হারাধনের বুড়োর দল
© প্রবীর কুমার সেনগুপ্ত, ১৯৬৯ ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং
হারাধনের বুড়োর দল, পার্কে গিয়ে সময় কাটায়
ছেলে মেয়ে দুরের থেকে টাকা কিম্বা ডলার পাঠায়।
কর্ম জীবন কষ্টে ছিল অফিস এবং নিজের ঘরে,
সে সব দিনের মন্দ মধুর স্মৃতিকে আজ আঁকরে ধরে –
দিন কেটে যায় দুঃখ সুখে, নাতনি-নাতি অনেক দূরে,
বুড়ো বুড়ির জীবন চলে- অনেকটা ঠিক ভবঘুরে।
অর্থ অভাব নেই তাহাদের – বেঞ্চে তো নেই জায়গা বেশী
কুছ পরোয়া নেই বুড়োদের বসতো গায়ে ঠেসা ঠেসি।
এমনি করে কাটছিল দিন দশটি বুড়োর মনের সুখে
সকাল বেলায় দেখা হলেই টানত সবাই নিজের বুকে
হঠাৎ সেদিন কি যে হল -গর-হাজিরা দশম বুড়ো –
ন’ জন বুড়ো হাজির হল দশের বাড়ি তারা হুড়ো।
সেথায় গিয়ে জানতে পারে লুকিয়ে ছিল কঠিন ব্যামো,
নানান রকম থেরাপি আর নিয়ম করে চলতো কেমো।
ন’জন এখন আড্ডা মারে ভুলেই গেছে দশের কথা
হা হা হো হো হাসির ভিতর লুকিয়ে রাখে মনের ব্যথা।
আরেকটি দিন সকাল বেলা ন’য়ের জন্য অপেক্ষাতে
প্রশ্ন করে একে তাঁকে, সময় তো তাদের নেই যে হাতে ।
সবাই মিলে ভীর জমালো ন’য়ের বাড়ীর সদর দোরে,
জানতে পারে – আজকে বুড়োর প্রাণ গিয়েছে অনেক ভোরে।
বছর দুয়েক ডায়ালিসিস চলছিল তাঁর – ছিলেন ভালো –
পার্কে আসর জমিয়েছিলেন ঠাট্টা মজায় গতকাল-ও।
বছর ঘুরে গরম শেষে শীতের আমেজ সকাল বেলায়
বুড়োরা সব জুবু থুবু শাল আলোয়ান কোটের ঠেলায়
আড্ডা তবু বাদ যাবে না রোজ সকালে পার্কে এসে
মাফলার আর মাঙ্কি টুপি – গল্প করে পাশে বসে
আট নম্বর বুড়ো এখন ভুগছে না কি নিউমোনিয়ায়
সঙ্গে ছিল সি ও পি ডি, শ্বাসের কষ্টে প্রাণ চলে যায়।
বাকিরা সব সুখেই আছে গল্প করে সময় কাটে,
কদিন ধরে সাত নম্বর বুকের ব্যথায় কষ্টে হাঁটে।
ই-সি-জি-তে পড়লো ধরা সি-টি স্ক্যানেও একই কথা।
হার্ট বাইপাস সার্জারিতে কমতে পারে বুকের ব্যথা।
আজকে হঠাৎ খবর দিলো সাত নম্বর বাড়ীর লোকে –
স্বর্গবাসী আজ হয়েছেন কালকে রাতের ম্যাসিভ স্ট্রোকে।
বছর ঘুরে কমতে থাকে এক এক করে বুড়োর দলে
সবাই বোঝে এ সব হলো নানান রকম রোগের ফলে।
এমনি করে কমতে থাকে ছয়, পাঁচ, চার সব শেষে তিন
সে সব ভুলে আগের মত গল্প করেই কাটছিল দিন।
লম্বা বেঞ্চে পা ছড়িয়ে তিন বুড়োয় আড্ডা মারে
পুরানো সব বুড়োর কথা ভুলেই গেছে এক্কেবারে।
তিনটি বুড়ো ভালোই আছে গল্প করে আগের মত,
রাজনীতি আর খেল দুনিয়ার আজব আজব খবর যত।
গলার দাপট কার কতটা – কম্পিটিশন লেগেই আছে,
আশে পাশের প্রতিবেশী ঘেঁষত না কেউ তাদের কাছে।
হঠাৎ সেদিন দুই জন বুড়ো তিনের জন্য অপেক্ষাতে –
খবর পেল কালকে বুড়োর প্রাণ গিয়েছে গভীর রাতে।
দুই জনে আজ সময় কাটায় আড্ডা গল্প মজা হাসি
একজনে আজ আটাত্তরে, আরেকজনে মাত্র আশি
স্বাস্থ্য শরীর ভালোই আছে রোগ অসুখের নেই কো বালাই
স্বাস্থ্য বিধি মেনেই চলে ওষুধ পথ্য দরকার নাই
সেদিন সকালে কি যে হল আশির বুড়ো করছে দেরি
আটাত্তরের বুড়ো ভাবে – দেখেই আসি তাড়াতাড়ি।
কালকে রাতে ঘুমের মাঝেই তিনি হলেন স্বর্গবাসী
বয়স তাহার খুব বেশি নয়, এই তো সবে মাত্র আশি।
ডাক্তারকে প্রশ্ন করে ওনার তো কই রোগ ছিল না
জীবনটা তো কাটছিল বেশ কোন রকম ওষুধ বিনা।
রোগ ছিল না? কি এসে যায়? বয়স ছিল আশির ঘরে –
‘বার্ধক্য‘ই আসল অসুখ, তাই গিয়েছে যম-দুয়ারে।
উপরওয়ালা যখন তোমায় নিজের কাছে ডেকে নেবে –
‘রোগ আছে’ বা ‘নীরোগ শরীর’ – লাভ হবে না এ সব ভেবে।
ডাক্তারিতে হাত পাকালাম পাক্কা তিরিশ বছর টানা,
বয়স রোগের ওষুধ কোথায়বাপের জন্মে নেইকো জানা।
একলা তুমি এসেছিলে এই সুবিশাল ধরার বুকে
স্বজন বন্ধু এঁদের নিয়ে কাটিয়েছিলে মনের সুখে
যাওয়ার সময় একলা তুমি, যাবে না আর সঙ্গে কেহ
সবার সাথে ছাড়তে হবে নিজের প্রিয় নিথর দেহ।
********






Add comment