ভূতের গল্প
© দীপঙ্কর রায়, ১৯৮০ সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং
ঠিক দুক্কুর বেলা, ভূতে মারে ঢেলা …
বিল্টু বলল, ও ভূতের কান্না শুনেছে। ওদের বাড়ির পাশের নিমগাছের ডালে বসে নাকি ভুত ডাকে …
ছোট্টবেলায় আমার যৌথ পরিবারে বেড়ে ওঠা। আমরা থাকতুম বরানগরের এক দোতলা পুরণো চক মেলান বাড়িতে, সেখানে একঘর থেকে অন্য ঘরে যেতে হলে বিস্তর সিঁড়ি, উঠোন এসব পেরিয়ে যেতে হত। সেই দোতলার উঠোনের পাশ দিয়ে একটা করিডরের মত সরু রাস্তা পেরিয়ে পৌছাতাম বড় জেঠীমার ঘরে। রাতে তো জেঠীমার ঘরে শুতে যেতাম, তো ঐ উঠোনের পাশের করিডর দিয়েই যেতে হত। বিল্টু যেদিন ভুতের কান্না শুনল, সেদিন রাতেই ঐ উঠোনের আলসেতে আমার প্রথম ভূত দেখা। টিমটিমে আলোয় করিডর পেরুচ্ছি কোনদিকে না তাকিয়ে। দুধাপ সিঁড়ি নেমে করিডর পেরিয়ে আবার দুধাপ উঠতে হবে। আলসের ফাঁক দিয়ে পাশের জমির নিমগাছের ডাল দোল খাচ্ছে হাওয়ায়। এমন সময় হঠাৎই…
আলসের ওপর একটা সাদা ঘোমটা … দেখা দিয়েই মিলিয়ে গেল। চোখটা কচলে ওঠার আগেই আবার তারপর আবার…
– হরে মুরারে মধুকৈটভারে …
ঠাকুমার শেখানো কৃষ্ণমন্ত্র তারস্বরে চেঁচিয়ে দুই লাফে আমি সোজা জেঠীমার ঘরে। হাঁফাচ্ছি সমানে
– কি হল? কি হল গোপালটুক? ভয় পেয়েছ?
জেঠীমা আমাকে ডাকতেন গোপালটুক বলে।
– ভূঊঊঊঊত… ভূঊঊঊঊত
জেঠু অধ্যাপক মানুষ, চেয়ারে বসে একটা দুরূহ আঁক কষছিলেন। আমার হাঁফানি শুনে ধড়মড়িয়ে উঠে পড়েছেন
– ভূত? কোনখানে দ্যাখলা ভূতরে?
– ছাআআদে..আলসেতে ছিলতোওওওও
জেঠু একটা ছড়ি হাতে ছাদ উঠোনে বেরিয়েছেন আর জেঠীমা আমায় কোলে জড়িয়ে …
-ঠাকুর ঠাকুর ঠাকুর…
তারপর জেঠু ফিরে এল চট করে। হাতে একটা সাদা পাতলা চাদর। আলসের পাশে মেলা ছিল …
– অ্যাই বীরপুরুষ, দেইহা যা তর ভূতের চাদর …
**********
যখন কলেজে পড়ি, আবাসিক ছাত্র ছিলুম। হোস্টেলগুলো ছিল ক্যাম্পাসে ছড়ানো ছিটোনো। দ্বিশতাব্দী প্রাচীন ক্যাম্পাসের মূল গেট থেকে রাস্তা গেছে কলেজে ভবনে আর তার কিছু আগে এক রাস্তা মোড় নিয়ে ডাইনে চলে গেছে হোস্টেলের দিকে। এই মোড়ে ছিল একটা ছোট্ট কবরখানা। তো একদিন, সন্ধে গড়িয়ে রাত তখন বেশ হয়েছে, সেই কবরখানার পাশ দিয়ে হোস্টেল ফিরছি, হঠাৎ শুনি খুরখুর শব্দ …খুরখুরখুররর …
