সাহিত্যিকা

ভূমিকা

ভূমিকা
© চন্দন গুহ, ১৯৭৭ ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং

ওঁ অজ্ঞানতিমিরান্ধস্য জ্ঞানাঞ্জনশলাকয়া।
চক্ষুরুন্মীলিতং যেন তস্মৈ শ্রীগুরবে নমঃ।।
অজ্ঞতার গভীরতম অন্ধকারে আমার জন্ম হয়েছিল এবং আমার গুরুদেব জ্ঞানের আলোকবর্তিকা দিয়ে আমার চক্ষু উন্মীলিত করেছেন। তাঁকে আমার সশ্রদ্ধ প্রণতি নিবেদন করি।

গুরুর্ব্রহ্মা গুরুর্বিষ্ণুঃ গুরুর্দেবো মহেশ্বরঃ।
গুরুরের পরং ব্রহ্ম
তস্মৈ শ্রীগুরবে নমঃ।।
বহু প্রচলিত এই শাশ্বত গুরুবন্দনা মন্ত্রের অর্থ আমরা জানি। হিন্দুধর্মে ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও মহেশ্বর যথাক্রমে, সংসারের শ্রষ্টা, পালনকর্তা ও বিনাশ কর্তা হিসেবে পূজিত হন। কিন্ত এই ত্রিদেব ছাড়াও এক পরম ব্রহ্ম আছেন যিনি সবার গুরু, সেই পরম ব্রহ্মকে প্রণাম জানাই।

বৈদিক যুগে অর্থাৎ খৃষ্টপূর্ব পনের’শ থেকে এক হাজার সালের মধ্যে বিকশিত এই গুরুমন্ত্র এক অনন্য মন্ত্র যা পৃথিবীর কোন সাহিত্যেই পাওয়া যায় না। গুরু বা সংস্কৃত ভাষায় যাকে আচার্য বলে, তাঁর প্রতি এই সমর্পণ ভাব অভাবনীয়। এই সমর্পণ ভাব কেন বা কীভাবে অত প্রাচীন কালে সমাজে এসেছিল?

বলা হয় বৈদিক যুগে শিক্ষা বা জ্ঞান অর্জনের অধিকার ছিল শুধুমাত্র পুরুষ ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয়দের। অন্য বর্ণের পুরুষ বা মহিলাদের ছিল না। কিশোরকালে উপনয়ণের পর জ্ঞানার্জনের জন্য তাঁদের গুরুকূল বা গুরুগৃহে পাঠিয়ে দেওয়া হতো। একটা কথা এখানে বলা অপ্রাসঙ্গিক হবে না যে, এই গুরুকূল শব্দটি, গ্রীক বা ল্যাটিন ভাষা থেকে ইংরেজিতে এসে স্কুল শব্দে পরিণত হয়েছিল।

গুরুকূল কোথায় ছিল?
গুরুকূল ছিল প্রকৃতির মাঝে জ্ঞান অর্জনের স্থান যেখানে গুরু নিজে বাস করতেন, পত্নীসহ বা একেলা। সেই বাসস্থানে আরও অনেক শিষ্য থাকতেন। গুরুমা বা গুরুপত্নী শিষ্যদের মাতৃরূপে স্বীকৃত ছিলেন। অর্থাৎ শিষ্যকুল গুরুগৃহকেই নিজের পিতৃগৃহ জ্ঞানে বসবাস করতেন। এবং রাজার পুত্র ও অন্যন্য পরিবারের ব্রাহ্মণ বা ক্ষত্রিয় পুত্রদেরও একই আশ্রমে বসবাস করতে হতো। জ্ঞান অর্জনের সাথে শিষ্যরা অরণ্য থেকে গাছ কেটে ইন্ধন জোগাড় করতেন, নদীর পানীয় জল ও ফলমূল সংগ্রহ করতেন। এই ব্যবস্থাটি শিষ্যকে পুঁথিগত শিক্ষার সাথে জীবনেও স্বয়ংসম্পূর্ণ করে তোলার উপযুক্ত করে দিত।

