বাজাতেন। সত‍্যজিতের ভারতীয় ধ্রুপদী সঙ্গীতের সঙ্গে প্রথম পরিচয় এবং বাঁশির প্রভাবে তাঁর শিস দেবার অভ্যাস এভাবেই হয়তো হয়েছিল।

শান্তিনিকেতনে সত‍্যজিতের থাকার সময় আরেকজনের কথা না বললে গল্পটা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। শান্তিনিকেতনের কলাভবনের অধ‍্যাপক ডঃ আলেকজান্ডার এরনসনের খুব প্রিয় ছিলেন সত‍্যজিত। এরনসন ভালো পিয়ানো বাজাতেন, সত‍্যজিত মন দিয়ে শুনতেন সেই বাজনা। সত‍্যজিত তখন নিজের কাছে সবসময় পাশ্চাত্য সঙ্গীতের রেকর্ড রাখতেন। সেই রেকর্ডগুলোও দুজনে মিলে শুনতেন। পরবর্তীকালে সত‍্যজিতের সঙ্গীতজীবনে পূর্ণতা আসার পেছনে এই দিনগুলোর অবদান ছিল সবচেয়ে বেশি। পিয়ানোর প্রতি আগ্রহও তাই।

অনেক পরে ছবি তৈরির ফাঁকে বা অবসর সময়ে সত্যজিতের মাথায় যখনই কোন সুর খেলা করতো, উনি প্রথমে শিস দিয়ে সেটা তুলতেন। তারপর সময় বুঝে তার স্বরলিপি বানিয়ে পিয়ানোতে বসে নোটসগুলো ঘষামাজা করে ছোট ছোট কম্পোজিশনের আকার দিতেন। উৎপলেন্দুর ডকুমেন্টারি আমি দেখেছি। শিস সত‍্যজিত অনুপ ঘোষালের আগে থেকেই ভালো দিতেন। শুটিংয়ের সময় কোনো ভালো নোটেশন মাথায় আসলেই প্রথমে দু তিনবার শিস দিয়ে সেটা মাথায় রাখতেন। পরে শিস দিয়েই স্বরলিপি তৈরি করে ফেলতেন।

*******

Sahityika Admin

Add comment