শুনশান রাস্তা ওভাল মাঠকে বেড় দিয়েছে। ঝুপসি আঁধারে ঘড়িঘরের সিল্যুয়েট। শব্দটা কবরখানার পাশ থেকে উঠে পিছন পিছন আসছে ..আমার ঘাড় ঘোরানোর সাহস হয়নি। সোজা চলেছি প্রায় চোখ বন্ধ করে, শেষে দশের কালভার্টের কাছাকছি এসে শব্দটা থেমে গেল …পিছন ফিরে দেখি, সত্যি বলছি, অন্ধকারের মধ্যে দুটো চোখ জ্বলছে। দশের কালভার্টে বন্ধুদের ঠেক, সেখান থেকে একটু তু তু করতেই ব্যাটা কুত্তা ন্যাজ নাড়িয়ে চলে এল .. যেন কিছুই হয়নি।
*********
নানা, এগুলো কোনো ভূতের গপ্প নয়। ভয় পাওয়ার গপ্প। আরেকবার ভূতের ভয় পেয়েছিলাম একটা ফোন পেয়ে। আমার অফিসের এক সহকর্মী। তার অবিশ্যি অন্য শহরে পোস্টিং, কিন্তু প্রায় একসঙ্গেই কোম্পানীতে আসার সূত্রে বেশ ঘনিষ্ঠতা ছিল। যোগাযোগ ছিল।
তো একদিন সে দুম করে চাকরি ছেড়ে প্রতিযোগী কোম্পানিতে চলে গেল। পেশাগত রেষারেষির কারণে এরপর থেকে যোগাযোগ ক্ষীণ হয়ে এল। সম্পর্কটা আবার ঝালিয়ে নেবার আগেই খবর পেলাম, ট্যুর থেকে সড়কপথে ফেরার সময় এক ভয়াবহ দুর্ঘটনায় মারা গেছে বিশ্বনাথ। যোগাযোগের আর দায় রইলনা।
এরপর কেটে গেছে বহুদিন, প্রায় দুই দশক। গৌহাটিতে থাকতে একদিন সন্ধ্যায় মোবাইল বাজল, পরিচিত নম্বর নয়। হ্যালো হ্যালো ..কিন্তু জবাবে একটা ঘসঘস শব্দ ছাড়া কিছু নেই।
– হ্যালো হ্যালো ..
এবার বহুদূর থেকে এক প্রতিধ্বনির মত আওয়াজ
– দীপাঙ্কার?
– হুজ স্পীকিং?
– ভাই ম্যায় বিশ্বনাথ…
হাত থেকে মোবাইলটা পড়ে গেল। বুকের মাঝে ধড়াস। আমার বাংলোর পিছনের পাহাড়ি টিলার ঝোপের বার্কিং ডিয়ারের ডাক ..
-কৌন বিশ্বনাথ?
– আরে গালি খায়েগা ক্যা?
-লেকিন …
কথা বাড়াইনি আর। মোবাইল দুদিন বন্ধ রেখেছিলুম। শেষে আরও খোঁজ টোজ নিয়ে জানতে পারি, না ইহলোকেই আছে সে। পথ দুর্ঘটনায় পড়েছিল সে ঠিকই, তবে বেঁচে ফেরে। শুধু যোগাযোগের অভাবে সে আমার কাছে হয়ে গিয়েছিল কেয়ার অফ পরলোক।
তবে এই সেদিন, বিশ্বনাথ সত্যি সত্যিই বৈতরণীর অপর পাড়ে চলে গেল। খবরটা শুনে মোটে বিশ্বাস হয়নি প্রথমে। খালি ভাবছিলাম, আবার হয়ত মোবাইল বেজে উঠবে ..
-দীপাঙ্কার?
একটুও ভয় পাবনা এবার…
*********






Add comment