গুরুগৃহে কী শিক্ষাদানের ব্যবস্থা ছিলো?
প্রাচীন কালে শিক্ষার বিষয়গুলি যে কোনো জটিল হতো না সে বলাই বাহুল্য। ব্যাকরণ, ন্যায়, ধর্ম ও অধর্ম, পূজা-পাঠ ও জ্যোতিষশাস্ত্রই ছিল শিক্ষার বিষয়। এর সাথে শরীরচর্চা ও যুদ্ধবিদ্যাও শেখানো হতো। বিশ্বামিত্র ছিলেন ক্ষত্রিয় ছিলেন, পরে ঋষি হয়ে তাঁর আশ্রমে সমরনীতির শিক্ষা দিতেন।

গুরু কী শিক্ষার জন্য শুল্ক গ্রহণ করতেন?
বৈদিক যুগে গুরু বা আচার্য শিক্ষাদানের জন্য বিনিময়ে কিছুই গ্রহণ করতেন না। তবে শিক্ষা সমাপ্ত হলে গুরুদক্ষিণা দেওয়ার প্রথা ছিল। তারও প্রকারভেদ ছিল। উদাহরণ, গুরু দ্রোনাচার্য তাঁর মানসিক শিষ্য একলব্যর কাছ থেকে যে গুরুদক্ষিণা গ্রহণ করেছিলেন তার জন্য তিনি যুগে যুগে ধিক্কার লাভ করেছেন।

প্রাচীন ভারতের আশ্রম বা গুরুগৃহের নাম।
মহাঋষি বাল্মীকির আশ্রম ছিল কানপুরের নিকটে বিঠুরে।
সপ্তর্ষি আশ্রম ছিলো হরিদ্বারে যেখানে সপ্ত ঋষি বশিষ্ঠ, কাশ্যপ, অত্রি, বিশ্বামিত্র, জন্মদগ্নি, ভরদ্বাজ ও গৌতম মুনি তপস্যা করতেন বা শিষ্যদের শিক্ষা দান করতেন।
মধ্য প্রদেশের উজ্জয়িনীতে সন্দিপনী আশ্রম এখনও বিদ্যমান যেখানে পুরাণের তথ্য অনুযায়ী শ্রীকৃষ্ণ শিক্ষা লাভ করেছিলেন।

সেকালে গুরু কী ভাবে শিক্ষা দিতেন?
সুদূর প্রাচীন কালে যখন লেখা আবিষ্কার হয় নি, তখন গুরু শিষ্য মুখোমুখি বসে শিক্ষার আদান প্রদান করতেন। গুরুর মুখ নিঃসৃত শিক্ষা শিষ্য শ্রবণ করেই শিখতেন। কোন জিজ্ঞাসা থাকলে গুরুকে প্রশ্ন করতেন। এই জ্ঞানার্জন পদ্ধতির নাম ছিল শ্রুতি।
আরও একটা পদ্ধতি ছিল -স্মৃতি, অর্থাৎ মনে রাখা। গুরুর থেকে শিষ্য, সেই প্রথায় সেই শিষ্য আবার তার শিষ্যকে যুগে যুগে যে জ্ঞান বিতরণ করেছেন তারই নাম স্মৃতি। সকল বেদ, উপনিষদ, পুরাণ, গীতা, ইত্যাদি এই পদ্ধতিতেই শ্রুতি আর স্মৃতির মাধ্যমে বৈদিক যুগ পার করে আজ পুস্তকের আকার ধারণ করেছে। কে লিখেছেন কেউ জানেন না। এমন সাহিত্য পৃথিবীতে তুলনাহীন।

প্রকৃতির মাঝে অরণ্যে ঘেরা পরিবেশে গুরু-শিষ্যের এই শিক্ষা দান আর গ্রহণ করা কী মনে হয় এই শিক্ষা সংঙ্কীর্ণ দৃষ্টি ভঙ্গীর সৃষ্টি করেছিলো?
না, তা ভারতের ক্ষেত্রে কখনোই হয় নি। রবীন্দ্রনাথ তাঁর Sadhana, The Realisation of Life বইতে খুবই স্পষ্ট ভাবে উল্লেখ করেছিলেন –“এই সব অরণ্যে মুনিঋষিদের মাঝে বসবাস করা লোকেদের নিস্তেজ, অলস, সংঙ্কীর্ণ মনের, আর নিজেদের উন্নতি করায় উৎসাহহীন মনে হতে পারে। প্রতিনিয়ত প্রকৃতির মাঝে থাকা তাদের মানসিক বিকাশে কোনো অন্তরাল সৃষ্টি করেনি, বরং মন উন্মুক্ত হয়েছিল। এমন পরিবেশে থেকেই তাঁরা উপলব্ধি করেছিলেন যে মানব আত্মা বা ব্রাহ্মণ আর এই বিশ্ব ব্রহ্মান্ড একে অপরের সাথে জড়িত আছে, কেউ সতন্ত্র নয়,একে অপরের পরিপূরক। এমন উপলব্ধি বিশ্বে আর কোথাও হয়েছে কী?”

ফাস্ট ফরওয়ার্ড – একুশ শতকের শিক্ষা ও শিষ্য।
বৈদিক যুগের গুরুকূল থেকে আমরা এখন পৌঁছেছি একুশ শতকের শিক্ষা ব্যবস্থায়। সময়ের প্রয়োজনে, সমগ্র বিশ্ব জুড়ে কোটি কোটি ছাত্রদের শিক্ষাদানের তাগিদে ও বিজ্ঞানের প্রসারের ফলে সকল শিক্ষাপ্রণালীর আমূল পরিবর্তন হয়েছে যাকে বলা যায় Paradigm shift! বৈদিক যুগের গুরুকূল পরিণত হয়েছে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে। শিষ্য হয়েছেন ছাত্র। নিঃশুল্ক শিক্ষার পরিবর্তে শিক্ষক এখন সেবার বিনিময়ে আর্থিক উপার্জন করেন। বিদ্যালয়ের শিক্ষা ছাড়াও এখন শিক্ষার ব্যাপ্তি বিভিন্ন ক্ষেত্রে ক্রমবর্ধমান, যেমন নৃত্য, গীত, খেলাধুলা, শরীরচর্চা, ইত্যাদি। সকল ক্ষেত্রেই গুরু এবং শিষ্য আছেন, কিন্ত গুরুর প্রতি শিষ্যের সমর্পণ কম বেশি একই রকম আছে। আজও রাস্তা চলতে চলতে ছাত্র শিক্ষকের চরণ স্পর্শ করেন, শ্রদ্ধার জ্ঞাপন করছেন এমনটি দেখা যায়।

আজ বড় হয়ে আমরা সেই শিক্ষকদের কথা কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করি যাঁরা আমাদের গড়ে উঠতে সাহায্য করেছেন। আমরা তাঁদের সম্মান জানাই যারা আমাদের শিক্ষাদানের পাশাপাশি জীবনের পথে সঠিক নির্দেশনা দিয়েছেন।আজও আমরা সেই সব শিক্ষককে শ্রদ্ধা জানাই, যারা আমাদের স্বতন্ত্র সত্তা ও ভবিষ্যতের স্বাবলম্বী মানুষ হয়ে ওঠার পিছনে কারিগরের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।

“এই জগতে পিতামাতা, সুহৃদ-বন্ধু, বিদ্যা বুদ্ধি, তীর্থসমূহ এবং দেবদেবী কেউ গুরুদেবের সমতুল্য হইতে পারে না, যেহেতু শ্রীগুরুদেবই একমাত্র সেই পরমব্রহ্মপদ শ্রীঘ্রই লাভ করাইয়া দিতে পারেন।”

খ্রিস্টপূর্ব ৩৭০-২৮৩ অব্দ সময়কালে কৌটিল্য বা চাণক্য, প্রাচীন ভারতীয় অর্থনীতিবিদ, দার্শনিক ও রাজ-উপদেষ্টা এবং অর্থশাস্ত্র নামক রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিষয়ক বিখ্যাত গ্রন্থের রচয়িতা বলেছিলেন:
“বিদ্বত্ত্বঞ্চ নৃপত্বঞ্চ নৈব তুল্যং কদাচন।
স্বদেশে পূজ্যতে রাজা বিদ্বান সর্বত্র পূজ্যতে॥”
অর্থাৎ একজন রাজা কেবল নিজের রাজ্য বা দেশের মধ্যেই সম্মান ও ক্ষমতা পান, কিন্তু একজন জ্ঞানী বা বিদগ্ধ ব্যক্তি তাঁর জ্ঞানের গুণের জন্য সব দেশেই বা সর্বত্র সমাদৃত ও পূজিত হন। অর্থাৎ, ক্ষমতার চেয়ে বিদ্যার সম্মান অনেক বেশি স্থায়ী এবং সর্বজনীন।

*******

Sahityika Admin

Add comment